মহীশুরের বাঘ, পর্ব-‌‌ছয়

মূল লেখার লিংক

মহীশুরের বাঘ (আগের পর্বগুলো)
অনেকদিন আগে থেকেই পিঠের অসুখে (সম্ভবত: ক্যান্সার) ভুগছিলেন হায়দার আলী। ভারতীয় ও ইউরোপীয় চিকিৎসকরা যথেষ্ট চেষ্টা করছিলেন তাঁকে সারিয়ে তুলতে। কিন্তু ক্রমেই তাঁর স্বাথ্যের অবনতি ঘটলো। ১৭৮২ সালের ০৭ ডিসেম্বর (কিছু কিছু ঐতিহাসিকের মতে ০৬ ডিসেম্বর) সকালে চিতোরে যুদ্ধ শিবিরে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন হায়দার আলী।
হায়দারের মৃত্যুর পর মহীশুরের মজলিসে শুরার সদস্যরা ঠিক করলেন, টিপু মালাবার হতে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত সংবাদটি গোপন রাখতে হবে; নইলে উত্তরাধিকার নিয়ে সালতানাতে বিদ্রোহ শুরু হতে পারে আর উপরি হিসেবে ব্রিটিশ-নিজামদের সমস্যা তো আছেই।
কিন্তু এত গোপনীয়তার পরও সুলতান হায়দার আলীর মৃত্যু সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই, মালাবারে টিপুর কাছে দূত পাঠানো হল যাতে দ্রুত তিনি রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তমে পৌঁছান।
০৯ ডিসেম্বর, ১৭৮২, সুলতান হায়দার আলীর মৃতদেহ চিতোর হতে রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তমে আনা হয়। সারা মহীশুর সালতানাতে উঠে শোকের মাতম।


সুলতান হায়দার আলীর সমাধি

বড় করে দেখুন: প্রথম ছবি- ১৮২৪সাল, এন্টিক প্রিন্ট ইন্ডিয়া, দ্বিতীয় ছবি-চালর্স এমিলিয়াস, তৃতীয় ছবি-হায়দার আলীর সমাধির বর্তমান চিত্র।সুলতান হায়দার আলীর মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে শুরু হলো মহীশুর সালতানাতের নতুন সুলতান কে হবে, তা নিয়ে লড়াই। হায়দারের পুত্রদের মধ্যে সবচেয়ে যোগ্য ছিলেন টিপু; হায়দার নিজেও টিপুকে রাজ্য পরিচালনার কাজে অন্য পুত্রদের চেয়ে বেশী প্রাধান্য দিতেন। কিন্তু প্রাসাদের ভেতরে টিপুর শত্রু কম ছিল না। হায়দার আলীর চাচাতো ভাই মুহাম্মাদ আমিন টিপুর পরিবর্তে হায়দারের অন্য পুত্র আব্দুল করিমকে সুলতান বানাতে চাইল। মুহাম্মদ আমিন ভেবেছিল টিপু বিদ্রোহ করবে। ফলে, দু’ভাই টিপু ও আব্দুল করিমের মধ্যে সালতানাতের উত্তরাধিকার নিয়ে যুদ্ধ হবে, দুর্বল হয়ে যাবেন উভয়ই। আর এর সুযোগে, মুহাম্মদ আমিন মহীশুর সালতানাতে নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করবেন। কিন্তু মুহাম্মদ আমিনের ষড়যন্ত্র ধরা পড়ে যায়। সমস্যা শুরু হবার আগেই তা শেষ করে দেন টিপু।
২২ ডিসেম্বর, ১৭৮২, বিশাল মহীশুর সালতানাতের সুলতান হিসেবে অভিষেক হল সুলতান মুহাম্মদ ফতেহ আলী খান টিপুর। সুলতান হায়দার আলী বিশাল সালতানাত রেখে গিয়েছিলেন। উত্তরে কৃষ্ঞা নদী হতে দক্ষিণে ত্রিবাংকুর রাজ্য ও তিনেভিলি, পূর্ব দিকে পূর্বঘাট হতে পশ্চিমে আরবসাগর।


টিপুর সুলতান হবার সময় মহীশুরের ভূ-অবস্থা

মহীশুরের সুলতান হবার পর টিপু সালতানাতের সমস্যাগুলো দিকে নজর দেন। বিদ্রোহ দমন আর ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালানা করার দিকে তাঁকে বেশি নজর দিতে হল। হায়দার আলীর মৃত্যুর সময় মহীশুরের সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় এক লক্ষ; টিপু সৈন্য সংখ্যা আরো বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সৈন্যদের উন্নত সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলেন। পণ্য ও ফসল উৎপাদন ও বন্টনের উপর কড়া নিয়ন্ত্রন আরোপ করলেন; ফলে, রাজস্ব বৃদ্ধি পেল, জিনিসপত্রের দাম সহনীয় পর্যায়ে নেমে এলো। আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা উন্নত করার ব্যবস্থা নিলেন, প্রতিটি অঞ্চলে কাজী নিয়োগ করা হল, আইন ও বিচার ব্যবস্থা নিয়ে লিখিত ফরমান/বিধান জারী করা হল। খুব দ্রুত পুরো মহীশুর সালতানাতে টিপু সুলতান তাঁর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্টা করলেন।টিপু সুলতান বুঝতে পেরেছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর উদ্দেশ্য শুধু ব্যবসায় করা নয় বরং তৎকালীন দুর্বল ভারত উপমহাদেশীয় রাষ্ট্র কাঠামোর দুর্বলতার সুযোগে রাজ্য বিস্তার করা। এখনই ব্রিটিশদের ভারত উপমহাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করা না গেলে মহা বিপদ! তাই, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এক হবার জন্য টিপু সুলতান দূত পাঠালেন মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ও মারাঠারাজ দ্বিতীয় মাধব রাও পেশবার কাছে কিন্তু কারো কাছ হতেই যথাযথ সদত্তুর পাওয়া গেল না।

হায়দারের মৃত্যুতে ব্রিটিশরা খুব স্বস্তি বোধ করে। নতুন উদ্যমে ব্রিটিশরা তাদের সামরিক সজ্জা করতে লাগল। মাদ্রাজে লেফটেনেন্ট জেনারেল আইরের পরিবর্তে দায়িত্বে এলেন মেজর জেনারেল জেমস স্টুয়ার্ট।


মেজর জেনারেল জেমস স্টুয়ার্ট। (ছবি: জর্জ রমনি)

ব্রিটিশরা হায়দারের মৃত্যুতে যারপরনাই খুশী হয়েছিল। মহীশুরে এখন নতুন সুলতান, তার উপরে সালতানাতের দাবী নিয়ে দুভাইয়ের মধ্যে সমস্যা, টিপু সুলতান ব্যস্ত মহীশুরে নিজের ক্ষমতা পোক্ত করার কাজে। ব্রিটিশরা ভেবেছিল মহীশুরকে কাবু করার এখনই মোক্ষম সময়। তাই, ব্রিটিশরা মহীশুরের পূর্বদিকে মাদ্রাজ কুঠি ও পশ্চিমদিকে বোম্বে কুঠির পরিচালনায় দুদিক হতে মহীশুরকে আক্রমন করে।১৭৮২ সালের ডিসেম্বরে হায়দারের মৃত্যুর পর বোম্বের ব্রিটিশ কুঠি হতে কর্নেল ম্যাথুজকে পাঠানো হলো মহীশুর পশ্চিমাঞ্চলের বেদনুর দখল করার জন্য। কর্নেল ম্যাথুজ দ্রুত পশ্চিমঘাট দিয়ে বেদনুর আক্রমন করেন। এসময় বেদনুরের মহীশুর নিযুক্ত প্রশাসক ছিলেন আয়াজ। বিশ্বাসঘাতক আয়াজ কর্নেল ম্যাথুজকে প্রস্তাব দেন- তাকে বেদনুরের গর্ভনর পদে বহাল রাখা হলে তিনি বেদনুর ব্রিটিশদের নিকট সমর্পন করবেন। কর্নেল ম্যাথুজ প্রস্তাব মেনে নিলেন। ব্রিটিশ বাহিনী বেদনুরে প্রবেশের সময় কিছু সংখ্যক মহীশুরীয় সৈন্য কর্নেল ম্যাথুজের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে। যুদ্ধে মহীশুর বাহিনী পরাজিত হয়। পরাজিত মহীশুরীয় সৈন্যরা পশ্চিমঘাট দিয়ে পালিয়ে যায়। ব্রিটিশরা ১৭৮৩ সালে ১৪ ফেব্রুয়ারী বেদনুর দখল করে নেয়। ব্রিটিশদের কাছে বেদনুরের পতন ও আয়াজের বিশ্বাসঘাতকতার খবর শুনে টিপু সুলতান খুব আহত হন। টিপু তখন বেদনুর পুনরুদ্ধার করার জন্য বিশ্বস্ত লুৎফ বেগকে পাঠালেন। কিন্তু লুৎফ বেগ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তেমন সুবিধা করতে পারলেন না, তিনি টিপুর কাছে আরো সৈন্য ও রসদ চাইলেন। এপ্রিল, ১৭৮৩-তে টিপু বিশাল মহীশুরীয় সৈন্যবাহিনী, বিপুল পরিমান গোলাবারুদ ও ফ্রেঞ্চ সৈন্য নিয়ে ব্রিটিশ বাহিনীর উপর মরণ আঘাত হানতে চললেন বেদনুরে। বেদনুরে ব্রিটিশ সৈন্যরা সাধারণ জনতার উপর ব্যাপক অত্যাচার করছিল। ফলে, টিপু বেদনুরের জনতার সাহায্য খুব সহজেই পেলেন। তিনদিক থেকে বেদনুর আক্রমন শুরু করেন টিপু। কর্নেল ম্যাথুজ তার সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করলেন কিন্তু টিপুর ভয়াবহ ত্রিমুখী আক্রমনের মুখে টিকতে পারলেন না। এদিকে, বেদনুরের বাইরে থেকে ব্রিটিশদের জন্য সব ধরনের সাহায্য আসার পথ বন্ধ করে দিয়েছেন টিপু। ভয়াবহ যুদ্ধে ও রসদের অভাবে কাবু হয়ে গেলো কর্নেল ম্যাথুজ ও তার ব্রিটিশ বাহিনী। অবশেষে কর্নেল ম্যাথুজ সন্ধি প্রস্তাব পাঠালেন। সন্ধির বিষয়বস্তু ছিল এরকম- ব্রিটিশরা সামরিক মর্যাদার সাথে সসস্ত্র অবস্থায় বেদনুর দূর্গ ছেড়ে যাবে। মহীশুর ব্রিটিশ সৈন্যদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে। টিপু জবাব পাঠালেন- ব্রিটিশরা মহীশুরের সৈন্যদের কাছে অস্ত্র আত্মসমর্পন করবে। এরপর, মহীশুর নিরস্ত্র ব্রিটিশ বাহিনীকে নিরাপদে বেদনুর ত্যাগের ব্যবস্থা করে দিবে। টিপুর এই প্রস্তাবকে অপমান হিসেবে দেখল কর্নেল ম্যাথুজ। তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু মহীশুর বাহিনীর সামনে বেশিক্ষণ টিকতে পারলো না ব্রিটিশ বাহিনী। অবশেষে, ২৮ এপ্রিল, ১৭৮৩-এ ব্রিটিশ বাহিনী বাধ্য হয়ে আত্মসমর্পন করে। কর্নেল ম্যাথুজ ও তার সৈন্যবাহিনীকে বন্দী করা হলো ও মহীশুর রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তমে পাঠানো হলো। ব্রিটিশ বাহিনী বেদনুর দখলের পর সেখানকার সাধারণ জনতার উপর ব্যাপক অত্যাচার চালায়, শ্রীরঙ্গপত্তমে ব্রিটিশদের এই যুদ্ধাপরাধের বিচার অনুষ্টিত হয়। ১৬ আগস্ট, ১৭৮৩-এ কর্নেল ম্যাথুজের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।

এদিকে, মহীশুরের পূর্বাঞ্চলেও ব্রিটিশরা মহীশূরের বিরুদ্ধে অগ্রসর হতে শুরু করলো। ১৭৮৩ সালের শুরুর দিকে, মেজর জেনারেল জেমস স্টুয়ার্ট মহীশুরের পূর্বাঞ্চলের ব্রিটিশ কুঠিগুলোতে রসদ সরবরাহ করতে শুরু করেন। ১৭৮৩ সালের ফেব্রুয়ারীতে মে. জে. জেমস স্টুয়ার্ট-এর নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী মহীশুরের পূর্বাঞ্চলের বন্দিবাস নামক এলাকা আক্রমন করে। টিপু সুলতান ও ফরাসী অফিসার কর্নেল কোসিনির নেতৃত্বে মহীশুর-ফ্রেঞ্চ যৌথ বাহিনী অবস্থান নিল বন্দিবাসের নদীর তীরে। ১৭৮৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারী দুপক্ষের মাঝে যুদ্ধ হলো। টিপুর কামান আর রকেটের তুমুল আক্রমন আর অশ্বারোহী বাহিনীর একের পর এক ভয়াবহ আক্রমনে কোনঠাসা হয়ে পড়ল ব্রিটিশ বাহিনী। কোন উপায় না দেখে মে. জে. জেমস স্টুয়ার্ট পিছু হটে যান।
০৭ জুন, ১৭৮৩, মে. জে. স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী মহীশুরের কোড্ডালোর অবরোধ করে। মহীশুরাধীন কোড্ডালোরের দায়িত্বে তখন ছিল ফ্রেঞ্চ অফিসার মারকুইস ডি ব্যাসি ক্যাস্টেলন্যুঁ
১৩ জুন মে. জে. স্টুয়ার্ট কোড্ডালোর দুর্গের সন্মুখভাগে আক্রমন চালান। ব্রিটিশ গোলন্দাজ বাহিনীর আক্রমনে পিছু হটে যায় মহীশুর-ফ্রেঞ্চদের যৌথ বাহিনী। দুর্গের ভিতর অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে মহীশুর-ফ্রেঞ্চ যৌথবাহিনী।


কোড্ডালোর যুদ্ধ (ছবি: রিচার্ড সিমকিন)

ফ্রেঞ্চদের আঁকা কোড্ডালোর যুদ্ধের মানচিত্র। (বড় করে দেখুন)

কোড্ডালোর দুর্গে অবরুদ্ধ মহীশুর-ফ্রেঞ্চ যৌথবাহিনীর জন্য আরো দু:সংবাদ অপেক্ষা করছিল। অ্যাডমিরাল এডওয়ার্ড হিউ-এর নেতৃত্বে কোড্ডালোরে সমুদ্রপথে ব্রিটিশদের জন্য রসদ ও সৈন্য আসতে থাকে। মে. জে. স্টুয়ার্ট প্রয়োজনীয় রসদ ও সৈন্য পেয়ে নতুন করে আক্রমন শুরু করেন কোড্ডালোর দূর্গে; ব্রিটিশ গোলন্দাজদের প্রচন্ড আক্রমনে কোনঠাসা হয়ে পড়ে মারকুইস ডি ব্যাসি ক্যাস্টেলন্যুঁর যৌথ মহীশুর-ফ্রেঞ্চ বাহিনী।এসময় আসে সুসংবাদ………
(চলবে)

পাদটীকা

  • ১. বেদনুরে মহীশুরের একটি কোষাগার ছিল।
  • ২. ইতিহাসে একে বলে হায়দারঘুরের যুদ্ধ।
  • ৩. ১৭৮২ সালে সুলতান হায়দার আলী ও ফ্রেঞ্চ অ্যাডমিরাল সাঁফ্রেনের মধ্যে চুক্তি হয়- কোড্ডালোরে নতুন ফ্রেঞ্চ কুঠি খুলতে মহীশুর সাহায্য করবে, বিনিময়ে ফ্রেঞ্চরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মহীশুরকে সাহায্য করবে। এর প্রেক্ষিতে ৮ এপ্রিল, ১৭৮২, মহীশুর বাহিনী কোড্ডালোর জয় করে নেয়।
  • ৪. কোড্ডালোর তখন মহীশুরের অধীন ফ্রেঞ্চ কুঠি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: