অশ্রু ঝরিয়েছিল যেসব সিনেমা

মূল লেখার লিংক

৯৪ সাল, রোজার ঈদ। জীবনে প্রথমবারার মত, ঈদে বাংলা সিনেমা দেখতে বসেছি। ছোট ছিলাম, কিন্তু বেশ আত্মসম্মানবোধ ছিল , সেটা থেকেই সম্ভবত সহজে কিছুতে কাঁদতাম না। সিনেমা শুরু হল , শাবানা-আলমগীর অভিনীত “মরণের পরে” ।ঘন্টাখানেক যাবার পরে ঘাড় শক্ত করে ফেললাম , ঘুরলেই অঝোর ধারায় বেয়ে পড়া অশ্রু সবাই দেখে ফেলবে :( । নাক টানা যাবে না , শব্দ শুনে সবাই বুঝে যাবে । চারপাশে অনেক নাক টানার শব্দ শুনছি , কিন্তু আমি স্থির । চোখের পানি , নাকের পানি একাকার হয়ে বন্যা বইয়ে দিল ঈদের সেই বিকাল। নিজের ভেতর চাপা অভিমান , ঈদের দিনে কি দরকার ছিল এসবের ?

জীবনের প্রথম কষ্টের সিনেমা দেখার স্মৃতিটা হঠাৎ খুব বেশি করে মনে পড়ে গেল খানিক আগে। তারপর, ১৮ বছর কেটে গেছে , এখনও কিছু মুভি ভেতরটায় এমনভাবে রেখাপাত করে, চেষ্টা করি মন খারাপের হলে সেটা বুকের ভেতরে জমা রেখে দিতে ।তারপরও কিছু সিনেমায় একদমই অসহায় করে ফেলে , অশ্রুর বাঁধ মানেনি কিছুতেই।

সিনেমার নাম: Sin Nombre
দেশ: Mexico
সাল: 2009

স্বদেশের মাটি ছেড়ে ঠিক যেখানে পড়ে আছি,জীবিকার তাগিদে পাশের দেশগুলি থেকে অবৈধভাবে আসা কিছু মানুষ অহরহই চোখে পড়ে। এই মানুষগুলির গল্প নিয়েই ২০০৯ সালের মেক্সিকান মুভি “Sin Nombre”। ধূসরিত জীবনে একটু রঙের প্রত্যাশায় অনিশ্চয়তার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে এক পরিবারের ৩ সদস্যের। দুর্গম সে যাত্রায় আত্মার বন্ধনে আবদ্ধ ৩ যাত্রী জানে, সীমান্তরের ওপাড়ের প্রথম সূর্যোদয়টা তাদের একসাথে কখনও দেখা হয়ে উঠবে না। তবুও জীবন বাজি রেখে প্রতিকূলতা জয় করার সংকল্প। স্বপ্নের অনেকগুলো ফানুস নিভে যাবে , কেউ হারিয়ে যাবে চিরতরে , কেউ বা শুরু করে নতুন করে। ভীষণ বাস্তবতাকে উপজীব্য করে বানানো মুভিটা ভেতরটা ছুঁয়ে দেয় , নিজেকে পৃথিবীর অনেক মানুষের চেয়ে অনেক সুখী মনে হয়।

সিনেমার নাম: Journey of Hope
দেশ: Turkey
সাল: 1990

Journey of Hope এর যাত্রাটাও Sin Nombre এর মতই। গল্পটা হয়ত একটু ভিন্ন, কিন্তু পৃথিবীর এ প্রান্তেও স্বপ্নটা একই। তুরস্কে একটি পরিবারের জীবন কেটে যাচ্ছে টানাটানিতে, কিন্তু জীবনে আরেকটু প্রাপ্তির আশায় কিংবা সন্তানদের একটা নিশ্চিত ভবিষ্যত উপহার দিতে স্বর্গভূমি সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে সন্তানকে নিয়ে যাত্রা করে বাবা-মা। দর্শকের মনে অভিমান ভর করে , প্রশ্ন জাগবে কেন এ অনিশ্চিত যাত্রা? অথচ যাত্রীদের উত্তর বা আবেগ অনুভব করা যাবে না মেনে নিয়েই , মনে মনে তাদের আশীর্বাদ করতেও ভুল হয় না। আমাদের অজস্র শুভকামনা কি শেষ পর্যন্ত তাদেরকে সেলুলয়েডের ফিটায় স্বর্গভূমির সন্ধান দিতে পারে ?

সিনেমার নাম: Welcome
দেশ: France
সাল: 2009

শুধু কি একটু স্বচ্ছলতার নেশাতেই সীমানা পেড়োনোর প্রতিজ্ঞা ? ভালবাসা কি পারেনা মানুষকে জীবন তুচ্ছ করে সাহসী হতে ?ভালবেসে মানুষ কতটা বেশি উজাড় করে দিতে পারে , সাহসের সীমানা কোন দিগন্ত ছোঁয়? সে উত্তরটি মেলে Welcome সিনেমায়। এক জোড়া হৃদয়ের মাঝে হাজার হাজার মাইলের দূরত্ব ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয় , মাঝে কেবল পড়ে থাকে ইংলিশ চ্যানেল। সমুদ্র পেড়োলেই নতুন সকাল । সকাল কি হবে সত্যিই ? সকাল হয় ঠিকই, হৃদয়কে দুমড়ে মুচড়ে রক্তাক্ত করে রক্ত সূর্য ওঠে।

সিনেমার নাম: My Father and My Son
দেশ: Turkey
সাল: 2005

মাই ফাদার এন্ড মাই সান নিয়ে আলাদা করে কিছু বলবো না , দেখবার দায়িত্ব দর্শক দর্শকদের কাছেই ছেড়ে দিলাম। কি কষ্ট , ভীষণ কষ্ট , এখনও ভাবলে গলা ধরে আসে ,ভেতরটা যেন দলা পাকিয়ে যায়।

সিনেমার নাম: Never Let Me Go
দেশ: United Kingdom
সাল: 2010

“Never Let Me Go” , ভীষণ ছুঁয়ে যাওয়া কথা, আকুতি, কি সিনেমার অনেক কিছু বলে দেয় না? সম্ভবত না , আরও অনেককিছু বাকি রয়ে যায় । শুধু নিখাদ কষ্টের কথা বললে কম হবে , সিনেমাটা এক কথায় অসাধারণ এক সৃষ্টি। দেখার পর অনেকগুলো ঘন্টা মনটা নিথর হয়ে ছিল, অবাক লাগে , এমন থিমের কোন মুভিও এতটা দাগ কাটতে পারে? বিষাদে ভরা ভীষণ জীবন্ত আবহ সঙ্গীতটা আমার প্রচন্ড রকমের প্রিয় ।

সিনেমার নাম: The Painted Veil
দেশ: United Kingdom
সাল: 2006

মুভিটা দেখতে উৎসাহিত হয়েছিলাম প্রিয় অভিনেতা নর্টন আর কলেজ জীবনে পরিচয় হওয়া প্রিয় লেখক উইলিয়াম সমারসেট মম এর গল্প দেখে । হতাশ হটে হয়নি এক ফোঁটাও। ভিজ্যুয়ালী স্টানিং , দর্শককে চুম্বকের মত ধরে রাখার অনবদ্য শৈলী কোনটি নেই সিনেমায় ? তবে বোধ করি, যাদের কাছে বিবাহিত জীবন এখনও ছবি , তাদের কাছে সিনেমার থিমটা দুর্ভাগ্যক্রমে ফস্কে যেতে পারে।

সিনেমার নাম: After the Wedding
দেশ: Denmark
সাল: 2006

ড্যানিশ সিনেমার সাথে আমার পাকাপাকি প্রেমের সূচনা After the Wedding দেখে । শেষ পর্যন্ত মনস্তত্ব , ভালবাসা , মানবিকতা, আর মায়ার বাঁধনে আটকে যাওয়া আট-পৌরে মানুষেরই গল্প। ভাললাগার গল্প , নিঃস্বার্থ হওয়ার গল্প।

সিনেমার নাম: The Song of Sparrows
দেশ:Iran
সাল: 2008

হৃদয়কে নিংড়ে দেয়া মুভির কথা বলব , অথচ ইরানী মুভির নাম আসবে না , এমনটা ভাবাই মোটামুটি অস্বাভাবিক। আর পরিচালক যদি হন মাজিদ মাজিদি , তাহলে আর বেশি কিছু বলার থাকে না। মাজিদির অসামান্য সৃষ্টি এই “The Song of Sparrows”। শুধু কষ্টই দিয়ে যায় তা নয় , মনোহর রঙের ছোপ ছোপ স্মৃতি আর ভাললাগার অসামান্য রেশটুকুও থেকে যায় বহুদিন।

সিনেমার নাম: A Moment to Remember
দেশ: South Korea
সাল: 2004

কোরিয়ান সিনেমা এর কথা খানিকটা বলতেই হবে। প্রথম ঘন্টায় সিনেমা যতটা এগুতে থাকে ঢালিউডের বাংলা সিনেমাগুলোর সাথে মিলটা ক্রমশ পাকাপোক্ত হয় । এতটা সময় ধৈর্য ধরে অপেক্ষা যারা করতে পারবেন, সিনেমা শেষ হওয়ার পর কারও আর আক্ষেপ থাকবে না। জোর করে কাউকে এই সিনেমা দেখতে বলব না , কিন্তু এতটা বলতে পারি , এই সিনেমা ছাড়া , খুব ভাল ব্যাখ্যা ছাড়াই হৃদয় ভেঙে গেছে , এমন সিনেমার খুব বেশি উদাহরণ আর সম্ভবত দিতে পারব না।

এবার পাঁচটি অসামান্য সিনেমার নাম বলব কেবল , বিস্তারিত বলার সম্ভবত কিছুই নেই

সিনেমার নাম: Taare Zameen Par
দেশ: India
সাল: 2007

সিনেমার নাম: পথের পাঁচালী
দেশ: পশ্চিম বাংলা
সাল: ১৯৫৫

সিনেমার নাম: অপরাজিত
দেশ: পশ্চিম বাংলা
সাল: ১৯৫৭

সিনেমার নাম: অপুর সংসার
দেশ: পশ্চিম বাংলা
সাল: ১৯৬০

সিনেমার নাম:Dhobi Ghat
দেশ: India
সাল: 2011

গত বছর মুক্তি পাওয়া এই সিনেমার আবেদন অসামান্য , খারাপ লাগার অনুভূতিটা রয়ে গেছে এখনও

সিনেমার নাম:Cinema Paradiso
দেশ: Italy
সাল: 1988

শৈশব-স্মৃতিকে উপজীব্য করে বুক ভেঙে দেয়া সিনেমার কথা বললে সম্ভবত অনেক মুভি-বোদ্ধাই সিনেমা প্যারাদিসোর নাম বলবেন সবার আগে। একটা কথা বারবার কেবল মনে হয় — প্রতিটা মানুষের জীবনেই একজন “আলফ্রেডো” আছে , একান্তই যদি না থাকে , তবে কল্পনাতেই আলফ্রেডোর জন্ম হয়।মাস্ট সি

সিনেমার নাম: Central Station
দেশ: Brazil
সাল: 1998

শৈশবের আরেকটি হৃদয় ভেঙে দেয়া সিনেমা । Central Station কেবল একটা দৃশ্যে কাঁদিয়ে বহুদিন হৃদয়ের কোঠরে স্থান করে নিয়েছে বহু সিনেমাবোদ্ধার

সিনেমার নাম: The Year My Parents Went on Vaccation
দেশ: Brazil
সাল: 2006

বাদ যাবে কেন ব্রাজিলের ৭০ দশকের সামরিক জান্তার যাঁতাকলে পিষ্ট হো্যা উত্তাল দিনগুলিতে শৈশব হারানো অনেক শিশুর কথা ? অসাধারণ সিনেমা

শেষ করব সত্যি ঘটনার উপর ভিত্তি করে নির্মিত দু’টি জাপানী চলচ্চিত্রের কথা বলে।

সিনেমার নাম: One Litre of Tears
দেশ: Japan
সাল: 2005

আয়া কিতোর (Aya Kitō) দুরারোগ্য ব্যাধিটি প্রথম ধরা পড়ে ১৫ বছর বয়েসে , ১৯৭৭ সালে । স্কুল পড়ুয়া মেয়েটির লড়াই শুরু সেখান থেকেই । এক দশকেরও বেশি সময় প্রবল লড়াইয়ের পর একসময় হারিয়ে যায় আয়া, পেছনে পরে থাকে তার দশ বছরে ভরে ওঠা ডায়েরি , আর শোকাচ্ছন্ন জাপান।

সিনেমার নাম:Nobody Knows
দেশ: Japan
সাল: 2004

১৯৮৮ সালে জাপানী এক মা তার প্রেমিকের হাত ধরে নিখোঁজ হয়ে যান। তার ফেলে যাওয়া অল্প বয়েসী চারটি ফুটফুটে শিশুর দায়িত্ব এসে পরে সদ্য কৈশোরে পা দেয়া বড় ছেলের পরের। পরের ঘটনাগুলো প্রচন্ড হৃদয়-বিদারক।

2 Comments to “অশ্রু ঝরিয়েছিল যেসব সিনেমা”

  1. দাদা, পচ্চিম বাংলা আবার দেস হল কবে থেকে? মমতাদি তার জল খসিয়ে পচ্চিম বাংলাকে দেস বানিয়ে ফেলচেন নাকি? জান্তুম না তো। আমি তো ভেবেছিলাম, এ সম্মান সুধু ঐ বাংলাদেসের চাসা-ভুসা বাঁঙ্গালদের।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: