মাচু পিচুর ট্রেনে চেপে, উরুবামবা নদীর তীরে

মূল লেখার লিংক

396116_10151210895190497_608590496_22929132_371341506_n

কাঁধের ভারী বোঁচকাগুলো নিয়েই ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়তে দৌড়তে কোনমতে ওয়্যানটাইটামবোর বিশ্বখ্যাত ট্রেনষ্টেশনে পড়িমড়ি করে ঢুকতে না ঢুকতেই প্লাটফর্মে কু ঝিক ঝিক করতে করতে এসে থামল ষ্টেশনটির বিখ্যাত হবার পিছনের মূল কারণটি- একটি ট্রেন!

400472_10151161930025497_608590496_22758967_953122677_n (1)

নিশ্চয়ই ভুরু কুঁচকে ভাবছেন- ডেঁপো ছোকরা, ষ্টেশনে ট্রেন আসবে না তো কি হাতি আসবে? এমন কথা শুনেছে কেউ কোন দিন?

জি না, কেউ শুনে নাই, এইখানে শোনাও সম্ভব না, বলছি আকাশ ছোঁয়া আন্দেজের কোল থেকে, হ্যানিবালের হস্তি বাহিনীর পক্ষেও সম্ভব হত না এত উঁচুতে সদর্পে আসা, আর ছোট্ট একটা কথা- এই মহাদেশে কোন হাতি নেই!

ট্রেনের কথায় ফিরে আসি আবার, ছবির মত পর্বতের বুক চেরা উপত্যকায় এসেছে দাঁড়াল সে, শরীরে লেখা- ইনকা রেল!
IMG_4478

এই সেই বিশ্বখ্যাত ট্রেন যা যাত্রীদের নিয়ে যায় বিশ্বের বিস্ময় ইনকা সভ্যতার পাহাড়ি শহর মাচু পিচুতে! সে ট্রেনে পা দেবার ভাগ্য অর্জন করাও বলা চলে দস্তুরমত সৌভাগ্য। অনেক ঝামেলা করে আমাদের তিনজনের টিকিট জোগাড় করতে পেরেছি, ট্রেন মিস হলে আমতো যাবেই , বাগানও যাবে।

396481_10151161928195497_608590496_22758963_1849344616_n

প্ল্যাটফর্মে রীতিমত নাম ডেকে, সীট নাম্বার মিলিয়ে, পাসপোর্ট চেক করে তবেই উঠার অনুমতি পাওয়া গেল। কিন্তু বড় ব্যাগ মানে ব্যাকপ্যাক সাথে রাখার অনুমতি নেই, সবার বড় বড় ছালাগুলোই আমাদের বগির একপাশে স্তুপ করে রাখা হল, এখন জায়গা মত পৌঁছে যার যার তা সহজে পেলেই হয়!

IMG_4476

সবার জন্য আলাদা আলাদা বসার ব্যবস্থা, একেক চামড়া মোড়া আসনে ২ জন আর মুখোমুখি ২জন, এক হালি মানব সন্তান। মাঝে সরু ফালি বেঞ্চ। তবে বেশ ঝক ঝকে তক তকে, চারিদিকে কেমন একটা সাহেবসুবো ভাব। এত দাম যে নিয়েছে কেবল ট্রেন টিকিটের জন্য তা মনে হয় পুরোপুরি বৃথা যায় নি।

IMG_4482

একদম ঘড়ির কাটার সাথে সময় মিলিয়ে ট্রেন ছেড়ে দিল বদর বদর বলে, শুরু হল আমাদের ঝাকাঝাকি। খানিক পরেই শহর, নগর, সভ্যতা চোখের আড়ালে পড়ে গেল, দুইপাশেই সবুজ পাহাড়ের আড়াল আর অপরূপ নিসর্গ।

এর মাঝেই পানীয় নিয়ে এল রেল কোম্পানির সুবেশী পরিচারিকা, তাদের সংগ্রহে আছে কোঁকা চা, কফি, সুপেয় জল, লেমোনেড।

IMG_4511

পেরুর আসার পর থেকেই সমানে কোঁকা চা গলাধঃকরণ করে চলেছি দলেবলে এই অল্প অক্সিজেনের বাতাসে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেবার জন্য, এই ক্ষেত্রেও তার ব্যতয় হল না। চায়ের কাপে আবার লেখা A Mystic Experience.

IMG_4518

টেবিলের উপর কাপ রেখে বাহিরের চলমান সবুজ সুন্দরে লেন্স ফোকাস করেছি কি করিনি, একজন এসে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলল- চায়ের কাপটি টেবিলের মাঝামাঝি রাখলেই ভাল হয় !
এটা আবার কি ধরনের কথা, আমার চায়ের কাপ, টেবিলে মাঝে রাখি আর নিচেই রাখি –ব্যাটা, সমস্যা কি ! কাপ উল্টে ট্রেন নোংরা না করলেই তো হল ! আর চার চারটে কাপই বা কোন হিসেবে সারি সারি বেঁধে টেবিলের উপর রাখব! কি আব্দার!

কিন্তু তার দূরদর্শিতার প্রমাণ পেলাম পরক্ষনেই হাতে নাতে, পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় চলতে চলতে যে ঝাকুনি দেয়া শুরু করল, তাতে টেবিলের মাঝে রাখা জিনিসও হালকা নৃত্যের তালে তালে কিনারের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল আত্মহত্যার জন্য, আর কিনারে এতক্ষণ থাকলে- পুরোই ঝপাং !

IMG_4506

মাঝে মাঝে রেললাইনের পাশ ঘেঁষেই হেঁটে চলা স্থানীয় কৃষক, কাঠুরেদের দেখা যাচ্ছিল, সেই সাথে সপ্তবর্ণা জীর্ণ পোশাক পরিহিতা মহিলাদের, তারা এই বিস্ময়কর বাহনের প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে হতক্লান্ত জীবনের একটি অপস্রিয়মাণ সন্ধ্যার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল ছোট ছোট পদক্ষেপে। ফাঁকা মাঠ মত এক জায়গায় মনে হল মেলা বসেছে, অনেক মানুষের সমাহার, সকলের গায়েই পনচো, ব্যাপার ঠিক বুঝে ওঠার আগেই সেই জমায়েৎ ট্রেনের গতির সাথে অসম পাল্লায় হেরে কেবলই স্মৃতি হয়েই রয়ল।

IMG_4496

গোটা কয়েক আঁধার সুরঙ্গও পাড়ি দিলাম সবাই, তার পরপরই রেললাইনের পাশেই দেখা মিলল সেই বুনো পাগলীর।

নাম তার উরুবামবা! নিঃসন্দেহে বিশ্বের সবচেয়ে খ্যাতিমান জলধারাদের একটি আন্দেজের বুক চিরে, মাচু পিচুর পা ছুয়ে চলে যাওয়া এই লাল রঙের স্রোতস্বিনী। উরুবামবা! উরুবামবা! নামের মাঝেই যেন শোনা যায় রণডমরু, বোঝা যায় নেহাৎ শান্ত শীর্ণ কোমল নদী নয় সে, যুদ্ধংদেহী, বিদ্রোহী, তেজি, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর এক ভাগ্যবিধাতা।

IMG_5253

নামের ব্যাপারে কিছু ছেলেমানুষি আছে আমার, কিছু কিছু নাম কারণে-অকারনেই কানে লেগে থাকে, সাত সমুদ্দুর পার হয়ে উদাত্ত আহ্বান জানায় তাদের জানতে, বুঝতে, দেখতে। যে কারণে সিডনী, নিউইয়র্ক, টরেন্টোর চেয়েও আমাকে বহুগুণে আকৃষ্ট করে হন্ডুরাসের এক মায়ান শহর যার নাম লুবানটুম, এই পেরুরই পর্বতে লুকিয়ে থাকা ইনকাদের পাহাড়ি রাজধানী ভিলকাবামবা, চীনের কাশগড়, মালির টিমবাকটুঁ । এর পিছনে কোন জানা যুক্তি নেই, কেবলই অন্য ধরনের এক ভাল লাগা কাজ করে, তেমনই এক উজ্জল নাম উরুবামবা।

প্রথম যখন নামটা পড়েছিলাম কিশোর পত্রিকার পাতায়, কর্ণকুহরে ভীম গর্জনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল সে, এসো আমার রহস্য উদ্ধারে কোন দিন, অবগাহন কর খরস্রোতা সলীলে, দেখবে কত রহস্য, কত অজানা গুপ্তধন আমি লুকিয়ে রেখেছি লোভী মানুষদের হাত থেকে তোমার মত রোমাঞ্চপ্রিয় কিশোরদের জন্য।

IMG_5274

অবশেষে প্রতীক্ষার পালা শেষ হল, দেখা হল টগবগ করে সমস্ত বাঁধা দলে ছুটে চলা নদীটির সাথে, যার নামের মতই সে রণহুংকারে মত্ত। এখন পৃথিবীর এই গোলার্ধে গ্রীষ্ম বলেই কি না জানি না, স্রোতের বেগ অত্যন্ত বেশী বোধ হল, সেই জল বেশী ধরনের লাল, হয়ত পরাস্ত ভূমির জন্যই!

IMG_5263

উরুবামবা কিছু বাসিন্দা বিশেষ করে পানকৌড়ি আর হাঁসেদের থেকে দূর থেকেই দেখা হল, শখ্য গড়ার সময় আর হল না এই যাত্রা। তারপর ছবি তোলাও ছিল বেজায় মুশকিল, তাই মাথা খাটিয়ে আর সব বাদ রেখে বাহিরের দৃশ্য উপভোগে মন প্রাণ ঢেলে দিলাম, জানালা ছাড়াও ট্রেনের ছাদের প্লাস্টিক ঢাকা অংশ দিয়েও বাহির বেশ দেখা যায়। এর ফাঁকেই সন্ধ্যের ঠিক আগমুহূর্তে পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্য- আগুয়াস কালিয়েন্তেস।

এখন সময় থিতু হয়ে আগামী সকালের গন্তব্যের জনা পরিকল্পনা করা, সেই গন্তব্য কোথায় সেটা যদি আপনারা না বুঝতে পারেন তাহলে বৃথাই লিখে চলেছি এতদিন ধরে—-

380135_10151150953185497_608590496_22721719_147184935_n

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: