দেশে বিদেশেঃ গান শোনা

যখন সেভেন এইটে পড়ি ফিডব্যাকের বঙ্গাব্দ ১৪০০ অ্যালবামটি বের হয়। ভারি চমৎকার কভার, ভাঁজ খুলে দেখা যায় প্রতিটি গানের লাইন আর সাথে পাতাজোড়া ব্যান্ড সদস্যদের ছবি। ক্যাসেটের দাম ছিল তখন চল্লিশ টাকা, একসাথে অত টাকা বের করা সহজ ছিল না। যাহোক কোনভাবে কিনে শুনার পরে মাথা ঘুরে গিয়েছিল, আরে এমন গান তো শুনিনি। এরকম গানের আগে কবিতার লাইন? কোথাও রোমাঞ্চ নেই, খাঁটি করুণ বাস্তবতা, এবং এই বাংলাদেশেরই কথা? অথবা মনে পড়ে তোমায় গানটির শেষ লাইনে “…এবং এক মিনিট নিরবতায়” কথাটির সাথে টিকটক টিকটক শব্দ? নাহ আরো কিছু গান শুনতে হচ্ছে।

কিনা হল আরো ব্যান্ডের গান। এই কথাটা খুব চলতো, ব্যান্ডের গান। রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, আধুনিক গান এইগুলি টিভি রেডিও তে চলতো। সন্ধ্যা ছয়টায় আধুনিক গানের অনুষ্ঠান ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে তে গৎবাঁধা বিটিভির সেটে আড়ষ্ট অচেনা নারী গাইতেন আধুনিক সঙ্গীত। বন্ধু যদি চলে গেলে নিষ্ঠুর বিধাতা হে আমায় তুলে নাও টাইপ গান। আর চলতো রবীন্দ্র নজরুল অথবা পল্লীগীতির অনুষ্ঠান। ব্যান্ডের গান ছিল অছ্যুত, টিভি প্রোগ্রামে তাদের দেখা যেতনা বললেই চলে। মাঝে মধ্যে বিপ্লব বা ওইরকম কেউ লম্বা চুল নিয়ে ধোঁয়াময় বিটিভি সেট অন্ধকার করে অদ্ভুত কিছু গান করতো, ওইটাই ব্যান্ড সঙ্গীত বলে চালিয়ে দেয়া হত। মিডিয়ায় ব্যান্ড বলতে এটুকুই। তাই নিয়মিত ক্যাসেট কিনতে হত গান শোনার জন্যে।

জেমস আর বাচ্চুর একটি ডুয়েল অ্যালবাম শুনি। ক্যাপসুল ৫০০ বা ওইরকম কিছু। একপিঠে এলআরবি আরেকপিঠে ফীলিংস। এক পিঠে হাসতে দেখ অথবা নীল বেদনা, আরেক পিঠে কত কষ্টে আছি। এরপরে একটানে ফীলিংসের সবকটা অ্যালবাম শুনতে থাকি। পুরো বুঝতাম না কিন্তু তন্ময় হয়ে শোনার মত কিছু গান। আঁকাবাঁকা মেঠো পথ ধরে হেলেদুলে কলসি কাঁখে চলেছে হারাগাছের নূরজাহান। শেষ ট্রেনের হুইসেল যখন অতীতে হারিয়ে যায়, তখন তোমার কাছে আনবে চিঠি মধ্যরাতের ডাকপিয়ন। ফুরিয়ে যাওয়া মানুষের মত নির্ঘুম রাত জেগে জেগে গীটার কাঁদতে জানে। জেমসের পুরোন দিনের গানে একটা চমৎকার জিনিষ ছিল গানের শেষাংশে জ্যামিং। প্রায় এক দেড় মিনিট শুধু মিউজিক। গীটারে জেমস আর ড্রামে ফান্টি। কীবোর্ডে আসাদ বলে নাকি একজন ছিল কভারে দেখতে পাই, কিন্তু ফীলিংসের গানে কিবোর্ডের মিউজিক আতসকাঁচ দিয়ে খুঁজতে হয়। আসলে জেমস আর ফান্টিরই রাজত্ব। বাংলার লাঠিয়ালের ইনট্রোতে ফান্টির ধুন্দুমার ড্রামবাজী শোনা একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা।

প্রথম কনসার্ট দেখার অভিজ্ঞতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রি ভবনের সামনে মাঠে। স্কুলে পড়ি তখন, ঐ মাঠের পাশেই স্কুল। বিরাট শাহী স্পীকার খাটিয়ে মঞ্চে গান গাইতে উঠলো রেনেসাঁ। ওয়েলকাম টু দ্য হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া। সাচ অ্যা লাভলি প্লেস। আর কি গান গেয়েছিল ভুলে গেছি, রেনেসাঁর গান মন দিয়ে শুনিনি তখনোও। এরপরে ফিডব্যাক। মঞ্চে মাকসুদের উপস্থিতি একটি অসাধারন জিনিষ। তিনি শুধু গানই গাননা তিনি শ্রোতাদের সাথে কথা বলেন। শ্রোতারাও তার জবাব দেয়। এইরকম প্রবল ক্যারিসম্যাটিক আরেক গায়ক ছিলেন দলছুটের সঞ্জীব চৌধুরী। তিনি গানের ফাঁকে ফাঁকে কৌতুক বলতেন অথবা কবিতা, মজা করে গান নিয়ে কোন একটি অভিজ্ঞতা বলতেন তারপর হঠাত দুম করে ভরাট গলায় গান ধরতেন আমি তোমাকেই বলে দেব কি যে একা দীর্ঘ রাত আমি হেঁটে গেছি বিরান পথে। তার মারা যাবার দিনটি একটি বিষাদময় দিন। ধরি মাছ না ছুঁই পানির মত গান গাওয়ার লোক দেশে আর কেউ রইলো না।

বেনসন অ্যান্ড হেজেস মাঝখানে তুমুল কনসার্ট করে ঢাকা মাতিয়ে দিল। শেরাটনে হল অ্যাম্পফিউশন, ওইখানে প্রথম অন্ধ বাউল শাজাহান মুন্সীর গান লাইভ শোনার সৌভাগ্য হয়। বাজনা বাজাচ্ছিল রেনেসাঁ, আর মঞ্চের মাঝে দোতারা হাতে শাজাহান মুন্সি গেয়ে চলেছেন, বাদিয়া মায়াডুরে কাঁদালে এমন করে এই কি প্রেমের প্রতিদান। অথবা সত্য কাজে কেউ নয় রাজী, সবই দেখি তানানানা। জাত গেল জাত গেল বলে। তার গায়কী অন্যরকম, তার উচ্চারন আলাদা জগতের। অ্যাম্পফিউশনের শেষে মঞ্চে উঠলো বাচ্চু আর মানাম। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দুজন, বাচ্চুর চোখ মানামের কীবোর্ডে আর মানামের বাচ্চুর গীটারে। এরা মিউজিক গুলে খাওয়া লোক, আঙুলের নাড়াচাড়া দেখে এরা ধরে ফেলে গান কোনদিকে যাচ্ছে। ঐভাবে দুইজন জ্যামিং চালিয়ে গেল কমপক্ষে পাঁচ মিনিট। আমি আমার সারা মাসের বেতন দিয়েও ঐ পাঁচটি মিনিট ফিরে পেতে চাই।

বড় একটি কনসার্ট হয়েছিল আর্মি স্টেডিয়ামে। আমি ঢুকার সময় শিরোনামহীন গান করছিল, ভাল শুনতে পাইনি। কোন একটি লালনের গান করছিল তারা এইটা আবছা মনে পড়ে। বুয়েটের কনসার্টে আমি খুব কম গেছি, একটিতে শিরোনামহীনের গাওয়া লালনগীতি শুনেছিলাম। অপার হয়ে বসে আছি, লয়ে যাও আমায়। চমৎকার। তো সেই অ্যাম্পফেস্টে এসেছিল জুনুন। হিন্দী পঞ্জাবী গান আমি তেমন শুনিনা, কিন্তু জুনুনের গীটার ও তবলার অভূতপূর্ব সম্মিলন এড়িয়ে চলা শক্ত। যাই হোক, সিল্ক রুট বা ওইরকম একটা হিন্দী গানের ব্যান্ডও এসেছিল। ওদের গান আমি আগে শুনিনি, কনসার্টে শুনে দুঃখই পেয়েছিলাম।

এরা নেমেছিল এলআরবির পরে। বিরাট ভুল সিদ্ধান্ত, মিসটেক অফ দ্য সেঞ্চুরী। এলআরবি যখন স্টেজে ওঠে তখন আঁধার নেমে এসেছে, স্টেজের আলো নিভিয়ে বাচ্চু গান ধরলো। সাথে গাইছে স্টেডিয়ামের প্রতিটি মানুষ। কিছুক্ষন পর বাচ্চু গাওয়া থামিয়ে দিল, গীটার থেমে গেলো, কীবোর্ডও। শুধু মৃদু ড্রামবিট। গান গেয়ে চলেছে স্টেডিয়াম। তুমি কেন বোঝনা তোমাকে ছাড়া আমি অসহায়। আমার সবটুকু ভালোবাসা তোমায় ঘিরে। আমার অপরাধ ছিল যতটুকু তোমার কাছে, তুমি ক্ষমা করে দিও আমায়। স্টেডিয়ামভরা লোক যেন বুঝাতে চাইল বাচ্চু সারাটি জীবন আমাদের গান শুনিয়ে এলে আজ রাতে আমরা তোমায় গান শোনাই এসো। এইরকম একটি মুহুর্তের সাক্ষী হয়ে থাকা ভাগ্যের ব্যাপার।

কনসার্ট কাঁপাতে জেমসেরও জুড়ি ছিলনা। তার কয়টা কনসার্ট কোয়ালিটি গান ছিল, যেমন সুলতানা বিবিয়ানা অথবা যাত্রা কিংবা নাগনাগিনীর খেলা। বুক কাঁপানো ড্রামবীটের সাথে জেমসের উদাত্ত কন্ঠের হৈ হৈ কান্ড রৈ রৈ ব্যাপার শুনে লাফিয়ে না ওঠা শক্ত। তার অনেকগুলি কনসার্টে গিয়েছি, সবগুলিতে তার গলা ঠিক থাকতো না। দুষ্ট লোকে বলে মাল খেয়ে টাল হয়ে আসত। সে যাই হোক, পুষিয়ে যেত তার গীটার জ্যামিংয়ে। মূল গানের সুর এদিক সেদিক করে পাগলের মত গীটার বাজাতো জেমস মিনিটের পর মিনিট, ক্যাসেটে ধারন করা মূল গানের খোলনলচে বদলে একবারে ভার্সন টু গান পরিবেশিত হত।

ক্যানাডায় আসার পর গানের জন্যে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ঢুঁ মারা শুরু করি। তখন ফ্রী এম্পিথ্রির দিন শুরু হয়ে গেছে, সিডি বের হবার দুই ঘন্টার মধ্যে গান আপলোড হয়ে যায়। নয়া ল্যাপটপ কিনেছি, ধুনায় ডাউনলোড শুরু করে দিলাম। এরপরে দেখি রাস্তা ঘাটে লোকে আইপড নিয়ে ঘুরাঘুরি করছে, আমারো কিনতে মঞ্চাইলো। তখন মাত্র এদেশে এসেছি হাতে পয়সাকড়ি নেই, লাঞ্চে খেতাম দুই ডলারের হটডগ। দুম করে একটা আইপড কিনে ফেলা সহজ ছিলনা। আইপড হাতে আসে আরো বছরখানেক পরে, ন্যানো। বৃত্ত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গান সিলেক্ট করতে হয়। অতি ঠান্ডা ব্যাপার। রিয়েল কুল। ঐ আইপড আমার এখনো আছে, চার বছরের উপরে হয়ে গেলো। আইফোন কিনার আগ পর্যন্ত আইপড ছাড়া আমি একটি দিনও ঘর ছেড়ে বেরোইনি, রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বাসে ঘুমাতে ঘুমাতে প্লেনে অথবা ট্রেনে আমি আমার আইপড ন্যানোতে বিশ হাজারতম বারের মত শুনতাম রোদ উঠে গেছে তোমাদের নগরীতে আলো এসে থেমে গেছে তোমাদের জানালায়।

টরন্টোয় ভিক্টোরিয়া পার্ক বলে একটা জায়গায় নানাবিধ বাংলা দোকানপাট। যথারীতি সিলডি ভাইয়েরা গ্রোসারী শপ চালাচ্ছেন দুনিয়া আলো করে। ওইখানে কিছু দোকানে গানের সিডি পাওয়া যায়। কিনি মাঝে মাঝে। সিডি শোনা হয়না, কিনি লজ্জাবশতই। এত গান শুনি গায়ককে একটা পয়সাও ছোঁয়াইনা বিরাট লজ্জার ব্যাপার। ইদানিং গান ডাউনলোডের সাইট কমে এসেছে, খুঁজে দেখতে হয় অনেক। তবে একটি সাইটে গান কিনতেও পারা যায়। মূল গায়কের কাছে কোন টাকা যায় কিনা কে জানে। নতুন সুবিধা হয়েছে ইউটিউব, প্রতিটি গানেরই মিউজিক ভিডিও বের হয় বা গানটি ইউটিউবে চলে আসে। এম্পিথ্রি হিসেবে ডাউনলোড করে সোজা চলে যায় আইফোনে। কিছুদিন আগে কয়েকটি দুর্দান্ত গান শুনেছিলাম ইউটিউবে, ওল্ড স্কুল বলে একটি ব্যান্ডের রূপকথা নেই অথবা জেমস ও শ্বেতাঙ্গ একটি অপেরা গায়িকার ফিউশন…অসম্ভব চমৎকার।

এখন শুনছি আনুশেহের গলায় প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের লিখা গান। এই মক্তবে নাই কুতুবে কেতাব, পাশ করিলে মিলেনারে মলানা খেতাব। মন দিয়া পড় আসল মাদ্রাসায়।

আমার এই তুচ্ছ লিখাটি তারেক মাসুদকে উৎসর্গ করলাম।

.

.

.

.

http://www.sachalayatan.com/mir178/43439

Advertisements

2 Comments to “দেশে বিদেশেঃ গান শোনা”

  1. অ-সাধারন। পড়ে অনেক আগের কথা মনে পড়ে গেল। স্কুলের কথা। মনে আছে?

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: