দেশে বিদেশেঃ পাবলিক বাস

বাংলাদেশে বাস ড্রাইভার (এবং ট্রাক ড্রাইভার) কে ডাকা হয় ওস্তাদ। ওস্তাদ অর্থাৎ দক্ষ, সুনিপুন, পটু। কোন একটি বিষয়ে অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী। চলাচলের প্রায় অনুপযুক্ত কিছু যানবাহন নিয়ে ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশ পাঁচ টনের রাস্তায় এরা যে ধুন্দুমার কান্ড লাগিয়ে দেয় এতে তাদের ওস্তাদ না ডেকে উপায় নেই।

ঢাকায় বাসের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ি ভার্সিটিতে ওঠার পর। উত্তরায় থাকি তখন, প্রতিদিন বাস ধরে ঢাবি আসতে হয়। গাজীপুর রুটের লাল বাসের নাম ছিল ক্ষণিকা। খুব সুন্দর নাম ঢাবির বাসগুলির, মিরপুর রুটে চলতো দুইটি বাস নাম ছিল বৈশাখী আর চৈতালি। যাইহোক ঐ ক্ষণিকা সকাল ৮টা থেকে ১০টা প্রতি ঘন্টায় একটি ট্রিপ মারতো। আমার এক বন্ধু গাজীপুর থেকে উঠতো, তারপরেই ঘুম। প্রতিদিন উত্তরা স্টপে উঠে দেখতাম সে ঘুমাচ্ছে। একবারে নিখুঁত প্রোগ্রাম করা ঘুম, আশপাশের হাউকাউ বাসের দুলুনি ঝাঁকুনি হর্নের প্যাঁপোঁ কিছুতেই তার ঘুম ভাঙত না, কিন্তু ঠিক আর্ট কলেজের সামনে স্পীডব্রেকারে বাস হালকা দুলে উঠার সাথে সাথে তার চোখ খুলে যেত।

লাল বাসের ড্রাইভারকে ডাকা হত মামা। সে এক অসম্ভব ভাগ্যবান মামা, নিয়ম ছিল বাসের সামনের আদ্ধেক মেয়ে পিছনের আদ্ধেক ছেলে বসবে। আমি পিছন থেকে দেখতাম মামাকে দেখা যাচ্ছে, কয় স্টপ পর পর মেয়েরা উঠছে আর পুরো মামা দেখা যাচ্ছেনা, খালি মাথাটা। একটু পরে মেয়েরা মামার সীট ধরে দাঁড়িয়ে গেলে মাথাটাও অদৃশ্য, খালি বাসটা চলছে দেখে বুঝা যেত চালক বলে কেউ আছে। বাসের ছিল একটি হেলপার, সেও মামা। সেই মামা নম্বর দুইয়ের কাজ ছিল দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকা, আর বনানী স্টপ আসতে আসতে মামার সাথে দরজা শেয়ার করতো একটি বা দুটি মেয়ে। শোনা যায় জার্মানীতে বাসে একবার আইন্সটাইন বসে ছিলেন আর একটি সুন্দরী হঠাত ঝাঁকুনিতে তার কোলে গিয়ে পড়ে আর ভারি লজ্জিত হয়ে বারবার বলতে থাকে সরি সরি। আইন্সটাইন মৃদু হেসে উত্তর দে, দ্য প্লেজার ইজ অল মাইন। সেরকম সকল প্লেজার বুকে ধারন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মামারা পথ পাড়ি দিতেন। সেই মামারা মজার মজার কান্ডও ঘটাতেন, একবার প্রাইম মিনিস্টার আসছে বলে রাস্তা আটকে দেয়া হয়, সবার সামনে ছিল বৈশাখী বাস। মামা ঘাড় বের করে চিৎকার করে ট্রাফিক পুলিশের উদ্দেশে বলেন, এই যে ভিতরে দেখতেসেন এরা পত্তেকে একেকটা প্রাইম মিনিস্টার। এদের কেলাস আসে, পরীক্ষা আসে। বলে একটানে বাস ছুটিয়ে দিলেন।

তখন মাত্র শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস ঢাকায় নেমেছে। প্রিমিয়াম বাস। সকল বাস শাহবাগ পিজি হাসপাতালের সামনে থামায় এরা থামানো শুরু করলো শেরাটনের সামনে। উত্তরা টু শেরাটন পনেরো টাকা, চড়ে নিজেকে বেশ দামী লোক মনে হত। ছোট ছোট টাটা বাস, অটোমেটিক দরজা আপনি খুলে যায়। ভাবতাম নাহ দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। ঐ প্রিমিয়াম বাসে চড়ে ঢাকার মানুষ সম্ভবত প্রথম লাইন করে বাসে ওঠা শিখে, তার আগে জোর যার বাস তার অবস্থা। পরে আরো একটি ল্যাভিশ বাস রাস্তায় নামে, নাম ছিল নিরাপদ। সম্ভবত কোরিয়ান বাস, খুবই প্রশস্ত। এতই এসি ছিল যে মাঝে মাঝে উঠে ঠান্ডা লাগতো। এই প্রিমিয়াম নিরাপদ বাসের ড্রাইভারেরা অন্যান্য সাধারন ওস্তাদের মতন লুঙ্গী এবং আধখোলা শার্ট পরে গাড়ি চালাতোনা, বাস চলতোও বেশ নিরাপদভাবে। তারা স্টপ ছাড়া কখনোই দরজা খুলতোনা, তখনকার হিসেবে বেশ রেভল্যুশনারী ব্যাপার।

মাঝে গ্রীন লাইন বলে একটা বাস নেমেছিল। উত্তরা টু মতিঝিল। সবুজ রঙের মাঝারী সাইজের বাস। ঐ লাইনের প্রত্যেকটি ড্রাইভার ছিল ফর্মুলা ওয়ান চ্যাম্পিয়ন। মহাখালী ফার্মগেটের গোলকধাঁধার ভেতর তারা যেমন সাঁই সাঁই করে গাড়ী বাস কাটিয়ে যেত তেমনটা আমি এনএফএসেও করিনি। কেউ যদি আমাকে ক্যাম্পাস থেকে ফোন দিয়ে বলতো কতক্ষন লাগবে আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম গ্রীন লাইন পেলে পঁয়ত্রিশ চল্লিশ মিনিট আর না পেলে এক ঘন্টা। সেই লিজেন্ডারি সার্ভিস আর আছে কিনা কে যানে।

উত্তরা থেকে মালিবাগ হয়ে মতিঝিল রুটে একটি বাস নামে আবাবিল। দুদিন পরে একই রুটে ছাড়ে আরেকটি বাস, নাম ছালছাবিল। তারপরে আরেকটি, অনাবিল। যেন কোন পিতা তার শিশুদের নামকরন করছেন। প্রতিটি আলাদা আলাদা মালিক বলেই জানতাম, মিলিয়ে মিলিয়ে নাম রাখার হিড়িক পড়েছিল কেন কে জানে। যাই হোক, তখন বাস বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থা যে কেউ আর আগেভাগে টিকেট কাটতো না, বরং পয়সা হাতে অপেক্ষা করতো। বাসস্টপগুলোয় বড় ছাতা টানিয়ে একটি টেবিল চেয়ার নিয়ে বসে থাকতো টিকেটম্যান, কোন একটি বাস আসলেই সেই বাসের কাউন্টার (অর্থাৎ টেবিল চেয়ার) থেকে সবাই টিকেট কিনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়তো। পার্ফেক্ট কম্পিটিশান।

এছাড়া আছে লোকাল বাস। এক নম্বর দুই নম্বর তিন নম্বর ছয় নম্বর ইত্যাদি। খাঁটি লক্কড় ঝক্কড় বাস, কখনো কাঁচ নেই তো কখনো দরজা ঠিক লাগে না। কালো রঙটির ডেফিনিশন হতে পারে ঐ বাসের ধোঁয়া, এছাড়া ড্রাইভারের ঠিক পাশের উঁচু জায়গা যেখানে লোকে বসার একটি সিট বিছিয়ে দেয়া হয় সেটি কোন কারনে ভয়ংকর গরম হয়ে থাকতো এই বাসগুলোয়। কিন্তু সুবিধা ছিল এই বাসগুলির ভাড়া, অসম্ভব স্বল্প ভাড়ায় বহুদূর যাওয়া যায় এই বাসগুলোয়। খেয়াল করলে দেখবেন এই বাসগুলো কখনোই পুরোপুরি থামেনা, হাল্কা গতি কমায় স্টপ আসলে আর ঐ অবস্থাতেই চটপট ওঠা নামা করতে হয়। বাসের হেল্পার নামার সময় চিৎকার দেয় বাম পাও বাম পাও, ডান পা আগে দিলে আছাড় খাওয়ার সম্ভাবনা। টাফ লাভ।

মাঝে কিছুদিন বিআরটিসির বেগুনী বাস নেমেছিল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নয় কিন্তু ভদ্রগোছের। ভাড়াও মাঝামাঝি। টাটা বাস, মাথার উপর ছাদে তিনটে স্পিকার। ঐ দিয়ে তারা গান ছেড়ে রাখতো দূরপাল্লার বাসের মত। একবার আমি সেই বাসে বাসায় ফিরছি, উপরে গান শুরু হল, আমি ন্যাংটা ছিলাম ভালো ছিলাম। আমার সামনে দুই দাড়িওয়ালা, একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেস করে, “আমি কি ছিলাম?” “ন্যাংটা ছিলেন ন্যাংটা”। প্রশ্নকর্তা অবাক হয়ে বলেন, এইটা আবার ক্যামন গান!

দূরপাল্লার বাস অন্য জিনিষ। আমি আন্তঃশহর জার্নি করতাম সাধারনত রাতে, একটা দিন বাঁচে। ঢাকা চিটাগং রুটে এস আলম বলে একটা লাইন ছিল, ঐ বাসের ড্রাইভারেরা রাস্তার মাঝে সাদা দাগটাকে ডিভাইডার মনেই করতোনা। পুরো রাস্তাটাই তার, চার লেনের রাস্তায় পাশাপাশি যাচ্ছে একটি ট্রাক আর একটি মিনিবাস, অতএব ঐ দুটোকে কাটাতে অপর লেনে উঠে ওভারটেক করা হত। মাঝে মাঝে রাস্তার পাশের ঘাসেও বাস উঠিয়ে দিত এরা। পুরো রাস্তা বাস উড়তো, তাই ভয়ে বাসে উঠেই দিতাম ঘুম। মাঝে হঠাত ঘুম ভেঙে গেলে চোখ মেলতেই দেখতাম আশপাশের ঘরবাড়ী জমি পর্বত সাইকেল হুন্ডা ট্রাক মানুষ গরু সব অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে পিছনে ফেলে প্রায় আলোর গতিতে চলেছে এস আলম। দুম করে আবার চোখ বন্ধ করে ঘুম দিতাম। মরলে না বুঝে মরাই উত্তম।

উত্তর আমেরিকায় বাস ড্রাইভারেরা ওস্তাদ নন, তারা গুলশানের অফিসার। টাই পরনে, চারটে কথা জিজ্ঞেস করলে একটার উত্তর দেয়। হেলপার নেই, ড্রাইভারের পাশে আমাদের মসজিদের দানবাক্সের মতন একটা ছিদ্রওয়ালা বাক্স, ওইখানে কয়েন ফেলতে হয়। গুলশানের অফিসারটি কিন্তু টাকা ভাঙ্গিয়ে দেবেনা, কয়েন না থাকলে বাড়ি যাও মুড়ি খাও। তার কাজ বাস চালানো, এবং ঐ করে তারা যেকোন বড় অফিসারের সমান বেতন পায়। মাঝেমধ্যে দুয়েকটা চ্যাটারবক্স ড্রাইভার মেলে বটে, কিন্তু অধিকাংশই মুখ গুলশানের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের গোমড়ামুখো ক্যাশিয়ারের মতন করে রাখে। এরা ইউনিয়ন ওয়ার্কার, ঠিক বাংলাদেশের সরকারী পিয়নটির মতন তার চাকরির ভয় নেই। আপনি কিসসুটি করতে পারবেননা ওদের।

অটোয়াতে যখন ছিলাম তখন বাসের জন্যে আলাদা রাস্তা দেখে ভারি অবাক হয়েছিলাম। জী হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন, আলাদা লেন নয় একেবারে আলাদা রাস্তা। ঐ রাস্তায় অন্য গাড়ি চলার হুকুম নেই। আমি ঢাকা শহরের তিন নম্বর বাস কি ক্ষণিকায় চড়া মানুষ, হ্যান্ডেলে হাত ধরার জায়গা পেতামনা। সেইখানে এমন এক শহর যেখানে মানুষই নাই বলে বাসের জন্য আলাদা রাস্তা বানিয়ে রেখেছে। শালার ফাউল।

অবশ্য টরন্টো শহর ওইরকম নয়। এটি নিউ ইয়র্কের ছোট ভাইয়ের মতন, বাসভর্তি মানুষ ২৪ ঘন্টা বাস সার্ভিস বিভিন্ন রকম টাউট বাটপারে শহর ভরা। বাসে উঠে আইপড কানে দিয়ে সুখে নিদ্রা দেয়া সবসময় নিরাপদ নয়। দুম করে রাত একটায় কিছু কিছু এলাকায় বাস থেকে নেমে পড়া উচিৎ নয়। ডাউনটাউনে প্রবল শীতেও ভিখারীর দল চেঞ্জ চেঞ্জ করে চেঁচায়। ঠিক যেন ঢাকা শহর, চোখ খোলা রেখে পথ চলতে হয় চিন্তা করে রাতে রাস্তায় নামতে হয়। ভারি আরাম। এই পরিবেশেই আমার বেড়ে ওঠা, পঞ্চইন্দ্রিয় সজাগ রেখে পথ চলা। টরন্টো তাই আমার কাছে ঢাকা শহরের মতই প্রিয়।

যাইহোক, বাস নিয়ে গল্প করছিলাম। দূরপাল্লার বাসে পুরো উত্তর আমেরিকায় মনোপলি একটি কোম্পানীর, গ্রেহাউন্ড। ছাই কুত্তা। অতি অখাদ্য সার্ভিস, এমনকি আমাদের ঢাকা বান্দরবান রুটের ডলফিন বাসেও সিট বুক করা যায়। এইখানে ফার্স্ট কাম ফার্স্ট সার্ভ, যে যার ইচ্ছেমত বসে। ফলে একটি গ্রুপ একসাথে বসাটা কঠিন হয়ে পড়ে। যন্ত্রনা। তবে কোস্ট টু কোস্ট আপনি ঘুরতে পারবেন এই বাসে, ক্যানাডার এক মাথা থেকে আরেক মাথা যেতে ছয় সাতদিন লাগার কথা। পাগল নাকি, ভাবছেন আপনি। আজ্ঞে না পাগল নই। দাম লাগে অনেক কম। আর রাস্তা ঘাটের সিনসিনারিও দেখা যায় হালকা পাতলা। সাথে চিপা সিটে বসার জন্য পাছাব্যথা ফ্রী। ক্যানাডার রাস্তাঘাট অতি মনোহর, একটি রোমান্টিক মন থাকলে বাসযাত্রা করাই যায়। আমি রোমান্টিক বানানই জানিনা তাই ঐ জার্নি করা হয়ে উঠেনি।

একবার আমি গ্রেহাউন্ডে করে কোথাও রাতে যাবো। সকালবেলা খবর এল ম্যানিটোবায় এক গ্রেহাউন্ড বাসে এক লোক তার পাশের প্যাসেঞ্জারের মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করেছে। তারপরে ঐ মাথা হাতে নিয়ে সে বাসেই বসে ছিল যখন অন্য প্যাসেঞ্জারেরা জানলা ভেঙে দৌড়। সাইকোপ্যাথ টাইপ কিছু। যাই হোক, ওইদিন রাত্রে আমি গ্রেহাউন্ডে চড়লাম। সাধারনত মোকামে পৌঁছে গেলে ড্রাইভারেরা স্পীকারে আওয়াজ দেয়, হে ভাইয়েরা উঠুন, চলে এসেছি ইস্টিশান। ওইদিন ভোরে গ্রেহাউন্ড যখন মোকামে পৌঁছালো তখন ড্রাইভার অতি গুরগম্ভীর কন্ঠে বললেন, ওকে উই হ্যাভ রিচড আওয়ার ডেস্টিনেশান সেফ অ্যান্ড সাউন্ড। আই কাউন্টেড, নোবডি লস্ট দেয়ার হেড।

সদ্য ঘুম ভাঙা আমরা বাসের সকল যাত্রী আকাশ ফাটিয়ে হেসে দিলাম।

.

.

.

http://www.sachalayatan.com/mir178/43341

One Comment to “দেশে বিদেশেঃ পাবলিক বাস”

  1. “ওস্তাদ অর্থাৎ দক্ষ, সুনিপুন, পটু”- পটু নাকি ুটু (প টা দিলাম না)।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: