কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার: কিছু অজানা তথ্য

মীর্জা ফকির মোহাম্মদ এবং জমিলা খাতুনের তৃতীয় পুত্র হামিদুর রহমানের জন্ম ১৯২৮ সালে পুরনো ঢাকার আশেক লেনে। কলেজিয়েট স্কুল থেকে মেট্রিক ও ঢাকা কলেজ থেকে আই. এ. পাশ করে তিনি প্যারিসের Ecole Beaux Arts এ ভর্তি হন ১৯৫১ সালে। ১৯৫৩ সালে Mural Paintings এর ওপর গ্রীষ্মকালীন কোর্সে অংশগ্রহণ করেন ফ্লোরেন্সের Accademia di Belle Arti Firenze তে। পরে লন্ডনের Central School of Art and Design থেকে ১৯৫৬ সালে ডিগ্রী লাভ করেন। ইতিমধ্যে ১৯৫২ সালে দেশে ঘটে যায় ভাষা আন্দোলন। উচ্চশিক্ষা শেষে বিদেশে প্রতিষ্ঠার সমস্ত সুযোগ উপেক্ষা করে দেশে ফিরে আসেন তরুণ শিল্পি।

১৯৫৬ সালের হেমন্ত কালে শিল্পি জয়নুল আবেদিনের অনুরোধে গণপূর্ত বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী এম এ জব্বারের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। তাকে জানানো হয় যে সরকারের গণপূর্ত বিভাগ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মানের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে এবং এ কাজে কয়েকজন মেধাবী শিল্পীর কাছ থেকে নকশা আহ্বান করা হচ্ছে। তাকেও একটি পরিকল্পনা জমা দিতে অনুরোধ করেন এম এ জব্বার। সেই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫৭ সালে একটি মডেল ও ৫২ টি নকশার কাগজ প্রস্তুত করে তিনি জমা দেন। বিখ্যাত গ্রীক স্থপতি ডকসিয়াডেস কে সভাপতি ও জয়নুল আবেদীন, প্রকৌশলী এম এ জব্বার এবং আরো কয়েকজন আমলাকে সদস্য করে একটি নির্বাচন কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি কর্তৃক নির্বাচিত হয় হামিদুর রহমানের প্রণীত নকশাটি। অত:পর নগরাঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মইনুল ইসলামের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে নকশাটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। কয়েকদিন পরে ড্যানিশ স্থপতি জং ডুযুরল্যান্ড কে তাঁর সহকর্মী রূপে নিয়োগ দেয়। ডুযুরল্যান্ড দিনরাত খেটে এক প্রস্থ নীল নকশা এবং কয়েকটি কার্যকরী মডেল তৈরী করে দেন। ১৯৫৭ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসের (বর্তমানে নার্সেস হোস্টেল) চত্বরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভিত্তি স্থাপন করা হয়। ১৯৫৮ সালের ফেব্রুয়ারির আগেই পূর্ণাঙ্গ শহীদ মিনারের নির্মান কাজ শেষ করে ফেলার পরিকল্পনা গৃহীত হয়। শহীদ মিনারের নির্মান পরিকল্পনার রয়ালটি বাবদ তিনি মাত্র পঁচিশ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন। মিস নভেরা আহমদের তিনটি ভাস্কর্য সম্পাদনের জন্যে দশ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল। যদিও সমগ্র কর্মিদলটি পেয়েছিলেন মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। শহীদ মিনারের বেসমেন্টে ১০০০ বর্গফুটের একটি ম্যুরাল এঁকেছিলেন হামিদ। আর তিনটি ভাস্কর্য নির্মান করেছিলেন নভেরা, যেগুলো মিনারের স্টুডিও কক্ষের অন্ধকারে চিরদিনের জন্যে বন্ধ হয়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত অসমাপ্ত মিনারের ছায়াতলেই অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৮ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারীর অনুষ্ঠানমালা। পরিকল্পিত নির্মান প্রায় সম্পূর্ণ হতে বাদ সাধে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন।

১৯৬৩-৬৪ সালে আবার মিনারের অসম্পূর্ণ কাজ সমাধা করতে একটি কমিটি গঠন করে সরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. মাহমুদ হোসেন, ঢাকা আর্ট কলেজের তৎকালীন প্রিন্সিপাল জয়নুল আবেদীন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ওই কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু এই কমিটিও অজ্ঞাত কারণে ভেঙ্গে যায়। ১৯৭২ সালে আবার একবার নতুন করে মিনার নির্মান পরিকল্পনা আহ্বান করা হয় এবং একটু পরিবর্তন করে হামিদুর রহমানের নকশাটিই নির্বাচিত হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তা আর এগোয়নি। উপরন্তু সেই বছরেই হামিদের করা সেই ম্যুরালটি ভেঙ্গে ফেলা হয়। তারও অনেক পরে, ১৯৮৬ সালে বর্তমান চেহারা পায় শহীদ মিনার। যদিও মূল পরিকল্পনার অনেক কিছুই বাদ দেয়া হয় এবার। তবুও হামিদুর রহমানের সেই বিখ্যাত পরিকল্পনা, যেখানে মায়ের দুপাশে দাঁড়ানো চার ছেলে-র রূপ পেয়েছে আমাদের প্রিয় শহীদ মিনার…..

তথ্যসূত্র:
১। হামিদুর রহমান কর্তৃক লিখিত ”শহীদ মিনার নির্মান সংক্রান্ত মূল্যবান তথ্যাদি” দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ১০ই মে, ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধ।
২। শিল্পী হামিদুর রহমানের ছোটভাই বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ত্ব সাঈদ আহমদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত ভাবে প্রাপ্ত তথ্য।

.

.

.

http://prothom-aloblog.com/posts/84/153711

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: