বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ ও উপন্যাস কে লিখেছিলেন?

১।

হাতের কাছে কোনো বাংলা ব্যাকরণ বই নেই। তবে ছোটবেলায় বাংলা ব্যাকরণের যে সংজ্ঞা মুখস্থ করতে হয়েছিলো তা হয়তো সবার এখনো মনে আছে-

যে পুস্তক পাঠ করিলে বাংলা ভাষা শুদ্ধরূপে লিখিতে, পড়িতে ও বলিতে পারা যায় তাহাকে বাংলা ব্যাকরণ বলে।

খেয়াল করে দেখুন- শুধু বাংলায় লেখা-পড়া নয়; যে বই পড়ার ফলে আমরা শুদ্ধরূপে আমাদের ভাষায় কথাও বলতে পারি তাকে বাংলা ব্যাকরণ বলে।

বাংলা ভাষার উৎপত্তি কেবল তিন-চারশ বছর আগে নয়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী হাজার বছর আগে বাংলা ভাষায় লিখিত ‘চর্যাপদ’ আবিষ্কার করেছিলেন। লুইপা, কাহ্নপা, শবরপারা এ ভাষায় সে সময় পদ রচনা করেছেন। অবশ্যই আজকের বাংলা ভাষার সাথে তখনকার চর্যাপদের ভাষার কোনো মিল নেই। না থাকাই স্বাভাবিক। কারণ, ভাষা বিবর্তিত হয়। তবুও সেটা বাংলা ভাষাই। আজ আমরাও যে ভাষায় কথা বলছি তাও একসময় বিবর্তিত হয়ে অন্যরূপ নেবে। কিন্তু তখনো সেটা বাংলা ভাষাই থাকবে।

চর্যাপদ বা তার আগে বা পরে লিখিত বাংলা ভাষার সাহিত্যগুলো কোনো অশুদ্ধরূপে লেখা হয় নি। তখনকার জন্য সেটাই ছিলো শুদ্ধরূপ এবং তা নিশ্চয়ই কোনো ব্যাকরণ মেনে করা হয়েছে। বাংলা ব্যাকরণ রচনার ইতিহাসও তাই হওয়া উচিত অনেক পুরনো।

কিন্তু আমাদের বাংলা ব্যাকরণের ইতিহাসে তার বদলে লেখা আছে অন্য ঘটনা। বাংলা উইকিপিডিয়ায় আছে-

পর্তুগিজ ধর্মযাজক মানোএল দ্য আসসুম্পসাঁউ (Manoel da Assumpcam) বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ রচনা করেন। ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগালের লিসবন শহর থেকে রোমান হরফে মুদ্রিত তাঁর লেখা Vocabolario em idioma Bengalla, e Portuguez dividido em duas partes শীর্ষক গ্রন্থটির প্রথমার্ধে রয়েছে একটি সংক্ষিপ্ত, খন্ডিত ও অপরিকল্পিত বাংলা ব্যাকরণ। এর দ্বিতীয়াংশে রয়েছে বাংলা-পর্তুগিজ ও পর্তুগিজ-বাংলা শব্দাভিধান। মানোএল ভাওয়ালের একটি গির্জায় ধর্মযাজকের দায়িত্ব পালনের সময় নিজের ও ভবিষ্যত্ ধর্মযাজকদের প্রয়োজনে এই ব্যাকরণ রচনা করেন; বাংলা ভাষার বিকাশ ঘটানো তাঁর লক্ষ্য ছিলো না। লাতিন ভাষার ধাঁচে লেখা এই ব্যাকরণটিতে শুধু রূপতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্ব আলোচিত হযেছে, কিন্তু ধ্বনিতত্ত্ব নিয়ে কোনো আলোচনা করা হয় নি। এছাড়া পুরো আঠারো ও উনিশ শতকে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকায় এই গ্রন্থটি বাঙালি ও বাংলা ভাষার কোনো উপকারেও আসে নি তখন।
বাংলা ভাষার দ্বিতীয় ব্যাকরণটি রচনা করেন ইংরেজ প্রাচ্যবিদ ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড (Nathaniel Brassey Halhed)। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংসের (Warren Hastings) অনুরোধে তরুণ লেখক হ্যালহেড বাংলা ভাষার ব্যাকরণ রচনায় হাত দেন। তাঁর লেখা A Grammar of the Bengal Language গ্রন্থটি ১৭৭৮ সালে প্রকাশিত হয়। এ ব্যাকরণটি অনেক কারণে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পূর্বের পর্তুগিজ ধর্মযাজকদের মতো নিজ প্রয়োজনে নয়, নিঃস্বার্থ বুদ্ধিজীবী হ্যালহেডের ইচ্ছা ছিল বাংলা ভাষাকে একটি বিকশিত ভাষাতে পরিণত করা|

অর্থাৎ পর্তুগিজ ধর্মযাজক মানোএল বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ রচনা করেন এবং ইংরেজ প্রাচ্যবিদ হ্যালহেড সাহেব বাংলা ভাষার দ্বিতীয় ব্যাকরণ রচনা করেন!!! জাতি হিসেবে আমরা এতই অধম যে আমাদের ভাষার ব্যাকরণও বিদেশীদের এসে রচনা করে দিতে হয়!

কিন্তু ব্যাপারটা কি আসলে বিশ্বাসযোগ্য? উইকিতেই আবার লেখা আছে মানোএল “গির্জায় ধর্মযাজকের দায়িত্ব পালনের সময় নিজের ও ভবিষ্যত্ ধর্মযাজকদের প্রয়োজনে এই ব্যাকরণ রচনা করেন”। অর্থাৎ বাঙালিকে শুদ্ধরূপে লেখা-পড়া করানো বা কথা বলানো তার উদ্দেশ্য ছিলো না। ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যেই বাংলা শেখার জন্য তিনি এই ব্যাকরণ রচনা করেন। বিজাতীয় হিসেবে তিনি নিশ্চয়ই মায়ের পেট থেকে বাংলা ব্যাকরণ শিখে আসেন নি। সেটা তাকে এদেশের মানুষের কাছ থেকেই শিখতে হয়েছে। অর্থাৎ বাংলা ব্যাকরণের অস্তিত্ব মানোএল রচনা করার আগেই এদেশে ছিলো। বাংলা ভাষাভাষী কেউ না কেউ সেটা রচনা করেছিলেন। হয়তো সেটা কোনো মুদ্রিত বই আকারে ছিলো না; ছিলো হয়তো কোনো বিধি আকারে পণ্ডিতের টোলে বা পাঠশালায় যা এখনো উদ্ধার করা যায় নি। কিন্তু তার জন্য বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ রচনার কৃতিত্ব কোনো বিদেশীর হয়ে যায় না, যেতে পারে না!

একই কথা হ্যালহেডের ব্যাকরণের ক্ষেত্রেও খাটে। আমাদের ব্যাকরণ বইগুলিতে সম্ভবত হ্যালহেডের ব্যাকরণকেই বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ হিসেবে উল্লেখ করা আছে। যতদূর মনে পড়ে আমি হ্যালহেডের ব্যাকরণের কথাই পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে প্রথম জেনেছিলাম। সেখানে নানাভাবে ইনিয়ে-বিনিয়ে বাংলা ভাষায় হ্যালহেড ও উইলিয়াম কেরির অবদানের কথা বিবৃত ছিলো।

এই উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনের একটা কৌশল ছিলো এখানকার মানুষগুলোকে হীনমন্য করে রাখা, যেন আমরা মনে করি ইংরেজরা ছাড়া আমরা অচল। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি হয়েছিলো বিদেশী প্রভুদের পদলেহী মেরুদণ্ডহীন কিছু অনুচর তৈরীর জন্য, যার পরিবর্তন আমরা আজো করি নি। আমাদের মেরুদণ্ডহীন শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা যুগ যুগ ধরে পড়ে যাচ্ছি হ্যালহেড সাহেবের ব্যাকরণই বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ- এ আর আশ্চর্য কী। একবার চিন্তা করে দেখুন যদি কোনো জার্মান বা ফ্রেঞ্চ আপনাকে বলে যে তাদের ভাষার প্রথম ব্যাকরণ রচনা করেছে একজন ব্রিটিশ- সেটা কেমন অবাস্তব শোনাবে। এটা যেমন অবিশ্বাসযোগ্য একটা কথা, তেমন একটি জাতির জন্য অপমানজনকও। কিন্তু আমাদের গায়ের চামড়া যেমন মোটা, তেমনি আমাদের মেরুদণ্ডহীন শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা শিখেছি আমাদের ভাষা, আচার-আচরণ, শিক্ষা-দীক্ষা সবকিছুর পেছনেই আছে ইংরেজদের অবদান। তারা আসার আগে আমরা নিতান্তই অসভ্য ছিলাম। আমাদের মাননীয় বিচারপতিরা অনেক কিছুতে বিব্রত হন, কিন্তু ইংরেজদের অনুকরণে জবরজং পোশাক পরে এদেশের মানুষের বিচার করতে তাদের বিব্রত হতে কখনো শুনিনি। বরং এই পোশাক-আশাক নাকি আমাদের বিচার ব্যবস্থার আভিজাত্যের প্রতীক!

২।

বাংলা ব্যাকরণ তো গেলো, এবার দেখি একটু বাংলা উপন্যাসের দিকে। একসময় যখন এক-আধটু কুইজ করতাম তখন দু’একটা প্রশ্নে এসে একটু ধন্ধে পড়ে যেতাম। এরকম একটা প্রশ্ন ছিলো- বাংলা ভাষার প্রথম উপন্যাস কে লিখেছেন? বাংলা ভাষার প্রথম উপন্যাস একজন বাঙালি লিখবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না, আমাদের মতো এমন উদার জাতি মনে হয় পৃথিবীতে আর একটাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাংলা ভাষার প্রথম উপন্যাস রচনার কৃতিত্বও আমরা একজন বিদেশীনিকে দিয়ে বসে আছি, ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ‘ নামে যিনি একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন- ১৮৫২ সালে যা প্রকাশিত হয়।

এই ইংরেজ ভদ্রমহিলার নাম হানা ক্যাথেরিন মুলেন্স। মিস মুলেন্সের স্বামী কোলকাতায় ডাক্তার হিসেবে কাজ করতেন (একজায়গায় লেখা আছে ম্যাজিস্ট্রেট) আর তিনি কোলকাতার ব্রিটিশ মিশনারীর সাথে এদেশে খ্রীষ্টধর্ম প্রচারের কাজে জড়িত ছিলেন। ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ বইয়ের মূল দুই চরিত্র ফুলমণি ও করুণা ছিলেন এদেশীয় দুই খ্রীষ্টান যাদের সাহচর্য মিস মুলেন্স পছন্দ করেছিলেন এবং তাদের বিবরণ প্রচারের মাধ্যমে এদেশীয় মহিলাদের মধ্যে খ্রীষ্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যেই তিনি এ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে মিস মুলেন্স তার এই বই লেখার উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন-

ধর্ম্মপুস্তক পাঠ করিলে আমরা দেখিতে পাই যে পরমেশ্বর প্রাচীন ধার্ম্মিক লোকদের চরিত্র বর্ণনাকরণ দ্বারা আপন মণ্ডলীস্থ লোকদিগকে বিশেষরূপে শিক্ষা দেন, তাহাতে যেন তাহারা ঐ ধার্ম্মিক ব্যক্তিদিগকে নিদর্শন স্বরূপ জানিয়া তাহাদের ন্যায় সদাচারী হইতে চেষ্টা করে। ইহা জ্ঞাত হইয়া আমি বিবেচনা করিলাম যদি উক্ত খ্রীষ্টিয়ানদের চরিত্রের বিষয়ে কিঞ্চিৎ লিখি তবে ঈশ্বরের আশীর্ব্বাদে বঙ্গদেশস্থ ভগিনীরা তাহা পাঠ করিয়া পারমার্থিক লাভ ও সন্তোষ পাইতে পারিবে। এই অভিপ্রায়ে আমি এই ক্ষুদ্র পুস্তক রচনা করিতেছি।- ফুলমণি ও করুণার বিবরণ, হানা ক্যাথেরিন মুলেন্স, ১৮৫২।

অর্থাৎ বঙ্গদেশের মহিলাদের মধ্যে খ্রীষ্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশেই তিনি এই ক্ষুদ্র পুস্তক রচনা করেছিলেন। কোনো সাহিত্য রচনার জন্য নয়।

বইয়ের বিভিন্ন অংশে মুলেন্স বাইবেলের বাণী উদ্ধৃত করে ফুলমণি ও করুণার ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যেমনটা বিভিন্ন ধর্মপ্রচারণামূলক গ্রন্থে আমরা দেখে থাকি। এদের মধ্যে ফুলমণি ও তার পরিবার ছিলো আদর্শ খ্রীষ্টান। অন্যদিকে করুণা ছিলো ‘মন্দ’ খ্রীষ্টান। ফুলমণির আদর্শ ও মুলেন্সের প্রভাবে করুণা কীভাবে ‘সত্য’ খ্রীষ্টান হয়ে ওঠে বইটিতে মুলেন্স তার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। বইয়ের এক পর্যায়ে ফুলমণির পরিবার সম্পর্কে মুলেন্স লিখেছেন-

বাঙ্গালাদেশে যদ্যপি এই পরিবারের মতো সকল খ্রীষ্টিয়ান লোক ধার্ম্মিক হইতো, তবে দেব পূজকদের মধ্যে আমাদের ধর্ম্ম অবশ্য সুগ্রাহ্য হইতে পারিত। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে অনেক ভক্ত খ্রীষ্টিয়ান লোকেরা হিন্দু মুসলমানের ন্যায় মন্দ আচার-ব্যবহার করিয়া খ্রীষ্টের নামে কলংক দেয়।

হিন্দু মুসলমানের ন্যায় মন্দ আচার-ব্যবহার করিয়া খ্রীষ্টের নামে কলংক দেয়!! কী দুষ্টু খাইছে

‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ বইয়ের দু’টি ইংরেজী ভার্সন আছে। প্রথমটি প্রকাশিত হয়েছে ১৮৬৫ সালে লন্ডন থেকে। নাম- Faith and victory: a story of the progress of Christianity in Bengal.

অন্যটি আমেরিকার প্রেসবাইটেরিয়ান চার্চ কমিটি প্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক ও ফিলাডেলফিয়া থেকে ১৮৬৭ সালে- ‘Life by the Ganges, or, Faith and victory’

‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ যে একটি ধর্মপ্রচারণামূলক বই, কোনো সাহিত্যগ্রন্থ নয় ইংরেজি নাম দুটো থেকে আরো পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। এ বইটি বাংলা সাহিত্যে উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃতি পেলে ‘মক্কা-মদীনার পথে’ বা ‘শ্রী শ্রী অনুকূলচন্দ্রের বিবরণ’ জাতীয় বইগুলোকেও উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া প্রয়োজন।

৩।

আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে এমন আরো অনেক বর্জ্য মিশে আছে যা অপসারণ করা জরুরী। ভাষার মাসে সব শহীদদের জন্য রইলো শ্রদ্ধা।

.

.

.

http://www.sachalayatan.com/tanveer/43295

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: