পেরু – বলিভিয়ার সীমান্তে বিড়ম্বনা, হঠাৎ পাওয়া বন্ধু এবং জোড়া রঙধনুর কাহিনী

397289_10151186443675497_608590496_22849581_190074346_n

যেই মুহূর্তে পেরু থেকে বিদায় নিতে উদ্যত আমরা তিন মাস্কেটিয়ার ( অধমের সাথে হুয়ান ভিদাল ও ইয়াইয়াস সেরণা), সেই মুহূর্ত থেকেই যত গণ্ডগোলের শুরু। ওয়াল্টার নামের এক পেরুভিয়ানকে বেশ কটি ট্যুরের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ টাকা দেওয়া হয়েছিল, সব সুচারু ভাবেই সম্পন্ন হল, কিন্তু টিটিকাকা হ্রদ ঘোরার পরপরই বাস স্টেশনে যেয়ে তার সহকারীর দেখা মিলল না! এখন কি করা ?

বলিভিয়া হয়ত না গেলেও চলে এই যাত্রা, কিন্তু সেই দেশের রাজধানী লাপাজ থেকে আমাদের বিমান টিকেট করা আছে আর্জেন্টিনার, সেটি মার যাবে যে ! বাস ভাড়া না হয় সামলে নেওয়া যাবে, কিন্তু বিমান ভাড়া জলে গেলে পুরোই অধিক শোকে পাথর হবার দশা হবে আমাদের! তাই কাউন্টারে জিজ্ঞেস করে পাওয়া গেল অন্য আরেক বাস টার্মিনালের হদিস, যেখান থেকে আন্তর্জাতিক বাস ছাড়বে কুড়ি মিনিটের মধ্যে! এমনিতেই তাপমাত্রা তখন ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, এই গরমের মাঝে এত ঝামেলা আর কাঁহাতক ভাল লাগে !

IMG_7040

আর কি, পড়িমরি করে সেখানে যেতে যেতেই বাস দিল ছেড়ে, অবস্থা যেই লাউ সেই কদুই হতে পারত কিন্তু বাঁচিয়ে দিল সেই টার্মিনালে অপেক্ষারত এক বলিভিয়ান নাগরিক, নাম তার কার্লোস হুগো লেমা তেখেরিনা, বাকী সময় তাকে হুগো নামেই সম্বোধন করলাম সবাই। সেই জানাল, এখানে ট্যাক্সি পাওয়া যেতে পারে, যেটা করে আমরা বলিভিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত যেয়ে, ইমিগ্রেশনের ঝামেলা শেষ করে আবার লাপাজে যাবার ট্যাক্সি ধরতে পারব, আর কয়েকজন একসাথে গেলে ভাড়াও এমন আহামরি বেশী কিছু হবে না। হুগোর বাড়ী বলিভিয়ার বৃহত্তম শহর সান্তাক্রুজে, যদিও সে এখন আসছে ইকুয়েডরের শ্বশুর বাড়ী থেকে, অনেক দিয়েগো ম্যারাডোনার মত দেখতে মানুষটির হাতে বেশ বড়সড় এক কাগজের প্যাকেট, তাতে লেখা Fragile, কি এমন ভঙ্গুর জিনিস সেই জানে! অল্প কথায় জানাল, তার আবার মুদ্রা সংগ্রহের বাতিক আছে, এমনকি সেই সংগ্রহশালায় আছে খোদ বাংলাদেশের মুদ্রাও।!

উত্তম প্রস্তাব, মিলল ট্যাক্সি, মুশকিল হল জায়গা নিয়ে, জনবল বেশী হয়ে গেছে! দলের বাকিদের জন্য আত্মত্যাগ স্বীকার করে পরম বন্ধু ইসাইয়াস গাড়ীর পিছনের খোলের মাঝে নানা ব্যাকপ্যাকের মাঝে ভিড়ে নিজের জায়গা করে নিল। শুরু হল আমাদের নতুন যাত্রা।

IMG_7044

সীমান্তের কাছের ইমিগ্রেশন অফিসের কাছেই গাড়ী ভিড়ল, কিন্তু ততক্ষণের আন্দেজের বৃষ্টি দেবতা আমাদের বিরহে কাতর হয়েই হয়ত তার রাশি রাশি জল কণা পাঠিয়ে দিয়েছে যাত্রাবিরতি করবার জন্য। গাড়ী থামার সাথে সাথে চারপাশ থেকেই জেঁকে এল অন্তত তিরিশজন কিশোর, প্রত্যেকেই চাইছে আমাদের ব্যাগপত্তর বহন করে কিছু পয়সা কামাতে, তাদের ভিড় দেখে আমি তো আমি, মেক্সিকোই জন্ম নেওয়া হুয়ান ভিদাল পর্যন্ত আর্ত চিৎকার করে উঠে বলল, ইস, মশার ঝাকে পড়েছি মনে হচ্ছে। সে বিপদ কাটানো এমন কোন ব্যাপার নয়, কিন্তু এই ডামাডোলে একটা ব্যাগ খোয়া গেলেই কিন্তু চিত্তির! অবশ্য ভরসা হচ্ছে গাড়ীর পিছনে কেউ চৌর্যবৃত্তির উদ্দেশ্যে খুললেও পাবে সদ্য ঘুম ভাঙা এক তরুণ!

বুক ঠুকে ইমিগ্রেশন অফিসে ঢোকা হল, এখন অপেক্ষার পালা! কতক্ষণ লাগে কে জানে, কিন্তু বাংলাদেশ- ভারত সীমান্তের মত দুর্ভোগ হবে না এমন আশা মনের কোণে। অন্য দুইজনের মেক্সিকান পাসপোর্ট বিধায় মিনিট খানেকের মধ্যেই ছাড়পত্র পেয়ে গেল, এবার বাংলাদেশে পাসপোর্ট হাতে পড়তেই ইমিগ্রেশন অফিসার একেবারে ইঁদুরের পনির শোঁকার মত চরম আগ্রহের সাথে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। এই পাতা উল্টায়, তো সেই পাতা নাড়ে! আরে ব্যাটা , তোর দেশ থেকে তো বাহির হয়েই যাচ্ছি, এত পরীক্ষা কিসের! এমনিতেই ওয়াল্টারের ওপর চটে সমস্ত পেরুভিয়ানকে শাপশাপান্ত করেই চলেছি অন্যদের আতিথেয়তা ভুলে। ব্যাটা মিনিট পনের তার সামনের প্রাগৈতিহাসিক যন্ত্রটা থেকে মুখ তুলে বলল- তুমি যে পেরুতে এসেছ তা আমাদের রেকর্ডে নিবন্ধ করা হয় নি!

মামুর বুটা, এইটা কি আমার দোষ! পাসপোর্ট খুলে দেখালাম সেখানে লিমাতে ল্যান্ডিং-এর সিলমোহর জ্বলজ্বল করছে, আর কি দরকার! তার এক কথা- তুমি যে পেরুতে এসেছ তা এখানেই লেখা হয় নি! মনে হয় সেদিন বিমান বন্দরের যন্ত্র কাজ করছিল না! আজব ব্যাপার- এখন আর কি করার আছে, আসার কথা যখন লিপিবদ্ধ কর নি, যাবার টাও কর না! শান্তি মত যেতে দাও না বাপু!

উল্টো সে কুত কুত চোখে জটিল ভঙ্গীতে তাকিয়ে অন্য দুইজনের পাসপোর্ট নিয়ে বিজয়ীর ভঙ্গীতে বলে উঠল- এদেরও রেকর্ড লিপিবদ্ধ করা হয় নি ! গোদের উপর বিষফোঁড়া! গেল চল্লিশ মিনিট এই ঝামেলা কাটাতেই! এমনিতেই পেরুভিয়ান অ্যাম্বাসীর উপর মেজাজ খাট্টা হয়েছিল নিজে উপস্থিত থেকে, আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে, অপরাধী যে না এমন প্রত্যায়নপত্র দাখিল করে ভিসা পাওয়ার ঝামেলায়, এখন আবার চটতে হল তাদের ইমিগ্রেশনের বদৌলতে।

ভালোর মধ্যে একটাই- ঝুম বৃষ্টি থেমে গেছে, খানিকটা ইলশে গুঁড়ি চলছে বটে, কিন্তু সহনীয় পর্যায়ের। চাল্লু গোছের এক ছোকরা রিকশাচালক নিজে থেকেই এগিয়ে এসে মালপত্র নিতে নিতে বলল, আমিই নিয়ে যাব তোমাদের কোপাকাবানায়! আরে, এই ব্যাটা জানল কি করে আমরা কোপাকাবানা যাব, কিন্তু সে তো যাত্রার শেষে ব্রাজিলের বিশ্বখ্যাত সৈকত। রিকশায় যেতে গেলে এক জীবনেও কুলোবে না! আমাদের অপ্রস্তুত অবস্থা দেখে সে একগাল হেসে বলল, আরে টাকা বেশী চাইব না, ঐ তো সেতু পার হলেই বলিভিয়ার ইমিগ্রেশন, সেটার পরপরই বলিভিয়ার কোপাকাবানা! মানে রিও সেই সৈকতের নামেই এই সীমান্তবর্তী শহরেরও নাম!

404727_10151186443050497_608590496_22849576_553417542_n

যাক নিশ্চিন্ত হয়ে রিকশায় তিনজন ব্যাকপ্যাক সহ চেপে বসতেই সে পেছন থেকে প্যাডেল ঘুরানো শুরু করল, বাংলাদেশের রিকশার মত সামনে নয়, এই ধরনের রিকশায় চালকের আসন থাকে যাত্রীদের পেছনে।

394482_10151186443400497_608590496_22849579_395947318_n

সেতু পর্যন্ত যাবার আগেই বিশেষ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কম্যান্ডোরা আমাদের থামিয়ে সেই রিকশাকে অপেক্ষা করতে বলে সোজা এক বদ্ধ কামরায় ঢুকিয়ে দিল !

মহা মুসিবত, সেখানে দুইজন বিশেষ রক্ষী ছাড়া আর কেউ নেই! কোন বিপদে পড়লে কেউ বাচাতেও এগোবেনা, কারণ এটি পুলিশেরই অফিস, আর পেরু পুলিশ যে বাংলাদেশ পুলিশের মতই দুর্নীতিবাজ না হলেও ফিনল্যান্ড পুলিশের মত দুর্নীতিমুক্ত নয় তা সবাই জানে! মনে মনে নিশ্চিত হয়ে গেলাম, কপালে কিছু অর্থদণ্ড আছে এবার।

ব্যাটারা অবশ্য খুবই ভদ্র ভাষায় দুঃখ প্রকাশ করে বলল , এমন তরতাজা তিনটি তরুণকে একসাথে দেখলে তাদের ব্যাগপত্র ভাল মত চিরুনি সার্চ করা যে কোন কাস্টমসেরই কর্তব্য! কেন বাবা, তরুণ বয়সে ঘুরলে তোমাদের সমস্যা কি, তাহলে কি হুইল চেয়ারে আসা উচিত ছিল? যতসব! সে মাখনের মত মোলায়েম ভাষায় বলল, যেহেতু এই অঞ্চলটি মাদক ব্যবসার জন্য কুখ্যাত তাই সে কেবল আমাদের মানিব্যাগগুলো অনুসন্ধান করে দেখতে চায় সাথে কোন অবৈধ মাদক আছে কি না !

আরে ব্যাটা সন্দেহ হয়েছে, সন্ধান তো চালাবিই, কিন্তু ম্যানিব্যাগ কেন! ফাঁকা করবার মতলব নিশ্চয়ই! কিন্তু আমাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত করে তার অত্যন্ত ভদ্র এবং সুচারু ভাবে সন্ধানকাজ শেষের পরপরই আমাদের রিকশায় ফের যাবার পথ দেখিয়ে দিল । বিশ্বাসই হচ্ছিল না, যে মুঠোর মধ্যে পেয়েও তারা কোন অর্থ দাবী করল না, অবশ্য কয় দিন পর এক বন্ধু বলছিল, তার ব্যাগের গোপন পকেটে রাখা ৫০ ইউরোর নোট হাপিশ হয়ে গেছে, কিন্তু সেটা সেই কাস্টমস কর্মকর্তার মাধ্যমে না নিজের বেখেয়ালে তা আর মনে নেই!

মিনিট তিনেকের রাস্তা, রিকশায় আর না উঠে সেতুটুকু হেঁটেই অতিক্রম করে পা দিলাম এক নতুন ভূখণ্ডে। রেড ইন্ডিয়ানরা দল বেঁধে সেখানে নদীতে ধরা টাটকা মাছ বিক্রি করছে, অনেকেই কাফেলা বেঁধে চলছে পেরুর দিকে বাণিজ্যের আশায়।

421882_10151296679375497_608590496_23190262_44321053_n

এখন বলিভিয়ার ইমিগ্রেশনের পালা, ফর্ম চাইতেই ব্যাটা পাসপোর্ট নেড়ে অবাক হয়ে বলল- তোমার তো বলিভিয়ার ভিসা নেই ! আরে বাবা, ভিসা যে নেই তা কি তুমি আমার চেয়ে ভাল জান! আবার ব্যাখ্যা করতে হল, ফিনল্যান্ডে বলিভিয়ার কনস্যুলেট আপাতত বন্ধ, তাদের সুইডেনের অ্যাম্বাসীতে ফোন করে যোগাযোগ করাতে তারা জানাল তাদের অ্যাম্বাসীও আর একমাস পর উঠে যাচ্ছে, কাজেই তারা এমতাবস্থায় ভিসা ইস্যু করতে অপারগ! কিন্তু আমাদের বিমান টিকিট যে কাটা আছে , এখন কি করা যায়! সেই পরামর্শ দিল, সীমান্তে যেয়ে ভিসা চেও, বাংলাদেশের নাগরিকদের সীমান্তে ভিসা দেবার নিয়ম আছে। ( আমেরিকান পাসপোর্ট হলে অবশ্যই ভিসা নিয়ে আসতে হবে, এবং তার খরচও প্রায় ১৫০ ডলার, যে কারণে ইসাইয়াস তার আমেরিকান পাসপোর্ট সযত্নে ব্যাগের গোপন কোণে রেখে মেক্সিকান পাসপোর্টই দেখাল এই যাত্রা)।

ব্যাখ্যা শুনে তার মন গলল, একগাল হেসে ফর্ম দিয়ে বলল, দেখ ইমিগ্রেশন অফিসার কি বলে। তার আগে ফর্মটা লিখতে হবে তো, স্থানীয় এক মহিলা এগিয়ে এসে জানাল খুব অল্প পয়সার বিনিয়ে উনি আমাকে ফর্মটা পূরণ করে দিতে ইচ্ছুক ( বাংলাদেশে অনেক অ্যাম্বাসীতেও যেটা হয় ), তাই হল। বিশাল লাইনে মিনিট বিশেক দাড়িয়ে ইমিগ্রেশন অফিসারের সামনে পোঁছানো মাত্রই উনি প্রায় চিৎকার করে উঠলেন- বাংলাদেশ!

তারপর জ্ঞান না হারালেও কি এক অজানা কারণে খুশী হয়ে প্রায় হাত ধরে পাশের ঘরে নিয়ে যেয়ে আরেক অফিসারের হাতে পাসপোর্ট দিয়ে বললেন – সেই বাংলাদেশ থেকে এসেছে, ভিসা দিয়ে দাও!

আহা, মধুবর্ষণ করল কানে বাক্যগুলো, কারণ পুরো যাত্রাই এক একটি ব্যাপারে আমরা সন্দিহান ছিলাম, আমার ভিসা না মিললে আবার ১০ ঘণ্টা বাসে চেপে কুজকো যেয়ে নতুন করে বিমান টিকেট কাটতে হত বুয়েন্স আয়ার্সের। যাক, ঝামেলা গেল।

বলতে বলতেই অন্য অফিসার চেয়ে বসল ৫৩ ডলার। না, না উপরি নয়, এটাই সেই দেশের ভিসার ন্যায্য দাম, কিন্তু দিতে হবে আমেরিকান ডলারে, না হয় বলিভিয়ার মুদ্রা বলিভিয়ানোতে, অথবা পেরুর মুদ্রা সোলেসে! কিন্তু আমাদের কাছে নেই এর একটিও! ইউরো দিলাম, ব্যাটারা বলে- দুনিয়ার এই প্রান্তে ইউরো অচল, যতই বলি এটি ডলারের চেয়ে অনেক শক্তিশালী মুদ্রা, কিন্তু তারা নিতে রাজী নয় ! একজন উপায় বাতলে দিল, পেরুতে ফিরে যেয়ে কোন মুদ্রা বিনিময়ের দোকানে ইউরো ভাঙ্গাতে!

হা কপাল, আবার সেই ভেজাল! সেই মুহূর্তে আর ঝামেলা বাড়াতে ইচ্ছে করছে না। এমন সময় মনে পড়ল হুগোর কথা, তার কাছে কিছু বলিভিয়ান মুদ্রা থাকতেই পারে! সে নাকি আবার বাহিরে আমাদের জন্যই ট্যাক্সি ঠিক করে অপেক্ষা করছে। কিন্তু কয়েক মিনিটের পরিচয়ে একজনের কাছে এভাবে টাকা চাওয়া ঠিক হবে, বিশেষ করে বলিভিয়ায় ৫৩ ডলার খুব একটা কম টাকা নয় ! তারপরও, মন বলল কাজ হতে পারে, মানুষই তো মানুষের উপকার করে।

সরাসরি বললাম হুগোকে- অ্যামিগো, এই বিপদে পড়েছি, কিছু টাকা অল্পক্ষনের জন্য ধার লাগবে! কোপাকাবানায় ঢুকেই শোধ করে দেব। সাথে সাথেই চওড়া হাসি দিয়ে সে জানাল, কোন চিন্তা কর না, আমি তো এখন ফিরছি শ্বশুরবাড়ী ইকুয়েডর থেকে, সাথে বেশ কিছু ডলার আছে, চল, তোমার ঝামেলা শেষ করে আসি।

বন্ধুত্বপরায়ণ হুগো সেই ইমিগ্রেশন অফিসারকে ৫৫ ডলার দিয়ে আবার বাকী দুই ডলারের সমপরিমাণ স্থানীয় মুদ্রা বলিভিয়ানো ঠিকই আদায় করে, আমাদের কৃতজ্ঞ বিস্মিত দৃষ্টির সামনে উঠে বসল অপেক্ষারত ট্যাক্সিতে। এবারের গন্তব্য- বিশ্বের উচ্চতম রাজধানী লাপাজ।

যাত্রা শুরু আগেই থেমে গেল, এক মোড়ে দাড়িয়ে গেল ট্যাক্সি, পিছনের ডালা খুলে বিশালদেহী এক লোক সুন্দর সেঁধিয়ে গেল ভিতরে! কি ব্যাপার, অনুমতি ছাড়াই এমন ঘটল কেন! জানতে চাইতেই, চালক জানালেন বলিভিয়ার সব গাড়ীতেই পেছনে এমন জনাদুয়েক যাত্রী এভাবে গুটিসুটি মেরে যায়! এইটাই নিয়ম।

এমন সময় চোখ পড়ল বলিভিয়ার আকাশে, আমাদের যাত্রাপথের সমস্ত ক্লেদ ক্লান্তি ভুলিয়ে এই প্রাচীন ভূমিতে স্বাগতম জানাবার জন্যই যেন আবির্ভূত হয়েছে অপূর্ব পূর্ণ রঙধনুর, একটি নয়, এক জোড়া! এমন অপরূপ দৃশ্য দেখা হয় নি কোনদিনই, সব ভুলে সেই নিসর্গই উপভোগ করতে লাগলাম সবাই চালক বাদে।

394827_10151196495595497_608590496_22877295_1727052714_n

মাঝে মাঝেই মনে হল, টিটিকাকা হ্রদের বুক থেকে যেন সরাসরি উঠে এসেছে সপ্তবর্ণা বিস্ময়,

403005_10151296679935497_608590496_23190265_1264566254_n

কখনো আবার মনে হল তেপান্তরের মাঠই এর উৎস

404543_10151206110215497_608590496_22915044_1054443451_n

এর খানিকপরই তেড়ে আসা বুনো মোষের দলের মত ঘন কালো মেঘের দল দখল করে নিতে থাকল সোনা রাঙা আকাশ, মেঘ- সূর্যের লুকোচুরির ফাঁকে মনের পর্দায় গেথে গেল সেই চুরি যাওয়া আলো।

394084_10151196495920497_608590496_22877296_1258269894_n

এই ধূসরতার মাঝেও চোখে পড়ল বিশ্বের তরুণতম ও দীর্ঘতম পর্বতমালা আন্দেজ।

395490_10151240443455497_608590496_23028129_819529664_n

395231_10151296679700497_608590496_23190264_1994857485_n

বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়া শুরু হল, তখনই দেখা গেল গাড়ীটি বেশ মান্ধাতার আমলের, হিটিং ব্যবস্থা ঠিক মত কাজ করছে না, কাঁচে জমে যাচ্ছে ধোঁয়াশা মতন! সামনে বসা চালক এবং হুগো পালাক্রমে সেই কাঁচ মুছে পরিষ্কার করে পথ চলছে! এই ফাঁকেই দেখলাম একটা সাইনবোর্ড, তাতে লেখা তিহুয়ানাকো- ৩ কিমি!! হায় হায়, আমার আরাধ্য স্থান এই প্রাচীন রহস্য নগরী, যেখানে আছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাথর খণ্ডের ফটক, যার উৎস আজো রহস্যে মোড়া, এত কাছে এসেও দেখতে পারব না ! জিজ্ঞেস করতেই শুনলাম, আজ অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে সেই নগরীর দরজা, কাজেই পরের বার!

418238_10151240442855497_608590496_23028124_2004430357_n

এর ফাঁকে হুগো Fragile লেখা বাক্স থেকে তার শ্বাশুড়ীর হাতের তৈরি পিঠা জাতীয় মিষ্টান্ন ভাগাভাগি করে দিল সবার মাঝে ( এই তাহলে সেই ভঙ্গুরতার রহস্য)। ঘণ্টা আড়াই পরে দেখা মিলল লাপাজের পার্শ্ববর্তী শহর আলতোর আলোর, তার পরপরই লাপাজ।

হুগোর পূর্বপরিচিত হোটেলেই উঠলাম একসাথে, যদিও প্রথমে তিন তারা দেখে সবাই একটু গড়িমসি করছিলাম, কিন্তু হুগো জানাল চিন্তার কিছু নেই, খুবই ভাল এবং নিরাপদ হোটেল, কিন্তু ভাড়া অত্যন্ত কম! আসলেই তাই, বিশাল বিলাসবহুল কক্ষের পরও জনপ্রতি ৮ ইউরো! এবার আমাদের লাপাজ দর্শনের পালা, হাতে সময় খুব কম। সবাই হোটেল কক্ষে বসে পরিকল্পনা ঠিক করছি, আমি বলে বসলাম, ছোট্ট বেলা থেকে শুনে আসছি লাপাজের দমকল বাহিনীর অফিস কোন কাজ করে না , কারণ প্রায় ১২,০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই শহরের বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ এতই কম যে আগুন লাগলেও তা ছড়াতে পারে না, তাই অব্যবহৃত থাকতে থাকতে অফিসগুলোর যন্ত্রতে নাকি মরচে পড়ে গেছে! তাই, অন্তত দমকল বাহিনীর অফিস দেখতে চাই একটি হলেও।

সেই সাথে আছে রাতের লাপাজের আহ্বান। শুরু হল আমাদের লাপাজ ভ্রমণ—

405854_10151196495185497_608590496_22877293_1758781808_n

.

.

.

http://www.sachalayatan.com/tareqanu/43299

One Comment to “পেরু – বলিভিয়ার সীমান্তে বিড়ম্বনা, হঠাৎ পাওয়া বন্ধু এবং জোড়া রঙধনুর কাহিনী”

  1. এনু যামু।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: