এক নজরে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত : “আমার সোনার বাংলা”

১৮৮৯ থেকে ১৯০১ পর্যন্ত বারো বছর পূর্ববঙ্গের শিলাইদহ ও শাহজাদপুরে জমিদারীর কাজে থাকাকালীন সময়ে “আমার সোনার বাংলা” কবিতাটি লিখেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

=>
১৯০৫ সালে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় কবিতা হিসেবে প্রথম প্রকাশিত হয়।

=>
১৯০৬ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আদর্শগত চেতনা হতে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গান হিসেবে কবিতাটি ব্যবহার করেন। কুষ্টিয়ার বাউল শিল্পী গগন হরকরার “আমি কোথায় পাবো তারে, আমার মনের মানুষ যে রে” গানের সুরের অনুকরণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই গানটির সুর করেন।

গগন হরকরার সেই গান :

আমি কোথায় পাব তারে,
আমার মনের মানুষ যে রে।
হায়ারে সেই মানুষে তার উদ্দেশ্য
দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে।
লাগি এই হৃদয় শশী
সদা প্রাণ হয় উদাসী,
পেলে মন হত খুশী,
দেখতাম নয়ন ভরে।।
আমি প্রেমানলে মরছি জ্বলে,
নিভাই অনল কেমন করে,
মরি, হায়, হায়, হারায়ে
ও তার বিচ্ছেদে প্রাণ
কেমন করে দেখনা তোরা হৃদয় চিরে।
দিব তার তুলনা কি
যার প্রেমে জগৎ খুশী,
হেরিলে জুড়ায় আঁখি,
সামান্যে কি দেখতে পারে তারে?
যে দেখেছে সেই মজেছে ছাই দিয়ে সংসারে,
ও সে না জানি কুহক জানে
অলক্ষে মন চুরি করে
কুলমান সব গেলরে
তবু না পেলাম তারে
বসত্ কোথায় না জেনে ভাই
গগন মরে,
না জেনে ভাই গগন কেঁদে মরে,
আমার মনের মানুষ যে রে।

=>
১৯০৭ সালের ০৭ আগস্ট কলকাতায় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী একটি সমাবেশে প্রথম গানটি গাওয়া হয়।

=>
শিল্পী গোপালচন্দ্র সেনের কন্ঠে গানটি প্রথম রেকর্ড করা হয়।
=>
পরিচালক জহির রায়হান তাঁর নির্মিত “জীবন থেকে নেয়া”(১৯৭০) চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহার করেন।

=>
১৯৭১ সালের ০৩ মার্চ পল্টন ময়দানে “স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদ” তাদের ইশতিহারে গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ঘোষণা করে।

=>
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে গঠিত বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গাওয়া হয়।

=>
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সুরকার অজিত রায় গানটির বর্তমানে প্রচলিত যন্ত্রসুর করেন।
“আমার সোনার বাংলা” গানটির অনেকগুলো ভার্সন রয়েছে। এরমধ্যে বহুল প্রচলিত হলো: ১। রবীন্দ্র ঢঙে। ২। কোরাস ঢঙে(কোরাস/সলো দুভাবেই গাওয়া যাবে)। কোরাস ঢঙটিই মূলত: আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই ভার্সনটির প্রবর্তন হয় ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। সম্ভবত: এই ভার্সনটির প্রবর্তন হয় সুরকার অজিত রায়ের হাতে। সুরকার আব্দুল আহাদ এই ভার্সনটির অনুমোদন বাংলাদেশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্বভারতী হতে করিয়ে আনেন। তবে, এই ভার্সনের প্রবর্তক হিসেবে সুরকার অজিত রায়, শিল্পী শান্তিদেব ঘোষ, সুরকার আব্দুল আহাদ, শিল্পী সুচিত্রা মিত্রের নামও চলে আসে।

=>
১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার গানটির প্রথম দশ লাইন জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে (মোট চরণ সংখ্যা পঁচিশটি)। যন্ত্রসঙ্গীতে ও সামরিক বাহিনী ব্যবহার করা হয় প্রথম চারটি লাইন। একই বছর বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে ব্যবহার করা “আমার সোনার বাংলা” গানটির স্বরলিপি বিশ্বভারতী সংগীতবোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত করা হয়।

জাতীয় সঙ্গীতের দশ লাইন:

আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।
ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে,
মরি হায়, হায় রে
ও মা, অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি।
কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ, কী মায়া গো
কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।
মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো,
মরি হায়, হায় রে
মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি।

সম্পূর্ণ গান (পঁচিশ চরণ) :

আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।
ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে,
মরি হায়, হায় রে
ও মা, অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি।
কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ, কী মায়া গো
কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।
মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো,
মরি হায়, হায় রে
মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি।
তোমার এই খেলাঘরে শিশুকাল কাটিল রে,
তোমারি ধুলামাটি অঙ্গে মাখি ধন্য জীবন মানি।
তুই দিন ফুরালে সন্ধ্যাকালে কী দীপ জ্বালিস ঘরে,
মরি হায়, হায় রে
তখন খেলাধুলা সকল ফেলে, ও মা, তোমার কোলে ছুটে আসি।
ধেনু-চরা তোমার মাঠে, পারে যাবার খেয়াঘাটে,
সারাদিন পাখি-ডাকা ছায়ায়-ঢাকা তোমার পল্লীবাটে,
তোমার ধানে-ভরা আঙিনাতে জীবনের দিন কাটে,
মরি হায়, হায় রে
ও মা, আমার যে ভাই তারা সবাই, তোমার রাখাল তোমার চাষি।
ও মা, তোর চরণেতে দিলেম এই মাথা পেতে
দে গো তোর পায়ের ধূলা, সে যে আমার মাথার মানিক হবে।
ও মা, গরিবের ধন যা আছে তাই দিব চরণতলে,
মরি হায়, হায় রে
আমি পরের ঘরে কিনব না আর, মা, তোর ভূষণ বলে গলার ফাঁসি।

=>
গানটি গীতবিতান গ্রন্থের স্বদেশ অংশের অর্ন্তভুক্ত।

=>
গানটি ইংরেজীতে অনুদিত করেন অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান।

ইংরেজী অনুবাদ :

My Bengal of gold, I love you
Forever your skies, your air set my heart in tune
as if it were a flute,
In Spring, Oh mother mine, the fragrance from
your mango-groves makes me wild with joy-
Ah, what a thrill!
In Autumn, Oh mother mine,
in the full-blossomed paddy fields,
I have seen spread all over – sweet smiles!
Ah, what a beauty, what shades, what an affection
and what a tenderness!
What a quilt have you spread at the feet of
banyan trees and along the banks of rivers!
Oh mother mine, words from your lips are like
Nectar to my ears!
Ah, what a thrill!
If sadness, Oh mother mine, casts a gloom on your face,
my eyes are filled with tears!

=>
২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকে অংশ নেয়া ২০৫ টি দেশের জাতীয় সঙ্গীতের তুলনামূলক বিচারে দৈনিক গার্ডিয়ান পত্রিকার মতে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত দ্বিতীয় হয়। উরুগুয়ের জাতীয় সংগীত প্রথম হয়।

=>
২০০৬ সালে আইনজীবী কালিপদ মৃধা মোবাইলের রিং টোন এবং ওয়েলকাম টোন হিসেবে জাতীয় সংগীতের বাণিজ্যিক ব্যবহারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় সংগীতকে মোবাইল ফোনে রিং টোন হিসেবে এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করাকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট। আদালত গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংককে ৫০ লাখ টাকা করে জরিমানা করেছিলো।

কিছু দু:খের কথা:

বাংলাদেশ স্বাধীন হলো আজ এত বছর কিন্তু এখনো সরকার কর্তৃক “আমার সোনার বাংলা”র কোন রেকর্ড বের হয়নি। যা হয়েছে সবই বেসরকারী উদ্যেগে; “শ্রোতার আসর” ১৯৭৯ সালে ও “আনন্দ ধারা” ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত সুরে “আমার সোনার বাংলা”র রেকর্ড প্রকাশ করে।
একটা তথ্য শুনে অবাক হবেন। স্বাধীনতার পর, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারে বাণীসহ প্রতিদিন বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত জাতীয় সঙ্গীতের সুরে “আমার সোনার বাংলা” গাওয়া হতো। ১৯৭৬ সাল হতে বাংলাদেশ টেলিভিশন বাণীসহ জাতীয় সংগীতের প্রচার বন্ধ করে দেয়। এর কিছুকাল পরে বাংলাদেশ বেতারও একই রাস্তায় হাঁটে। এখন তো শুধু যন্ত্রসঙ্গীত বাজানো হয়।

ডাউনলোড লিংকসমূহ:

০১। গগন হরকরার গান : “আমি কোথায় পাবো তারে, আমার মনের মানুষ যে রে”।
০২। গোপালচন্দ্র সেনের কন্ঠে “আমার সোনার বাংলা”।
০৩। পঁচিশ চরণের “আমার সোনার বাংলা”।
০৪। জাতীয় সংগীত।
০৫। যন্ত্র সঙ্গীত।
০৬। আমার সোনার বাংলা-ডুয়েল-রবীন্দ্র সঙ্গীত।

* গীত বিতানের এই অনলাইন কপিটি তৈরী করেছেন সোমেন মোহন ভট্টচার্যী। উনি এই কাজটা করেছেন BengTeX দিয়ে, যা অত্যন্ত শ্রম সাধ্য কাজ। তাঁর জন্য সালাম।

.

.

.

http://www.amarcharpash.com/2011/03/blog-post.html
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/37868

3 Comments to “এক নজরে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত : “আমার সোনার বাংলা””

  1. এই ব্লগের প্রকৃত ঠিকানা:

    http://www.amarcharpash.com/2011/03/blog-post.html

    http://www.sachalayatan.com/guest_writer/37868

    ব্লগ লেখক সচলায়তনের সবুজ পাহাড়ের রাজা।

    ****প্রতিটি ব্লগের সাথে প্রকৃত ব্লগলেখকের নাম দেয়া উচিত।

  2. প্রত্যেকটা লেখার সাথেই তার মূল লিংক দেয়ার চেষ্টা করি, এটাতে গোলমাল হলো কেন বুঝলাম না।
    এখন চতুর্মাত্রিক এর সেই লিংক এ গিয়ে দেখি কিছুই নেই।
    অনিচ্ছাকৃত এ ত্রুটির জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। লেখার শেষে নতুন লিংক যুক্ত করে দিচ্ছি।
    .
    .
    আরেকটা কথা, আপনি ‘সবুজ পাহাড়ের রাজা’ হয়ে থাকলে আমার সশ্রদ্ধ অভিনন্দন নিন। সচলায়তনে আপনার লেখার আমি একজন ফ্যান।
    ‘আমার চারপাশ’ সম্পর্কে জানা ছিল না, জানলাম আর ব্যক্তিগত পাঠ্যসূচীতে যুক্ত করে নিলাম।

  3. না ভাই! আমি সবুজ পাহাড়ের রাজা নই। সচলায়তনের পাঠক হিসেবে উনাকে চিনি এই যা। উনার লেখা ভালো লাগে।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: