ক্রিকেট নস্টালজিয়া

ইদানিং খেলাধুলার খবর পড়াই হয়না। না ক্রিকেট না ফুটবল। আজকে ভারত ইংল্যান্ডের খেলাতে অনেককে চিন্তেই পারছিলামনা। হঠাৎ মনে হল শৈশবের কথা। কেমন খেলা পাগল ছিলাম আমি। স্কুল জীবনে টুকিটাকি খেলাধুলা করেছি। চাচাদের কড়া নজরদারি ভেদ করে বেরোনর সাহস করিনি। ৯-৫ টা স্কুল, বাড়ি থেকে এক মেইল হেঁটে ক্লান্ত আমি বাসায় গিয়ে শক্তি পেতাম না।তার উপর আম্মুর চোখ রাঙ্গানির জন্য কি বেরনোর উপায় ছিল? তবু ও থেমে থাকিনি, রক্তের ভেতর বোধ করি একটা স্পোর্টস ম্যান শিপের ব্যাপার ছিল। অস্থির স্বভাব, দৌড়ের উপর থাকার নেশা তাড়িয়ে বেড়াতো। তার উপর এমন জায়গায় বাড়ি, না খেলে, খেলাকে ভালো না বেসে উপায় ছিলনা। আশেপাশের বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো ছেলেদের ডাংগুলি, মারবেল, হাডুডু থেকে বাচিয়ে রাখতে আম্মুর সে কি প্রচেষ্টা! এম্নিতে ভদ্র, নম্র, ভীরু,লাজুক, নিরুপদ্রব শান্ত ছেলে। তাই অবাধ্য হবার সাহস করিনি। নিতান্ত লুকিয়ে চুরিয়ে পালিয়ে দর্শক সারিতে জায়গা নিয়েছি। পাড়ার ছেলেরাও আমাকে ডাকতো না, খেলায় নিতেও চাইতনা। কারণ, আমার দাদি। দাদির ধারনা, ওদের সাথে মিশ্লেই আমি নষ্ট হয়ে যাবো, ওরা তো পড়াশোনায় ভালো না। তাই আমাকে ডাকলেই ওদের দোষ। এই ভয়ে বেচারা রা ঝুঁকি নেবার মত সাহসী হতোনা।

কিন্তু বেশিদিন ছিলনা এরকম।একটু যখন বড় হলাম, মানে বয়সে, শুরু হয়ে গেলো ক্রিকেট। বাড়ির পাশের বিলের মধ্যে কুনাকুনি পিচ, গাছের লাঠি দিয়ে স্ট্যাম্প। সস্তা ব্যাট আর ১৮ টাকার টেনিস বল এই সম্বল। ক্লাস টেনে পড়ার সময় ক্রিকেট আমার মাথায় চরম্ভাবে ডুকে গেলো। তখন বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলেই রোযা আসতো। সেহরিতে উঠলেই আর ঘুমায় কে, সকাল ৬ টা থেকে সারাদিন সেই এক বোলার এক কীপার আর বড়োজোর দু তিনজন ফিল্ডার দিয়েই কাজ চালাতাম।মাঝে মাঝে চলে যেতাম বীচে। বাসার সবাই ঘুম, কোন সময় ধরা খেলে দুয়েকদিন বন্ধ, আবার শুরু। কিভাবে জানি বড়দের চোখে পড়ে গেলাম। পাড়ার বড় ভাইয়েরা বলল আমি নাকি ভালো বল করি, লাইন লেংথ ভালো, পেস ও আছে ভালই।কিন্তু শুকনো চিকন শরীরে আর কত পেস দেয়া যায়?? একদিন ডাক পড়ল বড়দের কি একটা প্র্যাকটিস এ, বল করলাম এক দিনে তিন উইকেট তিন্তাই আবার বোল্ড। ওরা তো মহাখুশি, এরকম বোলার ঘরের ভেতর পেয়ে। জাভেদ ভাই বলল তোমার সব ঠিক আছে, আরেক টু পেস দাও। শক্তি লাগবে শরীরে, ঘন ঘন বিয়ের দাওয়াত খাও, গরুর মাংশ খেলে পেশি বাড়বে। এরপর প্রতিদিন ই চলে যেতাম বিকেল হলেই। সেই চট্টগ্রাম এয়ারপোর্ট এর মাঠ, বাড়ির পেছনেই। হাটলে ১০ মিনিট, দৌড়ালে ৫ মিনিট। কে আর হাঁটে। বাড়ি থেকে বেরিয়েই এক দৌড়। বাড়ি থেকে বেরনো সে এক রুপকথার কাহিনি। ঘরভরতি পাহারা। আম্মু, সুন্নিবা, গুন্নিবা, দাদি…………ভাগ্যিস আব্বু অফিসে। তাই দুপুরের কড়া রোদে ভাত টা খেয়েই, বাড়ির পেছনে পুকুরের পাড় ঘেঁষে চুরি করে বেরিয়েই এক ছুট, যা হবার হবে। সারাদিন মাঠে গড়াগড়ি , রোদে বোলিং ফিল্ডিং করে গায়ের রঙ জ্বলে বিচ্ছিরি অবস্থা। হাতের খোলা অংশ থেকে রোদে পোড়া ঘামের গন্ধ বেশ বুঝা যেত। এরপর সন্ধ্যায় ফিরলেই বিচার, ভাতের টেবিলে মার। কান্মলা, চড় থাপ্পর, আর না যাওয়ার প্রতিজ্ঞা। উদ্ধারকারী যথারীতি দাদি, আমি বলার আগেই দাদি বলতো যে কালকে থেকে আর যাবনা আমি। এক দুদিন বন্ধ, আবার শুরু।

কোন একটা প্রীতি ম্যাচ হলেই টেনশনে দুপুরে ভাত খেতে পারতাম না। খেলার অনেক আগেই গিয়ে বাউন্দারি দেয়া, স্কোর কার্ড, পানির বোতল নেয়া, সবাইকে ডেকে আনা এসব করতেই কিযে ভাল্লাগত! খেলার আগেরদিন রাতে ফিল্ডিং সাজাতাম খাতার মধ্যে, ব্যাটিং লাইন ও রেডি, কার পরে কে বল করবে, কে বলের টাকা দেয়নি সব রেডি। তারপর নামাজ পড়ার জন্য আযান দেয়া মাত্রই বেরিয়ে যেতাম। উদ্দেশ্য আমার সহ অধিনায়ক হালিম শাহজাহান এদেরকে দেখিয়ে ফিল্ডিং এর বেপারে মত নেব। দেখা গেলো ওরা বলল আমি তিন নাম্বারে ব্যাট করবনা, কিংবা বলল অমুক্কে ওপেনিং এ নামাও ওর হাঁতে স্ট্রোক আছে, কিংবা স্লিপের ফিল্ডিং চেঞ্জ করল।আমিও একমত। জামাত শুরুর আগ পর্যন্ত আলোচনা, আবার নামজ পড়ে বাসায় যাওয়া পর্যন্ত ও। খেলার দিন বেরোনো আরেক কঠিন। দেখা গেলো আমি ২ টা প্যান্ট পরলাম, খেলার ট্রাউজার ভেতরে। দুইটা গেঞ্জি গরমের মধ্যে, অনেক্তা আমাদের এলাকার হুসেন পাগ্লার মত যে সবসময় ২০-২২ টা টি শার্ট সোয়েটার পড়ে থাকে। হাহা।।এরপর নির্দিষ্ট সময়ে কেউ এসে দুইটা সাংকেতিক তালি দিল, আমি জানালা দিয়ে কেডস ফেলে দিলাম। কেউ একজন এসে আমার কেডস নিয়ে মাঠে চলে গেলো আগেই। পরে আসতে আসতে ভদ্র ছেলের মত পরিবেশ বুঝে বেরিয়ে যেতাম।খেলার মাঠে গিয়ে উপরের গুলো খুলে খেলা শেষে আবার পরে চলে আসতাম। এভাবে মুস্লিমাবাদ, জেলে পাড়া, ডেইল পাড়া, হিন্দু পাড়া, চৌধুরি পাড়া, মাইজ পাড়া, ফুলছরি পাড়া, বীচ, চরপারা, হাউজিং কলোনি, বালিকা স্কুলের মাঠ, হাই স্কুলের মাঠ, সিমেন্ত কলোনি, পূর্ব কাতগর, রিফাইনারি গেইট কোন পাড়া বাকি নাই। এর মধ্যে বাংলাদেশ জিতল আই সি সি ট্রফি। ব্যাস, হয়েই গেলো। ক্রিকেটার হওয়া হল জীবনের লক্ষ্য। লেখাপড়ায় ফাঁকি, এস এস সি পরীক্ষাতে আরও একশ নাম্বার বেশি পেতাম ক্রিকেট না খেললে। লাভ কি, এরপর কলেজে কেমিস্ট্রি ম্যাথের প্রাইভেট বাদ দিয়ে হাই স্কুলের মাঠে খেল্লাম জেবর মুল্লুক স্মৃতি সংসদের গোল্ড কাপ। প্রতিতা ম্যাচ যেন শিহরিত করত, লোম দাঁড়িয়ে যেত একেক্ টা উইকেট পড়লে। একেক টা জয় যেন বিশ্বজয়। শুধু তাই না, বাসায় গিয়ে অইদিন আর পড়াই হতোনা। খেলার ভুলত্রুটি বিশ্লেষণ, কার বল ভালো হয়েছে, কে ওয়াইড দিল বেশি, কে লাইনের বল ফুট ওয়ার্ক ছাড়া খেলে বোল্ড হল………।।এগুলা মাথায় ঘুরত। প্র্যাকটিসের সময় সে কি সিরিয়াস আমরা। নিয়ম ছিল ক্যাচ পড়লেই মাথা নিচে দিয়ে গড়াগড়ি খেতে হবে একবার, ভুল আউট হলে বারবার জবাবদিহি করতে হবে। মুস্লেহ উদ্দিন ভাই আমাদের ক্রিকেট গুরু, শাহজাহান ভাই ও। এই দুজন, জাভেদ ভাই, তসলিম, শাহাব মামা এদের সে কি পেশাদারিত্ব সেই সময়ে সেই ছোট্ট পাড়ায় তা আজকের জাতীয় দলেও বিরল আমি বলব।দল ঘোষণা হত মিটিং করে, কে বাদ পড়ল, কে জায়গা পেল সে নিয়ে কি উত্তেজনা। আমাকে দেখতে বয়সের চেয়ে ছোট দেখাতো। তাই সবাই কেমন একটু বেশিই পছন্দ করতো। বেসরকারি অখ্যাত কলেজে পড়ে এই ক্রিকেট যেন আমার রক্তে মিশে গেলো। যে বয়সে ছেলেরা প্রেমে পড়ে, মেয়েদের প্রতি আকৃষ্ট হয় সে বয়সটা আমার কেটেছে তীব্র ক্রিকেট প্রেমে।ক্রিকেট থাকাতে আর কোন অনুষঙ্গের কাছে যেতে হয়নি আনন্দের খোঁজে। টি ভি পর্যন্ত দেখতাম না। পুরো পাড়াতেই একটা ক্রিকেটের আবহ ছিল। চেন্নাইতে টেস্ট এ কে ব্যাট করছে, সাঈদ আনোয়ার এর কইটা সেঞ্চুরি, কিংবা ওয়াসিম আকরামের কেমন বলে বোল্ড হল স্তিভ ওয়াহ, ওয়াকার ইয়ুনিসের ইঞ্জুরি, নাসের হুসেনের প্রোফাইল এ গুলা পুরা মুখস্থ. কেউ ক্রিকেট নিয়ে কিছু জানতে চাইলে আমাদেরকেই জিজ্ঞেস করতো। একজন রিকশাওয়ালা ছিল স্থানিয়, শাহজাহান ভাই নামে। এখনও আছে। সে ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা করার লোভে আমাকে নেয়ার জন্য বসে থাকতো স্ট্যান্ডে। লিটন নামে বাড়ির পাশের এক ছেলে খালি পেপার কাটিং জোগাড় করতো আমার জন্য। সব ক্রিকেট বিষয়ক, হোকনা বহুদিন আগের। এর মধ্যে আছে পাকিস্তান ভারত এর সমরথক গ্রুপ। এ নিয়ে বাজি,হই চই, কোক ফানটা কিংবা পার্টী। ব্যাট বল স্ট্যাম্পের টাকা জোগাড় করতে সবাই বিয়ের অনুষ্ঠানে event management এর দায়িত্ত নিতাম। অথচ ঘরে এক গ্লাস পানিও ঢেলে খেতাম না। কি দিন ছিল হায়!!!!

তারপর একদিন সেই বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক হল। আমাদের খেলার জায়গা নেই।ছেলেরা সব বিচ্ছিন্ন।কেউ সৌদি আরবে, কেউ লন্ডনে, কেউ চাকরি পেল, কেউ বিয়ে করে সংসারের জোয়াল নিল কাঁধে। আমি চান্স পেলাম ভার্সিটিতে। এবার বাসার বকা দিতে হয়নি, নিজেই ৩৫ কি মি দূরে প্রতিদিন যাওয়া আসা করে ক্লান্ত থাকি।সপ্ন গেলো পালটে। বুঝলাম ক্রিকেটার হওয়া সোজা নয়, বাংলাদেশে খেলাধুলার ক্যারিয়ার ও তেমন নিশ্চিত কিছু না। আবেগের জায়গাটাও কমলো। বাস্তবিক চিন্তা, ক্যারিয়ারের চিন্তা ঢুকাতে ক্রিকেট প্রায় ছেড়েই দিলাম। তবুও ফাক ফোঁকরে খেলতাম। মাঝে মাঝে অনুরোধে খেপ ও খেলতাম। ২০০১ সালে বঙ্ঘবন্ধু গোল্ড কাপ আয়োজন করলাম, এরপর ব্যস্ত হয়ে গেলাম পড়াশোনা নিয়ে।মানে সিলেবাসের চাপে দিশেহারা, বাধ্য হয়ে টেবিলে। বন্ধুর সার্কেল পালটে গেলো, জীবন পালটে গেলো। ক্রিকেট ক্রমেই দূরে চলে গেলো মুলত মাঠের অভাবে, সময়ের অভাবে।

তবে ক্রিকেটের সাথে জীবনের ভিষন মিল, খুবই জীবন ঘনিস্ত। এই ক্রিকেট আমাকে লড়াকু বানিয়েছে। ক্রিকেটে যেমন একটা ভালো ওপেনিং জুটি দলকে জেতায়, জীবনের ভালো শুরুও আমাদের বিজয়ী করে, বিপরিত হলে দু ক্ষেত্রেই উলটা হয়। ক্রিকেট আমাকে মানসিক পরিপক্ষতা, নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা শিখিয়েছে।শিখিয়েছে নেতৃত্ব দেবার অসাধারণ ক্ষমতা। একটা দল নিয়ে ম্যাচ জিতে আসা, সীমিত সামর্থ্যে বড় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জ্বালানি ক্রিকেটই তো দিয়েছে।আমি সবসময় দুর্বল দলেই খেলতাম যখন আমাকে choose করতে দেয়া হত।পারায় december january তে টুর্নামেন্ট এর শেষ নাই। একবার বাংলাদেশ নামে একটা দল গঠন করেছিলাম, সাল ২০০২। সবগুলায় আনাড়ি আমার দলে দু একজন ছাড়া। বিপক্ষের সব দল শক্তিমান, তবুও আমরা লড়াই করে quarter final পর্যন্ত গেলাম। অনেক ভালো লেগেছিল।বিপক্ষের ওরা পর্যন্ত বলছিল আমাদের লড়াকু মনভাবের কথা। প্রচুর ক্রিকেট দেখতাম ও। test ক্রিকেট থেকে শিখেছি ধৈর্য।। মানসিক চাপ সামলে, ব্যাটসম্যানের psychology বুঝে বল করার ব্যাপার ছিল। প্রতিটা বল আমার একেক টা experiment, একেক টা টেস্ট।

ক্রিকেট আর জীবনের সবচেয়ে বড় মিল এক জায়গায় আমার মতে। তা হল ক্রিকেটে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা থাকে, যে কোন সময় সুযোগ থাকে ম্যাচে ফিরে আসার। আমি মনে করি জীবনেও সফল হবার দিন শেষ হয়ে যায়না, শেষ পর্যন্ত শেষ উইকেট পর্যন্ত কিংবা শেষ বল পর্যন্ত জেতার আশা থাকে। তাই ক্রিকেটের খোঁজ খবর কম রাখলেও, ক্রিকেটের কাছে কৃতজ্ঞ আমি। জীবনের চরম মুহূর্ত গুলতে নিজেকে ক্রিকেটার মনে হয়। মনে হয় আমি বড় স্কোর তাড়া করছি,হাঁতে উইকেট নেই বেশি, ওভার ( মানে সময়) ও ফুরিয়ে আসছে। ভালো বল্ কে সম্মান জানিয়ে ছেড়ে দিতে হবে, খারাপ বল থেকে রান তুলতে হবে। তাই ক্রিকেটের সময়তা মিস করি, মিস করি ক্রিকেট পাগল সেই উদ্দাম কৈশোর। পালিয়ে লুকিয়ে চুরিয়ে খেলার স্বাদ এখন অমূল্য মনে হয়।পাড়ার সেই ক্রিকেট গুরু বড় ভাইদের আর টীমম্যাট দের এখান থেকে অনেক শ্রদ্ধাভরা ভালবাসা জানাই, তাদের চিরন্তন ভালবাসা এবং sportsmanshipআর brotherhood এর জন্য। ক্রিকেটের জয় হোক, জীবনের জয় হোক, জয় হোক জীবনীশক্তির…………………।

.

.

.

http://www.nagorikblog.com/node/7644

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: