“Against All Odds”- একটি অসাম টাইপের অনলাইন ভিডিও গেইম

আমাদের কম বেশি সবারই সহজ-সরল-কঠিন-জটিল-কুটিল-মারদাঙ্গা ভিডিও গেইম খেলার অভিজ্ঞতা আছে বোধয়। যারা খেলে তারা জানে, কতটা নিখাঁদ উত্তেজনা, মজা, ফূর্তী, বিনোদন জড়িয়ে ছড়িয়ে আছে একেকটি গেইমের পরতে পরতে। চ্যালেন্জকে পাল্টা চ্যালেন্জ করা, যুথবদ্ধতা, দলীয় আনুগত্য, লীডারশিপ, ‘এক জীবনে কোনোদিনও পারব না’ এমন সব ভয়ানক সিদ্ধান্ত নিয়ে জয়ের দিকে জোরকদম এগিয়ে যাওয়া…এ এক অন্য জগত। অদম্য নেশা।

আমাদের কম বেশি সবারই সহজ-সরল-কঠিন-জটিল-কুটিল-মারদাঙ্গা ভিডিও গেইম খেলার অভিজ্ঞতা আছে বোধয়। যারা খেলে তারা জানে, কতটা নিখাঁদ উত্তেজনা, মজা, ফূর্তী, বিনোদন জড়িয়ে ছড়িয়ে আছে একেকটি গেইমের পরতে পরতে। চ্যালেন্জকে পাল্টা চ্যালেন্জ করা, যুথবদ্ধতা, দলীয় আনুগত্য, নেতৃ্ত্ব, ‘এক জীবনে কোনোদিনও পারব না’ এমন সব ভয়ানক সিদ্ধান্ত নিয়ে জয়ের দিকে জোরকদম এগিয়ে যাওয়া…এ এক অন্য জগত। অদম্য নেশা।

এ নেশায় মানুষ কেন মাতে, নানা জনে নানা জবাব দেবে। অনেকে এমনি এমনিই মাতে। অনেকে প্রতিদিনের একঘেয়েমি কাটাতে, কোনো এক বাজখাই টেনশান কিছুক্ষন ভুলে থাকতে, চাকরী,স্কুল ইত্যাদি রুটিন থেকে সাময়িক ছুটি নিতে এই টানটান উত্তেজনার জগতে স্বেচ্ছায় হারিয়ে যায়। কত বিচিত্র অনুভূতির সমাবেশ ঘটে এই গেইমগুলো খেলার সময়। কখনও স্রেফ সাঁইসুঁই গতি বাড়িয়ে, একে অন্যকে পাশ কাটিয়ে, গুতো দিয়ে চমৎকার একটা গাড়ী নিয়ে দ্রুততম সময়ে অভীষ্টে পৌঁছে যাওয়া। কখনও লক্কর ঝক্কর এবড়ো থেবড়ো প্রান্তরে হাজারটা খানাখন্দ ডিঙ্গিয়ে মোটরবাইক রেইসে জয়লাভ। খেলতে গিয়ে জেনেছি পারশিয়ার প্রিন্স হবার কত হ্যাপাঃ পদে পদে বিপদ, অন্ধকার ভবিষ্যত, মারামারি, শত্রুতা মোকাবিলা করতে করতে কাহিল কিন্তু দিনশেষে বিজয়ের আনন্দ…এতগুলো ঘন্টা ইনভেস্ট করা সুদে-আসলে উসুল। আবার কখনও কুটনৈতিক সব চাল চেলে, স্ট্র্যাটেজি প্রয়োগ করে, নানা ভদ্র ও কিঞ্চিত অভদ্র উপায়ে সম্পদ অর্জন করে, নিজস্ব মিলিটারি হাঁকিয়ে যুদ্ধে জিতে নিজ হাতে আস্ত একটা ‘গ্রীক সভ্যতা’ গড়ে তোলার দিগ্বিজয়ী আনন্দ…অতুলনীয়! Wii আর Playstation-এর কারণে এখন তো হরেক রকম শারিরীক কসরতযুক্ত খেলাও খেলছে সবাই সমানে। ঘাম ঝরিয়ে তুমুল নাচানাচি, নিজের ব্যান্ড গড়ে হাউকাউ ক্যারিওকি…মাশা আল্লাহ সব রকমের খায়েশ মেটান যায় একেকটা গেইম খেলে।

মাস দুয়েক হল নতুন এক অনলাইন গেইমের সন্ধান পেয়েছি। একদম ফ্রী। “Against All Odds” নামের এই অন্যরকম, অসাধারণ গেইমটি বানিয়েছে The UNHCR ( United Nations High Commissioner for Refugees)। ২০০৫ সালে প্রথমে এটি সুইডিশ ভাষায় রিলিজড হয়, তারপর ২০০৬ সালে জার্মান ভাষায় এবং শেষে ২০০৭ সালে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। গ্রীক, স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ, ডেনিশ, ফিনিস, নরওয়েজিয়ান, আইসল্যান্ডিক ও এস্টোনিয়ান ভার্শনেও এটি খেলা যায়।

ইউরোপিয়ান মিডল স্কুলের শিক্ষকদের এই গেইমটি ‘সিভিক লেসন্স’এর অন্তর্ভুক্ত করার জন্য অনুপ্রানিত করা হচ্ছে শুরু থেকেই। ফলাফল অত্যন্ত ইতিবাচক; শিক্ষক, ছাত্র উভয় পক্ষই এই চমৎকার পদক্ষেপে সোৎসাহে সম্মতি জানিয়েছে। ক্যাথ্রিন রড্রিগেজ নরমান, যিনি এই গেইম তৈরিতে অংশ নিয়েছিলেন, বলেছেন, গেইমটি বানান হয়েছে মুলত ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের জন্য। কেননা, এই বয়সটিতেই মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক সহ অন্যান্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ধ্যানধারনা গঠিত হয়, বিকশিত হয়।

হোক না স্কুলের বাচ্চাদের জন্য গেইম। আমি তুমুল আগ্রহে খেলেছি। আপনারও ভাল লাগবে, কোন সন্দেহ নেই। খেলা শেষ করতে আমার লেগেছে চার ঘন্টা। আপনি আমার চেয়ে স্মার্ট হলে আপনার আরও কম সময় লাগার কথা। হাসি

শরনার্থী (Refugee) জীবনের বিচিত্র, অদেখা, অজানা সব জটিলতা, প্রতিবন্ধকতা, বিপদ-আপদের সাথে গেইমারকে পরিচয় করিয়ে দেবে এই গেইম। উত্তেজনা, মজা আর একইসাথে দারুন সব শিক্ষনীয় উপাদান ঠাসা আছে এতে।একবার শুরু করলে শেষ না করা পর্যন্ত ‘বিড়ি ব্রেক’ বা ‘ফেইসবুকিং’ অসম্ভব!

গেইমটি যে উদ্দেশ্য নিয়ে বানান তা এক কথায়ঃ শরনার্থী পরিস্থিতী সম্পর্কে আমাদেরকে একটি বাস্তব, বিশদ ধারণা দেয়া। সেই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একজন শরনার্থীর ভূমিকায় আমি খেলে যাচ্ছি, লড়াই করে যাচ্ছি। অত্যাচারী, শোষক মিলিটারি সরকারের গড়া রাষ্ট্র- যন্ত্র থেকে, শাসন থেকে বাঁচার জন্য কী আকুল প্রাণপন চেষ্টা আমার! একটিই লক্ষ্য, বেঁচে থাকা কোনরকমে। তারপর বর্ডার পেরিয়ে অন্য কোথাও পালিয়ে যাওয়া। নতুন করে জীবন শুরু করা।

যে কেউ একা বা দলবেঁধে খেলতে পারে এ জীবন-মরন খেলা। এমনকি স্কুলের বাচ্চা-কাচ্চারা পুরো ক্লাসশুদ্ধ একসাথে খেলতে পারে। সমস্ত নিয়মাবলী সহজ ভাষায় বিস্তারিত দেয়া আছে। গ্রাফিক চমৎকার! অভিজ্ঞতা আর জ্ঞানার্জনের জন্য এটি একটি পারফেক্ট গেইম। (আমার সুপারিশ চোখ বন্ধ করে মেনে নিতে পারেন হাসি )

তিনটি ধাপ পেরুতে হবে আপনাকেঃ “যুদ্ধ”, “সীমানা পেরিয়ে”, “নতুন জীবন”। বার রকমের পরীক্ষায় টিকতে হবে। টিকে থাকার সংগ্রামে আপনাকে রুদ্ধশ্বাস সব ‘প্রতিবন্ধকতা’ ছুঁড়ে দেয়া হবে। দুঃস্বপ্নেও যা ভাবেন নি, সেরকম সব নিষ্ঠুর পরিস্থিতিতে ঠেলে ফেলে দেয়া হবে আপনাকে। কোন্ স্ট্র্যাটেজিতে নিজেকে বাঁচাবেন, কিভাবে, কত তাড়াতাড়ি বিপদমুক্ত হবেন নির্ভর করছে আপনার বুদ্ধিমত্তা এবং রনকৌশলের উপর। একটুখানি এদিক ওদিক করেছেন কি মিলিটারী এসে দুমাদুম কয়েক ঘা বসিয়ে দেবে আপনাকে! আপনি খতম!

প্রশ্ন হলো, শরনার্থী বিষয়ে আমার/আপনার জেনে লাভ কী? একজন শরনার্থীর জুতো পায়ে আমি/আপনি কেন খামোখা হাঁটতে চেষ্টা করব?…..একবার কল্পনা করুন তো, আপনি ভয়ঙ্কর অস্থির এক যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশে মৃত্যু হাতের মুঠোয় পুরে দম বন্ধ করে বেঁচে আছেন! যেখানে নাগরিক অধিকার ভুলুন্ঠিত হয় প্রতি পদে পদে। নিরপদে জীবন যাপনের নিশ্চয়তা হুমকির মুখে। বাক স্বাধীনতা নেই, স্বাধীনভাবে চিন্তা করবারও অধিকার ছিনতাই হচ্ছে প্রতিদিন। পরিস্থিতি এমন যে, হয় আপনার দিকে তাক করা সামরিক জান্তার বন্দুকের নলের সামনে নতজানু হয়ে বাঁচুন আমৃত্যু অথবা অন্য কোন দেশে শরনার্থী হয়ে পালিয়ে যান, আপন অধিকারেই আবার বেঁচে উঠুন; পরিবার-পরিজন, বন্ধুজনের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠুন আপনি।

কোনরকমে পালিয়ে গেলেন হয়ত বা অন্য কোন দেশে, এখানেই কি যুদ্ধের সমাপ্তি? শরনার্থী শিবিরে, এই নির্বাসনে আছে আরও রূঢ় লক্ষ কোটি সমস্যাঃ আবাসন সঙ্কট, সম্মানজকভাবে একটা কাজ জুটিয়ে খেয়ে পড়ে বাঁচার নেই কোন গ্যারান্টী, এ দেশের ভাষা আপনি জানেন না, নতুন দেশের নতুন সব জনগোষ্ঠির সাথে খাপ খাইয়ে চলতে শেখা, সম্পূর্ণ নতুন সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল, ‘শরনার্থী’ নামের অপবাদ নিয়ে প্রতিদিন দিন শুরু করা, মানসিক টানাপড়েন…আরও কত কি! পৃথিবীতে প্রতি তিনশত জনের ভেতর অন্তত একজন হতভাগ্য মানুষ শরনার্থী হিসেবে বাধ্য হয়ে নিজ দেশে ছেড়ে পরদেশে পাড়ি জমিয়েছে প্রাণভয়ে। একবার ভাবুন তো আপনিই সেই একজন!

বিশ্বময় ছড়িয়ে থাকা এই অভাগাদের অধিকারের প্রতি সম্মান আর সচেতনতা বাড়াতেই এই গেইমটির সৃষ্টি।

দারুন এক এ্যাকশান-ঠাসা, রোমাঞ্চকর সময় কাটবে আপনার, নিঃসন্দেহে। মাত্র একটা মাউস-ক্লিক করলেই বিনোদন আর অজানা একটি বিষয়ে শিক্ষালাভ একই সাথে ধরা দিচ্ছে আপনার কাছে। আপনার টিনেজার সন্তানকে সাথে নিয়ে খেলুন। ঐ বয়সী যে কারও সাথে খেলুন, খেলতে অনুপ্রাণিত করুন। সেই সাথে নিশ্চই একটুখানি সময় ব্যয় করে শরনার্থীদের নিয়ে আরও বিস্তারিত জানতে চাইবেন আপনি। কে জানে হয়ত এই গেইমটি খেলতে খেলতেই ঐ অভাগা মানুষগুলোর সাহায্যে এগিয়ে আসতে আপনি মনস্থির করে ফেলবেন!

.

.

.

http://www.sachalayatan.com/uchhola/43225

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: