সিকান্দার বাদশা – ২

প্রথম পর্ব এখানে

পৌরববিজয় এক বিরাট ব্যাপার, এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব মহান আলেকজান্ডারের খয়েরখাঁরা যতটা প্রচার করে তার চেয়ে অনেক ব্যাপক। হেরে গেলে সর্বনাশ হতো, পৌরবেরা অবশ্যই তাক্সিলা দখল করতে এগিয়ে যেত আর মহান আলেকজান্ডারকে কাবুলের বেতমিজ পাহাড়িদের এলাকা দিয়ে ফেরত যেতে হতো। এই বিজয়ে শুধু যে পৌরব হাতে এল তাই নয়, উপরন্তু পারস্যের সাথে সিন্ধু নদ আর ভারত মহাসাগরের মাধ্যমে নতুন কানেকশন খুলে গেল।

তিনি জাহাজ নির্মাণের জন্য কাঠ কাটার হুকুম দিলেন, উত্তরের বন থেকে কাঠ এনে জাহাজ বানিয়ে ঝিলম নদীতে ভাসানো হল। ঝিলামের দুই পাড়ে দুইটি নতুন শহর পত্তন করা হল, বুকাফালিয়া আর নিকিয়া। শহরদুটোয় সিন্ধুনদ টহলের জন্য নৌবহর বসানোই ছিল আলেকজান্ডারের আসল ধান্দা, পদাতিক বাহিনীর পাশাপাশি নৌবাহিনীর গুরুত্ব তার কাছে ছিল অপরিসীম। সিন্ধু নদটাও তার খুব ভালো লেগে যায় কোন কারণে, নদের কুমীর দেখে তিনি খুশিতে ডগমগ হয়ে ভাবেন আরে এই কুমীর তো নীলনদেও দেখেছি, তাইলে মনে হয় নীল নদই নামতে নামতে সিন্ধু হয়ে গেছে! তার এই ভুল অবশ্য পরে ভেঙেছিল।

আলেকজান্ডার চেনাব নদী পার হয়ে নতুন পৌরবে ঢোকেন। তাক্সিলার রাজার মতই এর রাজা পৌরবের পতনে মহা আনন্দিত ছিলেন, পুরান পৌরবের রাজা তার সম্পর্কে চাচা লাগেন। কিন্তু ভাতিজা যখন খবর পায় যে চাচা হেরে আবার আলেকজান্ডারের সাথে চরম দোস্তি করেছে তখন সে ভয়ে রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যায়। আলেকজান্ডার রাজ্য চাচার হাতে তুলে দেন।

ম্যাসিডোনিয়ানরা কিন্তু বিরক্ত হয়ে উঠছিল, আলেকজান্ডারের ভারত জয়ের মুলা তাদের আর পছন্দ হচ্ছিলোনা। কাদা পানির দেশে যুদ্ধ করে তারা ছিল অতিষ্ঠ, গঙ্গা নদীর বদলে তারা সটান গ্রীস ফেরত যেতে চাইলো। আলেকজান্ডার তাদের কতনা বোঝালেন, সোনা বাছা করে বললেন এইতো আরেকটু পরেই গঙ্গা, গঙ্গার পরেই ভারত মহাসাগর, আর কে না জানে ভারত মহাসাগর পেরোলেই কাস্পিয়ান সাগর! কে শোনে কার কথা, তারা শতদ্রু নদী পেরুতেই অসম্মতি জানালো। চোখের পানি মুছতে মুছতে আলেকজান্ডার ফেরার পথ ধরলেন।

আলেকজান্ডারের সাথের সাদা লোকেরা ভারি বুদ্ধিমান ছিল। তারা ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেশটাকে দেখে বুঝার চেষ্টা করেছিল। অবশ্য সাধারন লোকের জীবন তাদের কাছে ধরা দেয়নি, বাইরের জগতটাই তারা দেখতে পেরেছে। পাঞ্জাবে গোত্রগুলির মধ্যে তারা দেখে খুব কড়া কিছু আইন, যা তাদের চোখে অদ্ভুত ঠেকে। কিছু গোত্রে বক্সিং রেসলিং তীরন্দাজী ইত্যাদিতে হেরে গেলে কুমারী কন্যাকে পুরষ্কার হিসেবে দান করার রেওয়াজ ছিল। অন্যকিছু গোত্রে একজোড়া হালের বলদের বদলে বউ কেনা জায়েজ ছিল, অতএব যতজোড়া বলদের পয়সা মরদের পকেটে ছিল সে ততটা বউ নিয়ে ফূর্তি করতে পারতো। তাক্সিলা শহরে একটা রীতি ছিল, কুমারী মেয়ের গরীব বাপ মেয়ের জন্যে স্বামী জোটাতে না পেরে তাদের বাজারে নিয়ে নিলামে ওঠাত। ঢাক ঢোলক বাজিয়ে লোক জড়ো করা হত তাদের আশপাশে, মেয়েদের গলা থেকে কাঁধ পর্যন্ত কাপড় নামিয়ে লোকে দেখত। কারো পছন্দ হলেই ইনস্ট্যান্ট শুভ বিবাহ।

দুইটি বর্ণের লোকদের গ্রীকদের মনে হয়েছিল উঁচুজাতের মানুষ। ব্রাহ্মন, অর্থাৎ জ্ঞানী লোক। এরা দার্শনিকও বটে। আরেকদল কাঠে, এরা সম্ভবত প্রাচীন ক্ষত্রীয়।

ব্রাহ্মনেরা নানাদিকে ছড়িয়ে ছিল। কিছু ছিল সরকারী কর্মচারী, এরা রাজার বুদ্ধিদাতা হিসেবে কাজ করতো। কিছু ছিল বিরাট তপস্বী টাইপ, এরা দিনের পর দিন খাড়া রৌদ্রে দাঁড়িয়ে সাধনা করতো। কেউ কেউ জ্ঞান বিতরনে মগ্ন ছিল। অনেকে আবার পরিবেশ স্টাডি করতো, ঝড়বাদল খরা রোগশোক এগুলির কারন বের করাই ছিল এদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য। কোন কাজ না থাকলে এদের অভ্যাস ছিল আজাইরা রাস্তাঘাট দোকানপাট মেরামত করা। সাধারন মানুষ এদের ভারি সমঝে চলতো, যেকোন দোকান থেকে তারা যা খুশি তাই তুলে হাঁটা ধরতো। তারা প্রায় ন্যাংটোই ঘুরতো বলা চলে, কিন্তু যেকোন ঘরের অন্দরে এমনকি মেয়েমহলেও এদের অবাধ যাতায়াত। যখন যে ঘরে খুশি তারা ঢুকে গল্প জুড়ে দিত আর তাদের খাবার খেতে বসে যেত। এরকম দুইজন একবার আলেকজান্ডারের টেবিলে এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাবার খেতে শুরু করে, পাঞ্জাবী ব্রাহ্মনেরা কঠোর জাতপাতের নীতি তেমন মানতো বলে মনে হয়না। খাবার খেয়ে তারা কাছাকাছি একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে ধ্যান করা আরম্ভ করে রোদের মধ্যে। এরা রোগকে ঈশ্বরের শাস্তি মনে করতো, কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে নিজের গায়ে আগুন লাগয়ে দিত।

তাক্সিলার ব্রাহ্মনদের নিয়ে আলেকজান্ডারের কৌতূহল ছিল। আজকের হিসেবে যাকে ধর্ম বলা হয় তা আলেকজান্ডার বা তার গ্রীক বন্ধুরা কেউই পালন করতোনা, গ্রীসে মূর্তিপূজা আসলে ছিল উৎসবেরই নামান্তর। রাস্তাঘাটে মানুষ দৈববাণী শুনতে পেত বলে দাবী করতো কিন্তু সত্যকার ধর্মপালন বলতে যা বুঝায় তা ছিল অনুপস্থিত। তাই আলেকজান্ডারের এই ন্যাংটো ব্রাহ্মনদের ধর্মীয় পাগলামী বুঝতে ইচ্ছে করে। তিনি এদের ডেকে পাঠান। ব্রাহ্মনেরা জানায় তিনি যদি ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করতে চান তাহলে ওরা আসবেনা বরং তাকেই তাদের কাছে যেতে হবে। তাই তিনি ওনেসিক্রটাসকে তাদের কাছে পাঠালেন।

সে এক আজব ইন্টারভিউ বটে। শহর থেকে দুই তিন মাইল দূরে সবুজ জঙ্গল। পনেরোটি ন্যাংটাবাবা, কেউ কেউ আবার মাথার উপর দুই হাতে কাঠের টুকরা ধরে এক পায়ে খাড়া। কেউ পাথরের উপর বসে বা শুয়ে। উন্মাদ ছাড়া এই কড়া ভারতীয় রোদে কেউ এই কাজ করে তা ভাবাই যায়না। সাদা ভাইয়া তার দোভাষী নিয়ে হাজির। তিনি বললেন, ওহে ভারতীয় বন্ধুরা, আমি আসছি মহান আলেকজান্ডারের পক্ষ থেকে। তিনি নিজেই এক দেবতা, আর তার কানে কালানোসের পান্ডিত্যের কথা গিয়েছে। তিনি তোমার কথা শুনতে আগ্রহী। পাথরের উপর শুয়ে থাকা ন্যাংটাবাবা কালানোস উত্তর দিলেন, “তোর গায়ের কাপড় প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ আর দেবতার অপমানও বটে। এইরকম অহংকার আর আমোদে দিন গুজরান করলে জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। সত্যযুগে ধুলার মত অফুরন্ত ছিল গম, পানির মত দুধ, মধু, মদ আর তেলের নহর বয়ে যেত। কিন্তু মানবজাতির আমোদফুর্তির বহরে দেবতারা রুষ্ট হন, আর সব কেড়ে নেয়া হতে থাকে। এইরকম চলতে থাকলে খরা দুর্ভিক্ষ লাগতে কি আর দেরি লাগবে? শুন, সত্যই শিখতে চাইলে যা কাপড় খুলে আয় আমার পাশে পাথরের উপর বস। দেখ কত শিখাই।”

গ্রীক ভাইয়া হাঁ করে তাকিয়ে থাকলো। ন্যাংটা ফাজিল বলে কি? মান্দানিস বলে আরেক সাধু কিন্তু কালানোসকে বকে দিল বিদেশির সাথে খারাপ ব্যবহার করার জন্য। তারপরে ওনেসিক্রটাসকে শুধালো, বুঝলাম আলেকজান্ডার বিরাট জ্ঞানের পিপাসু, সব রাজারা তার মত হলে দেশটা সগ্যে পরিনত হত। কিন্তু বল দেখি, তোমাদের দেশে কি এইটা মানে যে সত্য ধর্ম হল সেই শুদ্ধ আত্মার তালাশ যে আনন্দ অথবা কষ্ট কোনটাতেই বিচলিত হয়না?

ওনেসিক্রটাস বললেন পিথাগোরাস এরকম একটা মতের কথা বলে গেছেন বটে, যেখানে তিনি ছাত্রদের জন্য জীবহত্যা নিষিদ্ধ করে গেছেন, কারন তাদের প্রাণ আছে। মান্দানিস বললো, হ্যাঁ কথা ঠিক আছে…কিন্তু তারাও তো নিয়মের দাস! প্রকৃতির মাঝে ফিরে আসা চাই।

যাই হোক তাকে লোভ বা ভয় দেখিয়েও আলেকজান্ডারের কাছে আনা গেলনা। মান্দানিস আলেকজান্ডারের দেবতা হওয়ার খায়েশ নিয়ে ভারি তামাশা শুরু করলেন, বললেন তার কিছুই চাইনা আর কাউকে তার ভয়ও নেই। “আমি মরলে”, বললেন তিনি, “আমার আত্মা শরীরপিঞ্জর থেকে মুক্তি পাবে, আর এক মহান আনন্দময় স্থানে গমন করবে”। কালানোস কিন্তু পোল্টি খেলেন, তিনি ঠিকই আলেকজান্ডারের দরবারে গিয়ে হাজির। তাকে দরবারে নিয়মিতই দেখা গেল, আলেকজান্ডারের পিছুপিছু তিনি ভারতও ত্যাগ করেন একসময়। আলেকজান্ডারকে নিয়ে প্রশংসামূলক গীত রচনায় মেতে উঠেন তিনি। অবশেষে একদিন তিনি অসুখে পড়েন, আর রীতি অনুযায়ী নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে ভবলীলা সাঙ্গ করেন ন্যাংটা সাধু কালানোস।

(শেষ)

……………………………………………………………
জেমস হুইলার রচিত “The History of India from the Earliest Ages: Hindu Buddhist Brahmanical revival” অবলম্বনে।

.

.

.

http://www.sachalayatan.com/mir178/43045

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: