ক্যামেরাবাজি: আসুন ‘প্যানিং’ শিখি

আমরা অনেকেই যারা ছবি তুলতে পছন্দ করি, কোন না কোন সময় ‘প্যানিং’ শব্দটা শুনেছি। প্যানিং কি বা কাকে বলে এবং কিভাবে আমরা সহজে প্যানিং করতে পারি আজকে সে ব্যাপারে কথা বলব। বলে নেয়া ভাল আমি বিরাট পণ্ডিত না, নিজে নিজে ইন্টারনেট আর বই ঘেঁটে ঘেঁটে যতটুকু শিখেছি প্যানিং সম্পর্কে, ততটুকুই সহজ ভাষায় বলার চেষ্টা করব। এখানে অনেক অভিজ্ঞ আর দক্ষ আলোকচিত্রী আছেন, আশা করছি তারাও মন্তব্য অংশে টিপস দিয়ে আমাদেরকে সাহায্য করবেন যাতে আমরা আরো বেশি বেশি শিখতে পারি।

একটা রিয়েল লাইফ ঘটনা দিয়ে শুরু করি। একবার লাউয়াছড়া থেকে আসছি, রাস্তায় গাড়ি একজায়গায় গ্যাস নেয়ার জন্য দাঁড়াল। লাউয়াছড়া গিয়েছিলাম ৩ বন্ধু মিলে ছবি তুলার জন্য। নুমায়ের তখনই অনেক ভাল ছবি তুলে, আমি আর ইশতিয়াক ২ জনই নতুন নতুন ডি এস এল আর ক্যামেরা কিনেছি। যাই হোক গাড়ি গ্যাসের লাইনে, আমরা ৩ জন দাঁড়িয়ে আছি রাস্তার ধারে। নুমায়ের হঠাৎ বলল যে প্যানিং করার ট্রাই করা যাক, আমি কিছুই বুঝলাম না কারণ আমি তখন পর্যন্ত নামটাই কোনদিন শুনিনি। নুমায়েরকে জিজ্ঞেশ করাতে ও আমাকে হালকা-পাতলা একটা ধারণা দিল প্যানিং সম্পর্কে, তবে ওর নিজের ধারণাও খুব বেশি পোক্ত ছিলনা যে কি করে একটা সুন্দর প্যান্ড ছবি তুলা যায়। ৩ জনে মিলে ঐ আধা-খাঁচড়া জ্ঞান নিয়েই অনেক অনেক চেষ্টা করলাম, বলাই বাহুল্য তেমন কোন ভাল ছবিই পেলাম না। কেন পেলাম না এবং কি করলে পেতাম এই ব্যাপারগুলা এখন আমরা আস্তে আস্তে দেখব।

এই আলোচনায় আমি ফটোগ্রাফির বেসিক টার্ম আর সেটিংস গুলা যেমন এ্যাপারচার, শাটার স্পীড, আই এস ও ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করবনা। যদি এমন কেউ থাকেন যে এই পোস্ট পড়ছেন কিন্তু এই ব্যাপারগুলা সম্পর্কে ভাল জানেননা, তাহলে দেখতে পারেন সচলের এই পোস্ট , এই পোস্ট, এই পোস্ট অথবা এই পোস্ট। প্রত্যেকটা পোস্টই প্রচন্ড ইনফরমেটিভ কিন্তু সহজবোধ্য।

আচ্ছা এবার বোধহয় ধরে নিতে পারি যে আপনি বেসিক জিনিসগুলা অলরেডি জানেন। তো মনে করুন একদিন আপনি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছেন (উদ্দেশ্য কি সেটা আপনি জানেন), আর আপনার গলায় সাধের ডি এস এল আর টা ঝুলছে। রাস্তায় হঠাৎ খুব সুন্দর একটা গাড়ি দেখতে পেলেন, ঠিক করলেন গাড়িটার একটা জটিল ছবি তুলে বন্ধু মহলে হৈ চৈ ফেলে দিবেন। আপনার ক্যামেরায় সেটিং তখন এ্যাপারচার F 9.0 আর শাটার স্পীড ১/২০, আই এস ও অটো মোডে। তো ঐ সেটিংয়েই গাড়িটাকে তাক করে ছবি তুলে ফেললেন, পেলেন এরকম কিছু

স্বাভাবিকভাবেই ছবিটা পছন্দ হলনা, এরকম ছবি চান না দেখেই না পকেট খালি করে ডি এস এল আর কিনেছেন! একটু চিন্তা করেই বুঝতে পারলেন যে গাড়িকে স্পষ্ট দেখতে চাইলে শাটার স্পীড ১/২০ থেকে বাড়াতে হবে, এবং বাড়িয়ে সেটা ১/৮০ করলেন। সেই সাথে এক্সপোজার আগের মতই রাখার জন্য এ্যাপারচার এ্যাডজাস্ট করে নিলেন (শাটার প্রায়োরিটি মোড হলে ক্যামেরা নিজেই করে নিবে)। তারপর মনমত আরেকটা গাড়ি দেখতে পেয়ে দিলেন শাটার চেপে। এবার ছবিটা হল এরকম

বাহ ছবিটা বেশ! গাড়ি, গাড়ির ড্রাইভার, গাড়ির পিছনে সাইনবোর্ড সব একেবারে চকচকে এসেছে, আহা সাধু সাধু! কিন্তু কি জানি একটা মিসিং, দেখে মনে হচ্ছে গাড়িটা থেমে আছে রাস্তার মাঝে। গাড়িটা যে সবকিছুকে ছাড়িয়ে শাঁ করে চলে যাচ্ছিল, সেই ব্যাপারটাকে কোনভাবে ছবিতে আনা যায়না? আপনার এই প্রশ্নের উত্তরে বলি, “হ্যাঁ যায়, এই টেকনিকটার নামই হচ্ছে প্যানিং।”

প্যানিং কে ভালভাবে বুঝার জন্য আসুন একটা সহজ পরীক্ষা করি। আপনার ডান অথবা বাম হাতের তর্জনি (অথবা মধ্যমা, যদি মঞ্চায় খাইছে ) খাড়া করে নিজের নাক বরাবর চোখের সামনে ৬ ইঞ্চি থেকে ১ ফুট দূরত্বের মধ্যে ধরুন। এবার এক চোখ বন্ধ করুন আর দ্বিতীয় চোখ ফোকাস করুন আঙুলের উপর, তারপর আঙুলকে আনুভূমিকভাবে ডান থেকে একেবারে বামে অথবা বাম থেকে একেবারে ডানে একটু জোরে সরান। এই এদিক-ওদিক একাধিকবার করতে পারেন এবং খোলা চোখ দিয়ে পুরোটা সময় আঙুলকে অনুসরণ করুন। কি দেখতে পাচ্ছেন? পুরো মুভমেন্টের সময় জুড়ে আঙুল স্পষ্ট দেখতে পেলেন কিন্তু ব্যাকগ্রাউন্ড ঝাপসা বা Blurred. এইখান থেকে এরকম একটা মোমেন্টকে টুস করে ধরে ফেলাই প্যানিং। এর মানে হচ্ছে প্যান্ড ফটোতে সাবজেক্ট থাকবে স্পষ্ট, ক্রিস্প আর ব্যাকগ্রাউন্ড থাকবে ব্লার্ড (ঝাপসা), যেটা ব্যাকগ্রাউন্ডের সাপেক্ষে সাবজেক্টের গতিময়তাকে তুলে ধরবে দর্শকের সামনে।

এইবার আসি অস্ত্রপাতি আর রণকৌশলের কথায়। প্যানিংয়ের জন্য প্রধানত ৩টা পয়েন্ট মনে রাখা জরুরী:

  • প্রথমত, লম্বা ফোকাল লেংথের লেন্স ব্যবহার করতে পারলে ভাল, হতে পারে সেটা জুম লেন্স অথবা প্রাইম লেন্স। লং ফোকাল লেংথের লেন্সকে তুলনামূলকভাবে ভাল বললাম কারণ আপনি প্রয়োজনে দূরের সাবজেক্টকে প্যান করতে পারবেন, আর নিরাপদ দূরত্বে থেকে করতে পারবেন (রেসিং সার্কিটের কথা চিন্তা করুন)। তবে এমন নয় যে লং লেন্স ছাড়া কাজই হবেনা, ১৮-৫৫ কিট লেন্সেও কাজ চলবে।
  • দ্বিতীয়ত, ফ্রেমিংয়ের সময় খেয়াল রাখবেন যাতে সাবজেক্ট ফ্রেমের মধ্যে খুব দূরে বা খুব কাছে না থাকে। সাবজেক্ট কে এমন দূরত্বে রাখুন যাতে সেটা আপনার ফ্রেমকে মোটামুটি fill করে রাখে, তাহলে অনেক ভাল দেখাবে।
  • তৃতীয় পয়েন্টটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্যানিং করার জন্য এমন সাবজেক্ট বেছে নিন যেটা বাম থাকে ডানদিকে অথবা ডান থেকে বামদিকে যাচ্ছে। গতিপথ হতে পারে সরলরৈখিক (যেমন সাইকেল, গাড়ি অথবা যেকোন যানবাহন যা সমতল রাস্তায় চলছে) অথবা কিছুটা কৌণিক (যেমন দোলনা অথবা ঢাল বেয়ে নামা চলমান কিছু )। যদি এমন কোন সাবজেক্ট সিলেক্ট করেন যা আপনার দিকে আসছে বা আপনার থেকে দূরে চলে যাচ্ছে তাহলে প্যানিং হবেনা, কারণ এক্ষেত্রে ক্যামেরায় কোন ব্যাকগ্রাউন্ড আসবেনা। যেমন নিচের ছবিটা

এবার একটা প্রশ্ন করি, “প্যান্ড ফটোতে সাবজেক্ট থাকবে স্পষ্ট, আর ব্যাকগ্রাউন্ড থাকবে ব্লার্ড”- এটা কিভাবে করা যায়? উত্তর হল এটা তখনই সম্ভব যখন ক্যামেরার সাপেক্ষে সাবজেক্ট একেবারে স্হির এবং ব্যাকগ্রাউন্ড গতিশীল। আরো সোজাভাবে বললে আমরা যখন ট্রেনে বসি তখন ট্রেনের গতি আর আমার গতি একই, কিন্তু বাইরে তাকালে দেখি সবকিছু পিছনে চলে যাচ্ছে। এর মানে ট্রেনের সাপেক্ষে আমি বা আমার সাপেক্ষে ট্রেন স্হির কিন্তু বাইরের যেকোনকিছু উভয়ের সাপেক্ষে গতিশীল। প্যানিংয়ের জন্য ক্যামেরাকে সাবজেক্টের সাথে পারফেক্ট Sync-এ আনতে হয় যাতে ক্যামেরার সাপেক্ষে সাবজেক্ট একেবারে স্হির হয়ে যায় (আঙুলের পরীক্ষার কথাটা মনে করুন)। এই অবস্হায় শাটার চেপে ছবি তুললে প্যান্ড ফটো পাওয়া যাবে।

এখন আরো কিছু সেটিংস নিয়ে আলোচনা করব যা ভাল প্যানিংয়ের সম্ভাবনা অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। পুরো ব্যাপারটাকে মোট ৭ টা পয়েন্টে ভাগ করে ব্যাখ্যা করলে আশা করি সহজবোধ্য হবে:

১) শাটার প্রায়োরিটি মোড: ক্যামেরাকে শাটার প্রায়োরিটি মোডে রাখুন। ক্যাননের ক্ষেত্র এই মোডের নাম Tv আর নাইকনের ক্ষেত্রে S। এই মোডের সুবিধা হচ্ছে আপনাকে শুধু শাটার স্পীড পরিবর্তন করতে হবে, এ্যাপারচার ক্যামেরা নিজে নিজে এ্যাডজাস্ট করে নিবে।

২) শাটার স্পীড: মনে রাখবেন প্যানিংয়ের সময় শাটার স্পীড তুলনামূলকভাবে কম বা ধীর রাখতে হয়, যদিও ঠিক কতটুকু কম/ধীর হবে সেটাও নির্ভর করে সাবজেক্টের গতির উপর। যেমন সাইকেলের প্যানিংয়ে যে শাটার স্পীড লাগবে রেসিং কারের ক্ষেত্রে শাটার স্পীড তার চেয়ে বেশি হবে। ভাল হয় যদি একটা রেঞ্জ নিয়ে শুরু করেন যেমন ১/১৫ থেকে ১/৩৫। এক্ষেত্রে রুল অফ থাম্ব হচ্ছে যদি ছবি তুলার পর দেখেন সবকিছু (সাবজেক্ট ব্যাকগ্রাউন্ড দুটোই) ঝাপসা তাহলে শাটার স্পীড বাড়ান, যদি দেখেন সবকিছুই স্পষ্ট তাহলে শাটার স্পীড কমান।

৩) অটো ফোকাস: নাইকন ক্যামেরার অটো ফোকাসের ক্ষেত্রে Continuous Auto focus mode (C) আর ক্যাননের ক্ষেত্রে AI Servo mode সিলেক্ট করুন। এই মোড সক্রিয় থাকলে ক্যামেরার অটো ফোকাস continuously সাবজেক্টকে ফোকাসে রাখে যদিও ক্যামেরা এবং সাবজেক্ট দুটোই প্রতি সেকেন্ডে জায়গা পরিবর্তন করছে। যদি সিংগেল বা ওয়ান শট অটো ফোকাস মোড সিলেক্টেড থাকে, তাহলে ক্যামেরা প্রথমে একবার সাবজেক্টকে ফোকাস করার পর সেটাকে লক করে ফেলে এবং সাবজেক্টের জায়গা পরিবর্তনের সাথে সাথে ফোকাসকে এ্যডজাস্ট করেনা। ফলে যেই মুহূর্তে ছবিটি তুলছেন তখন হয়তো অলরেডি সাবজেক্ট আউট অফ ফোকাস হয়ে গেছে।

৪) ফোকাস পয়েন্ট: ডি এস এল আর ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে তাকালেই নয়টি ফোকাস পয়েন্ট দেখা যায় তাইনা? প্যানিংয়ের সময় সবসময় মাঝখানের ফোকাস পয়েন্টটা ব্যবহার করতে হবে, এই ফোকাস পয়েন্টকে বলে ‘সেন্টার অটোফোকাস পয়েন্ট’। এটা ব্যবহার করার দুটো সুবিধা আছে

  • যেকোন ক্যামেরার সেন্টার অটোফোকাস পয়েন্ট সবচেয়ে দ্রুত আর স্পষ্ট ফোকাস পয়েন্ট।
  • এই সেন্টার অটোফোকাস পয়েন্ট দিয়ে সাবজেক্টকে টার্গেট এবং ট্র্যাক করা সুবিধাজনক। আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে উপরে বলেছি, প্যানিংয়ের সময় ক্যামেরা continuously সাবজেক্টকে অনুসরণ করবে। মনে করুন আপনি স্নাইপার, ক্যামেরা আপনার রাইফেল, শাটার হচ্ছে ট্রিগার, সাবজেক্ট হল টার্গেট আর সেন্টার অটোফোকাস পয়েন্টটা হচ্ছে রাইফেলের টেলিস্কোপের মাঝের ক্রস বিন্দু টা যেটা দিয়ে আমরা টার্গেট করি। আশা করি বুঝাতে পেরেছি।

৫) কখন শুট করব? ধরে নিলাম আপনি এই মুহূর্তে প্যানিং করছেন, আপনার ক্যামেরা সাবজেক্টের সাথে একেবারে Sync এ আছে। প্রশ্ন হচ্ছে আপনি কখন ছবিটা তুলবেন? সাবজেক্ট যখন ঠিক আপনার সামনে আসবে তখন? উত্তর হচ্ছে, যদি আপনি সাবজেক্ট ঠিক আপনার সামনে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন এবং এরপর শাটার চেপে একটা ছবি তুলেন, ঠিকঠাক ছবি পাওয়ার সম্ভাবনা খুব খুব কম। তাই সাবজেক্টকে ট্র্যাক করার পরপরই টাসটাস শাটার চাপতে থাকুন এবং একাধিক ছবি তুলুন। গোলাগুলির ভাষায় বললে একবার ফায়ার না করে ব্রাশ ফায়ার করতে থাকুন। আর এ থেকেই ৬ নাম্বার পয়েন্টের উদ্ভব।

৬) কোন্ শাটার মোড? উপরেই বলেছি আপনাকে ব্রাশ ফায়ার করতে হবে, তাই সিলেক্ট করুন নাইকনে Continuous Drive Mode (CH) আর ক্যাননে Multiple Shot Mode। Single Shot Mode এ একবার শাটার চাপলে ক্যামেরা একটাই ছবি তুলে, কিন্তু Continuous Drive Mode এ শাটার যতক্ষণ চেপে রাখবেন ক্যামেরা ছবি তুলতে থাকবে। তবে একবারে কয়টা ছবি উঠবে সেটা নির্ভর করবে ক্যামেরার fps রেটিং বা Burst রেটিংয়ের উপর, ক্যামেরাভেদে এসব রেটিং বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। এই আলোচনায় আজকে আর যাবনা।

৭) আর সবশেষে প্র্যাকটিস!!

আমি অনেকই অলস, ছবি তুলিনা বেশি, ফলাফল মোটামুটি কোয়ালিটির ছবি। নমুনা নিম্নরূপ:

নমুনা-১

নমুনা-২

নমুনা-৩

এবার কিছু অসাধারণ ছবি দেখি (আমার তোলা না)

আজ এই পর্যন্তই। হ্যাপি প্যানিং!! হাসি

.

.

.

http://www.sachalayatan.com/guest_writer/43005

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: