বাংলায় কথা কই

বাংলায় বোধ হয় আমাদের আর পোষাচ্ছে না। চলনে বলনে কাজেকর্মে কোনোখানেই না। হিন্দিপ্রেম তো অনেক আগে থেকেই ছিলো আমাদের। আজকাল ডোরেমন শিশুরা বাংলার চেয়ে হিন্দিতে পারদর্শী হয়ে উঠছে। কথার ফাঁকে দুয়েকটা হিন্দি বুলি জুড়ে না দিলে বড়রাও ঠিক খুউল হতে পারছেন না। বাংলায় তাই আর পোষাচ্ছে না।

পথ চলতে চলতে বিশাল বিশাল বিলবোর্ডে চোখ পড়লে পণ্যের নামের আগে বানানপ্রমাদে দৃষ্টি গেঁথে যায় স্বভাবদোষেই। আমার ভীষণ পড়ুয়া খালাত ভাই মাহরাফ পথেঘাটে চলতে ফিরতে ব্যানার-বিলবোর্ড দেখে দেখে বানান শিখত। বলত আ-তে আড়ং, ম-তে মার্কেন্টাইল ব্যাংক। বইয়ের বিদ্যা বাস্তবে ফলাতে সে ভালোবাসে। স্কুলে শেখা নতুন শব্দগুলো সুযোগ পেলেই কাজে লাগায়। সোফাকে বলে আরামকেদারা, কাপকে পেয়ালা। আমরা ওকে উৎসাহ দিলেও অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এই চর্চা বহাল রাখলে বাচ্চাটা বিপদে পড়বে। ব্যানার, বিলবোর্ডে বানান আর ব্যাকরণের অসামঞ্জস্যতা আর ইংরেজির মিশেল দেখে সে নির্ঘাত বিভ্রান্ত হবে। আড়ং এখন খাঁটি দুধের অঙ্গীকার নিয়ে ‘রেডি’ করছে বাংলাদেশকে। সচেতন মায়েরা সন্তানের ‘প্রপার’ বেড়ে ওঠার জন্য হরলিক্সকে ‘রেগুলার’ খাবারের তালিকাভুক্ত করেছেন। ম্যাগি এখন অনেক ‘হেলদি’, ‘টেস্টি’ আর ‘ইয়াম্মি’। ভুলভাল ব্যাকরণ আর ইংরেজির খিচুড়ির পরিসর এখন চটুল বিজ্ঞাপনী লিফলেট থেকে নামিদামি ব্র্যান্ডের অনুষঙ্গ। এই পরিস্থিতিতে বাংলার অমিশ্রিত প্রয়োগ কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ বৈকি।

একটু পেছনের কথা বলি। সালটা সম্ভবত ৯৮। স্কুলের বিজ্ঞান মেলার প্রজেক্টের কাজে সাহায্য করছিলেন এক বান্ধবীর বাবা। তিনি পেশায় জীববিজ্ঞানী। সেই সুবাদে তার সংরক্ষিত ল্যাবে ঘোরাফেরার সুযোগ পেতাম আমরা। তিনি বিজ্ঞানের ব্যাপারগুলো বুঝানোর পর শিখিয়ে দিলেন বিচারকদের সাথে কথা বলার সময় যেন কিছু ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করি। ওতে নাকি আমাদের স্মার্টনেস প্রকাশ পাবে। সে যাত্রায় কোনো পুরস্কার পাইনি আমরা। যথেষ্ট স্মার্টনেস দেখালেও শেষ রক্ষা হতো বলে মনে হয় না। কারণ আমাদের কারিগরি প্রস্তুতিতে বেশ ঘাটতি ছিলো। এরপর ঘড়ির কাঁটা ঘুরেছে অজস্রবার, পৃথিবী বদলেছে অনেক। বদলায়নি আমাদের স্মার্টনেসের সংজ্ঞা। শুনেছি এক সময় গ্রামে বিয়েবাড়িতে বরপক্ষ ও কনেপক্ষের মধ্যে ইংরেজি বলার প্রতিযোগিতা হতো। সে এক ধরনের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। ইংরেজি জানাটা মর্যাদার প্রতীক। গ্রামে এই চল আজও আছে কি না জানা নেই। তবে ইংরেজির মিশেল এখনো আমাদের জাতে তুলে দেয়।

আজ সকালে অফিস আসার পথে গাড়িতে এফএম চলছিলো। আরজের কথা শুনতে শুনতে স্মৃতিকাতর হই কিছুটা। বছর দুয়েক আগে পাশ করে বেরুনোর ঠিক পরপর আমার প্রথম চাকরির প্রয়াস ছিলো ওখানে। শুরুটা হয়েছিলো আরজে হান্ট দিয়ে। অনলাইনে ফর্মপূরণের পর দুটা ইন্টারভিউ আর একটা ভয়েজ টেস্টের পর ওয়ার্কশপে যোগ দিয়েছিলাম।

দ্বিতীয় ইন্টারভিউতে জিজ্ঞেস করা হয় বাংলাদেশের কোন আরজে আমার প্রিয়।

বলেছিলাম, “কেউ না।”

“কেন?”

“সবার ভাষা খারাপ।”

“আপনার কি মনে হয় আপনি আরজে হলে রেভুল্যুশন আনতে পারবেন?”

“আমি বাংলা বললে ভালো বাংলা বলি। ইংলিশ বললে ভালো ইংলিশ বলি। আপনাদের এখানে কি এমন কোনো নিয়ম আছে যে ইংরেজি গুলিয়েপাকিয়ে বাংলা বলতে হবে?”

“না, তা নেই।”

“তাহলে পারব। আমি স্বাভাবিকভাবেই কথা বলব।”

বলাবাহুল্য অর্বাচীন আমি ওপাড়ায় গেছিলাম ন্যূনতম ধারণা ছাড়াই। বাসায় ফিরে তাদের ওয়েবসাইট ঘেঁটে জেনেছিলাম ইন্টারভিউ বোর্ডের তিনজনই নামি আরজে। এহেন চাঁছাছোলা জবাবের পরে আমার ডাক পড়বে আশা করিনি। এরপরেও যখন ডাক পড়ল, ইচ্ছের পারদ আকাশ ছুঁয়েছিলো স্বাভাবিকভাবেই।

ওয়ার্কশপে আমরা বাছাইকৃত দশজন ছিলাম। আমাদের বোঝানো হলো প্রচলিত বেতারের সাথে এফেমের সাংস্কৃতিক পার্থক্য, এফেমের উদ্দেশ্য-বিধেয়, করণীয়-অকরণীয় প্রভৃতি। কেতাবি আলাপশেষে কল্পিত কোনো শো’র জন্য স্ক্রিপ্ট তৈরি করতে হতো। গানের বিরতিতে যাওয়ার আগে বলতে হতো “এখন নিবো ছোট্ট একটা break… till then শুনতে থাকুন অমুকের তমুক গান…”। হিন্দি গান বাজানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে তাদের উত্তর: “মানুষ হিন্দি গান শোনে, তাই আমরা বাজাই। আমরা না বাজালে অন্য কোনো স্টেশন বাজাবে। হিন্দি গান না বাজিয়ে তো আমরা হিন্দি গানের বাজার বন্ধ করতে পারব না।”

আমি বাংলায় বলার চেষ্টা করলে ফোকর গলে ইংরেজি শব্দ “suggest” করা হতো। তাদের ভাষায় এটাই চলতি ধারা, এটাই “তারুণ্য”। বেতারের মতো কেতাদুরস্ত ভঙ্গিতে বাংলা বললে চলবে না। শ্রোতারা আমাদের “friends”, তাই কথা বলতে হবে তারুণ্যের ভাষায়। ওই স্টেশনে আমাদের দশজনের কেউই শেষ পর্যন্ত খুঁটি গাড়তে না পারলেও তৎকালীন আরজেরা এখনো স্বমহিমায় রয়েছেন। ছড়িয়ে দিচ্ছেন তারুণ্যের ভাষা।

শৈশবে দেখতাম তরুণ প্রজন্মের প্রিয় মুখগুলো চমৎকার বাংলা বলতেন। এখন টিভি চ্যানেলগুলোয় ঘোরাফেরা করলে “করসো খাইসো” ভাষার পাশাপাশি শুনি “বুচ্ছো (বুঝেছ)”, “বুস্তে পাচ্ছি না (বুঝতে পারছি না)”র মতো ঘোলাটে বাংলা উচ্চারণ। রোজকার কথ্য বাংলার ফাঁকে “so”, “it’s like”, “you know”, “I think” গুঁজে দেওয়াটা এখন সময়ের দাবি। হরলিক্সের বিজ্ঞাপনের নির্মাতাদল হয়ত ব্যাকরণে কাঁচা। তাই “হরলিক্স ছাড়া ও প্রপার (properly হবে) বেড়ে উঠছে তা তো আমি ভাবতেই পারি না” বাক্যটা প্রচারিত হয়। কিন্তু সুশিক্ষিত তরুণ মুখেও যখন শুনি “আমাকে কিছু new dress বানাতে হবে”, “day-তে যাবো না, night-এ যাবো”, তখন মনে হয় এটাই হয়ত এখনকার কেতা। খানিকটা মিশেল না থাকলে ঠিক জমে না আমাদের। পুরো বাক্যটা ইংরেজিতে বলতে না পারলে সমস্যা নেই, দু-একটা ইংরেজি শব্দ জুড়ে দিলেই চলবে। হয়ত অদূর ভবিষ্যতে বিলবোর্ড জোড়া হিন্দি কথামালাও দেখতে পাবো। আশা করি বড় হতে হতে মাহরাফও বাস্তবতা বুঝে তার চর্চিত বাঙালিয়ানায় খাদ মিশিয়ে স্মার্ট হয়ে উঠবে।

.
.
.
http://www.sachalayatan.com/bunohaash/43008

One Comment to “বাংলায় কথা কই”

  1. লেখাটা সুন্দর, কিন্তু লেখক একটু বেশী আবেগী। বাস্তবতার খাতিরে আমাদের সবাইকেই কিছু English শব্দ ব্যবহার করতে হয়। তাছাড়া, লেখকের দেখি অনেক ক্ষোভ “দূরদর্শনে” দেখানো নাটকের ব্যাপারে। বাস্তবতাঃ আমি যখন তোর সাথে সামনা-সামনি বা “মুঠো দূরালাপনিতে” কথা বলি তখন বলি- বুচ্ছোস, কখনই বুঝেছেন বলি না। লেখক বোধহয় জানেনা বাংলায় একটা “দাপ্তরিক দরখাস্ত” লেখতে গেলে কি অবস্থা হয়। সব দরখাস্ততো বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বারাবর লেখা হয় না, কখনো কখনো তা সচিব বরাবর ও হতে পারে।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: