সিকান্দার বাদশা – ১

খ্রিস্টজন্মের ৩২৭ বছর আগের কথা। ভারতবর্ষ। সুদূর ম্যাসিডোনিয়ার গ্রীক রাজা আলেকজান্ডার সৈন্যবাহিনী নিয়ে কাবুল নদী পার হয়ে দ্রুত সিন্ধুনদের দিকে ধাবমান। তার বয়স মোটে আঠাশ বছর, তবু তার পায়ের তলায় পশ্চিম ইয়োরোপ থেকে পারস্য পর্যন্ত। এশিয়াতে তার নাম লোকে একই সাথে শ্রদ্ধা ও ত্রাসের সাথে উচ্চারন করতো, তিনি ছিলেন তাদের কাছে দেবতার মতই। অন্য সাধারন তাতার কমান্ডারের মত তিনি শুধুই লুটপাটের জন্যে রাজ্য দখল করতেননা, কিংবা গ্রীক সংস্কৃতি দিকে দিকে ছড়িয়ে দেবার মহান দায়িত্বও তার ছিলনা। তার স্বপ্ন ছিল সারা দুনিয়াকে তার সাম্রাজ্যে পরিণত করা।

দারিয়ুসের সিংহাসনে চড়ে তিনি প্রথম বুঝতে পারেন যে টাইটেলের বেইল নাই যদি উত্তর আর পূর্বের বর্বর জাতিগুলাকে হাতের মুঠোয় না আনা যায়। অতএব তিনি উত্তরে হানা দিলেন, পশ্চিম হিমালয় পার করে বলখ দখল করতে। এদিকে অক্সাস নদী পার হয়ে খিভা আর জাক্সার্টেস নদী পার হয়ে বুখারা পর্যন্ত দখল হল। ম্যাপের উত্তর দক্ষিন পশ্চিম সব কোণাকাঞ্চির জাতিগোত্র হাতের মুঠোয় এনে তিনি ভারতের পাঞ্জাবের দিকে নজর দিলেন। তার ধারণা ছিল পূর্ব সাগরের পারে সবশেষ পয়েন্ট ভারত, এরপরে আর কিছু নেই। তার মহান কল্পিত সাম্রাজ্যের পূর্ব প্রদেশ ছিল ভারতবর্ষ।

কিন্তু তার ম্যাসিডোনিয়ার সৈন্যবাহিনীর তেল ফুরিয়ে আসছিল। আলেকজান্ডার তার সাদা বন্ধুদের কথা বাদ দিয়ে বাদামী চাটুকারদের কথায় কান দেয়া শুরু করলেন, গ্রীক হেলমেটের বদলে তিনি পরা শুরু করলেন পারসীক মুকুট। আচার আচরনেও পরিবর্তন এলো তার। বাপ ফিলিপের মত তার নারী দেখলে জিভ দিয়ে পানি পড়তো না, কিন্তু ব্যাক্ট্রিয়ার সুন্দরী রোক্সানার প্রেমে পড়ে তাকে বিয়ে করে ফেলেন তিনি। প্রেমের ব্যাপারটা অবশ্য গুজব হবারই সম্ভাবনা বেশি, আলেকজান্ডার নারী নয় মদে আসক্ত ছিলেন।

এদের পাল্লায় পড়ে আলেকজান্ডারের ভিতর মেয়েলী ঢং, প্রতিহিংসা, প্রশংসা আর চাটুকারিতার প্রতি দূর্বলতা ইত্যাদি এশিয়ান বদ স্বভাব গড়ে উঠলো। চাটুকারের দল তাকে বোঝাল তিনি অমর দেবতা টাইপ কিছু। খ্যাতি ও প্রতিপত্তি পাবার লোভে তিনি পাগল হয়ে উঠলেন, দিকে দিকে তার নামে পুজা আরম্ভ হয়ে গেলো। কতদূর সেই পূজা ছড়িয়েছিল তা বলা শক্ত, কিন্তু তা সারা ইরান তুরান সহ গোটা ভারতবর্ষে গভীর ছাপ ফেলে গেছে তা নিশ্চিত। আলেকজান্ডারের প্রাচ্য নাম সিকান্দার এশিয়ান মুসলমানদের মধ্যে সেইরকম সম্মানের সাথে উচ্চারিত হয় যেমন আলেকজান্ডার নামটি পশ্চিমা জগতে।

আলেকজান্ডারের ভারত দখলের প্ল্যানটি অল্প কথায় বুঝিয়ে দেয়া সম্ভব। কাবুল নদীটি কাবুল, জালালাবাদ আর পেশোয়ার হয়ে আটক দূর্গের কাছে সিন্ধুনদে গিয়ে শেষ হয়। সিন্ধুর পূর্বপাড়ে সুফলা পাঞ্জাব, তাতে পানি দেয় সিন্ধু, ঝিলাম, চেনাব, রাভি, বিপাশা, শতদ্রু ও সরস্বতী নদী। আলেকজান্ডারের মতলব ছিল সিন্ধুর পশ্চিমে কাবুলসহ পুরো এলাকা দখলে নেয়া, তারপরে সিন্ধু পেরিয়ে আটক, তারপরে পাঞ্জাব দিয়ে মার্চ করে কোনাকুনি দক্ষিন পুর্বে এগোন। সবশেষে দিল্লী আগ্রা দিয়ে গঙ্গা যমুনা নদী পার হয়ে প্রাচীন নগর প্রাজ্ঞ ও গৌড়ের মাঝামাঝি পুরো মগধ বা পাটলিপুত্র সাম্রাজ্য জিতে নেয়া। ভারত কমপ্লিট।

প্ল্যানে কিছু সমস্যা ছিল। পথে পড়ে বিস্তর বজ্জাত ছোটখাট রাজ্য, যেমন কাবুলের ভেতর মাসাগা নগরী। মাসাগা ছিল আশাকান জাতির রাণীর শহর । সিন্ধুর ওইপাড়ে অন্তত তিনটে এলাকা ঝামেলা পাকানোর মতলবে ছিল;- সিন্ধু আর ঝিলামের মাঝামাঝি তাক্সিলা, ঝিলাম আর চেনাবের মাঝামাঝি পুরান পৌরব, চেনাব আর রাভির মাঝে নতুন পৌরব। পুরান পৌরব সবচাইতে শক্তিশালী শোনা যায়, কিন্তু তারা ছিল খুবই বন্ধু টাইপ জাতি। ডাইনে বাঁয়ে তাক্সিলা আর নতুন পৌরব বাবাজীদের সাথে তার মুখ দেখাদেখি বন্ধ। উত্তর দক্ষিনেও ছোটখাট রাজাদের সাথে কাইজা ছিল তাদের।

একটা ব্যাপার পরিষ্কার করা দরকার। এশিয়াতে সাম্রাজ্য ব্যাপারটা মোটের উপর একগাদা লোকাল রাজা বা সামন্ত প্রভুদের যোগফল, একক সম্রাট বলে কিছু নেই। এরা সবাই মাসে মাসে প্রভুদের চাঁদা দিত আর মিলিটারি পুষতো যদি যুদ্ধ লেগে যায় ওইজন্য। গৃহযুদ্ধ লাগানোর একবারে নিখুঁত ব্যবস্থা! তলোয়ার ছাড়া এই সিস্টেম বহাল রাখা অসম্ভব। আলেকজান্ডারের আগমনের সময় কাবুল আর পাঞ্জাবে এইরকম বেড়াছেড়া শাসন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল।

আলেকজান্ডারের আক্রমন কোন সাধারন দস্যুর মত ছিলনা। তার নিজের ও সৈন্যবাহিনীর দক্ষতা সম্বন্ধে অতি উচ্চ ধারনা ছিল ঠিকই, কিন্তু খাঁটি সৈনিকের মত তিনি বুঝে পা ফেলতেন। যাকে বলে খুব খিয়াল কইরা। সম্মুখের শত্রুকে তিনি পরোয়া করতেননা, কিন্তু এশিয়ার অভিজ্ঞতা তাকে পেছনের শত্রু সম্বন্ধেও সাবধান হতে শিখিয়েছিল।

আলেকজান্ডারের প্রথম পদক্ষেপ খুবই বুদ্ধিমানের মতন ছিল। কাবুল নদীতে পৌঁছে তিনি ঘাটে ঘাটে দূত পাঠিয়ে দিলেন যেন তারা এসে তার ক্যাম্পে কথা বলে যায়। পুরান পৌরবের শত্রু নগরীগুলো ভাবলো এইবার একটা শক্ত লোক পাওয়া গেছে, এর সাথে দোস্তি করে পুরান পৌরবকে ভর্তা বানানো যাক। তার ক্যাম্পে রাজাগজার লাইন পড়ে গেল, বিশেষত তাক্সিলার রাজা চরম দামী আর বিরল উপহারে ক্যাম্প ভরিয়ে দিলেন। তাক্সিলা রাজ্য সিন্ধুনদ আর পুরুর মাঝখানে, পুরু আক্রমনের মিলিটারি অপারেশনের জন্য চমৎকার। উত্তরে আলেকজান্ডার পিউকেলাটিস রাজ্য দখলে লোক পাঠিয়ে দিলেন, সৈন্যবাহিনীর সিন্ধুনদ পেরুতে তা দরকার ছিল।

আলেকজান্ডার তখন কাবুলের উপজাতিদের বাঁশ দিতে মন দিলেন। কাবুলে আফগানীদের বাস। এরা যেকোন ভারতীয়দের তুলনায় যুদ্ধবাজ। এদের মাঠে হারিয়ে দিলে দেয়ালঘেরা শহরে গিয়ে ওঠে, শহরে হারিয়ে দিলে পাহাড়ে পালায়। বিরাট যন্ত্রনা। মাঝে মাঝে আলেকজান্ডারের বাহিনীর আসার খবর পেয়ে নিজেরাই শহর জ্বালিয়ে পাহাড়ে উঠে বসে থাকে, মহাবীর আলেকজান্ডার এসে দেখেন বেবাক ফাঁকা! অনেকগুলি ছোট যুদ্ধের পর তারা হার মেনে এদিকসেদিক ছিটিয়ে পড়লো। সবচেয়ে দুর্ধর্ষ ছিল আশাকান জাতির রাণী ক্লিওফেস, মাসাগায় থাকতেন তিনি। সারা ভারত ছেঁকে সাত হাজার যোদ্ধা জড় করেছিলেন তিনি, যারা খোলা প্রান্তরে ম্যাসিডোনিয়ানদের যুদ্ধে আহবান করতো। আলেকজান্ডার দূরে পালিয়ে যাবার ভান করে সরে যেতেন, তারপরে হঠাৎ দুম করে এগিয়ে আক্রমন করতেন। শেষে তারই বিজয় হয়, কিন্তু শহরের অধিকাংশ লোক পালিয়ে শহরে আশ্রয় নেয়। তুমুল যুদ্ধ চলে মাসাগায়, কিন্তু সেনাপ্রধানের মৃত্যুতে তারা পিছু হটে আর আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। যোদ্ধাদের ম্যাসিডোনিয়ান ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয় তাদের সৈন্য হিসেবে যোগ দেয়ার জন্য। কিন্তু আলেকজান্ডার খবর পান তারা গভীর রাতে পালাবার ধান্দা করছে, তার হয়ে লড়ে তারা রাণীর বিরুদ্ধে যেতে আগ্রহী নয়। তাদের মুন্ডু কর্তন হল। মাসাগার পতন হল পরদিন, রাণী আত্মসমর্পন করলেন।

কাবুল হাতের মুঠোয় আনার পর তিনি সিন্ধু পেরিয়ে পাঞ্জাব ঢুকলেন। পথে তাক্সিলায় থেমে একটু জিরিয়ে নিলেন, তারপর ঝিলাম নদীর পথ ধরলেন। পুরান পৌরব নদীর ওপারে হাতী ঘোড়া সৈনিক নিয়ে প্রস্তুত। শত্রুর সামনেই বৃষ্টিবাদলার মধ্যে নদী পার হতে হল আলেকজান্ডারকে, অন্ধকার ঝোড়ো রাতে তার বাহিনী ধীরে ধীরে এগুতে থাকলো। পাঁড়ে আসার কাছাকাছি বিদ্যুৎচমকের দ্রুত আলোয় তাদের আসার কথা টের পেয়ে যায় পৌরবরা, তাদের রাজা তার ছেলেকে ঘোড়ার রথবাহিনী দিয়ে পাঠিয়ে দেন। বৃষ্টিস্নাত কাদামাটিতে রথের চাকা আটকে বেকায়দায় পড়ে তারা, সবাই ধরা পড়ে। আলেকজান্ডার যুদ্ধে হারান তার ঘোড়া, পৌরবরাজ হারান তার ছেলে।

এই ভয়ংকর খবর পেয়ে রাজা তার শ্রেষ্ঠ বাহিনীকে যুদ্ধে পাঠান। ধুলোধূসরিত এক প্রকান্ড মাঠে তারা অবস্থান নেয়। সামনে ছিল দুইশ হাতী, একেকটি প্রায় একশ ফিট দূরত্বে। তার ঠিক পেছনেই সেনাবাহিনী, আর দুই পাশে ঘোড়সওয়ারের দল। আলেকজান্ডার দুই দিক থেকে আক্রমন করলেন। পৌরব ঘোড়ার দল কোণঠাসা হয়ে তাদের নিজেদের হাতীদের মধ্যে পড়ে গেল, বেচারা হাতী কি আর ঘোড়া চেনে…সে সামনে যে ঘোড়া পেল তাকেই গদাম দিতে থাকলো। এরপরে হাতী দেখলো আরেক উৎপাত, ঘোড়ার পিঠের সৈন্য সে পৌরবই হোক আর গ্রীকই হোক তারা বর্শা দিয়ে হাতী খুঁচাতে শুরু করলো। আহত ভীত হাতীর দল দিল পিছন ফিরে ছুট, এইবার তাদের পায়ের তলায় ভর্তা হল পৌরব সেনাবাহিনী। পরাজিত হল পৌরব, তাদের রাজা আত্মসমর্পন করে রাজপুত প্রথা অনুযায়ী বন্ধুত্বের হাত বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেন। আলেকজান্ডার রাজি হলেন। দুদিন আগের দুই চরম শত্রু আজ শপথ নিলেন ইয়ে দোস্তি হাম নেহি তোড়েঙ্গে।

(পরের পর্বে সমাপ্য)

……………………………………………………………
জেমস হুইলার রচিত “The History of India from the Earliest Ages: Hindu Buddhist Brahmanical revival” অবলম্বনে।

পাদটীকা

  • ১. তৃতীয় দারিয়ুস, পারস্যের তৎকালীন রাজা
  • ২. অক্সাস অর্থাৎ আমু দরিয়া
  • ৩. খিভা অর্থাৎ খোরাসান নগর, বর্তমানে উজবেকিস্তানের শহর
  • ৪. জাক্সার্টেস অর্থাৎ সির দরিয়া
  • ৫. ব্যাক্ট্রিয়া অর্থাৎ পোখতার নগর। বর্তমানে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তানের কিছু এলাকা নিয়ে গঠিত
  • ৬. পিউকেলাটিস ছিল অষ্টনগর, বর্তমান পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনের অন্তর্গত

.
.
.
.
http://www.sachalayatan.com/mir178/43007

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: