চীন – অসাধারণ সব উন্নয়ন

ছোটবেলায় পৃথিবীর সপ্তাশ্চার্য চীনের প্রাচীরের বিশালত্বের কথা জেনে অবাক হতাম। জ্ঞানার্জনের জন্য চীনে যাও – এমন কথাও ধর্মীয় কোন উৎস (হাদীস) থেকে শুনেছিলাম। তারপর সস্তা মেড ইন চায়নার জয় জয়কার, বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের প্রভাব, এ্যাথলেটিকসে চীনের দক্ষতা ইত্যাদি দেখে দেখে চীনের ব্যাপারে খবরাখবরে অবাক বা কৌতূহলী হওয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম। এই সব হলে কি হবে, চীন বা জাপান তেমন কোন উন্নত মৌলিক গবেষণা হয়না; কিংবা, ওরা শুধু আমেরিকা ইউরোপের টেকনোলজি কপি করে নিয়ে সস্তায় পণ্য বানায়; চীনের জিনিষ মানেই ফালতু – এমন একটা ইমেজও মনের মধ্যে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ইদানিং চীনের একের পর এক রেকর্ড গড়া সব টেকনোলজির খবর দেখে চীনের জ্ঞানচর্চার উল্লম্ফন সম্পর্কে পুরাতন একটা সমীহ আবারই জেগে উঠছে। অসাধারণ বড় বড় জিনিষপত্র বানানোর বাতিক কোন শারীরিক দুর্বলতার কারণে সৃষ্ট মর্মবেদনা থেকে উৎপন্ন কি না সেটা নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও চীনের আকার, জনসংখ্যা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিচারে এ ধরণের উন্নয়ন অস্বাভাবিক নয় বলেই মনে হয়।

দীর্ঘতম, উচ্চতম বা দ্রুততম বিষয়গুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল, টেকনোলজির উন্নয়নের সাথে সাথে কেউ না কেউ এর চেয়ে বড় বা দ্রুততর কিছু বানিয়ে ফেলবে – তাই এর ভিত্তিতে কেউ সেরা, কেউ ভূয়া – এমন কোন ধারণা মনের মধ্যে রাখা উচিত নয় বলেই মনে হয়। তবে, শুধুমাত্র পরীক্ষার জন্য কিছু বানানো, আর একটা কিছু বানিয়ে সেটাকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য আছে। দ্রুততম যানবাহন শুধু বানালেই হয় না, বাণিজ্যিক ভাবে এগুলো চালাতে হলে এ্যাত দ্রুত অথচ নিরাপদে চলার মত পথ তৈরী ও রক্ষণাবেক্ষণ করাটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। আবার একই ভাবে বৃহত্তম যানবাহন নিরাপদে চলার উপযোগী পথ, পথের বাঁকে গাড়ি ঘোরানোর জন্য জায়গা (টার্নিং রেডিয়াস) – এগুলোর আয়োজন করে সেই গাড়িকে পথে বাণিজ্যিক ভাবে নামানোটা একটা বড় সফলতা বলে মনে হয়। এই লেখাটার মূল ফোকাস চীনের উন্নয়ন করা অদ্ভুদ এক সিটি বাস; তবে সেই প্রসঙ্গের আগে চীনের অন্য কিছু সক্ষমতা – যা চীনের ব্যাপারে আমার কৌতুহল বৃদ্ধি করেছিলো, সেগুলো সংক্ষেপে জানাতে চাই।

বিশ্বের দীর্ঘতম বাস: …. এই দুই এক দিন আগের খবর, প্রথম চোখে পড়ে বিডিনিউজ২৪ এর টেকনোলজি পাতায়। চীন বিশ্বের দীর্ঘতম বাস বানিয়েছে, এবং এটা অচিরেই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ওদের কিছু শহরের রাস্তায় চলবে। এক বাসে ৩০০ যাত্রী বসে যেতে পারবে – যাত্রী সংখ্যার এই বিশালত্বটাই অবাক করার মত।

রেলগাড়ি: যুক্তরাজ্যের টেলিগ্রাফ পত্রিকার একটা রিপোর্ট অনুযায়ী (২০১১-মে-১১) চীনে বিশ্বের দ্রুততম বাণিজ্যিক রেলগাড়ি চলে। এটা ছাড়াও বর্তমানে বিশ্বে বাণিজ্যিকভাবে চলা দ্রুততম ম্যাগলেভ ট্রেন সার্ভিসও চীনে (সর্বোচ্চ ৪৩১কিমি/ঘন্টা, গড়ে ২৬৬ কিমি/ঘন্টা)।

কোন এক সময়ে শুনেছিলাম চীন এমন ট্রেনের উন্নয়ন করছে যেগুলোকে দীর্ঘ যাত্রাপথের মধ্যবর্তী কোন স্টেশনে যাত্রী উঠানামা করানোর জন্য থামতে হবে না, ফলে যাত্রার সময় লাগবে অনেক কম। এতে কোন একটা স্টেশন অতিক্রম করার কিছু আগে ঐ স্টেশনে নামতে ইচ্ছুক যাত্রীগণ ট্রেনের ছাদে একটা বিশেষ বগিতে জড়ো হবে। ঐ বগিটা মূল ট্রেনের ছাদের উপরে থেকেই ধীরে ধীরে ট্রেনের পেছনের দিকে যেতে থাকবে, অর্থাৎ ভূমির সাপেক্ষে এর গতিবেগ কমতে শুরু করবে এবং ট্রেনের ছাদ বরাবর স্টেশনের লাইনে চলে গিয়ে ধীরে ধীরে মন্দনের ফলে থেমে যাবে। একই ভাবে মূল ট্রেন ঐ স্টেশনের নিচের লাইন দিয়ে অতিক্রমের কিছুক্ষণ আগেই একই রকম আরেকটা বগি ঐ ট্রেনে গমনেচ্ছু যাত্রীদেরকে নিয়ে স্টেশন ত্যাগ করে গতিবেগ বাড়াতে থাকবে এবং মূল ট্রেনের গিয়ে ছাদে গিয়ে যুক্ত হবে। এটার ধারণার ইউটিউব ভিডিওটি দেখলে ব্যাপারটা সহজে বুঝা যাবে।

এই উপায়ে বেইজিং থেকে গুয়াংঝুর মাঝের ৩০টি স্টেশনে গড়ে ৫ মিনিট করে প্রায় আড়াই ঘন্টা সময় বাঁচানো যাবে। ট্রেনটি স্টেশনগুলোতে না থেমে একটু কম গতিতে অতিক্রম করবে।

বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু: কিছুদিন আগে চীনে বিশ্বের দীর্ঘতম সড়ক সেতু উদ্বোধন করা হল। যদিও কিছু জায়গায় এটাকে দীর্ঘতম সেতু বলে স্বীকার করেনি, কারণ ৪২ কিলোমিটারের মধ্যে বেশ কিছু অংশ পানির উপর দিয়ে না গিয়ে ভূমির উপর দিয়ে গিয়েছে এবং এতে বাঁকের কারণে দৈর্ঘ বৃদ্ধি পেয়েছে। এখানে যে ব্যাপারটি অবাক করেছে সেটা হল এটার খরচ। চীনের সরকারী মুখপাত্র পত্রিকার খবরে মাত্র ২.৩ বিলিয়ন ডলার। আমাদের ৬ কিলোমিটারের পদ্মা সেতুর খরচ কত বিলিয়ন ডলার?

এবার আসি মূল টপিকে:
গত বছর মে মাসে চীনের বেইজিং হাইটেক এক্সপোতে শেংঝেং হাসি ফিউচার পার্কিং ইকুইপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড চীনের যানজট এবং বায়ুদূষণ কমানোর জন্য এক ধরণের রেলগাড়ি মার্কা বাসের প্রকল্পের কথা প্রকাশ করে। এই বাস রাস্তার দুই পাশের রেইলের উপর চাকা রেখে চলবে, তবে রনপা লাগানো মানুষের মত এর যাত্রীবাহি অংশ ভূমি থেকে অনেক উপরে থাকবে, ফলে এর তলা দিয়ে ২ মিটারের কম উচ্চতা বিশিষ্ট ছোট গাড়িগুলো বাধাহীন ভাবে চলাচল করতে পারবে।


রনপা বাস: এর তলা দিয়ে ছোট গাড়ি যেতে পারবে


রনপা বাস স্টপেজ: সাথে সুপার ক্যাপাসিটর চার্জার

এই গাড়ি চালাতে বিদ্যূৎ কিংবা সৌরবিদ্যূৎ ব্যবহার করা হবে। ২০ ফুট চওড়া আর ১৩ ফুট উচ্চতার এই বাসে ১২০০ থেকে ১৪০০ যাত্রী বসতে পারবে। রাস্তার পাশের উঁচু প্লাটফর্ম থেকে বাসের পাশের দরজা দিয়ে কিংবা রাস্তার উপরের ফুট ওভার ব্রীজের মত জায়গা থেকে বাসের ছাদ দিয়ে এই গাড়িতে যাত্রী উঠানামা করবে (দুইটা অপশনই থাকবে)। যাত্রী উঠা-নামানোর জন্য থামানো/পার্কিং থাকুক কিংবা চলন্ত থাকুক, এর তলা দিয়ে সবসময়ই গাড়ি চলতে পারবে। তাই এটা রাস্তা ধরে চললেও রাস্তার জায়গা দখল করে না এবং এর ফলে এটার কারণে রাস্তায় যানজট লাগবে না। যাত্রী পরিবহন করা সত্বেও রাস্তা দখল না করার জন্য এটা বরং রাস্তা থেকে কিছু সংখ্যক বাস কমিয়ে যানজট কমিয়ে দেবে। আর ট্রামের মত বিদ্যূৎ চালিত হওয়ায় এটা মোট কার্বন নিঃসরণও কমিয়ে দেবে (গাড়িপ্রতি ৮৬০টন/বছর)। নিচের ইংরেজি ডাবিংকৃত ভিডিওটাতে এর কর্মপদ্ধতি ব্যাখ্যা করছেন একজন এক্সপার্ট।

ওনাদের দাবী অনুযায়ী এই ধরণের সিস্টেম বানানো সাবওয়ের চেয়ে অনেক দ্রুত এবং কম খরচে করা সম্ভব (১ বছর বনাম ৩ বছর)। আর বাসের ছাদের বিরাট স্কাইলাইটগুলো এর যাত্রীদের মনকে প্রফুল্ল রাখবে বলেও মনে করছেন তারা।

রনপা বাস সরাসরি বিদ্যূৎ ব্যবহার করে চলবে। এই বিদ্যূতের যোগান দুই উপায়ে হতে পারে। একটি পদ্ধতিতে রাস্তার পাশে কিছুদুর পর পর চার্জিং পোস্ট থাকবে। এর থেকে একটা অংশ বাসের ছাদের চার্জিং রেইলকে স্পর্শ করে থাকবে। চার্জ করার পোস্টগুলো এমন দূরত্বে থাকবে যে, বিরাট বাসটি একটা চার্জ পোস্ট থেকে বের হওয়ার মুহুর্তে পরের চার্জ পোস্টের স্পর্শ পেয়ে যাবে। এটাকে রিলে চার্জিং বলে। অন্য পদ্ধতিতে ছাদের উপরে সুপার ক্যাপাসিটর থাকবে: প্রতিটা স্টপেজে এ দ্বারা খুব দ্রুতগতিতে বাসে থাকা ব্যাটারী চার্জ হয়ে যাবে। একটা স্টপেজে নেয়া চার্জ দিয়ে বাসটা পরের স্টপেজ পর্যন্ত যেতে পারবে, সেখানে আবার চার্জিং হবে। আর স্টপেজের ছাদের সোলার সেল থেকেও এই বিদ্যূৎ যোগাড় করা সম্ভব। এই পদ্ধতিতে বাস থেকে কোনরকম ক্ষতিকারক গ্যাস নির্গত হবে না।

এছাড়া এই বাসের মধ্যে কয়েক রকম সেন্সর থাকবে। এর তলা দিয়ে চলন্ত কোন গাড়ি এর পাশে বাসের ফ্রেমের/চাকার বেশি কাছে চলে আসলে এটা অ্যালার্ম দিয়ে সেই গাড়িগুলোকে সতর্ক করবে। এর স্ক্যানার এর পেছন থেকে আসা গাড়িগুলোকে স্ক্যান করে এর তলা দিয়ে যাওয়ার মত উচ্চতা না হলে সেগুলোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার জন্য সংকেত দিবে। এছাড়া এটা মোড় ঘোরার আগেই এর নিচে থাকা গাড়িগুলোকে আলোর সংকেত দিয়ে জানাবে যে আমি সামনে মোড় ঘুরতে যাচ্ছি। বিআরটি পদ্ধতিতে বাসগুলো কোন মোড় পার হওয়ার সময় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সবুজ বাতি পায়। এই বাসেও সেই ধরণের ট্রাফিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাস কোন মোড়ে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এটার জন্য সবুজ সংকেত আর অন্য পথগুলোতে লালবাতি দেখাবে। এর তলে থাকা গাড়িগুলো মোড় পার হতে চাইলে এর সাথে চলে যেতে পারে, নাহলে ওদের লাল বাতি মেনে দাঁড়িয়ে যেতে হবে।

দুই লেন রাস্তার প্রশস্থতার সাথে মিলিয়ে এই বাসগুলো ৬ মিটার প্রশস্থ হবে, আর ওভার পাস ইত্যাদির তলা দিয়ে বাধাহীন ভাবে যাওয়ার জন্য এর উচ্চতা হবে ৪ থেকে ৪.৫ মিটার। কখনও বিরাট দূর্ঘটনা ঘটলে যাত্রীদের বের হওয়ার জন্য এর পাশের দেয়ালগুলো ইমার্জেন্সি দরজা হিসেবে নিচের কব্জায় ভর করে স্লাইডারের মত স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যাবে – অনেকটা বিমানের ইমার্জেন্সিতে যেভাবে নামতে হয় সেভাবে।

গত বছরের শেষেই এই বাস তৈরী শুরু হওয়ার কথা। কে জানে আজ থেকে ৫০ বছর পরে যানজট জর্জরিত বিরাট নগরগুলোতে এটাই হয়তো টেকসই গণপরিবহন হিসেবে গৃহিত হবে। তবে, এই ধরণের বৈপ্লবিক আইডিয়াগুলোকে অনেক অপপ্রচার ও বাঁধা পার হতে হবে কারণ এ ধারণাগুলো বিস্তার লাভ করলে ক্ষতি হবে প্রতিষ্ঠিত কার ইন্ডাস্ট্রির।

তথ্যসূত্রসমূহ:
http://www.imageclix.com/img-miscellaneous-13-longest-traffic-jam-208.htm

রনপা বাস:
http://www.smartplanet.com/blog/thinking-tech/chinas-car-straddling-bus-8212-and-its-creativity-in-clean-tech/4934
http://i56.tinypic.com/1z3t5yu.jpg
http://www.archdaily.com/wp-content/uploads/2010/08/1282309604-bus-528×275.jpg
http://youtu.be/Hv8_W2PA0rQ

লম্বা বাস:
http://www.smartplanet.com/blog/thinking-tech/worlds-largest-bus-seats-300-passengers/9942
http://tech-us.bdnews24.com/details.php?shownewsid=3370

লম্বা সেতু:
http://en.wikipedia.org/wiki/List_of_longest_bridges_in_the_world
http://www.popsci.com/technology/article/2011-07/china-opens-worlds-longest-sea-bridge-toppling-american-record-holder
http://www.nola.com/traffic/index.ssf/2011/06/causeway_refuses_to_relinquish.html

ম্যাগলেভ:
http://en.wikipedia.org/wiki/Maglev

দ্রুততম রেলগাড়ি:
http://en.wikipedia.org/wiki/High-speed_rail
http://www.telegraph.co.uk/news/worldnews/asia/china/8506370/Fastest-trains-in-the-world.html
http://www.smartplanet.com/blog/thinking-tech/chinas-new-bullet-train-is-worlds-fastest-smashes-record/9656?tag=content;siu-container

স্টেশনে না থেমেই যাত্রী উঠানামার কৌশল:
http://www.youtube.com/watch?v=p9Ig19gYP9o

http://www.sachalayatan.com/hussainuzzaman/42904

One Comment to “চীন – অসাধারণ সব উন্নয়ন”

  1. আমার লেখাটি ছড়িয়ে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: