রং দে আরব বাসন্তী

গতবছর তিউনিসিয়া থেকে বাহরাইন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া আরব সমাজে রাজনৈতিক অস্থিরতাকে ভালোবেসে আরব বসন্ত নাম দিয়েছে পশ্চিমা মিডিয়া। ঋতু বসন্তের চেয়ে রোগ বসন্তের সাথেই এর সাদৃশ্য বেশি। তিউনিসিয়ায় এক ক্ষুব্ধ অপমানিত ফলবিক্রেতা নিজের গায়ে তেল ঢেলে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যা করেন, আর সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে সুদূর বাহরাইন পর্যন্ত। সুদীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আরব সমাজ গর্জে উঠেছে তিউনিসিয়া, মিশর, লিবিয়া, সিরিয়া, বাহরাইন ও ইয়েমেনে। আরব বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরবে এ আঁচ লাগেনি, যেমন লাগেনি আরব আমিরাতেও। হয়তো এরা পশ্চিমা বিশ্বের তেলের বহুলাংশ যোগান দেয় বলেই এসব দেশে আরব বসন্তের বিরুদ্ধে আগেভাগেই নানা টীকা দেয়া ছিলো।

ঢালাওভাবে আরব দেশগুলোয় ছড়িয়ে পড়া রাজনৈতিক বিক্ষোভকে আরব বসন্ত নাম দিয়ে প্রতিটি বিক্ষোভের স্বাতন্ত্র্যকে অস্বীকার করে কিছু মোটা দাগের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এদের একটি কার্পেটের নিচে পাঠিয়ে দিয়েছে মিডিয়া। আমাদের দেশের খবরের কাগজ ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় যারা কাজ করেন, তারা বড় পশ্চিমা মিডিয়ার বক্তব্যকেই তর্জমা করে চালিয়ে দেন। আমরাও তাই আরব বিক্ষোভকে আরব বসন্ত নামেই চিনতে শিখলাম, সেইসাথে মিডিয়ায় গর্জমান একটি কথা ছড়িয়ে পড়লো, এই বিপ্লব ফেসবুক বিপ্লব, সামাজিক যোগাযোগের সাইট এই বিপ্লবের জনক।

এই কথাটা মিডিয়ায় এসেছে, আবার অন্যান্য ঘটনার চাপে মিডিয়া থেকে সরেও গেছে, কিন্তু প্রভাবশালী মহলের কানে এই বাক্যটি অনুরণিত হয়ে চলছে। সামাজিক যোগাযোগর সাইট নিয়ে মিডিয়ামুদি থেকে শুরু করে রাজনীতিকও উদ্বেগ প্রকাশ করে চলছেন। আসছে আষাঢ় মাস, তাঁদের মন ভাবছে, কী হয় কী হয়, কী জানি কী হয়!

সামাজিক যোগাযোগ সাইট বিপ্লবের জন্ম দেয় না। বিপ্লবের জন্ম হয় শাসকের অদক্ষতা আর অকর্মণ্যতা থেকে, শাসিতের বঞ্চনার অনুভূতি থেকে। একাত্তরে এদেশে ফেসবুক ছিলো না, ছিলো না নব্বইতেও। কিন্তু একবার পাকিস্তানী সেনাশাসন, আরেকবার বাংলাদেশী সেনাশাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লব করেছে বাংলাদেশের মানুষ। ফেসবুকে বসে বিপ্লব করে ফেলা লোকের অভাব যদিও নেই, কিন্তু বিপ্লব হয় আকাশের নিচে, সেখানে মানুষের উপস্থিতি লাগে, লক্ষ্য লাগে, কর্মপন্থা লাগে। সামাজিক যোগাযোগের সাইট বিপ্লব নিয়ে মত বিনিময়ের কাজটা শুধু অনেক সহজ করে দিয়েছে, এ-ই। আমাদের নীতিনির্ধারকরা সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলো আরব বসন্তের জীবাণু দেখা শুরু করে দিয়েছেন সম্ভবত মিডিয়ার দেখানো জুজুর ভয়ে, কিংবা আরব বসন্ত এবং সামাজিক যোগাযোগ সাইট সম্পর্কে নিজেদের পর্বতপ্রমাণ অজ্ঞতার কারণে। আমাদের নেতানেত্রীরা কিছু শব্দ মুখস্থ করে যত্রতত্র ব্যবহার করেন, এবং তাঁদের অনবধানতাবশে মাঝেমধ্যে শব্দগুলো তার মূল অর্থ হারিয়ে যোগরূঢ়ার্থেই মানুষের কাছে বেশি পরিচিত হয়। গত শতাব্দীর শেষ দিকে এমনই একটি বহুলব্যবহৃত শূন্যগর্ভ শব্দমালা ছিলো “একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ”, যার উচ্চ ঘটনসংখ্যায় বিরক্ত হয়ে হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, বাঙালি বিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাতেই অসমর্থ, সে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ কী মোকাবেলা করবে? এরপর আমরা সবকিছুতেই শহীদ জিয়ার স্বপ্ন পেয়েছি কিছুদিন, জানতে পেরেছি বর্তমান সময়ে যা কিছু ঘটে সবই শহীদ জিয়ার স্বপ্ন। এখন যোগরূঢ়ার্থে ধন্য হচ্ছে “ডিজিটাল”। “আরব বসন্ত”কে সেই পথে নিয়ে যাওয়ার কাজটা মিডিয়া-রাজনীতিকের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য জোট সফল করে তুললেও তুলতে পারে।

তিউনিসিয়ায় যে বসন্ত এসেছিলো, তার সাথে মিশরের বসন্তের কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। কিন্তু লিবিয়ায় বসন্তের কিসিম ছিলো সম্পূর্ণই ভিন্ন, যদিও পশ্চিমা মিডিয়া লিবিয়াকেও একই কাতারে ভিড়িয়ে দিয়ে খুশি। সিরিয়াতেও লিবিয়ার তরিকায় বসন্ত আনয়নের চিন্তাভাবনা চলমান। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোর নাম ফেটেছে তিউনিসিয়া আর মিশরের ক্ষেত্রেই। খুলে বলি।

তিউনিসিয়া আর মিশর, দুই জায়গাতেই দীর্ঘ সময় ধরে একনায়কের শাসন চলছে। তিউনিসিয়ায় রাজনৈতিক ব্লগের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, ফেসবুক নিয়ে একনায়ক বেন আলির কোনো মাথাব্যথা ছিলো না। সেখানে টিভি আর পত্রিকা, দুটিই ছিলো সেন্সরশিপের আওতায়। ফলে সিদি বুজিদে যখন মোহামেদ বোয়াজিজি নামে এক তরুণ ফল বিক্রেতা পুলিশের চাঁদাবাজি ও চড়থাপ্পড়ের কারণে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হন, এবং অভিমানে তাদের দরজার সামনেই গায়ে তেল ঢেলে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যা করেন, তখন ঘটনাটা পত্রিকা বা টিভি বা ব্লগ, কিছুতেই আসেনি। পরদিন অসংখ্য আম পাবলিক নগর কর্তৃপক্ষের দরজার সামনে ব্যাপক বিক্ষোভ করলে তাদের ওপর পুলিশ গুলি চালায়, সে খবরও মিডিয়া চেপে যায়। কিন্তু বিক্ষোভকারীদের হাতে ইঁটের পাশাপাশি মোবাইল ফোনও ছিলো। মোবাইলে তারা পুলিশের তাণ্ডব ভিডিও করে তুলে দেয় ফেসবুকে। রাজধানী তিউনিসের এক ব্লগার স্লিম আমামু সেই জিনিস দেখতে পেয়ে ছড়িয়ে দেন। তরুণদের মধ্যে সেই জিনিস আলোড়ন তুললেও তিউনিস শহরে সিদি বুজিদের মতো সাড়া পড়েনি। তিউনিসে সিদি বুজিদের মতো বিক্ষোভ শুরুর কাজটা করেন আমামু ও তার কয়েকজন বন্ধু। শহরের এক চত্বরে নাগরিকদের জড়ো হওয়ার ডাক দিয়ে শুরু হয় আরব বসন্ত, আর ফেসবুকের নামটাও ফাটে তখনই। একবার বেন আলির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়ে যাওয়ার পর সেটা নিজ থেকেই গতি পায়। বিক্ষোভ চলাকালে টুইটারও বিপ্লবীদের কাজে এসেছে। পুলিশ কোথাও জড়ো হয়ে কোনো রাস্তা আটকে দিলে তারা সেটা টুইট করে জানিয়ে দিয়েছে অন্যদের, এদিক দিয়ে নয় ওদিক দিয়ে চলো। সামাজিক যোগাযোগের সাইটের দৌড় অতটুকুই। তিউনিসিয়ায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বেন আলির দুর্নীতিগ্রস্ত শাসন চলছিলো। বিপ্লব ফেসবুকে পেজ বা গ্রুপ খুলে শুরু করা যায় না, বিপ্লবের বারুদ সমাজে জমা হতে হয়। তিউনিসিয়ায় সেই বারুদে একটা স্ফূলিঙ্গের প্রয়োজন ছিলো, যা বোয়াজিজির আত্মহনন এবং তদপরবর্তী সিদি বুজিদ বিক্ষোভ থেকে এসেছে। তিউনিসিয়ায় মানুষ ফেসবুকে চোখ রেখেছে স্বাধীন সংবাদপত্র আর ইলেকট্রনিক মাধ্যমের অভাবের কারণেই। প্রেস-টিভি-রেডিও তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য ঠিকমতো পালন করতে পারেনি বলেই সেখানে সামাজিক যোগাযোগের সাইটের দিকে ঝুঁকে পড়েছে মানুষ। তিউনিসিয়ায় ইন্টারনেট ব্যবহারের হারও অনেক বেশি, প্রতি তিনজনে সেখানে একজন ইন্টারনেট ব্যবহার করেন।

মিশরে বিক্ষোভ ছড়িয়েছে মানুষের ওপর পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদ হিসেবে। খালিদ নামের এক তরুণ রাজনৈতিক অ্যাকটিভিস্টকে মিশরীয় পুলিশ নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। খালিদের ভাই খালিদের মৃত মুখের ছবি তুলে নেটে পোস্ট করেন। সেই ছবিটি মিশরের তরুণদের আলোড়িত করে, সেইসাথে তিউনিসিয়ার টাটকা উদাহরণ তাদের একই রকম আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু মিশরে নেট ব্যবহারকারীদের সংখ্যা তিউনিসিয়ার চেয়ে আনুপাতিক হারে অনেক কম। শুধু তা-ই নয়, ফেসবুকে সেখানে পুলিশ শকুনের মতো চোখ রাখে সবসময়, ঊনিশ-বিশ দেখলে তুলে নিয়ে পেটায়। তাই খালিদের হত্যাকাণ্ডের পর কয়েকজন তরুণ-তরুণী গোপনে পরিকল্পনা করেন, তারা গণবিক্ষোভের ডাক দেবেন অন্যভাবে। এ কাজে তারা ব্যবহার করেন কায়রোর ট্যাক্সিচালকদের। যেন খুব গোপন কিছু বলছেন, এভাবে তারা মোবাইলে ট্যাক্সিচালকদের শুনিয়ে শুনিয়ে অমুক জায়গায় তমুক দিন গণজমায়েতের কথা বলেন। ট্যাক্সিচালকরা সেই গুজব বিশ্বস্ততার সাথে ছড়িয়ে দেয় সারা শহরে। গণবিক্ষোভের আলামত দেখার পর মোবারক সরকার সোজা দেশে মোবাইল আর ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে। আর সেটাই হয় কাল। যা পাবলিক ফোনে, নেটে, কানাঘুষায় জানতে পারছিলো, তা জানার জন্যে নেমে আসে পথে। আর তারই ফলাফল তাহরির স্কোয়্যারে কুড়ি লক্ষ মানুষের সমাগম। মোবারক সেই জনতার ওপর জলকামান থেকে শুরু করে ট্যাঙ্ক, পুলিশ-সেনা থেকে শুরু করে উষ্ট্রারোহী গুণ্ডা, সবই লেলিয়ে দেয়, কিন্তু সুবিধা করতে পারেনি। এখানেও বিপ্লবের জন্ম সামাজিক যোগাযোগ সাইটে নয়, মোবারকের চলমান অত্যাচারে। আর বিপ্লবের সাফল্য শুধু মিশরীদের অনমনীয় আন্দোলনেই নয়, মোবারকের প্রতি ওবামা আর মিশরী সেনাবাহিনীর নিমকহারামিতেও। মোবারক মার্কিন-ইসরায়েলি অক্ষের পরীক্ষিত বন্ধু, কিন্তু পরিস্থিতি প্রতিকূলে দেখে ওবামা তাকেও এলি এলি, লামা শবক্তানি বলিয়ে ছাড়ে। মিশরীয় সেনাবাহিনীও তাদের আনুগত্য যতটা বারাকের প্রতি, ততটা মোবারাকের প্রতি দেখায়নি।

তিউনিসিয়া-মিশরের সাথে লিবিয়ার পার্থক্য, সেখানে বিপ্লব গৃহযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। গাদ্দাফির পতন যত না সাধারণ মানুষের হাতে, তারচেয়ে বেশি ন্যাটোর আক্রমণ ও ব্রিটিশ-প্রশিক্ষিত মিলিশিয়াদের হাতে [১]। তিউনিসিয়া বা মিশরের চেয়ে লিবিয়ার মানুষ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বেশি ভোগ করতো, তাই গাদ্দাফিকে মুখোমুখি হতে হয়েছে নিজের দেশের একাংশসহ ন্যাটোরও, যেটা তিউনিসিয়া বা মিশরে ঘটেনি। ফেসবুক বা টুইটার লিবিয়াতে কোনো কাজে আসেনি, যেমন আসছে না সিরিয়া বা ইরান বা বাহরাইন বা সৌদি আরবের ক্ষেত্রে। শেষের দেশগুলো সামাজিক যোগাযোগ সাইট সম্পর্কে খুব হুঁশিয়ার অবশ্য, তারা কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ এখনও পাইকারি হারে মানুষ মেরে চলমান বিক্ষোভ দমন করে যাচ্ছে, সেখানে ফেসবুক বা টুইটারের জয়গান নিয়ে আরব বসন্তের কোকিলেরা একেবারেই চুপ। কারণ সামাজিক যোগাযোগের সাইটের ম্যাজিকের বেলুন সেখানে বাশারের নির্মম সেনাবাহিনী ঝাঁঝরা করে দিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোকে পাইকারি হারে বিপ্লবের জনক বানিয়ে দেয়ার আগে, দুই হাজার নয়ে ইরানের কারচুপির নির্বাচন প্রসঙ্গে কথা বলা যায়। ইউটিউবে তরুণী নেদার মৃত্যুর ভিডিও সেখানে মড়কের মতো ছড়িয়ে গিয়েছিলো। ছিলো ফেসবুক, ছিলো টুইটারও। কিন্তু কিছু হয়নি। অটোয়া সিটিজেনে ডেক্ল্যান হিল লিখেছেন, ইরানের বিক্ষোভের কয়েকদিন পরই মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যু ঘটার কয়েক ঘন্টার মধ্যে গোটা ব্লগোস্ফিয়ার ইরানের রাজনীতি বাদ দিয়ে মাইকেলের সেরা গান বাছাই নিয়ে মগ্ন হয়ে পড়ে [২]।

হিল তাঁর নিবন্ধে রং দে আরব বাসন্তী প্রপঞ্চটিকে আরেকটু ভালোমতো খতিয়ে দেখতে চেয়েছেন। যদি সামাজিক যোগাযোগ সাইটের কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকাই না থাকবে, তাহলে এদের নাম এতো ফাটলো কীভাবে? তিনি খুঁজে বার করেছেন দু’টি কারণ। এক, সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলো চায় তাদের নাম ফাটুক, সেই খাতে তারা কিছু খরচাপাতি চেষ্টাচরিত্রও করে, তাই তাদের নাম কিছুটা ফাটে। দুই, তাদের চেষ্টাচরিত্রের বাইরে নাম ফাটে সাংবাদিকদের কারণে। পশ্চিমা মিডিয়ায় সাংবাদিক ছাঁটাই চলছে সমানে। যুক্তরাষ্ট্রে ২৫% সাংবাদিক ছাঁটাই হয়েছেন খবরের কাগজ থেকে। সারা বিশ্বে যখন নানা গিয়ানজাম চলমান, যখন ভালো সাংবাদিককে অকুস্থলে গিয়ে ঘটনার ওপর রিপোর্টিং করা জরুরি হয়ে পড়েছে, ঠিক তখনই চলছে উল্টো ছাঁটাই। বাজেটেও নানা কাটছাঁট করে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে যে সাংবাদিকরা আর ডেস্ক ছেড়ে বেরোয় না, সামাজিক মিডিয়ায় নানা তথ্য-তত্ত্ব-ছবি-গালি-বুলির তালাশ করে বেড়ায়। তাতে করে সামাজিক যোগাযোগের সাইটের কদর বাড়ে, আর বড় মিডিয়া হাউসগুলো নিজেদের খরচ কমানোর ব্যাপারটা ধামাচাপা দিতে পারে।

এই ধরনের চিন্তা বা বিশ্লেষণ থেকে আমাদের মিডিয়া দূরে। গুটি কয়েক পোড় খাওয়া ঝানু সাংবাদিকের পাশাপাশি অগণিত বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী সংবাদকর্মী আমাদের দেশে মিডিয়া চালায়, যাদের অনেকে ঠিকমতো ইংরেজি থেকে বাংলাও করতে পারে না, ভুলভাল লিখে ছেপে বা এয়ার করে বসে থাকে। এরা এই গোটা আরব বসন্তের ঘটনাকে মিডিয়ায় উপস্থাপন করেছে ফেসবুক বিপ্লব হিসেবে। আমাদের এক বিতাড়িত রাষ্ট্রপতির বাতিল রাজনীতিক ছেলে ফেসবুকে তরুণদের রাজনৈতিক দল খুলে বসেছেন আরব বসন্তের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে। এই আরব বসন্তের ঝোঝুল্যমান মূলা ধামরাইয়ে খালেদা জিয়ার জনসভাতে্ও উচ্চারিত হতে শুনি আমরা। মিডিয়াও নিজের অজ্ঞতা-মূর্খতা চেপে চুপে রেখে ফেসবুক আর সামাজিক যোগাযোগের সাইটের বিপ্লবপ্রসূ চেহারাটাকে জিইয়ে রাখে, আবার সময় বুঝে সেই একই ধরনের সাইটগুলোকে শেকলবন্দী করার জন্যে চারতারা হোটেলে দাওয়াত করে এনে রাজনীতিকদের ধমকায়, কেন এখনও এইসব সাইটকে লাগাম-কাপাইয়ের আওতায় আনা হয়নি।

আমরা জানি, আমাদের দেশে মিডিয়া অনেক স্বাধীনতা ভোগ করে। কিন্তু মিডিয়ার আচরণ আরব বিশ্বের বন্দী মিডিয়ার মতোই। ভেতরে ভেতরে হয়তো আমাদের মূল মিডিয়া জানে, তাকে রফা করতে হবে তাদের সাথেই, যাদের বিরুদ্ধে বিপ্লব সাধারণত হয়। তাই সে পরিচয়ে স্বাধীন হলেও আচরণে বশংবদ। সামাজিক যোগাযোগের সাইটের জুজু দেখাতে পারলে রাজনীতিকের সাথে তার দর কষাকষির সুযোগ প্রশস্ত হয়, সংকীর্ণ হয় না। তাই রাজনীতিকরা ফেসবুক-টুইটার-ইউটিউব নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, মিডিয়া এই উদ্বেগ সরবরাহ করে খুশি থাকে। আমাদের দেশে অতীতে বিনা নোটিসে ইউটিউব আর ফেসবুক বন্ধ করা হয়েছে (দেশে কিছু কর্তৃপক্ষের মনোভাব আইয়ুবের আমলাদের চরিত্র বহন করে এখনও), সেও এই উদ্বেগেরই ফসল।

কিন্তু সামাজিক যোগাযোগের কি কোনো ভূমিকাই তাহলে বিপ্লবে নেই? এই যে আমরা ব্লগিং করছি, ফেসবুকে সন্নিবিষ্ট হচ্ছি, মত বিনিময় করছি, সকলই ভ্রান্ত সিন? মিডিয়া তাহলে সামাজিক যোগাযোগ নিয়ে এমন আড়ে আড়ে তাকায় কেন? ব্লগ নিয়ন্ত্রণে তাহলে কিছু লোক আইন চায় কেন? ঢোঁড়া সাপের জন্যে তাহলে কেন কুঁচকি পর্যন্ত গামবুট?

এর উত্তর দিচ্ছি দ্বিতীয় পর্বে। সামাজিক মিডিয়ার শক্তি আর মিডিয়া-রাজনীতিকের যৌথ ব্ল্যাকবোর্ডে তার ভুল উপস্থাপন নিয়ে সেখানে যথারীতি বাজে বকবো।


তথ্যসূত্র:[১] Inside story of the UK’s secret mission to beat Gaddafi, মার্ক আরবান, বিবিসি

[২] The Arab Spring is not the ‘Facebook Revolution’, Declan Hill, THE OTTAWA CITIZEN

http://www.sachalayatan.com/himu/42841

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: