মিরিয়াম

আকবর বাদশার বিয়ের বাতিক ছিল, তার বউয়ের সংখ্যা কোন বইয়ে ৩৬ কোন বইয়ে ৩০০ দেখতে পাই। বউ ছাড়াও হেরেমে ঢলাঢলি করার জন্য দুনিয়া চষে হাজার পাঁচেক মেয়ে মজুত ছিল তার। বীর্য বিলিয়ে বেড়াতে আকবর তুলনাহীন ছিলেন, সব জাতের সব ধর্মের মেয়ে চেখে দেখার স্বভাব ছিল তার। মিরিয়াম ছিল আকবরের খ্রিস্টান বউ। গোয়ার পর্তুগীজ যাজক সম্প্রদায়ের লোকের চোখ চকচক করে ওঠে আকবর মিরিয়ামের বিবাহে, মোগল বাদশাকে খ্রিস্টান করে হোলি পোপের অধীনে ক্যাথলিক ভারত গড়ার স্বপ্নে তারা বিভোর ছিল। আজকের লিখাটি জেমস হুইলার লিখিত “Tales from Indian history” হতে নেয়া।
……………………………………………

আইন ই আকবরীর রচয়িতা মোগলাই চাটুকার আবুল ফযল বাদশা আকবরকে ইসলামের উপর বীতশ্রদ্ধ করে তোলেন। অষ্টম হেনরীর মত তিনিও স্থানীয় ধর্মীয় আলেমউলামাদের ক্ষমতায় রুষ্ট হন, আর আবুল ফযলের সাথে শলা করতে থাকেন ইসলাম ধর্মের পোপ জাতীয় কিছু হওয়া যায় কিনা।

এই সময় তিনি খ্রিস্টধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন, মিরিয়াম বা মেরী নামে এক খ্রিস্টান মেয়ে বিয়ে করেন তিনি। মিরিয়ামের জন্য প্রাসাদ গড়া হয় ফতেপুরে, ঐ প্রাসাদ আজও আছে। গোয়ার পর্তুগীজ যাজকদের তিনি আমন্ত্রন দিয়ে আনেন, ফতেপুর প্রাসাদের ভেতরে একটি ক্যাথলিক গীর্জা গঠনের অনুমতিও দেয়া হয়। রাস্তাঘাটে ক্রুশ ঝুলিয়ে ঘোরার স্বাধীনতা পায় তারা, ইচ্ছেমত ধর্মপ্রচারেও নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়া হয়।

ঠিক কোন কারনে আকবর মিরিয়ামের বিবাহ ঘটে তা ঠিক করে জানা যায়না। মিরিয়াম সম্ভবত গোয়ায় শিক্ষিত পর্তুগীজ রমণী, তার মনে হয়তো আশা ছিল মহান মোগল বাদশাকে ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করবেন। গোয়ার ধর্মযাজকের দল মিরিয়ামকে ব্যবহার করে আকবরকে কনভার্ট করতে চেয়েছিল সেটাও হতে পারে, মিরিয়াম হয়তো দাবার বড়ে ছাড়া কিছুই ছিলনা।

ছোট্ট দ্বীপ গোয়া ভারতের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত, ঐসময় মোগল ভারতের নাগালের বাইরে। দ্বীপটি মাত্র বারো বাই ছয় মাইল বড়, মূল ভারত হতে একফালি সাগর দ্বারা বিচ্ছিন্ন। পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত গোয়া ছিল পাইরেটদের আখড়া, পরে এক মুসলমান সুলতান জলদস্যুদের পিটিয়ে তক্তা করে দ্বীপে মুসলমান সওদাগর বসিয়ে দেন। ষোড়শ শতাব্দীতে আল্বুকার্কের নেতৃত্বে পর্তুগীজেরা গোয়া দখল করে দূর্গ গড়ে শহর পত্তন করে। এরপর থেকে পর্তুগীজ ভারতের রাজধানী হিসেবে গোয়া মাথা তুলে দাঁড়ায়।

গোয়ার পর্তুগীজরা ছিল চরম নাক উঁচু। ধর্মযাজক ছাড়া সব পুরুষ লোকে তলোয়ার পরে ঘুরত, আর দাবী করতো তারা বিরাট বংশের মানুষ। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় তারা মাথার টুপি উঁচিয়ে ধরতো, কেউ এর উত্তরে টুপি না তুললে তাদের একদম ইজ্জত যেত আর তলোয়ার উঁচিয়ে মারতে যেত তাকে। প্রত্যেকে দাস নিয়ে ঘুরতো, এমনকি নগণ্য সৈনিকের পেছনেও ছাতি মাথায় ঘুরঘুর করতো দাস। ছেলেবুড়ো সবাই ছিল ব্যবসাদার, রোববার বাদে প্রতিদিন এরা হাটে গিয়ে কেনাবেচা করতো।

গোয়ার বড়বড় জাহাজ, কামান, প্রাচীর, দূর্গ এইসবের কথা আকবরের কানে গিয়েছিল। কিছু ইয়োরোপীয়দের তিনি নিযুক্ত করেছিলেন বন্দুক তৈরির কাজে। এদের শারিরীক গঠন, কর্মচাঞ্চল্য, সততা আর সাহসের বেজায় ভক্ত ছিলেন বাদশা। এদের মদ খাওয়ার বহর দেখে তার বিস্ময়ের অবধি ছিলনা, ভারতীয়দের মত মদ খেয়ে টাল হওয়ার বদলে মদ খেয়ে আরও এনার্জি পাওয়ার ব্যাপারটি তিনি ধরতে পারেননি। সাদা মানুষের উপর চরম ইমপ্রেসড আকবর ঠিক করলেন এদের লাগিয়ে দেখতে হবে, কোথা থেকে মিরিয়াম বলে একটি মেয়েকে তিনি ধরে আনলেন। কে যে এই মিরিয়াম ঠিক বলা যায়না, হয়তো তার অধীনে কাজ করা কোন ইয়োরোপীয়দের মেয়েই হবে।

আকবরের ঘরভর্তি তখন মুসলমান আর রাজপুত বউ, খ্রিস্টান সাদা মেয়ের ওইখানে ঢোকার যন্ত্রনা কম নয়। তবু মিরিয়াম জানত কোনভাবে যদি হিদেন আকবরকে খ্রিস্টান করে দেশটাকে পোপের অধীনে আনা যায় তাহলে তাকে চার্চ সেইন্ট ফেইন্ট ঘোষনা করে দেবে। তাছাড়া আকবর বাদশা দেখতেও লাল পেয়ারার মত টুকটুকে ছিলেন, হয়তো মিরিয়াম সত্যসত্যই তার প্রেমে পড়েছিল। বিয়ে ঠিক হবার পরে গোয়ার ভাইসরয়কে আকবর পাদ্রী পাঠানোর অনুরোধ করে চিঠি পাঠান। এই চিঠির পেছনে মিরিয়ামের হাত আছে বলে শোনা যায়। চিঠি পেয়ে গোয়ার পাদ্রীসমাজে রসগোল্লা বিলানো শুরু হয়ে যায়, দ্বীপের প্রত্যেক পাদ্রী হাঁটুগেড়ে পাইকারী প্রার্থনা শুরু করে দেয় যেন ঈশ্বরের কৃপায় আকবরকে ধর্মান্তরিত করতে তাকে পাঠানো হয়।

তিনটে পাদ্রী অবশেষে যাত্রা করে হিন্দুস্তানের উদ্দেশ্যে, যাবার পর আকবর তাদের কোলে তুলে নেন। গোয়ার ভাইসরয়ের দেয়া উপহার মহান বাইবেল আকবরের হাতে তুলে দেয়ার সময় তাদের হাত কাঁপতে থাকে, মুসলমান বাদশা রেগে তাদের মুন্ডু কেটে না সেই বাইবেলের সাথে সিলাই করে দেয় সেই ভয়ে তারা অস্থির ছিল। তারা অবাক হয়ে দেখল বাদশা শ্রদ্ধাভরে বই মাথায় ঠেকালেন। এরপরে পাদ্রীদের ঝোলা থেকে বেরুলো মহান যীশু আর মাতা মেরীর ছবি, যা মুসলমানেরা প্রতিমাজ্ঞানে ঘৃণা করতো। আকবর কিন্তু ছবিগুলোয় চুমো খেলেন। মিরিয়াম আগে থেকে শিখিয়ে পড়িয়ে রেখেছিলেন নিশ্চই আকবরকে, নইলে এরকম শ্রদ্ধা দেখানোর নিয়ম তিনি জানার কথা না।

পাদ্রীদের অনেকদিন ধারনা ছিল আকবরকে খ্রিস্টান বানানোর কাজ কমপ্লিট। একবার সারারাত বাদশা তাদের সাথে খ্রিস্টধর্ম নিয়ে ব্যাপক বকবক করেছিলেন, যীশুর জীবন ও মথি লিখিত সুসমাচার নিয়ে বিরাট ক্যাচাল চলে ঐ রাত। প্রাসাদের সেরা কক্ষে তাদের ঘুমানোর ব্যবস্থা করা হয়। প্রাসাদের অভ্যন্তরে যে গীর্জা গড়ার অনুমতি দেন তিনি শুধু তাই নয়, তিনি নিজেও মাঝে মাঝে গীর্জার ভেতরে যীশুর মূর্তির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ঢং করতেন। প্রিয় জ্ঞানী চাটুকার আবুল ফযলকে তিনি হুকুম দেন বাইবেল ফার্সীতে অনুবাদ করার।

দুইচারদিনের জন্য আকবর হয়তো খ্রিস্টান হয়েছিলেন মনে মনে, কিন্তু তাকে ব্যাপ্টাইজ করা হয়নি। নারীঘটিত সমস্যা ছিল। তার মা বাদশা হুমায়ূনের বউ চরম ধর্মভীরু মুসলমান ছিলেন, এছাড়া মিরিয়াম ছাড়া তার অন্যান্য বউগুলিও বেঁকে বসে। তখনকার দিনে খ্রিস্টধর্ম পালন করা ছিল ফ্যাশনেবল ব্যাপার, আকবরের অগুণতি ছেলের একটিকে খ্রিস্টান শিক্ষায় পাঠানো হয়। এমনকি মন্ত্রী ফযল সাহেব খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন। অবশ্য ফযল সাহেবের মন্দির মসজিদ দেখলেই ঢুকে পড়ার প্রাচীন স্বভাব ছিল, যেকোন ধর্মের ঈশ্বরের কাছে তিনি প্রার্থনা করতেন। মনে হয় শিওর ছিলেননা কোনটা কাজের ভগবান, তাই সবাইকেই খুশী রাখতেন। যদি লাইগা যায় টাইপ ব্যাপার।

তবে দিন গড়ানোর সাথে সাথে আকবরের খ্রিস্টধর্ম হতে মন উঠে যায়, মিরিয়ামকেও ততদিনে ছিবড়ে ফেলা কমপ্লিট। তিনি আর চাটুকার ফযল ভাই মিলে নতুন শলা করতে থাকেন, প্রচলিত ধর্মের নবীরাসূল না হয়ে নতুন ধর্ম বানিয়ে তার অবতার হলে কেমন হয় সেই শলা। মুসলমানরা মুহম্মদ বা খ্রিস্টানরা যীশুকে যে সম্মান দেয় সেই সম্মান পাওয়ার ধান্দা করতে থাকেন তিনি। হিন্দু রাজপুত বউসমূহ আর চাটুকার ফযল তাকে বোঝায় তিনি সূর্যের অবতার বিষ্ণু। হিন্দুস্তানের সম্রাট তখন দৈনিক কাকভোরে উঠে প্রকাশ্যে জানালা খুলে সূর্যের পূজা করা শুরু করেন, আর নিচে পাবলিক চেঁচাতে থাকে যে তিনি সূর্যের রশ্মির মতই বলবান। ঠিক রোমান সীজারের মত তিনি আকাশের দেবতা হতে চেয়েছিলেন।

১৬০৫ সালে তেষট্টি বছর বয়সে আকবর পটল তোলেন। আগ্রা থেকে মাইল চারেক দূরে সেকান্দ্রার বাগানে তাকে কবর দেয়া হয়। কবরের চারপাশে ক্রুশ বসানো হয়, কিন্তু তা কি মিরিয়ামের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নাকি তার খ্রিস্টান বিশ্বাসের সম্মানে সেই রহস্য কখনো ভেদ করা সম্ভব হয়নি।

http://www.sachalayatan.com/mir178/42889

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: