বেনারস আফিম এজেন্সী

ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অন্যতম প্রধান রপ্তানীদ্রব্য ছিল আফিম ও আফিমজাত মাদক। বাংলায় উৎপন্ন আফিম চড়াদামে চীনে বিক্রয় করা কোম্পানীর অন্যতম মুনাফার উৎস। আফিম চীনে নিষিদ্ধ মাল তখন, এই নিয়ে কোম্পানীর চীনের সাথে দুইবার মারপিটও হয়ে গেছে। এই লিখাটি ১৮৫১ সালে “The Records of The Bengal Government” হতে নেয়া, ঐ বইয়ে বাংলাদেশের আফিম ব্যবসা নিয়ে বিস্তারিত লেখেন কোম্পানীর শুল্ক, লবণ ও আফিম বোর্ডের প্রধান পরীক্ষক ডব্লিউ সি বি ইটওয়েল, এম ডি।
………………………………………

ভারতে পপিচাষ হয় মূলতঃ ছশো মাইল বাই দুশ মাইল বিস্তৃত এলাকায়, উত্তরে গোরকপুর, দক্ষিণে হাজারীবাগ, পূবে দিনাজপুর আর পশ্চিমে আগ্রা তক। এই বিস্তীর্ণ এলাকা দুইটি এজেন্সিতে বিভক্ত, বিহার আর বেনারস। বিহারের হেড অফিস পাটনায়, আর বেনারস এজেন্সি চালানো হয় গাজীপুর কুঠি হতে। এই দুই এজেন্ট আবার কোলকাতায় শুল্ক, লবণ ও আফিম বোর্ডের অধীনে। বিহার এজেন্সি অপেক্ষাকৃত বড় ও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, এরা বেনারসের তিনগুণ আফিম উৎপন্ন করে।

বেনারস এজেন্সি আটটি ডিভিশনে বিভক্ত, যথা বেনারস ও মির্জাপুর, গাজীপুর, আজিমগড়, জৌনপুর, সেলিমপুর, গোরকপুর, কৌনপুর এবং ফতেপুর। এই আট বিভাগ মিলিয়ে ১৮৪৯-৫০ মৌশুমে মোট এক লাখ সাত হাজার আটশ বিঘা জমিতে পপিচাষ হত। প্রতিটি বিভাগ প্রধান ছিলেন সাব-ডেপুটি আফিম এজেন্ট, তিনি থাকতেন বিভাগীয় প্রধান কুঠিতে। বিভাগীয় প্রধান কুঠি হতে বাৎসরিক মাল গুনেগেঁথে পাঠানো হত গাজীপুর হেডকোয়ার্টারে।

এইসব সাব-ডেপুটির ছাড়াও ছিলেন কালেক্টররা, যারা ছিলেন বিভিন্ন কুঠির চার্জে। কালেক্টর ঠিক সাব-ডেপুটির অধীন নন, তারা সরাসরি ডেপুটি এজেন্টের সাথে কারবার করতেন। কালেক্টর কড়া নজর রাখতেন যেনো ডেপুটির অনুমোদন ব্যতিত সাব-ডেপুটি কোন মাল কিনা বা বেচা করতে না পারেন। আবার সাব-ডেপুটি খেয়াল রাখতেন যেনো কালেক্টর মাল সংগ্রহ করার সময় কোন দুই নম্বরি না হয়। বেশি মুনাফার লোভে কালেক্টররা আফিমচাষিদের যেনো না ঠকায় বা যেনো অন্যভাবে না বাঁশ দেয় সেদিকেও সাব-ডেপুটির নজর থাকতো। কোন কোন বিভাগে আবার সাব-ডেপুটি ছিলোনা, কাগজে কলমে সেখানে গাজীপুরের ডেপুটিই ছিলেন প্রধান…তবে কার্যতঃ কালেক্টরই বিভাগ চালাতো তখন। পুরো বিভাগ একলা চালানো বড় কঠিন কর্ম, অভিজ্ঞ নেটিভ অফিসারদের উপর অনেক দায়িত্ব বর্তাতো। এদের ডাকা হত গোমস্তা।

প্রতিটি বিভাগ আবার বিভিন্ন উপবিভাগে বিভক্ত, এদের বলা হত “কুঠি এলাকা”। প্রতিটি এলাকার এমনভাবে সাজানো যেনো একজন অফিসারের পক্ষেই তা সামলানো সম্ভব হয়। এলাকাগুলির দায়িত্বে থাকতেন একজন গোমস্তা। গোমস্তাদের হেড অফিস ছিল একএকটি কুঠি। কুঠি বলতে বুঝাতো দালানটাইপ কিছু, এলাকার কেন্দ্রে স্ট্র্যাটেজিক স্থানে অবস্থিত। কুঠির রাজস্ব হিসেব রাখতে গোমস্তার অধীনে থাকতো তহবিলদার বা খাজাঞ্চি, তার কাজ ছিলো এলাকার মালের ডেবিট ক্রেডিট হিসেব রাখা।

সাব-ডেপুটি এজেন্ট আফিমচাষিদের সাথে চুক্তি করার পর গোমস্তারা জমি মাপজোক করে এলাকা দাঁড় করানোর জন্যে। এরা মাপার পর সাব-ডেপুটির নিজস্ব লোক আবার গিয়ে জমি মাপে। এই দ্বিতীয় গ্রুপের লোকেদের হাতে শীতকালে জমি ন্যস্ত থাকে, তখন আফিমচাষের অযোগ্য জমি। সুতরাং পরে যেনো জমির মাপ নিয়ে ঝামেলা না লাগে তাই এই দুইবার মাপার ব্যবস্থা। গোমস্তারা আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে, সাব-ডেপুটির সইকৃত আগাম টাকা এরা বুঝিয়ে দেয় এলাকার আফিমচাষিদের মধ্যে। চাষিদের কাছ থেকে আফিম আদায় করা ও গাজীপুর সদরে পাঠিয়ে দেওয়ার গুরুদায়িত্বও গোমস্তাদের।

গোমস্তাদের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজে তাদের সহায়তা করে আরো কিছু লোক, এদের ডাকা হয় জমিদার। জমিদারদের কাজ চাষিদের সরাসরি তদারক করা, আর চাষের ভালোমন্দ দেখা। এইসব নেটিভ অফিসারদের পাশাপাশি কাজ করতো মুত্তামীমের দল, এরা মোটামুটি পান্ডাগোছের লোক…পুরো বিভাগের সব ঠিকঠাক চলছে কিনা তার রিপোর্ট দিত এরা ডেপুটি বা সাব-ডেপুটিকে। পুরো সিস্টেমে এরকম নেটিভ অফিসারের সংখ্যা প্রচুর। প্রথম শ্রেনীর নেটিভ অফিসার দেড়শ এর কাছাকাছি, তাদের অধীনে ছিল আরো বারোশ অফিসার ও চাকর। এদের মত স্থায়ী কর্মচারীর পাশাপাশি আফিম মৌসুমে চাকরি করতো আরো অনেকে। শুধুমাত্র গাজীপুর সদর দপ্তরেই ছয়শ অস্থায়ী কর্মকর্তা কাজ করতো, যাদের মধ্যে তিনচারজন ইয়োরোপীয় সহকারী হিসেবে কাজ করতো আর চোদ্দপনেরোটি ছিল সাদা খ্রীস্টান ছেলেপিলে।

মাঠে পপিচাষে নিযুক্ত মোট লোকের সংখ্যা বিপুল। লম্বরদার, যারা কোম্পানীর সাথে চুক্তি সই করতো, তাদের সংখ্যা ১৮৪৯-৫০ মৌসুমে ছিলো ২১,৫৪৯। মোট চাষির সংখ্যা ছিলো ১,০৬,১৪৭। কতটা জমিতে কতটা আফিম হবে বলা শক্ত। সব ঠিকঠাক থাকলে একবিঘা জমি থেকে ১২ কি ১৩ সের আফিম উৎপন্ন হয়। বাজে মৌসুমে বিঘাপ্রতি আসে ৬ কি ৮ সের।

এজেন্সির কড়া আইন ছিল মূল্যের ব্যাপারে। কাউকে জবরদস্তি করে আফিম ব্যবসায় ঢোকানো হতনা, কিন্তু স্বেচ্ছায় আসা চাষিরা কোম্পানী নির্ধারিত দামে আফিম বিক্রয়ে চুক্তিবদ্ধ ছিল। তাদের সাফ বলে দেয়া হত মূল্য পছন্দ না হলে চাদর পেতে ঘুমিয়ে থাকো তোমার জমিতে আপত্তি নেই, দর নিয়ে মুলামুলি চলবেনা। সাব-ডেপুটি চুক্তি করতেন লম্বরদারের সাথে, যার অধীনে চাষিরা কাজ করতো। চুক্তি হবার পর লম্বরদারকে হিন্দি ভাষায় লিখিত চুক্তির কপি দেওয়া হত, এই কপির চলতি নাম ছিল হাত-চিটঠি। লম্বরদারের নাম, চাষিদের নাম, গোমস্তা নির্ণিত জমির বর্ণনা, বুঝে নেওয়া আগাম টাকা ও প্রতিশ্রুত আফিমের ওজনের বিস্তারিত বিবরন থাকতো হাত-চিটঠিতে। মৌসুম শেষে সাব-ডেপুটি ও লম্বরদার এই হাত-চিটঠি মোতাবেক লেনদেন করতো।

চিটঠি অনুযায়ী, নির্ধারিত সময় পর পর লম্বরদার এজেন্সি হতে আগাম টাকা পেত। মোট নির্ধারিত মূল্যের অর্ধেক বা তার বেশি পরিশোধ করা হত মাল হাতবদলের সময়, বাকী টাকা আগাম দেয়া হত। চাষিদের কাঁচামাল কিনার জন্যে আগাম ছিল আবশ্যক। কে কত আগাম পাবে তার আলাদা হিসেব আছে। যদি জমিতে আগেও চাষ হয়ে থাকে, তাহলে গত বছরের হিসেব দেখে আগাম অনুমান করা হত। পতিত জমির ক্ষেত্রে হিসেবটা একটু জটিল, তাকে বিঘাপ্রতি কিছু বেশি টাকা আগাম দিতে হত জমি ফসলের উপযুক্ত করে তুলবার জন্যে। সেপ্টেম্বর/অক্টোবরের দিকে প্রথম কিস্তির টাকা দেয়া হয়, চারা রোপনের পরে নভেম্বরে দ্বিতীয় কিস্তি। ফসল তুলে এজেন্সির হাতে বুঝিয়ে দেবার পর বাকি টাকা। পুরো ব্যাপারটাই দুই পক্ষের জন্য অসম্ভব স্বচ্ছ একটি প্রক্রিয়া। কোন চাষি ঠিকমত কাজ না করলে তার টাকা আটকে দেয়া হয়, আর আগাম টাকা পাই পয়সা ফেরত নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অন্যদিকে ঝড় বৃষ্টি বা বন্যায় ফসল নষ্ট হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমান পাওয়া গেলে চাষিকে দেওয়া আগাম মকুব করে দেয়া হয়। পূর্ববাংলায় চাষিরা নীলচাষে অস্বীকৃতি জানালে চাবকে লাল করে দেয়া হয় শুনেছি। ওখানে নীলচাষের নামে যে বজ্জাতি চলছে তার তুলনায় আফিম এজেন্সির কার্যক্রম সুপ্রশংসনীয়।

http://www.sachalayatan.com/guest_writer/42829

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: