যে সকল উদ্ভাবকদের আবিস্কারের স্বীকৃতি দেয়া নিয়ে বিতর্কের জন্ম নিয়েছিল


এই পৃথিবীতে যুগের পর যুগ ধরে জ্ঞানী, গুনী এবং পণ্ডিত ব্যক্তিগণ তাদের নিরলস প্রচেষ্টার দ্বারা পৃথিবীর কল্যানে, মানুষের কল্যানে প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু আবিস্কার করে চলেছেন। এটা অনস্বীকার্য যে, বাস্তবতার নিরিখে বিশ্বের মানুষও এ সকল পণ্ডিত, মৃত্তিকাখনক ও অগ্রদুতদের উপযুক্ত সন্মান, শ্রদ্ধা ও তাদের কাজের স্বীকৃতি দানে কার্পন্য করেনি। তা সত্বেও শতভাগ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার সাথে এসকল প্রতিভাবানদের কাজের মূল্যায়ন করা হয়েছে তা কিন্তু নয়। যদি আমরা ইতিহাসের পাতায় লক্ষ করি তাহলে দেখব এমন কিছু ব্যক্তিকে প্রতিভাবানদের তালিকায় সংযুক্ত করা হয়েছে অথচ তিনি সেটা উদ্ভাবন করেননি অথচ যিনি সত্যিকারের আবিস্কারক তাকে তো মূল্যায়ন করা হয়নি বরং অবহেলা করে দুরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। আজ অতীতে এমনি কয়েকজন প্রতিভাবান আবিস্কারকদের সাথে করা বৈষম্যমূলক ও বিমাতাসুলভ আচরণ নিয়ে আপনাদের সাথে শেয়ার করবো।


১.টেলিফোন
যদি প্রশ্ন করা হয় টেলিফোনের আবিস্কারক কে ছিলেন, হয়ত উত্তরে অনেকেই আলেকজান্ডার গ্রাহামবেল এর নামটি বলবেন। কিন্তু বাস্তবে এটা ছিল অসত্য। যদিও এই অসত্যকে সত্যের আলোকে নিয়ে আসতে সময় লেগেছিল ১শত বছর। টেলিফোনের সত্যিকারের আবিস্কারক ছিলেন ইতালির উদ্ভাবক এন্টনিও মেউচি । এই এন্টনিও মেউচি ১৮৭৩ সালে সর্বপ্রথম টেলিফোন আবিস্কারের উপর একটি খসড়া পেটেন্ট উত্থাপন করেন এবং নকশাটি পরীক্ষার জন্য আলেকজান্ডার গ্রাহামবেল এর গবেষনাগারে পাঠান। পরবর্তীতে দুর্লভ মূল্যবান নকশাটি আলেকজান্ডার গ্রাহামবেলএর হস্তগত হয়ে যায় এবং নিজের নামে পেটেন্টটি জমা দিয়ে টেলিফোন আবিস্কারের খেতাবটি ছিনিয়ে নেন।
যাহোক বহু দেরিতে হলেও সত্য তার আলোর মুখ দেখতে পায়। ২০০২ সালের ১১ জুন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সভায় এই বিষয়ে একটি প্রস্তাব উত্থাপন ও(প্রস্তাব নং ২৬৯)অনুমোদন দানের মধ্য দিয়ে আলেকজান্ডার গ্রাহামবেল নয় এন্টনিও মেউচিকেই টেলিফোন আবিস্কারক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।


২. মটরগাড়ী।
যদিও জনপ্রিয় সুশীল সমাজ উদ্ভাবক হেনরি ফোর্ডকে সর্বপ্রথম গাড়ী আবিস্কারক দাবি করেন কিন্তু তাদের দাবি ছিল বাস্তবতা থেকে বহুদূরে। ১৯১০ সালে ফোর্ড যখন তার তৈরী আধুনিক ও অপেক্ষাকৃত সহজলভ্য গাড়ী বিক্রয়ের জন্য বাজারজাত করেন তারও ১৫ বছর আগে জার্মানির উদ্ভাবক কার্ল বেঞ্জ ৩ চাকা বিশিষ্ট গাড়ীর পেটেন্ট প্রকাশ করেন যা কিনা সে সময়ে আধুনিক গাড়ী বলে বিবেচনা করা হত। ৩ চাকার সমন্বয়ের এই গাড়ীতে ছোট চার-স্ট্রোক বিশিষ্ট একক সিলিন্ডার, কার্বোরেটর এবং ঠান্ডাপানির বিচ্ছুরণ ঘটার জন্য তাপ বিকিরণযন্ত্র অনুভূমিকভাবে সজ্জিত ছিল।


৩. ইন্টারনেট।
যদিও যুক্তরাষ্টের আল গোর নিজে কখনই ইন্টারনেট বা অন্তর্জাল আবিস্কারের উদ্যোতা বলে দাবী করেননি এরপরও কোনো কোনো মহল আল গোরকে আন্তর্জালের প্রথম অগ্রদূত বলে গুজব ছড়িয়েছিল। যাহোক ইন্টারনেট আবিস্কারের সত্যিকারের ইতিহাস জানতে হলে আমাদেরকে ১৯৬৯ সালের রুশ-আমেরিকার স্নায়ুযুদ্ধের সেই দিনগুলোতে ফিরে যেতে হবে। রুশবাহিনীর পক্ষ থেকে সম্ভাব্য আক্রমনের কথা মাথায় রেখে সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী রুশ বাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কে দেশের যে কোনো স্থান থেকে আগাম তথ্য সংগ্রহ ও প্রেরণ করার উদ্দেশ্যে দেশ ব্যাপী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। তখন এই নেটওয়ার্কের নাম ছিল আরপানেট(ARPANET),আর সামরিক বাহিনীর এই নেটওয়ার্কের জনক ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কম্পিউটার বিজ্ঞানী ভিন্টন সের্ফ। ভিন্টন সের্ফ হলেন সেই ব্যক্তি যিনি ১৯৭২ সালে ইন্টারনেটে ডেটাবেইস আদান প্রদানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি নেটওয়ার্ক প্রটোকল এর (TCP/IP)রূপকার।


৪. রেডিও
বিগত বছরগুলোতে প্রকৃত রেডিও আবিস্কারক কে ছিলেন এ নিয়ে নিকোলাস টেলসা এবং গুগ্লিয়েরম মার্কনির মধ্যে বিতর্কের অবকাশ ছিল না। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে মার্কনি একটি বেতার যন্ত্রের রূপরেখা তৈরী করেন এবং এই যন্ত্রের সাহায্যে তিনি কোনো সংকেত আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে পাঠাতে সক্ষম হন। বাস্তবিকপক্ষে মার্কনির এই যন্ত্রটির রূপরেখাটি ছিল নিকোলাস টেলসির রেডিও বিষয়ক ১৭ রূপরেখার সম্মিলিত প্রচেষ্ঠা। টেলসা দাবি করেন ১৮৯৫ থেকে ১৮৯৯ সালের বিভিন্ন সময়ে তিনি দূরবর্তী কোনো স্থান থেকে তারবিহীন সংকেত গ্রহন ও প্রেরণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অবশেষে সকল বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ১৯৪৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রীমকোর্ট নিকোলাই টেলসাকে সর্বপ্রথম রেডিও আবিস্কারক হিসাবে স্বীকৃতি দান করেন।
এরপরও এই আবিস্কারের পেছনে যার নামটি অধরা রয়ে যায় তিনি হলেন স্পেনিশ ইঞ্জিনিয়র খুলিয় সের্ভেরা বাভিয়েরা । ১৮৯৮ সালে স্পানিশ-মার্কিন যুদ্ধ সমাপ্তির পর বাভিয়েরা ৩ মাস মার্কনি ও তার সহযোগী জর্জ ক্যাম্প এর সাথে টেলিগ্রাফি বিষয়ে কাজ করেন এবং শতাব্দীর শেষে এসে মার্কনি তারবিহীন টেলিগ্রাফ আবিস্কার করতে সমর্থ হন। এর বেশ কয়েক বছর পর স্পেনের নাভারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের বিজ্ঞ অধ্যাপকগণ খুলিয় সের্ভেরা বাভিয়েরার রেডিও বিষয়ক গবেষণালব্ধ তথ্যগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পান, যে কার্য সম্পাদন করার জন্য মার্কনিকে রেডিও আবিস্কারকের উপাধি দেয়া হয়েছিল ১১ বছর আগে খুলিয় সের্ভেরা সেই কাজটি অত্যন্ত সফলতার সাথে সম্পন্ন করেছিলেন। এটা সত্য যে, মার্কনি তারবিহীন টেলিগ্রাফি আবিস্কার করেছিলেন এবং তাঁর সেই আবিস্কৃত টেলিগ্রাফির সাহায্যে দুরে কোথাও সংকেত পাঠানো যেত। কিন্তু রেডিও বলতে আমরা যে যন্ত্রটিকে চিনি এবং রেডিও এর কার্যপ্রণালী বিশ্লেষণ করে যদি এটাকে মানুষের কন্ঠ ধারণকারী যন্ত্র বলা যায় তাহলে মার্কনিকে নয় বরঞ্চ বাভিয়েরা হচ্ছেন সর্বপ্রথম রেডিওএর উদ্ভাবক যিনি ১৯০২ সালে স্পেনের শহর আলিকান্তে থেকে ওপর পারের শহর ইবিজা দ্বীপে মানুষের কন্ঠ প্রেরণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন।


৫. বৈদ্যুতিক বাতি।
যদিও আমরা বৈজ্ঞানিক আলফা এডিসনকে প্রয়োগিক বৈদুত্যিক বাতির আবিস্কারক হিসেবে জানি কিন্তু তিনি যে প্রথম এই বাতির পথিকৃৎ ছিলেন এমনটি বলা সঠিক হবে না। ১৮০৯ সালে ব্রিটিশ রসায়নবিদ স্যার হাম্ফ্ররী ডেভী যিনি ব্যাটারির আবিস্কারক ছিলেন তিনি একটি প্লাটিনাম ফলা ব্যাটারির দুই মেরুতে স্থাপন করে বক্র আকারে আলো উৎপন্ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন । পরবর্তীতে তারই আবিস্কারের সুত্র ধরে ৭৫ বছর পর আলফা এডিসন দ্যুতিময় বাতি আবিস্কার করেন।


৬. ভিডিও
১৮৯১ সালে আলভা টমাস এডিসনের অপর আরেকটি আবিস্কার ইতিহাসের প্রথম “ভিডিও চিত্র” নিয়ে তখনকার দিনে নিয়ে বিতর্কের অন্ত ছিল না। মানকিসাইনস (Monkeyshines ) নামে আলফা এডিসনের তথাকথিত ভিডিও চিত্রটি বের হওয়ার ২ বছর পূর্বে ১৮৮৮ সালে ফ্রান্সের উদ্ভাবক লুইস লে প্রিন্স তার বাড়ির সংলগ্ন বাগানে Roundhay Garden Scene নামে ২ মিনিটের একটি ভিডিও চিত্র রেকর্ড করেছিলেন। এই আকর্ষনীয় ভিডিওতে যে দুই ব্যক্তি দৃশ্যমান হয় তাদের একজন হচ্ছেন লুইসের স্ত্রী এবং অপরজন তার ছেলে। বহু ইতিহাসবিদের মতে লুইস লে প্রিন্স ছিলেন বিশ্বের প্রথম ভিডিও চিত্রের আবিস্কারক। কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাস লুইস তার পেটেন্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করার পূর্বেই ১৮৯০ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ডিজন থেকে প্যারিস যাবার পথে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন এবং এরপর বহু খোজাখুজি করেও তাকে ও তার লাগেজের কোনো সন্ধান পাওয়া যায় নাই।


৭.বিমান
আমাদের সকলের হয়ত রাইটস ভ্রাতৃদ্বয়ের কথা মনে আছে যারা অনড় পাখাওয়ালা বিমানে মটর সংযোজন করে আকাশে উড়াল দিয়ে প্রথম মটরওয়ালা বিমানের বৈমানিক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সঙ্গতকারণেই এই মূল্যবান খেতাবটি রাইটস ভ্রাতৃদ্বয়ের নয় নিউজিল্যান্ডের অধিবাসী রিচার্ড পিয়ার্স এর ঝুলিতে শোভা পাওয়ার কথা ছিল। ১৯০৩ সালের মার্চ মাসে পিয়ার্স তার বানানো বাশের তৈরী বিমানে বাতাসের চেয়ে ভারী বায়ু মটর সংযোজন করে উড়াল দিয়ে ১৪০ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিলেন। রাইটস ভ্রাতৃদ্বয় তাদের বিখ্যাত বিমান “কীটি হাব্ক” নিয়ে আকাশে ভ্রমন করার আটমাস পূর্বে রিচার্ড কৃতিত্বের সাথে এই কাজটি সম্পাদন করেছিলেন । কিন্তু পিয়ার্সের এই সফলতাটি সেদিন আলোর মুখ দেখেনি। অনেক ইতিহাসবিদের মতে পিয়ার্স নিজে প্রচার অম্বেষী ছিলেন না, তাছাড়া তখন তিনি তার কৃতকার্যতা নিয়ে কিছু বিরোধপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছিলেন। যাহোক সুযোগের অভাবে হোক বা অনিচ্ছার কারণে হোক পরবর্তী সময়ে তিনি তার আবিস্কারটি আর বেশি উন্নতিসাধন করতে পারেননি যেমনটি রাইটস ভ্রাতৃদ্বয় করেছিলেন। ফলশ্রুতিতে তার সেদিনের সফলতা স্বীকৃতি না পেয়েই কালের আবর্তে হারিয়ে যায়।

 

 

http://www.somewhereinblog.net/blog/colegitarealblog/29512638

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: