চার্লি চ্যাপলিন: শুধুই কমেডিয়ান নন, অসামান্য এক বোদ্ধা


সাদাসিধা ভবঘুরে একটা মানুষ, যার পরনে নোংরা ঢিলেঢালা প্যান্ট, শরীরে জড়ানো জীর্ণ কালো কোট, পায়ে মাপহীন জুতো, মাথায় কালো মতো হ্যাট আর হাতে লাঠি। যে ব্যাপারটি কারও চোখ এড়ায় না তা হচ্ছে লোকটার কিম্ভুত আকৃতির গোঁফ। লোকটা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে আর ঘটাচ্ছে অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা। আর এসব দেখেই হেসে কুটিকুটি হচ্ছে বিশ্বের কোটি মানুষ। বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রবাদপ্রতিম পুরুষ স্যার চার্লস স্পেন্সর চ্যাপলিন। দ্য ট্রাম্প বা ভবঘুরে চরিত্রটি দিয়ে যিনি বিশ্ব চলচ্চিত্রে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। চলচ্চিত্র খুঁজে পেয়েছিলো সর্বকালের সেরা শোম্যানকে। নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে মানুষকে হাসানোর মত দূরহ কাজটি শুধুমাত্র অঙ্গভঙ্গি দিয়ে যিনি করতেন অত্যন্ত সফলভাবে।

চার্লি মানে ব্যঙ্গ, চার্লি মানে হাসি। তাঁর চলচ্চিত্রগুলো দেখে দর্শক হাসতেই হাসতেই খুঁজে পাবে প্রতিটি মনের গহিনে লুকিয়ে থাকা যন্ত্রণার উপস্থিতি। অট্টহাসির মাঝেই ধরা দেবে রূঢ় বাস্তবতা। হাসিতে হাসিতে দর্শকের পেটে খিল ধরতে না ধরতেই সামনে এসে উপস্থিত হবে যুদ্ধের উন্মত্ততা আর নিষ্ঠুরতা। তার মানে, চার্লি আসলে দর্শকদের সামনে আসতেন আনন্দ আর কষ্টগুলো ভাগাভাগি করতে। তখন তিনি কোনো চলচ্চিত্রকার নন, নন শুধু চিত্তবিনোদনকারী; চার্লি তখন দর্শকের বিবেক, তাদের সুখ-দুঃখের সাথী। তাই তিনি বলতেন, ‘জীবনটা ক্লোজআপ শটে ট্র্যাজেডি; কিন্তু লং শটে কমেডি।’

হাস্যরসের মধ্য দিয়ে চ্যাপলিনের চলচ্চিত্রে উঠে এসেছিল সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতিসহ তৎকালীন বিভিন্ন রাজনৈতিক সমস্যা, দুটি বিশ্বযুদ্ধ, হিটলারের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, জাতীয়তাবাদ, মানবাধিকারসহ নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়বস্তু। প্রতিটি চলচ্চিত্রেই স্যার চ্যাপলিন কোনো না কোনো বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন এবং তিনি সেটা করেছিলেন তাঁর চিরচেনা দ্য ট্রাম্প স্টাইলে। বিশেষ করে বিভিন্ন ছবিতে তার রাজনৈতিক জ্ঞানের যে পরিস্ফুটন দেখা যেত তা ছিল সত্যিই অসাধারণ।
ট্রাম্প বা ভবঘুরে চরিত্রটি প্রথমবারের মতো পর্দায় আসে ‘কিড অটো রেসেস অ্যাট ভেনিস’ [১৯১৪] চলচ্চিত্রটি দিয়ে। এরপর একে একে তৈরি করেন ‘শোল্ডার আর্মস’ [১৯১৮], ‘দ্য কিড’ [১৯২১], ‘দ্য সার্কাস’ [১৯২৮], ‘সিটি লাইটস’ [১৯৩১], ‘মডার্ন টাইমস’ [১৯৩৬] প্রভৃতি কালজয়ী চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রে তার ভূমিকা থাকত বহুমুখী। তিনি চলচ্চিত্রে প্রযোজনা, পরিচালনা, চিত্রনাট্য রচনা, অভিনয়, নাচ, গান সবই করতেন।

দি সার্কাস ছবির একটি দৃশ্য

দি কিড চলচ্চিত্রটির একটি দৃশ্য

সিটি লাইটস চলচ্চিত্রটির একটি দৃশ্য

দিকে দিকে যখন চ্যাপলিনের জয়ধ্বনি, ঠিক এরকম সময়ই চলচ্চিত্র জগতে অনুপ্রবেশ ঘটে সবাক চলচ্চিত্র বা টকির। চ্যাপলিন তখনও স্রোতের বিপরীতে গা ভাসিয়ে চলছেন। তৈরি করছেন একের পর এক নির্বাক চলচ্চিত্র, যা রীতিমতো বক্স অফিস কাঁপাচ্ছে। টকি তার কাছে পাত্তাই পাচ্ছে না; কিন্তু মানুষ সবাক চলচ্চিত্রে অভ্যস্ত হয়ে গেল। চ্যাপলিনও বুঝলেন পরিবর্তন আনতেই হবে। তাই টকির জন্মের ১৩ বছর পর চ্যাপলিন তাঁর প্রথম সবাক চলচ্চিত্র বানালেন_ ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ [১৯৪০] এবং যথারীতি সৃষ্টি করল ইতিহাস।

দি গ্রেট ডিক্টেটর ছবির একটি দৃশ্য

তার প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটরে’ তিনি অ্যাডলফ হিটলার ও ফ্যাসিবাদ নিয়ে সরাসরি বিরোধিতা করে চরম সাহসিকতার পরিচয় দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভে মুক্তি পাওয়া এ চলচ্চিত্রটিতে নাজি বাহিনী কর্তৃক এক ইহুদি নাপিতের হেনস্থা হওয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়। চ্যাপলিন চলচ্চিত্রটিতে ফ্যাসিস্ট ডিক্টেটর ও ইহুদি নাপিতের দ্বৈত ভূমিকায় অভিনয় করেন। ডিক্টেটর চরিত্রটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হিটলারের আদলে সৃষ্টি করা হয়েছিল। আর হিটলারের সঙ্গে চ্যাপলিনের দৈহিক সাদৃশ্য ছিল। মজার বিষয়, হিটলার ছিলেন চ্যাপলিনের ভক্ত। শোনা যায়, তিনি নিজে এ ছবিটি দু’বার দেখেন এবং তার ব্যক্তিগত থিয়েটার রেকর্ডে রাখেন।

চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি দু’বার অস্কারে ভূষিত হন। ১৯২৯ সালে তিনি ‘দ্য সার্কাস’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ও নির্দেশকের জন্য মনোনয়ন পেলেও নির্বাচিত হননি; কিন্তু জুরি বোর্ড নির্দেশনা, প্রযোজনা, অভিনয় ও চিত্রনাট্য রচনা, সর্বোপরি বহুমুখী অবদানের জন্য তাকে বিশেষ সম্মানজনক পুরস্কার প্রদান করে। ১৯৭২ সালে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো অস্কার সম্মাননা পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে লাভ করেন নাইট উপাধি।

মর্ডান টাইমস ছবির একটি দৃশ্য

১৮৮৯ সালের ১৬ এপ্রিল লন্ডনের ওয়ালওয়ার্থে জন্ম নেওয়া এ মহাতারকা ১৯৭৭ সালের বড়দিনে মারা যান। চ্যাপলিনের সর্বশেষ ছবি ছিল ‘এ কাউন্টেস ফ্রম হংকং’ (১৯৬৭)। তাঁর মৃত্যুর পর আরেক অস্কারজয়ী নির্মাতা স্যার রিচার্ড অ্যাটেনবোরো চ্যাপলিনের জীবনের উপর ভিত্তি করে নির্মাণ করেন ‘চ্যাপলিন’ (১৯৯২)। চলচ্চিত্রটিতে তিনি স্যার চ্যাপলিনকে কমেডিয়ানের চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছেন একজন দূরদর্শী নির্মাতা ও রাজনীতি বোদ্ধা হিসেবে যিনি হাসির খোরাক জোগানোর পাশাপাশি সবাইকে জানান দিয়ে গেছেন, বিশ্ব আজ ধ্বংসপুরী, লঙ্ঘিত মানবতা। তাই যুদ্ধটা হওয়া উচিত সুন্দর এক পৃথিবীর জন্য। যেখানে মানুষে মানুষে যুদ্ধ হবে না, থাকবে না কোনো হানাহানি।

 

http://www.somewhereinblog.net/blog/Kawser_Rhuso/29509863

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: