বহির্গ্রহের খোঁজে

ছোটবেলায় সাধারণ জ্ঞানের বইয়ে পড়তাম, পৃথিবীর ভর এত, ব্যাস এত, বয়স এত। ভেবে পেতাম না, এগুলো বের করে কিভাবে। এখনও অনেক কিছু নির্ণয়ের প্রক্রিয়া জানি না। তবে কিছু কিছু প্রক্রিয়া জেনে খুব মজা পেয়েছি। উচ্চ মাধ্যমিক বইয়ের অতি সাধারণ সূত্র দিয়ে কত জটিল জটিল পরিমাপ করা যায়- ভাবলে অবাক হতে হয়! যেমন ইন্টারে পড়েছি ডপলার ক্রিয়া। বহির্গ্রহ সনাক্তকরণ প্রক্রিয়া ঘাটতে গিয়ে এই ডপলার ক্রিয়াই বেরিয়ে এল। ডপলার ক্রিয়া ব্যবহার করে কিভাবে বহির্গ্রহ খুঁজে পাওয়া যায় সেটাই আজ লিখব। তবে বলে রাখা ভাল, বহির্জাগতিক গ্রহ সনাক্ত করার আরও অনেক পদ্ধতি আছে, অন্তত ৬ টি প্রক্রিয়া ব্যবহার করে আশানুরূ ফল পাওয়া গেছে। সেগুলো নিয়ে কিছু না বলে সরাসরি ডপলারে চলে যাচ্ছি।

ডপলার ক্রিয়ার মাধ্যমে বহির্গ্রহ সনাক্তকরণ বুঝতে হলে প্রথমেই দুটি বিষয় বুঝে নিতে হবে: মহাকর্ষের প্রভাবে তারার ঘূর্ণন এবং অরীয় গতি।

মহাকর্ষের প্রভাবে গ্রহ-তারার ঘূর্ণন

সাধারণ্যে প্রচলিত ধারণা হচ্ছে: গ্রহগুলো তারাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। কিন্তু আসল ঘটনা ভিন্ন। মহাকর্ষের সূত্রমতে এমনটা হওয়ার কথা না। আসল ঘটনা হচ্ছে: গ্রহ এবং তারা তাদের সাধারণ ভারকেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত হয়। লিভারের মাধ্যমে ভারকেন্দ্রের বিষয়টা আরও স্পষ্ট করি:

উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, লিভারের এক পাশে বেশী ভরের একটা বল, অন্য পাশে কম ভরের একটা বল। অনুভূমিক দণ্ডকে ভারসাম্যে রাখতে হলে ভারসাম্য দণ্ডটাকে স্থাপন করতে হবে ভারী বলের খুব কাছে। এটাই হবে তাদের ভারকেন্দ্র।
এখন এই বড় বলটাকে তারা এবং ছোট বলটাকে গ্রহ হিসেবে কল্পনা করা যাক। তারা এবং গ্রহ উভয়েই কিন্তু এই সাধারণ ভারকেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত হয়, কেউ কাউকে ঘিরে নয়। ভারকেন্দ্র তারার অনেক কাছে হওয়ায় তারার আবর্তনটা সহজে চোখে পড়ে না। সূক্ষ্ণ পরিমাপের মাধ্যমেই কেবল এই আবর্তন বোঝা সম্ভব।

একের বদলে অনেকগুলো গ্রহ (ধরুন সৌরজগৎ) কল্পনা করলেও অসুবিধা নেই। কারণ সবগুলো গ্রহের ভর যোগ করলেও তারার তুলনায় সেটা একেবারে নগণ্য হয়ে থাকে। যেমন, সূর্যের ভর সৌরজগতের মোট ভরের ৯৯.৮৬%। এতেই বোঝা যাচ্ছে, ভারকেন্দ্রটা তারার কত কাছে হবে।

তো গ্রহ-তারার এই ঘূর্ণন দেখে আমরা একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারি। যেসব তারার আশেপাশে কোন গ্রহ নেই তাদের মধ্যে এ ধরণের কোন ঘূর্ণন দেখা যাবে না। আর যাদের আশেপাশে গ্রহ আছে তাদের মধ্যে এ ধরণের ঘূর্ণন দেখা যাবে। এই গতি সনাক্ত করার মাধ্যমেই তাই বহির্গ্রহ আবিষ্কার করা সম্ভব।

অরীয় বেগ

তারাবিহীন গ্রহ এবং তারাসমৃদ্ধ গ্রহের পার্থক্য বোঝা গেল। কিন্তু তারা কোন ভারকেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে কি-না তা বোঝার উপায় কি? উত্তর হচ্ছে, অরীয় গতির মাধ্যমে।

পৃথিবী থেকে আমাদের দৃষ্টিরেখা বরাবর কোন বস্তুর গতিকেই বলা হয় অরীয় গতি। এটা অবশ্যই পৃথিবীবাসী মানুষের সাপেক্ষে চিন্তা করতে হবে। ধরা যাক সূর্যের অরীয় বেগ পর্যবেক্ষণ করছি। তাহলে পৃথিবী থেকে সূর্য পর্যন্ত একটি সরলরেখা টেনে সেটাকে বর্ধিত করে দিতে হবে। আর এই রেখা বরাবর সূর্যের বেগটাই হবে অরীয় বেগ। অর্থাৎ সূর্য আমাদের দিকে আসলে বা আমাদের থেকে দূরে সরে গেলেই কেবল অরীয় বেগ পাওয়া যাবে। সরলরেখার বাইরে যতই নড়াচড়া করুক, কোন লাভ নেই।

পৃথিবী থেকে অনেক দূরের কোন তারার সব গতিকে হিসাবের বাইরে রেখে শুধু অরীয় বেগ নিয়ে চিন্তা করা যাক। যদি তারাটির অরীয় বেগ পাওয়া যায় তাহলেই বুঝতে হবে, সে একটি ভারকেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। আর ভারকেন্দ্র ঘিরে আবর্তন মানেই তার আশেপাশে কোন গ্রহ আছে। গ্রহটা অবশ্যই দুরবিন দিয়ে দেখা সম্ভব না। কিন্তু অরীয় বেগের লেখচিত্র আঁকতে পারলেই ধরে নেয়া হয়, বহির্গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে। এটা তাত্ত্বিক হলেও খুব নির্ভরযোগ্য। আবিষ্কৃত দুই শতাধিক বহির্গ্রহের অধিকাংশই এই পদ্ধতিতে পাওয়া গেছে। তাদের কোনটিই দুরবিন দিয়ে দেখা যায়নি। কারণ গ্রহ নিজে কোন আলো বিকিরণ করে না এবং খুব বেশী আলো প্রতিফলনও করে না।

সুতরাং আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারি, কোন তারার অরীয় বেগের লেখচিত্র যদি সাইন কার্ভের মত দেখায় তবেই বোঝা যাবে তার আশেপাশে কোন গ্রহে আছে। লেখচিত্র আঁকা এবং তার সাথে সাইন কার্ভের সম্পর্ক বোঝার জন্য ডপলার বর্ণালিবীক্ষণ বোঝা প্রয়োজন।

ডপলার বর্ণালিবীক্ষণ

প্রথমেই আসে ডপলার ক্রিয়ার কথা। বিজ্ঞানী ডপলার বলেছিলেন, চলমান উৎস থেকে আসা তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্য উৎসের গতির সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। উৎস যদি দর্শক বা শ্রোতা থেকে দূরে সরে যেতে থাকে তাহলে তার থেকে আসা তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যাবে, আর যদি কাছে আসতে থাকে তবে তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমে যাবে। তরঙ্গদৈর্ঘ্য বাড়া মানে কম্পাঙ্ক কমা আর তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমা মানে কম্পাঙ্ক বাড়া। এবার ট্রেনের উদাহরণ দিলেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে:
হুইসেল দিতে দিতে ট্রেন যত কাছে আসে তার শব্দ তত তীব্র হয়, অর্থাৎ তার থেকে আসা তরঙ্গের কম্পাঙ্ক বাড়ে, বা তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমে। আর ট্রেন দূরে গেলে কম্পাঙ্ক কমতে থাকে এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে।

সব তরঙ্গের ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য। সুতরাং তারা থেকে আসা আলোও এই নিয়ম মেনে চলবে। তারা যদি আমাদের কাছে আসে তবে তা থেকে আসা তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমবে, অর্থাৎ তার আলো নীল রঙের দিকে সরে যাবে। আর তারা যদি দূরে যায় তবে তার থেকে আসা আলো লাল রঙের দিকে সরে যাবে। কারণ, দৃশ্যমান আলোর বর্ণালী বিশ্লেষণ থেকে আমরা জানি- লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশী, এবং নীল-বেগুনীর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম। লাল রঙের দিকে সরে যাওয়াকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় “লাল সরণ”, আর নীল রঙের দিকে সরে যাওয়াকে বলে “নীল সরণ”।

এই আলোচনা থেকেই অরীয় বেগের তাৎপর্য বোঝা যাচ্ছে। অরীয় বেগ না থাকলে তারা আমাদের কাছেও আসবে না বা দূরেও সরে যাবে না। এমন অনেক গ্রহওয়ালা তারা আছে যাদের কোন অরীয় বেগ নেই। সেই তারার গ্রহগুলো তাই এই পদ্ধতিতে আবিষ্কার করা যাবে না। যেমন কোন তারা জগতের কক্ষপথ যদি এই ছবির মত হয়, তাহলে তার কোন অরীয় বেগ থাকবে না এবং যথারীতি কোন লাল-নীল সরণও থাকবে না:

কিন্তু তারা জগৎ যদি হয় এই ছবির মত তবেই অরীয় বেগ পাওয়া যাবে:

কারণ বোঝাই যাচ্ছে, এই জগতের তারা পৃথিবীর সাপেক্ষে কখনও কাছে আসছে কখনও দূরে সরে যাচ্ছে। শুধু কাছে আসা এবং দূরে সরে যাওয়াটাই আমরা বিবেচনা করব, কারণ এর মাধ্যমেই লাল-নীল সরণ পাওয়া সম্ভব।

এই ছবিটা আরেকটু ভাল করে লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে, তারা থেকে আসা আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সাইন কার্ভ অনুসরণ করবে। বিষয়টা একেবারে সোজা: তারা যখন ভারকেন্দ্র বরাবর থাকবে তখনকার তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে যদি ধ্রুব ধরি, তবে এই তরঙ্গদৈর্ঘ্য বাড়তে বাড়তে একসময় সর্বোচ্চ মানে পৌঁছাবে, তারপর আবার কমতে কমতে ধ্রুব মানে আসবে। এরপর আবার কমতে কমতে সর্বনিম্ন মানে পৌঁছাবে, যথারীতি আবারও বাড়তে বাড়ে ধ্রুব মানে এসে পৌঁছাবে।

তবে ডপলার বর্ণালিবীক্ষণের সাহায্যে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের লেখ আঁকা হয় না। আঁকা হয় অরীয় বেগের লেখ। কেপলারের গ্রহীয় গতি সূত্র এবং নিউটনের মহাকর্ষ ও গতি সূত্র ব্যবহার করে এটুকু থেকে অনেক তথ্য বের করে আনা যায়। অরীয় বেগের লেখটা হয় এরকম। এটা আদর্শ লেখ। বাস্তবে এর থেকে একটু ব্যত্যয় দেখা যায়। কোন তারার অরীয় বেগের লেখ এমন হলেই বাজিমাত…

সমীকরণের জটিলতায় না গিয়ে বরং ডপলার বর্ণালিবীক্ষণ থেকে কি কি বের করা যায় সেটা জানিয়ে দেই:
– তারার অরীয় বেগ (V-rad)
– তারা থেকে বহির্গ্রহটির দূরত্ব (r)
– তারার ভর (M-star)
– তারার আবর্তন কাল (P-star)
– তারাটির চারদিকে গ্রহের ঘূর্ণন বেগ (V-pl)
– গ্রহের ভর (M-pl)
একাধিক গ্রহের ক্ষেত্রে হিসাবটা আরেকটু জটিল হয়ে যায়, তবে অসম্ভব না।

http://www.sachalayatan.com/shikkhanobish/25492

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: