ইস্তাম্বুলের বাজারে

IMG_8100

ইস্তাম্বুল, আমাদের মানবজাতির নির্মিত একমাত্র শহর যা দুই মহাদেশের মাঝে বিস্তৃত, এশিয়া ও ইউরোপের সন্ধিক্ষণ। এককালে শতাব্দীর পর শতাব্দী মসুলমান অটোম্যান সম্রাটদের দখলে থাকা তিলোত্তমা রাজধানী শহর ইস্তাম্বুলের মহাকালের বুকে জয়যাত্রা শুরু কিন্তু আবার প্যাগান রোমান সভ্যতার রাজধানী রোম থেকে স্থানান্তর করে ইস্তাম্বুলে (তখন তার নাম হয়েছিল কনস্ট্যান্টিনোপল) নেওয়া হয়েছিল তখন থেকেই।

পূর্ব-পশ্চিমের এই মহানগরী অসংখ্য কারণে যেমন ইতিহাসের সন্ধিক্ষণগুলো দখল করে আছে তেমনি পর্যটকদের কাছে ইস্তাম্বুলের অমোঘ আকর্ষণ নানাবিধ কারণে, যার অন্যতম এখানে অবস্থিত মধ্যযুগের সপ্তাশ্চর্যের একটি হাজিয়া সোফিয়া, নয়নকাড়া মসজিদের মিছিল, বসফরাসের নোনা বাতাস এবং এর অতি বিখ্যাত প্রাচীন বাজারগুলো, আমাদের যাত্রা আজ ইতিহাসময় জনমুখর বাজারগুলোর দিকেই।

খেমোখাতায় পরিচয় হয়েছিল তুর্কি তরুণী ফুলিয়া আনলিরের সাথে, ডিসেম্বরে দিনকতকের ছুটি পেয়ে হন্যে হয়ে নতুন গন্তব্যের সন্ধানে ছিলাম, সে আমন্ত্রণ জানালো ইস্তাম্বুল ঘুরে যাবার। বলল- আমাদের বাড়ীতেই থেকো, সেই সাথে গাইড হয়ে আমরাই পুরো শহর তোমাকে ঘুরিয়ে দেখাব। এতো মেঘ না চাইতেই শতাব্দীর বন্যা। ভবঘুরে মনের জন্য আর কি চাই! সোজা যেয়ে নামলাম ইস্তাম্বুলে। সে তো আর এলেবেলে শহর নয়, ইংরেজিতে বলে কসমোপলিটন, কোটি দুয়েক বাসিন্দা তার।

দিন দুয়েক নানা উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য পর্যবেক্ষণের ( নয়নাভিরাম মসজিদ থেকে শুরু করে অটোম্যান টোপকাপি প্রাসাদ, সুলতানের হারেম কিছুই বাদ পড়ে নি) পর এক বিকেলে যাওয়া হল এখানকার সবচেয়ে বড় বাজার পরিদর্শনে যা গ্র্যান্ডবাজার নামে ভুবননন্দিত।

IMG_8066

চোখ মটকে ফুলিয়ার ভাই ফাতিহ জানালো আজ বুঝবে মানুষের মেলা কাহাকে বলে! আরে ব্যাটা, তরুণ তুর্কি, আমি হলাম বাঙ্গালমুলুকের বাসিন্দা, প্যাঁচে পড়ে ঢাকাতেও ছিলাম কিছু দিন, আমাকে তুমি মানুষের ভিড় দেখিয়ে চমকাতে চাও! ঘুঘু দেখেছ হে ফাঁদ দেখ নি!

IMG_8091

কিন্তু বড় বাজারে মানুষের যাঁতাকলে পড়ে নিজে ফাঁদ তো দেখলুমই, সেই সাথে ফাও হলদে সর্ষেফুল দেখেই ফেলেছিলাম প্রায়! জনসমুদ্র কাহাকে বলে, এক ঢাকার বঙ্গবাজার আর দিল্লীর চাঁদনী চক ছাড়া এমন গিজগিজে চলমান জনস্রোতের অস্তিত্ব থাকতে পারে তা কল্পনাও করি নি। তিল পরিমাণ জায়গা নেই সেই বিস্তীর্ণ গলিগুলোতে, এক সমুদ্র থেকে আরেক সমুদ্র পর্যন্ত কেবলমাত্র মানুষ আর মানুষ, এর মাঝেই সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। পরে জানলাম বিশ্বের সর্ববৃহৎ এবং পুরাতন বাজারগুলোর মধ্যে অন্যতম এই তীর্থে প্রতিদিন আড়াই লক্ষ থেকে পাঁচ লক্ষ লোকের জনসমাগম ঘটে থাকে!

IMG_8045

IMG_8043

১৪৫৫ সালে সুলতান মেহমেদের নির্দেশে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়, শেষ হয় মাত্র ছয় বছরের মাথায় ১৪৬১ সালে। এখনো এখানে ছাদ আবৃত ৫৮টি গলি আছে, যার আনাচে কানাচে ঠাই পেয়েছে হাজার চারেক দোকান, হরেক দেশের হরেক পণ্যের। মনে হল সোনামুখী সুচ থেকে শুরু করে ইন্দ্রের ঐরাবত কোনকিছুর সন্ধান মেলা অসম্ভব হবে না এখানে,

IMG_8785

IMG_8033

IMG_8067

IMG_8145

IMG_8784

IMG_8109

IMG_8034

IMG_8783

IMG_8073

কিন্তু বরাবরের মতই সবার আগে গেলাম গুপ্তধনের খোঁজে, পুরনো বইয়ের দোকানে।

IMG_8052

কেন জানি মনে হয় বিশ্বের সব বইপড়ুয়ারা যেমন প্রাণের বন্ধু, আত্মার আত্মীয়, ঠিক তেমনি পুরনো বইয়ের দোকানদাররাও ঝিম মেরে সুযোগের জন্য ওঁত পেতে থাকা এক আবিশ্ববিস্তৃত মাফিয়া চক্রের সদস্য, যাদের কাজই বইপ্রেমীদের অকৃত্রিম উৎসাহ আর নিষ্পাপ আবেগের বহিঃপ্রকাশকে পুঁজি করে যতখানি সম্ভব তাদের পকেট হালকা করা। এর ব্যতিক্রম কোথায়! প্রিয় নীলক্ষেত, পল্টন থেকে শুরু করে দিল্লীর দরিয়াগঞ্জ, কেপটাউনের শহরতলী, হাভানার স্কয়ার, প্যারিসের গলি, অন্নপূর্ণার উপত্যকা? কোথাও না! তাই ইস্তাম্বুলেই বা এর ব্যতিক্রম হবে কেন!

IMG_8048

IMG_8047

তবে এখানের বইবাজারে সন্ধান মেলে অদ্বিতীয় সব সম্পদের, যেমন প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, আরবি হরফে তুর্কি ভাষায় রচিত তুলোট কাগজে কাব্যসম্ভার, অদ্ভুতাকৃতির মানচিত্র, সেই সাথে অটোম্যান চিত্রকরদের আঁকা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আবহ ধরে রাখা পটচিত্র।

IMG_8060

IMG_8058

জালালুদ্দীন রুমির গোটা দুয়েক বইয়ের দাম করতে যেয়েই বুঝে গেলাম মাছি মারতে ব্যস্ত দোকানীরা আমাদের কণ্ঠস্বরের আবেগ ভরা ওঠানামা আর কলরবের ঠেলাতে বুঝে গেছে শিকার এসেছে আপনা থেকেই গুহাতে , এখন কেবল জাল গুটানোর পালা! দাম কমাবে না কিছুতেই! দলের সবচেয়ে যুদ্ধংদেহী সদস্য তুর্কি তরুণী জুলাল তার ভুবনমোহিনী হাসি দিয়ে ইজিয়ান সাগর তীরের বিকেলের সৌন্দর্য কয়েক গুণ বাড়িয়ে শেষ ব্রহ্মাস্ত্রটি প্রয়োগ করল – একজন অতিথিকে তুমি নিরাশ করছ, হে বড় বাজারের বই বিক্রেতা! এই সংলাপের পর আর কি কথা চলে, দোকানীও তো একজন নশ্বর মানুষমাত্র!

কিন্তু মুস্কিল হল, বই হাতে আসার আগেই দাম চুকিয়ে দিল স্থানীয় বন্ধুরাই! কি মুশকিল! এমন এক দোকানে তুরস্কের পুরনো কিছু ডাকটিকেট দেখে আবাল্য আগ্রহটা থলে থেকে বের করতেই দেখি পুরো ডাক টিকেটের খাতা একজন হনুমানের গন্ধমাদন পর্বত পরিবহণের মত তুলে এনে হাতে দিয়ে বলল- শুভেচ্ছা! বন্ধু, মনে রেখ আমাদের! এরপর থেকেই কোন কিছু পছন্দ করার আগে মহা সতর্ক হতেই হল, এত ভালবাসার অত্যাচার আবার অসহনীয় মনে হয় মাঝে মাঝে।

IMG_8072

বড় বাজারের কাছেই ইস্তাম্বুলের ২য় বৃহত্তম ছাদ আবৃত বাজার মশলা বাজারে যাওয়া হল, ১৫৯৭ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হবার পর থেকেই এখানে আগমন শুরু হয় মিশরের নানা বন্দর দিয়ে আমদানিকৃত সুগন্ধি মশলার, মশলা বাজার পরিণত হয় এক সাম্রাজ্যের মশলা সংগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে, তার সেই সুনাম আজও অটুট।

IMG_8113

কি সব বাহারি মশলা, কত তাদের নাম-ধাম, ইতিহাসের সুলুক সন্ধান, কি বিচিত্র তাদের জোগাড়ের কাহিনী। বিশ্বের সবচেয়ে দামি মশলা জাফরানের কদরও দেখলাম আলাদা মাপের।

IMG_8105

এর মধ্য আরও কয়েকজন বন্ধু দেখা করতে আসায় সবাই মিলে চা-চক্রে বসা হল, সুগন্ধি মশহুর চা এল কাঁচের পাত্রে আলগোছে, পরিবেশনের রীতিই আলাদা তুরস্কে।

IMG_8076

কেবলই অবাক হচ্ছিলাম, এই চা-খানাতেই পাঁচশ বছর আগেও এমন আড্ডায় জমায়েত হয়েছিল তামাম দুনিয়ার মানুষেরা, মেতে উঠেছিল নানান যুক্তি তক্কো গপ্পে, আজ তাদের আস্তানা কেবল ইতিহাসের ধূলি ধূসরিত পথে, আমরাও একদিন তাদের অনুগামী হব, ইস্তাম্বুলের বাজার ঠিকই রয়ে যাবে, ২৫১০ সালে হয়ত উঠবে চা কাপে ঝড়, জমবে কথার উৎসব।

IMG_8081

তুরস্ক ঠিক একটা দেশ নয়, সুদীর্ঘ ইতিহাসে নানান দেশের, নানান প্রান্তের মানুষের আগমনে ও শতাব্দী পরম্পরায় তাদের বংশধরদের মধ্যে পরিবার গঠনের মাধ্যমে তুরস্ক পরিণত হয়ে এক স্বতন্ত্র বিশ্বে, যেখানে আশ্রয় হয়েছে সব বর্ণের, সব জাতের মানুষের। কাজেই অন্য অনেক ভূখণ্ডের মত এখানে চট করে চোখ বুলিয়েই বলা সম্ভব নয় কে কোন দেশের নাগরিক! বিশ্বাস হল না, নিচের ছবিটি দেখে বলুন তো- সেখানে উপস্থিতগণ কোন কোন দেশের অধিবাসী।

IMG_8080

এবার বলি, উপরের ছবিটিতে উপস্থিত অধম বঙ্গসন্তান বাদে সকলেই আদি ও অকৃত্রিম ইস্তাম্বুলের বাসিন্দা।

বাজার থেকেই বেরোতেই হৃষ্টপুষ্ট এক মোরগের মালিক ভাগ্যগণকের সাথে দেখা, মোরগ তার ইশারা পেলে সামনে রাখা অসংখ্য সুকথায় ভরা কাগজের পুরিয়া থেকে একটা বেছে নেবে আগ্রহীর জন্য, তার সামনে বয়ে ঘাস চিবোচ্ছে দুটি তুষার ধবল খরগোশ, শুনলাম তারাও ভাগ্যগুনতে সাহায্য করে! ঘাসের বদলে মাঝে মাঝে পছন্দসই কাগজের পুরিয়া তুলে নেই মুখে! ভাগ্য জানতে বয়েই গেছে আমার! কিন্তু এমন চিড়িয়ার দেখা পেলে স্মৃতি হিসেবে রাখতে খুব ইচ্ছে করে।

IMG_7724

এরপরের যাত্রা বসফরাসের নোনা বাতাস খেলানো মাছের বাজার, যে কোন দেশের মাছের বাজারের ছবি দৃশ্যপটে বন্দী করতে খুব ভাল লাগে আমার,হয়ত নানা ধরনের অতল জলের বাসিন্দাদের দেখা মেলে এই কারণেই, রঙধনুর সাত রঙে রাঙানো মাছ থেকে শুরু করে আট শুঁড়ের অক্টোপাস কি নেই সেখানে! সেই সাথে শামুক, ঝিনুক এন্তার।

IMG_7673

IMG_7669

IMG_7667

জানতাম প্রিয় লেখক ওরহান পামুকের আস্তানা এই মহানগরীর ট্যাক্সিম মহল্লায়, নিভৃতলোকের বাসিন্দা এই শব্দের জাদুকরের নির্জনতার মোহ ভঙ্গ করার কোন অভিপ্রায়ে নয়, স্রেফ তার কলমের খোঁচায় তৈরি জাদুনগরীর পরিবেশ অনুভবের জন্য যেয়ে বাড়তি পাওনা হল সেখানের ফুলের বাজার, যা খোলা থাকে মধ্যরাত পর্যন্ত।

IMG_8233

IMG_8229

এর পরপরই বন্ধুরা এক রকম জোর করেই নিয়ে চলল সাঝের বসফরাসের তীরে, এই ছিলাম এশিয়ায়, তো এখন ইউরোপে! অস্তগামী সূর্যের অন্ধকার বিস্তারের হুমকিকে অগ্রাহ্য করে মাছে শিকারে ব্যস্ত ও ন্যস্ত হাজার হাজার সৌখিন মৎস্য শিকারি,

IMG_8186

এর মধ্যে কিছু শিকার যেমন আলো করে ঘরের হেঁসেল, ঠিক তেমনি কিছু ঠাই পাই স্থানীয় রেস্তোরাঁয়। তেমনি এক ভাসমান জাদু রেস্তোরাঁয় ঠাই হল আমাদের দলের, টাটকা মাছ ভাজার লোভের সাথে সাথে ইস্তাম্বুল, এর অধিবাসী আর বাজারগুলোকে ভালো লেগে, ভালোবেসে।

IMG_8195

I am listening to Istanbul, intent, my eyes closed:

At first there is a gentle breeze

And the leaves on the trees

Softly sway;

Out there, far away,

The bells of water-carriers unceasingly ring;

I am listening to Istanbul, intent, my eyes closed.

I am listening to Istanbul, intent, my eyes closed;

Then suddenly birds fly by,

Flocks of birds, high up, with a hue and cry,

While the nets are drawn in the fishing grounds

And a woman’s feet begin to dabble in the water.

I am listening to Istanbul, intent, my eyes closed.

I am listening to Istanbul, intent, my eyes closed.

The Grand Bazaar’s serene and cool,

An uproar at the hub of the Market,

Mosque yards are full of pigeons.

While hammers bang and clang at the docks

Spirng winds bear the smell of sweat;

I am listening to Istanbul, intent, my eyes closed.

I am listening to Istanbul, intent, my eyes closed;

Still giddy from the revelries of the past,

A seaside mansion with dingy boathouses is fast asleep.

Amid the din and drone of southern winds, reposed,

I am listening to Istanbul, intent, my eyes closed.

I am listening to Istanbul, intent, my eyes closed.

A pretty girl walks by on the sidewalk:

Four-letter words, whistles and songs, rude remarks;

Something falls out of her hand –

It is a rose, I guess.

I am listening to Istanbul, intent, my eyes closed.

I am listening to Istanbul, intent, my eyes closed.

A bird flutters round your skirt;

On your brow, is there sweet? Or not ? I know.

Are your lips wet? Or not? I know.

A silver moon rises beyond the pine trees:

I can sense it all in your heart’s throbbing.

I am listening to Istanbul, intent, my eyes closed

ORHAN VELİ KANIK

IMG_8200

http://www.sachalayatan.com/tareqanu/42359

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: