জরথুসত্র ও পারসীক ধর্ম

ধর্মপ্রচার নয়, বিভিন্ন ধর্মমত সম্পর্কে যৎসামান্য জানার প্রচেষ্টা মাত্র।

পারসীক ধর্মের আদি নাম ‘মজদা য়স্ন’। জরথুসত্র এই ধর্মমতের প্রচারক।

জরথুসত্রের জন্ম বিষয়ে সুনির্দিষ্ট স্থান এবং সময়ের নির্দেশ পাওয়া যায়না। তাঁর জন্মকাল, স্থান এবং দর্শন নিয়ে ঐতিহাসিকেরা নানা মত পোষণ করেছেন। কারও কারও মতে তাঁর জন্ম ৪০০০ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে। সম্ভবত এটি অতিশয়োক্তি।

আধুনিক কালে ঐতিহাসিকগণ জরথুসত্রের সময়কাল নির্ধারন করেছেন, ১২০০ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দ থেকে ৮০০ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দের মধ্যে।

অনেকের মতে জরথুসত্রের জন্ম, বৈদিক ‘বল্হীক’ (প্রাচীন ব্যাকট্রা), বর্তমান ‘বলখ’, আফগানিস্তানের উত্তরে আমু দরীয়ার তীরে অবস্থিত, অতীতে পারস্য সাম্রাজ্যের অনর্ভূক্ত ছিল। পারস্যের অনেক গোত্রই জরথুসত্রকে নিজেদের গোত্রের বলে দাবী করে।

কোন কোন সূত্র থেকে জানা যায় তাঁর পিতার নাম ছিল, ‘পুরুষ্যাসম্প’ এবং মাতার নাম ‘দুগ্ধ’। তাঁর গোত্রের নাম ছিল ‘স্পিতামা’।

জরথুসত্রের প্রচারিত দর্শন বা ধর্মমত ছিল একেশ্বরবাদী বা একত্ববাদী। তাঁর সময়ে প্রচলিত ‘মিথ্রা’ ধারনা বা ধর্মমত যা কিনা বেদে ‘মিত্র’ ধারনা হিসাবে পাওয়া যায়। এই বিধান মতে ‘ইন্দ্র’ এবং ‘বরুন’ উভয়ই সম মর্যাদায় পুজিত হতেন। প্রথানুসারে পশু(ষন্ড বা ষাঁড়) বলী দেওয়া হত, এবং ‘হাওমা’ নামক এক ধরনের মৃদু নেশা জাতীয় দ্রব্য পান করা হত। বেদে এই ‘হাওমা’কে ‘সোমরস’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ধারনা ছিল দেবতার উদ্দেশ্যে বলীকৃত পশু বা ষাঁড়ের পুন্য রক্তে ভূমি উর্বরতা লাভ করে।

জরথুসত্র এই প্রথার বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি একেশ্বরের ধারনা প্রচার করেন। তিনি কখনই নিজেকে প্রভু দ্বারা প্রেরিত কোন দূত হিসাবে নিজেকে দাবী করেননি। এমনকি তাঁর প্রচারিত বানীও প্রভুর নিকট হতে প্রাপ্ত, এমন কথাও তিনি বলেননি। তিনি তাঁর জ্ঞান ও শুভ চিন্তা থেকেই প্রাপ্ত দর্শন মানুষের মধ্যে প্রচার করেছেন।

জরথুসত্র, মানুষের ধর্মাচরণের জন্য সুনির্দিষ্ট কোন ক্রিয়া-কর্ম বা আচার-অনুষ্ঠানের কথা বলেননি। একারনে তাঁর প্রচারিত মতকে প্রচলিত অর্থে ধর্মমত না বলে মানব মুক্তির দর্শন বলা যেতে পারে।

দাস প্রথাকে তিনি নিরুৎসাহিত করেছেন। তিনি প্রচলিত শ্রেণীপ্রথার বিরোধিতা করেছিলেন।
জরথুসত্র, নর-নারীর সমতা বিধানের কথা বলতেন।
তাঁর উপদেশের মধ্যে আরও ছিল, ভূমি, বায়ু, পানি ও অগ্নিকে পরিশুদ্ধ রাখতে হবে।
অলসতা বর্জন করতে হবে। অপরের শ্রমলব্ধ ফলের উপর অধিকারকে তিনি নিরুৎসাহিত করতেন।
তিনি বলতেন, সকলকে স্ব স্ব প্ররিশ্রমলব্ধ ফলের উপর নির্ভরশীল থাকতে হবে।
কোন রকম উপাসনালয় বা দেবালয় প্রতিষ্ঠাকে তিনি চরমভাবে বিরোধিতা করেছেন।
তিনি অলৌকিকের ধারনাকেও অস্বীকার করেছেন।
তিনি পশুর প্রতি কোন রকম হিংস্রতাকে প্রচন্ড অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।

ধারনা করা হয় তাঁর সময়ে জরথুসত্র পারস্যের একজন জ্ঞানী পুরোহিত ছিলেন। তাঁর রচিত ‘গাথা’য় ১৭টি স্তোত্রগীত আছে।
তিনি বলেন যে, ‘আহুর মাজদা’ বা ‘অসুর মেধস’ একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, শক্তি ও জ্ঞানময় ঈশ্বর। সমস্ত প্রাকৃতিক শক্তি ও বস্তু তাঁরই অধীন। ‘আহুর মাজদা’কে জরথুসত্র আলোকিত শক্তি রূপে চিহ্নিত করেছেন। তিনি মানুষকে তাদের অন্তরকে আলোকিত করতে বলেছেন।
আলোক এবং অগ্নিকে তিনি মনে করতেন পরিচ্ছন্ন, বিষ্ময়কর এমন বস্তু যা কখনই দুষিত বা অবিশুদ্ধ করা সম্ভব নয় তাই তিনি একে ‘আহুর মাজদা’র প্রতীক হিসাবে উল্লেখ করেছেন।
এই ঈশ্বর মানুষকে চিন্তার শক্তি দিয়েছেন। শক্তি দুই প্রকারের, (১) ‘স্পেন্ত মইন্যু’ বা শুভ শক্তি, (২) ‘অঙ্গর মইন্যু’ বা অশুভ শক্তি।

এখানে প্রাসঙ্গিক ভাবে একটি বিষয়ের উল্লেখ করতে চাই। ২০০০ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দের কাছাকাছি কোন এক সময়ে আর্যদের কয়েকটি গোত্র একত্রিত হয়ে ‘ইন্দ্র’ নামক এক সেনানায়কের নেতৃত্বে পরশুজন ও নিম্নমাদ্রজনের উপর আক্রমন করে তাদের অনেক পুরুষ এবং শিশুদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
কয়েক শতাব্দি পরে এই ‘ইন্দ্র’ দেবতা হিসাবে পূজিত হতে থাকে।

অনেক পার্শব ও নিম্নমাদ্র নরনারী প্রান বাঁচিয়ে বক্ষু উপত্যকা (তাজিকিস্তান) ছেড়ে পশ্চিম দিকে পালিয়ে যায়। তাদের বংশধরেরাই পরবর্তিতে পার্শব (পার্সিয়ান বা ইরানী) এবং মাদ্র (মিডিয়ান) নামে পরিচিতি লাভ করে। এদের পূর্বপুরুষের উপর ‘ইন্দ্র’ এর নেতৃত্বে যে অত্যাচার হয়েছিল তা তারা কখনই ভোলেনি।

ধারনা করা হয় জরথুসত্র তাদেরই বংশধর ছিলেন, এবং সে কারনেই তিনি ‘ইন্দ্র’কে অস্বীকার করেছিলেন।, এবং নতুন পথের সন্ধান করেছিলেন।

১৮০০ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দের কাছাকাছি সময়ে বক্ষু উপত্যকা (তাজিকিস্তান) থেকে আগত ‘অঙ্গিরা’ নামক একজন আর্য ঋষি, তক্ষশিলায় (পশ্চিম আফগানিস্তান) তাঁর নিজ গৃহে আর্যদের অতীত ঐতিহ্য, আচারবিধি এবং আর্যরক্তের বিশুদ্ধতা বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান দান করতেন। সম্ভবত তাঁর নাম থেকেই ‘অঙ্গর মইন্যু’ বা অশুভশক্তি ধারনাটি নেওয়া হয়েছে।

ঋষি অঙ্গিরা ছিলেন দেবপূজারীদের গুরু।

উল্লেখযোগ্য আরও একটি বিষয় হল, জরথুসত্রের গোত্র ‘স্পিতামা’ সম্পর্কে অথর্ববেদের ‘ভার্গব সংহিতা’য় অসুরপুজারীদের গুরু শুক্রাচার্যের গোত্রকে ‘স্পিতামা’ হিসাবেই উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই বলে আমি কিন্তু জরথুসত্রের শুভ চিন্তা ও মানুষের মঙ্গল কামনার বিষয়টিকে খাটো করে দেখছিনা।

জরথুসত্র বলেছেন, যাঁরা সৎপথে চলবেন তাঁদের ছয়টি আধ্যাত্মিক আদর্শ অবলম্বন করতে হবে। এগুলি হল, শ্রেষ্ঠ মনন, সত্য বা সততা, দৈবশক্তি, ভক্তি অর্থাৎ ঈশ্বরে অনুরাগ, পরিপুর্ণতা ও অমৃতত্ব।

মানুষ এরই সাধনা করবে এবং পালন করবে তিনটি নীতি, (১) শুভ মনন, (২) শুভ কথন, (৩) শুভ কর্ম। এই আদর্শে জীবন যাপন করলে মৃত্যুর পরে তাঁর আত্মা স্বর্গে যাবে আর অন্যথায় ভোগ করতে হবে নরকের শাস্তি। তিনি বলেন, মানুষের আত্মাকে একটি সেতুর উপর দিয়ে ঈশ্বরের বিচারের জন্য যেতে হবে।

জরথুসত্র ছিলেন দ্বৈতবাদী। প্রাকৃত ও আধ্যাত্মিক জগতের দুটি মূল কারন তিনি স্বীকার করেছিলেন। মন, বাক ও কর্ম এই তিনের উপর তাঁর ধর্ম প্রতিষ্ঠিত।

তাঁর সময়ে পরশুপুরী (পারস্যের বৈদিক নাম), মাদ্র (মিডিয়া), পৃথু (পার্থিয়া), কুরুশ্রাভন (খোরাসান), বল্হীক (বলখ) প্রভৃতি অঞ্চলে তাঁর দর্শন ও ধর্মমত প্রসার লাভ করেছিল।

উমাইয়া খিলাফতের সময় আরবদের পারস্য অভিযান ও তাদের নিষ্ঠুরতার কারনে বহু পারসী ধর্মাবলম্বী ভারতে অভিবাসিত হন। কিছু সংখ্যক ব্যক্তি জিজিয়া কর প্রদানের মাধ্যমে মুসলিম খিলাফতে বসবাসের অনুমতি পান।

জরথুসত্র রচিত গাথাসমূহ য়স্ন নামক পুস্তকে যা কিনা আদি আবেস্তায় সংযোজিত এবং পরবর্তিতে অন্যান্য অথর্বান পুরোহিতদের রচিত উপদেশাবলী এবং রীতিসমূহ নব আবেস্তা একত্রিত ভাবে আবেস্তা নামকরনে সংকলিত হয় তাঁর মৃত্যুর অনেক পরে।

আবেস্তা হচ্ছে ৪টি পুস্তকের সমন্বিত রূপ, (১) য়স্ন, (২) উস্ত, (৩) বিসপরত এবং (৪) বিদৈবদাত।

জরথুসত্র এর মৃত্যুর পর সুবিধাবাদী ধর্মব্যাবসায়ী পুরোহিত শ্রেণী জরথুসত্রের দর্শনের মূল চেতনা থেকে সরে আসেন এবং তাঁরা প্রচার করেন যে, জরথুসত্র অগ্নিকে উপাসনা করতে বলেছেন, তিনি কিছু আচার-অনুষ্ঠানের বিধান দিয়ে গেছেন। এই পুরোহিতেরা জরথুসত্রকে অগ্নি উপাসক হিসাবে উপস্থাপন করেছেন।

http://www.sachalayatan.com/guest_writer/42333

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: