আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনা কৌশলের ক্রমবিকাশ-১

একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ তাদের সেনাবাহিনীর পরিচালনা কৌশল। আর সেই দেশটি যদি পাকিস্তান হয়, তবে সেখানে সেনাবাহিনীর পরিচালনা কৌশলই আদতে দেশটির পররাষ্ট্রনীতি। এটা ৪৭, ৬৫, ৭১ এ যেমন সত্য ছিল, এখনো আছে। এবছরের নভেম্বরের ২৬ তারিখের ঘটনা ও তারপরের বহুল প্রচারিত কেচ্ছাকাহিনিতে সেটাই দেখা গেছে।

বেশ ক’বছর আগে ‘গেরিলা থেকে সম্মুখযুদ্ধ’ বইটি যখন প্রথম বারের মত পড়ই আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকে মাঠ-পর্যায়ে দেখতে পেয়েছি। তবে মাঝে মাঝেই পেছনের একটি প্রচ্ছন্ন পরিচালনা কৌশলের উপস্থিতি টের পেয়েছি। তার থেকেই ৭১ ও এর আগে পাকিস্তানী, ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং স্বাধীনতাযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর রণ-পরিচালনা কৌশল নিয়ে আগ্রহী হই। এখানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ক্ষন পর্যন্ত এই তিনটি দলের রণ-পরিচালনা কৌশলের ক্রমবিকাশ নিয়ে কিছু কথা লিখছি। এই কথাগুলো ঘটনার বর্ণনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আলাদা করে কোন কিছু প্রমাণ করার ইচ্ছে নেই।

টিকটিকি বিপদে পড়লে লেজ ফেলে পালায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বার্মা যুদ্ধক্ষেত্রের ঠিক পেছনেই অবস্থিত বাংলার প্রতিরক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্রিটিশ ফিল্ডমার্শাল অকিনলেক এখানের সমতল ভূমি, নরম-সরম মানুষজন আর এখানের মাটির নিচে সোনাদানার অভাব বিবেচনা করে এদেশটাকে টিকটিকির লেজ সাব্যস্ত করল। জাপানি আক্রমণ এলে এদেশটাকে তাদের হাতে ছেড়ে দিয়ে ভাগীরথীর ওপারে বসে সে ও তার সাথীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। একটা লেজ খসলে আরেকটা গজাবে। বাংলায় অগণিত মানুষ। এর কিছু মারা পড়লে পড়বে, তারপর আবার কিছু জন্মাবে। সুতরাং এখানে সামরিক বিনিয়োগ করা হল না। বরং খাদ্য-নিয়ন্ত্রণের নামে যুদ্ধ ছাড়াই প্রচুর বাঙ্গালীকে অনাহারে মেরে ফেলা হল। অকিনলেক আরো কিছুদিন ছিল। কিন্তু একদিন যাবার সময় হল ওরা গেল। যাবার আগে ওরা মালিকানার চাবির সাথে সাথে পাকিস্তানের হাতে ৬ টি পদাতিক ডিভিশন রেখে গেল। তার মাত্র একটি রইল পূর্ব পাকিস্তানে। এই ডিভিশন আবার বাবুরাম সাপুড়ের দুবলা সাপ। এর শিং নেই, নখ নেই। ভারী অস্ত্র বা আর্মার্ড বাহনও নেই।

৪৭ এ ঢাকায় পূর্বাঞ্চলের সেনাপ্রধান হয়ে এলো ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খান। এখানে সে তার ইংরেজ প্রভুদের ‘টিকটিকি’ ধারনাটি মনে প্রাণে ধারণ করল। যদি তার জানি দুশমন ভারত কোনদিন পাকিস্তান আক্রমণ করে বসে, তার প্রতিক্রিয়ায় সেই লেজ খসানো কৌশল বলবত রাখার ব্যাপারে সে দৃঢ়-কল্প হল। কাশ্মীর যুদ্ধের সময়ে সে ও তার সাথীরা প্রচার করল ‘The defense of the East pakistan lies in the West’. আসলে ব্রিটিশরা যুদ্ধবাজ জাত বলে বলে পাঞ্জাবী-পাশতুন-বালুচদের মাথাটাই বিগড়ে দিয়েছিল। অনেকদিন হাঁটুসর্বস্ব থাকলে একদিন ঠাস করে তো আর কেউ হাঁটুর বাইরে ভাবতে পারেনা। কিন্তু ‘৫৮ সালে ঢাকার মার্কিন কনসুলার পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক সমস্যা পরিষ্কার ভাবে দেখেছিল। ২৯ মে ১৯৫৮ সালে স্টেট ডিপার্টমেন্টে পাঠানো এক টেলিগ্রামে সে বলে দিল, “পূর্ব পাকিস্তানকে ধরে রাখতে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করতে হবে। এখানের একটি দুর্বল ডিভিশনে দুটি বাঙালি ব্যাটেলিয়ন আছে যারা বিদ্রোহ করে বসতে পারে। এখানে সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করা মানে পশ্চিম পাকিস্তানে সেনাবাহিনীকে দুর্বল করা।” আমেরিকার বদৌলতে হাঁটুর ভেতরেই রয়ে গেল পাকিস্তানের সেনাধ্যক্ষরা।

’৬২তে চীন ভারত যুদ্ধ না লেগে গেলে ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় সেনাবাহিনীর সদস্যদের কোমর মেদহীন রাখাটা বেশ কষ্টকরই হত। চৌকশ যোদ্ধার কাছে শান্তিকালীন অনুশীলন তো ছুটির মতই। এই যুদ্ধের সময়ও পূর্বাঞ্চলীয় সেনাপ্রধানের কাছে ‘মুর্গীর গলা’ শিলিগুড়ি করিডোরে চীনা আক্রমণ আর মিজোরাম-নাগাল্যান্ড-পশ্চিমবঙ্গের গণ অভ্যুত্থান মোকাবেলার যতটুকু অগ্রাধিকার ছিল, তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান নিয়ে অতটা ভাবা-ভাবি তার বা দিল্লীতে তার ওপরওয়ালা, কারোরই খুব একটা করা হয়ে ওঠেনি। ৬৫’র যুদ্ধের সময়ে ওই টিকটিকির মাথারা দেখিয়ে দেয়, ওদের চোখে, লেজটি কোথায়। বিনোদনের বিষয়, পশ্চিম ফ্রন্টে উন্নত সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও কোনও বিশেষ আঞ্চলিক দখল ছাড়াই পাকিস্তান হেরে বসে। এই যুদ্ধের পর থেকে ভারত ও পাকিস্তান দুপাশ থেকেই পূর্বাঞ্চল নিয়ে নতুন করে ভাবা শুরু হয়। ভারতের কৌশল নিয়ে পরে বলছি। আগে পাকিস্তানের কৌশল নিয়ে কিছু বলা যাক।

৪৭ এর পর থেকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর যাকিছু প্রবৃদ্ধি, তার প্রায় পুরোটাই ঘটেছে পশ্চিমে, পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার স্বার্থে। পাকিস্তান দেশটির সেনাবাহিনী ৬ ডিভিশন থেকে বেড়ে ১৩টি হলেও, পূর্বপাকিস্তানে থেকে গেছে একটিই। ইয়াহিয়া এসে সেনাবাহিনীতে কিছু রদবদলের ভান করেছিল বটে। তার পাঠানো ইয়াকুব খান পূর্ব পাকিস্তানের সেনাধ্যক্ষ হয়ে এসে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষায় একটি রণ-পরিচালনা কৌশল গঠনের কাজ শুরু করে। তারই লোক কর্নেল রাও ফর্মান আলী ৬৮-৬৯ এর নভেম্বর-জানুয়ারিতে ‘অপারেশন এক্স-সুন্দরবন-১’ পরিচালনা করে। ইয়াকুবের আরেক করিতকর্মা অফিসার মেজর জেনারেল মোজাফফর হোসেনের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় ‘অপারেশন তিতুমীর’ ১৯৭০ এর জানুয়ারি মাসে। এই দুটি অনুশীলনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের প্রথম পরিচালনা কৌশল।

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পরিকল্পনাবিদের জানা ছিল যে,
১. বছরের একটি অল্প সময় পূর্বপাকিস্তানে স্বাভাবিক যুদ্ধ পরিচালনা করা যায়। এর বাইরে, পূর্বপাকিস্তান বস্তুত একটি জলাভূমিতে পরিণত হয়। সে সময়ে এখানে সুসজ্জিত সৈন্যবাহিনীকে গন্তব্যে এগিয়ে নেয়া কষ্টসাধ্য।
২. যুদ্ধ পরিচালনার যোগ্য সেই কয়েকটি মাসেও এই ভূখণ্ডের নদীবহুলতা এখানে যুদ্ধ পরিচালনার একটি বড় অন্তরায়। শেষ পর্যন্ত আকাশ ও নদীপথ যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তার জয় নিশ্চিত।
৩. পূর্ব পাকিস্তান বস্তুত ভারতের ‘ভেতরে’ অবস্থিত।
৪. ভারতের মূল আক্রমণ পশ্চিম দিক থেকে আসবে, যেটা যমুনা নদী পর্যন্ত দখল করে নেবে। পূব থেকেও গৌণ আক্রমণ আসতে পারে, যেগুলো অনায়াসে সিলেট ও চট্টগ্রামকে দখল করে নেবে।
৫. পশ্চিম পাকিস্তান বা চীনা আক্রমণ না ঘটলে ভারতের ঢাকা সহ পূর্বপাকিস্তান পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিতে বড়জোর ২-৩ সপ্তাহ লাগবে।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে ভারতের আগ্রাসন থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে রক্ষা করার বাস্তব চেষ্টা করতে হলে পূর্ব পাকিস্তানে এরকম সংখ্যায় পদাতিক সৈন্য রাখতে হবে, যা ভারতের পূর্বাঞ্চলের প্রত্যাশিত সেনা-সংখ্যার চারগুণ। তদুপরি ভারতীয় বিমান ও নৌবাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য যথেষ্ট এন্তেজাম ও থাকতে হবে। এইসব যোগাড়যন্ত্র করার সামর্থ্য পাকিস্তানের থাকলেও সেগুলো করার ইচ্ছা পশ্চিম পাকিস্তানের কোনদিনই ছিলনা। তাই এইসব পূর্বধারণা ও অপারেশন এক্স-সুন্দরবন-১ ও তিতুমীরের ফলাফলের ভিত্তিতে যে রণকৌশল রচিত তার উদ্দেশ্য সেই পুরাতন টিকটিকির লেজ ফেলে পালানোর চাইতে বেশী দূরে এগুলো না। এই ভূখণ্ড ও এর জনগণকে যথোচিত রক্ষা করার বদলে সেনাবাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি কমানো ও ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকা থেকে ভারতীয় আক্রমণ যতদিন সম্ভব ঠেকিয়ে রাখাই হল এই পরিকল্পনার লক্ষ্য।

পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে ভারতের পুরো সীমানা জুড়ে সেনা মোতায়েনের তো প্রশ্নই আসেনা, এই পরিকল্পনার যে ফরওয়ার্ড লাইন, বা সম্মুখবুহ্য সেই খুলনা- যশোর-রাজশাহী-হিলি-দিনাজপুর-রংপুর-জামালপুর-ময়মনসিংহ-সিলেট-কুমিল্লা –চট্টগ্রাম বরাবর এলাকায়ও সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা পাকিস্তান রাখল না। দ্বিতীয়বুহ্যটি ধরা হল মধুমতী-পদ্মা-রাজশাহী-হিলি-বগুড়া-জামালপুর-ময়মনসিংহ-ভৈরব-কুমিল্লা-মেঘনা-ফরিদপুর – এই বরাবর। সিলেট আর চট্টগ্রামকে এর বাইরে রাখা হল। ইনারলাইন বা গর্ভবুহ্য চিহ্নিত করা হল যমুনা-পদ্মা-মেঘনা-পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদীর মাঝের মানে ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকাকে।
যদি ভারত আক্রমণ করে, তাহলে সৈন্যরা রংপুর থেকে সরে এসে হিলি-বগুড়া হয়ে গর্ভবূহ্যের ভেতরে চলে আসবে। একইভাবে যশোরের সৈন্যেরা থেকে মধুমতীর এপারে চলে আসবে। ঢাকায় অবস্থিত সৈনিকেরা উত্তরে গিয়ে জামালপুর-ময়মনসিংহ-ভৈরব সামলাবে। আর কুমিল্লা থেকে সেখানের সৈন্যেরা পশ্চিমে সরে এসে চাঁদপুর-দাউদকান্দিতে শত্রুর মোকাবেলা করবে।

১৯৭০ এর ডিসেম্বরে এই পরিকল্পনা রাওয়ালপিন্ডিতে পাশ করা হয়। এর কিছুদিন পরেই ১৯৭১ এর মার্চের প্রথম সপ্তাহেই অপারেশন ব্লিটজের আওতায় পূর্বপাকিস্তানে নিযুক্ত সামরিক বাহিনী থেকে সম্ভাব্য বিদ্রোহীদের আগাম দমন শুরু হয়ে যায়।

(চলবে)

http://www.sachalayatan.com/durdanto/42273

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: