আমার দেখা ই্উরোপীয়ানদের বাংলাদেশ ভাবনা

চাকরীর সুবাদে অনেক ইউরোপিয়ানদের সাথে কাজ করার ও কথা বলার সুযোগ হইছে আমার। এদের অনেকেরই বাংলাদেশ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা ছিলো না। আসলে ইন্ডিয়ান রা যেভাবে বহির্বিশ্বতে তাদের ইমেজ তৈরী করেছে আমরা সেভাবে পারিনি। এর পিছনের আমাদের রাজনীতিক দের যেমন দুর্বলতা আছে ঠিক তেমনি আছে আমাদের নিজস্ব উদ্যোগের অভাব। যার ফলে অনেক ইউরোপিয়ান রা এখনো বাংলাদেশকে আলাদা করে যেনে নিতে পারেনি।
ইসলামী আন্দোলন বা জঙ্গীবাদ যাই বলি না কেনো এসব কারনে আফগানিস্তান বা পাকিস্তান কে তারা ভালোভাবে চিনে। আবার চীন বা ইন্ডিয়াকে চিনে তাদের বিপুল জনসংখ্যার পাশাপাশি তাদের উন্নয়নশীল কর্মকান্ডের জন্য।আমাদের জনসংখ্যা অনেক বেশি হলেও তা আমাদের সম্পদ হয়ে উঠতে পারেনি।
এখনও গুগল এ সার্চ দিলে বাংলাদেশ নামের জন্য উঠে আসে আমাদের ঈদের সময় প্রচন্ড ভীরে ঘিরে থাকা বাস বা ট্রেন গুলো। জার্মান কিছু কলীগ আমাদের সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে গুগল থেকে এর চেয়ে ভালো কিছু বের করতে পারেনি। আসলে গুগলে নেই আমাদের সম্পর্কে ভালো ও সমৃদ্ধ কোনো আর্টিকেল অথবা থাকলেও তা তাদের নজর এড়িয়ে যায়।
ঠিক কোথা থেকে শুনেছে সে আমি জানিনা, আমার আরেক জার্মান কলীগ আমার আরেক দেশী কলিগকে জিজ্ঞেস করলো তোমাদের ট্রেন এর লাইনের উপর নাকি মানুষ বাজার নিয়ে বসে। আর ট্রেন চলে আসলে দৌড় মারে? আমরা একটা কথা বলেই পার পেয়ে যাই যে আমাদের অনেক মানুষ তো তাই এরকম কিছু ঘটনা তো থাকেই। আসলেই আমাদের এতো মানুষ কে ট্রেনের লাইনের নিচে পড়ে মারা গেলো তাতে আমাদের কিছুই যায় আসে না। কিন্তু জার্মানিতে দেখলাম ট্রেনের লাইনে মানুষ চলাফেরার রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করে না। লাইনের দুই পাশে ব্যরিকেড দেয়া থাকে যাতে দ্রুতগামী ট্রেনের কারনে যাতে আশেপাশের জনজীবনে কোনো ব্যঘাত না ঘটে।
প্রথম বার বাংলাদেশে এসে পোলিশ কলীগেরা রাস্তায় এসে একটু থমকে গিয়েছিল। নাহ, অনেক মানুষ দেখে নয়। তারা আসলে অবাক হয়েছিল এখানে অনেক গে বা লেসবিয়ানদের দেখে !!! অবাক হলেন? আসলে তারা রাস্তায় দেখলো বাংলাদেশের মানুষ একে অপরের কাঁধে হাত রেখে হাটে অথবা হাত ধরে রাস্তা পার হয়। জার্মানী বা পোল্যান্ডে সমকামিদের সংখ্যাটা একটু বেশি বলেই ওরা এদেরকেও সমকামি ভেবেছিল।
এদের সাথে আরো একটি ঘটনা ঘটেছিলো। সকালে মর্নিং ওয়াকে বের হয়েছিলো দুই পোলিশ কলীগ। হোটেল সোনারগাঁ থেকে বের হয়ে হাটতে শুরু করার কিছু সময় পর তারা খেয়াল করলো কেউ তাদেরকে ফলো করছে। তারা দাঁড়িয়ে পরল। এবং সেই ব্যক্তি তাদের একজনের মাথায় একটা ঠুয়া(টোকা) মেরে চলে চলে গেলো। মজার ব্যাপার সেই কলিগ আবার টাক মাথা ছিলো আরকি। বেচারা বুঝতেই পারেনি যে এটা কি ফান ছিল নাকি অন্য কিছু। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম পাগল গোছের কেউ হবে নিশ্চয়ই।
ট্রেনিঙয়ের জন্য আমাকে পোলান্ড ও জার্মানীতে আসতে হয়েছে। তাই এসব দেশ সম্পর্কে ভালোভাবে জানার জন্য তাদের ভিসা অফিস একটা করে দেশের পরিচিতিমুলক বই দেয়। আমাদের ভিসা অফিস গুলোতে এই ধরনের কোনো সিস্টেম চালু আছে কিনা আমার জানা নাই। তাহলে এরা আমাদের সম্পর্কে আরো ভালো জানতে পারতো। এবং দেশের জন্য এটা বিশাল সুনাম নিয়ে আসতে পারতো।
অনেক ইউরোপিয়ান রা ভাবে আমরা ডাস্টবিন থেকে খাবার নিয়ে খাই। আফ্রিকা বা এশিয়ানদের সম্পর্কে এদের ধারণা তাই অনেক খারাপ।এবং আফ্রিকানদের কেও আমাদের সাথে একই কাতারে ফেলার একটা প্রবনতা খেয়াল করেছি। কোম্পানির একটা ব্রাঞ্চ অফিস আছে বাংলাদেশে। তাই অফিসের জন্য কিছু লাইসেন্সড কম্পিউটার পার্টস ও সার্ভার দেশে পাঠানো হয়েছিল কিছুদিন আগে। যথারীতি আমাদের কাস্টমস এগুলাকে আটকে দিয়েছে। ভ্যালিড কাগজ থাকার পর ও কোনো কাস্টমস এ ধরনের কাজ করতে পারে এরা সেটা ভাবতেও পারে না।যাই হোক লাখখানেক টাকা ঘুষ দিয়ে তবেই ছাড়পত্র পেলো।
এসব কর্মকান্ড নিশ্চয়ই আমাদের সম্পর্কে কোনো ভালো ধারণা দিবে না।
আরেকটা ঘটনা মনে পড়ে গেলো। বাংলাদেশে প্রথম অফিস খোলার জন্য যে বাসাটা ভাড়ার কথা হয়েছিলো সেটাও খুব একটা সুখকর ছিল না। আমাদের গুলশানের কোনো এক বাড়ি ওয়ালার সাথে পাকা কথা হওয়ার পর যেদিন তাকে টাকা দিয়ে কন্ট্রাক্ট করার কথা সেদিন তিনি হটাত করেই বলে বসলেন যে এত কমে তিনি ভাড়া দিবেন না (হয়ত তিনি ভেবেছিলেন যে বেশি চাইলে এরা বেশি দিবে, বিদেশী কোম্পনী বলে কথা)। যাই হোক এ ধরনের ছোট-খাট অনেক ঘটনাই নিশ্চয়ই তারা তাদের দেশে আলোচনা করে। যা আমাদের সম্পর্কে ভালো কোনো ধারণা দেয় না।
জার্মানীতে এসে ঘুরতে বের হওয়া হয়েছিল বেশ কিছু জায়গায়। চলে গিয়েছিলাম ইউরোপের অন্যতম বৃহত্তম পর্বতমালা আল্পস এ। প্রায় ১৭৬০ মিটার উপরে এক জায়গায় বসে রেস্ট নিচ্ছিলাম। এক অস্ট্রিয়ান ভদ্রলোক এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলো কোথা থেকে এসেছে। বললাম বাংলাদেশের নাগরীক। সে বলল “ও পাকিস্তান।” অবাক ও বিরক্তি নিয়ে বললাম নাহ এটা বাংলাদেশ। এদের ইতিহাস শিক্ষাটা আসলে এদের নিজেদের ইতিহাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাই বাংলাদেশ কে এখনও পাকিস্তানের অংশ ভেবে বসে আছে।
তবে সব ইউরোপিয়ান রা একরকম ভাবে না। এদের আসলে নিজেদের জাতিয়তাবোধ অনেক বেশি। তাই এরা আশা করে আমাদের দেশ কেও আমরা সুন্দর করে উপস্থাপন করবো, ঠিক তারা যেভাবে করে তাদের দেশকে। পোল্যান্ড এর মত ৪ কোটি মানুষের একটা দেশ উইকিপিডিয়ায় নিজেদের ভাষায় ৮লাখ ৪০ হাজারের বেশি নিবন্ধ লিখেছে। ইংলিশের পর পরের ৫টি দেশ ইউরোপিয়ান যারা উইকিপিডিয়ায় স্থান দখল করে আছে। আর যেই বাংলা ভাষা আমাদেরকে এত কষ্ট করে অর্জন করতে হয়েছে তার জন্য আমাদের আরো অনেক কিছু করার বাকি। ভাষার জন্য কাউকে যুদ্ধ করতে হয়েছে এটা আমাদের কে ইউরোপিয়ানদের কাছে অনেক মর্যাদা সম্পন্ন করেছে। আসুন নিজের জায়গা থেকে দেশটার নামটা একটা সুন্দর স্থানে নিয়ে যাই। পিছনে তাকিয়ে থাকার দিন শেষ।

 

http://www.choturmatrik.com/blogs/%E0%A6%AA%E0%A6%9E%E0%A7%8D%E0%A6%9A%E0%A6%AE-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BE/%E0%A6%86%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%96%E0%A6%BE-%E0%A6%87%E0%A7%8D%E0%A6%89%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%AA%E0%A7%80%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A6%BE

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: