পাঠ+আসন =পাঠাসন

অনেকদিন আরাম করে বসে কোন বই পড়া হয় নাই। উচ্চশিক্ষালাভের ধ্যানমগ্নতার ভান ধরে কতদিন যে গল্পের বই পড়ি না।খটোমট পেপার পড়েই দিন কাবার হইতেছিল। উচ্চশিক্ষার খেতা পুড়ি বলে ইস্তফা দিয়ে ভাবলাম এইবার আরাম করে অনেক গল্পের বই পড়তে পারব। দেশ থেকে বইও নিয়ে এসেছি অনেক গুলা। শুরু করলাম সঞ্জীবের লোটাকম্বল। এক পাতা পড়ে ঘুম আসে, পরেরদিন ভুলে যাই কতটুকু পড়ছিলাম। আবার আগের পাতা থেকে শুরু করি। আগের দিনের চে এক প্যারাগ্রাফ আগায় আবার ঘুম আসে। এমন করে করে ৩ মাসে ১০ পাতা আগাতে পেরেছি।
ভাবলাম সমস্যা বুঝি বই পড়ার পরিবেশে। আগে কি ভাবে বই পড়তাম? বিছনায় শুয়ে? চেয়ার টেবিলে বসে? দাঁড়িয়ে? উপলব্ধি হইল সবখানে সব ভাবেই বই পড়তাম। কত আজব জায়গায় আজব ভঙ্গিতে বই পড়েছি ভেবে হাসি পেল। উদাহারন দেই

প্রথম তিন গোয়েন্দা পড়েছি কার্ডবোর্ডের বক্সের মধ্যে বসে। কোন কারনে টিভি বা এরকম কিছুর মোটামুটি সাইজের একটা বাক্স বারান্দার এক কোনে পড়ে ছিল। তার মধ্যে ঢুকে পড়েছিলাম তিন গোয়েন্দার মৃত্যুখনি আর ছায়াশ্বাপদ। ঐ বাক্সের মধেই যে কল্পনায় জঞ্জালের তলায় তিন গোয়েন্দার হেড কোয়ার্টারের মত আমারও একটা হেড কোয়ার্টার তৈরি হয়েছিল বলাই বাহুল্য। বাক্স ফেলে দেয়ার পর আস্তানা গেড়েছিলাম দাদার ঘরে দেয়াল আলমিরা আর ছাতের মাঝে যে টুকু ফাঁক থাকে সেখানে তুলে রাখা লেপ-কোলবালিশের মাঝে। সেটা খুবি আরামদায়ক জায়গা ছিল বটে। ড্রয়ারের হাতলগুলোকে মই বানিয়ে উঠে যেতাম, সারাদিন কেউ খুঁজেও পেত না, জ্বালাতনও করত না। মনীষীদের ছেলেবেলা, বাংলাদেশের নির্বাচিত হাসির গল্প, বনফুল, শরৎচন্দ্রের বৈঠকি গল্পের সংগ্রহ, ঠাকুরমার ঝুলি, সাথে সত্যজিৎ রায়, একবার না কতবার যে পড়েছি ঐ চালায় বসে। আমার পড়ার সীমানা বড় না, যেটা ভাল লাগে সেই বই বার বার পড়ি।
কত বই পড়েছি স্রেফ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। হয়ত শেলফ থেকে হাতে নিয়েছি পুরনো বইএর পাতা উল্টাবো বলে, কখন যে আরেকবার পড়া হয়ে গেছে খেয়াল হয়নি। প্রচুর বই পড়েছি স্কুলের লাইব্রেরিতে বসে। ক্লাস এইট পর্যন্ত নিয়ম ছিল সপ্তাহে একটা বই নিতে পারব। রাশান রুপকথার বই এর জন্য আমাদের সিরিয়াল ছিল, তুই ফেরত দিলে আমি নিব, তারপরে ও, তারপরে ও। অর্থাৎ বই ফেরত দেয়া মাত্র পরেরজনকে ছোঁ মেরে সেটা বগলদাবা করে নিজ নামে ইস্যু করতে হবে। এই লাইব্রেরিতে খুঁজে পেলাম Nancy Drew সিরিজ। ইংরেজি বইগুলা কত পুরনো ছিল? ৭০ দশকের প্রিন্ট তো বটেই। এগুলাও পড়তে হলে টিকটিকির মত চোখ রাখতে হত। কেউ ফেরত দেয়া মাত্র বগলদাবা করতে হবে। একবারে এক জন শুধু একটা বই নিতে পারত। কাজেই পছন্দের বই নেয়ার জন্য অনেক রকম ট্যাক্টিকস চিন্তা করতে হত। যখন নাইনে উঠলাম তখন তো মেলা বড় হয়ে গেছি। নিয়ম কানুনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানোর মত সাহস হয়েছে একটু। আরেক বই পাগল বান্ধবীর সঙ্গে মিলে ঠিক করলাম লাইব্রেরীর সব বই পড়ে ফেলব। ডে শিফটে পড়তাম, কিন্তু স্কুলে, বলা ভাল লাইব্রেরিতে গিয়ে হাজির হতাম ১১টার দিকে। গিয়েই কোন একটা বই এর শেলফের মাঝে লুকিয়ে যেতাম। তাক থেকে নিয়ে ওখানেই মাটিতে বসে পড়েছি অনেক বই। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার উপকথা সংগ্রহ নিয়ে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত কিছু চমৎকার বই আছে। প্রায় ১৭টা খন্ড। এভাবেই ধুলোমাখা মেঝেতে বসে বা দাঁড়িয়ে পড়েছি। ১টায় ক্লাস শুরু হবার আগে একটা করে বই ইস্যু করতাম। ক্লাসে পড়ার বই এর মাঝে লুকিয়ে ৫ পিরিয়ডের মাঝে সেটা শেষ করবার তাড়া ছিল। হুড়োহুড়ি করে পড়েছি বলেই এখন হয়ত আর বইগুলার নাম/ কাহিনী মনে করতে পারি না। ৫টায় ঘন্টা পড়লে বই খাতা ফেলে আগে ছুট দিতাম লাইব্রেরির উদ্দেশ্যে। লাইব্রেরিয়ান তালা মেরে চলে যাবার আগেই হাতের বইটা ফেরত দিয়ে আরেকটা নিয়ে আসা চাই। লাইব্রেরিয়ান মিস এত মিষ্টি মহিলা ছিলেন, আমাদের মত দুটা পাগলের জন্য উনি অপেক্ষা করে থাকতেন। ও! এর মাঝে বন্ধুদের থেকেও ১/২টা বই ধার করা হয়ে গেছে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে এক হালি ডাসা পেয়ারা হাতে নিয়ে শেষ হত একটা বই…উমমম মনে হয় ড্রইং রুমের সোফায় বসে টেবিলে পা তুলে দিয়ে… ততোক্ষণে রাতের খাওয়ার ডাক পড়েছে। খাওয়ার পর পড়ার টেবিলে বসে পড়াশোনার মুড আনার জন্য আরেকটা বই ধরতাম, এইটা সাধারনত হত সেবার অনুবাদ। শেষ করার পর খানিক্ষন তব্দা মেরে থেকে ভাবতাম, থাক! কালকের ক্লাস টেস্টের জন্য সকালে উঠে পড়লেই চলবে। দেঁতো হাসি

অসুখ বিসুখ হলে বিছানায় আধ শোয়া হয়ে টিন টিন পড়ার কোন তুলনা নাই। সাথে ফেলুদাও অসুইখ্যা বিছানায় সঙ্গী হিসেবে ভাল। চোখ টিপি বিছানায় উপুড় হয়ে বই পড়া মনে হয় সবচে পাঠকপ্রিয় ভঙ্গি। আমার অবশ্য কিছুক্ষণ পরেই হাড্ডি টনটনায় এইভাবে পড়লে। তখন বইটা মাটিতে ফেলে, খাটের কিনার থেকে কচ্ছপের মত গলাটা+ মাথাটা বের করে দিয়ে পড়ি। বহুবার এমন হয়েছে যে বিছানায় শুয়ে বই পড়া অবস্থায় নিম্নচাপ হওয়ায় বাথরুমের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে পথিমধ্যে দু পায়ের উপর ভার বদল করতে করতেই বই শেষ হয়েছে। নির্ভার মনে ছোটঘরে গিয়ে ভারমুক্ত হয়েছি। অনেকে শুনেছি ভারমুক্ত হওয়ার সঙ্গী হিসেবে বই ছোটঘর নিয়ে যান। সেটা ইসবগুলের ভুষি না টয়লেট পেপারের বিকল্প হিসাবে সেখানেই প্রশ্ন। Angela’s Ashes বইতে পড়েছিলাম বিকল্প টয়লেট পেপার ব্যাবহারের ফলে ইয়ে-পোড়া বানরের মত মসি-বর্ণের পশ্চাতদেশ নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর কথা।

দূরযাত্রায় অনেকের প্রিয় সঙ্গী বই। কিন্তু বাস যাত্রায় আমি সব সময় পেটের ভিতর থেকে উদ্গীরন করতেই ব্যাস্ত থাকি, বই গলাধঃকরন করব কখন? মন খারাপ মনে আছে ছোটবেলায় একবার ট্রেন জার্নির শুরুতে হকারের থেকে ২-৪টাকা দিয়ে ভূতের গল্পের ২ টা চটি বই কিনে দিয়েছিল। ট্রেনের দুলুনিতে বসে সেই যে মামদো ভূত, কন্ধকাটা ভূত আর পেত্নীর সাথে পরিচয় হলো, সেই ভীতি বুড়ো বয়সেও মাঝে মাঝে বড় লজ্জায় ফেলে দেয়। মামদো ভূতের সাথে পেত্নীর বিয়ে হবে। পেত্নী গেল বিউটি পারলারে সাজতে, আর মামদো গেল নাপিতের দোকানে। সেখান থেকে কেমন করে নাপিতানী আর নাপিত ভূত দুটোকে ধরে ফেলল, বেশ একটা ডাবল ডেট টাইপের গল্প ছিল। ভূতের গল্প কেবল রাত বিরাতে পড়তে হবে, কে বলেছে? আত্মা ছোট হলে আর লেখক তেমন হলে ভর দুপুরেও হাতে ধরা বইটার ফাঁকে আঙ্গুল ঢুকিয়ে রেখে আস্তে করে খাটের নিচে বা দরজার চিপাটা একটু উঁকি দিয়ে দেখে নেয়া লাগে। তবে শীতের দুপুরে বারান্দায় যখন কড়া মিষ্টি চায়ের মত ওম ওম রোদটা এসে পরে তাতে পিঠ মেলে দিয়ে ভেজা চুল শুকাতে শুকাতে শরৎচন্দ্রের নেকা নেকা প্রেমকাহিনী, আহা বেশ বেশ! রোদটা যখন আরেকটু সরে আসে, তখন পায়ের পাতায় চিড়বিড়ে রোদের তাপ উপভোগ করতে রবিদাদুর গল্পগুচ্ছ ধরলে মনে হয় বুড়োর প্রেমে পড়ে যাই।

আরেকটু বড় হয়ে ( যখন থেকে মা খাওয়া নিয়ে ঘেনানো বাদ দিয়ে শরীর স্বাস্থ্যের দায়িত্ব আমার হাতে ছেড়ে দিল) আবিষ্কার করলাম আমার খাওয়া দাওয়া করতে ভাল্লাগে না । এতদিন আম্মা হু-তু-তু-তু করে খাইয়েছে, এখন নিজেকে নিজে কিভাবে ভুলায় ভালায় খাওয়ানো যায়? নিজেকে ঘুষ দিলাম, বই। একটা বই নিয়ে খেতে বসি। বই পড়তে পড়তে নানা রকম অখাদ্য পেটে চালান করে দিই, কোন সমস্যা হয় না। এমনিতে খেতে বসে পাতে ভাত খুঁটতে থাকি ঘন্টার পর ঘন্টা। বই থাকলে কখন খাওয়া হয়ে যায়, খেয়ালই হয় না! বই শেষ করার খাতিরে আরেকটু খাই। এই ক’বছর পারি নাই। ওজন কমেছে ১৫ পাউন্ড। গত দু’সপ্তাহ থেকে আবার বইসমেত খাওয়া দাওয়া চলছে, ওজন দেখি বাড়ন্ত! এইভাবে পড়লাম হুমায়ূন আহমেদের কতগুলা দামের সমান পৃষ্ঠাসংখ্যার কিছু বই। সময় প্রকাশন থেকে বের হওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধার ডায়রী সংকলন কয়েক খন্ড।

এত কিছুর পরেও এখন কেন বই পড়ে জুত পাচ্ছি না সেটা হয়ত কিছুটা ব্লগের দোষ। ছোট লেখা পড়ে পড়ে মনোযোগের দৈর্ঘ্য কমে গেছে। কাগজের বদলে স্ক্রীনে তাকিয়ে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি বলেই কি? তাহলে পিডিএফ পড়ে আরাম পাই না কেন? কারন জানি না, কিন্তু পাঠক সত্ত্বাটা হারিয়ে নিদারুন অসহায় আর বিমর্ষ বোধ করছি, তাই ইনিয়ে বিনিয়ে এই লেখা।

বই পাঠের আরও কতরকম আয়োজন, সেগুলোর কথা ইচ্ছে করেই বললাম না। সব আমি বললে পাঠক বলবে কী?

http://www.sachalayatan.com/himika64/42019

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: