মিলানের দিন-রাত্রি

পৃথিবীর যে কয়টি সত্যিকারের ঐতিহাসিক, সুবিশাল, জাঁকজমকপূর্ণ শহর শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্যপী একইসাথে প্রাচীন ইতিহাসের ছোঁয়া ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে মিলান নগরী তার মাঝে অন্যতম । তার সাথে আবার কয়েক দশক ধরে যোগ হয়েছে ফুটবল উম্মাদনা, বিশ্বের আর কোন শহরে বিশ্বমানের এমন দুটি ফুটবল ক্লাব আছে!

IMG_0385

ইতালির এই প্রাচীন শহরে পৌঁছালাম এক জুনের মাঝমাঝি প্রায় মধ্যরাতে। পাতাল রেল থেকে বের হয়ে হোস্টেলে যাবার দিক নির্দেশনা হাতে থাকলেও ইতালির ২য় বৃহত্তম এই মহানগরীর বিশাল আয়তনের কাছে হাবুডুবু খাওয়ার দশা, কোনমতে এক আলোকজ্জল বড় রাস্তায় পৌঁছে আরেক বিপদ, রাস্তায় পায়ে হাটা কেউ নেই, কেবল নিশিকন্যারা ইতস্তত দাড়িয়ে। তাদেরই একজন পথভ্রষ্ট পথিক দেখে আধা ইংরেজি আধা ইতালিয়ানে পথ বাতলে দিল। এবার সোজা ইয়ুথ হোস্টেলে, সেখানের টিভি কক্ষে তখন ইউরো কাপের চরম উত্তেজনাপূর্ণ খেলা চলছে। ফুটবলের মহা পাগল আমি নিজেও, কাজেই ঝাকের কই ঝাকে মিশে যেতে সময় লাগল না। আর সেই সাথে বান্ধবহীন শহরে মিলে গেল জনাকয়েক সহৃদয় বন্ধু। ইয়ুথ হোস্টেলে থাকার মজাই এইখানে, সমমনা ব্যাকপ্যাকাররা ছুটে আসে সারা গ্রহ থেকে, প্রায়শই মিলে যায় মনের মত ভ্রমণ সঙ্গী, মনে আসে রবি ঠাকুরের পংক্তিমালা—
কত অজানারে জানাইলে তুমি
কত ঘরে দিলে ঠাই,
দূরকে করলে নিকট বন্ধু
পরকে করলে ভাই ।।

P1160505

পরদিন সাতসকালে এমনই এক নতুন বন্ধু পেরুভিয়ান-আর্জেন্টাইন কার্লোসের সাথে বেরোনো হল নগর পরিভ্রমণে, ঝকঝকে রোদ গায়ে মাখতে মাখতে আমাদের প্রথম গন্তব্য মিলানের প্রতীক, সেখানকার গর্ব চির উন্নত মম শির মিলান ক্যাথেড্রাল।
IMG_0378

অবাক বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয় এর আকৃতিগত বিশালতা আর সুষম স্থাপনার সৌন্দর্য দেখে, সারি সারি মিনার, শত শত নিপুন ভাস্কর্য কিনার ঘেঁষে দাড় করানো। যাজক, পুরোহিত, সিংহ থেকে শুরু করে কল্পকথার গ্রিফন, ফিনিক্স, ড্রাগন, গারগয়েল কি নেই সেখানে!
IMG_0393

সামনের বিশাল চত্বরে হাজারো মানুষের মেলা, সেই সাথে অসংখ্য কবুতর বাক বাকুম করতে করতে দর্শনার্থীদের দেয়া গম খুঁটে খাচ্ছে মনের সুখে। ১৩৮৬ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হওয়া ইতালীয় গথিক স্থাপত্যকলার প্রকৃষ্ট নিদর্শন এই ক্যাথেড্রালটির নির্মাণ কাজ চলে ৫৬৪ বছর ধরে, অবশেষে ১৯৫০ সালে সম্পূর্ণরূপে শেষ হয় তা। এই দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন রাজা, স্থপতি ও শিল্পীর হাত ধরে ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ অবয়ব পায় এই অমর সৃষ্টি। জনশ্রুতি আছে, এর ভেতর এক সাথে ৪০ হাজার লোক অবস্থান করতে পারে। সত্যিকারের এই মাস্টারপিসটির অন্যতম আকর্ষণ এর সিংহ দরজা আর সুউচ্চ মিনারগুলো।
P1160492

অদুরেই এক গ্যালারীতে চলছে বিশ্বখ্যাত এক্সপ্রেসোনিস্ট আইরিশ চিত্রকর ফ্রান্সিস বেকনের চিত্রকর্ম প্রদর্শনী। কার্লোসও পেশায় চিত্রকর, আমার নিজেরও বেকনের কাজ নিয়ে প্রবল আগ্রহ, আসলে তার প্রদর্শনী এত কম হয় যে চর্মচক্ষে তা দেখতে পাবার সুযোগ অতি বিরল, কাজেই টিকিট কেটে ঢোকা হল ভিতরে। শিল্পীর সারা জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে সৃষ্টি দিয়ে সাজানো, দেখা আলো না দেখা রূপের সে এক অদ্ভুত জগৎ। কমাস আগেই বেকনের এই পেইন্টিং বিক্রি হয়েছে ৫০ মিলিয়ন ডলারে( প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা), প্রদর্শনীরগুলো আরে অনেক বিখ্যাত ও দামি কিন্তু বিক্রির জন্য নয়। উল্লেখ্য বিশ্বের সব পেইন্টারদের মধ্যে ফ্রান্সিস বেকনের ডাবলিনের কাজ করার স্টুডিও অতি বিখ্যাত।

নয়ন সার্থক করে বাহির হলাম বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত আরেক চিত্রকর্ম দেখতে যার নাম জেনে এসেছি হাইস্কুলের বইয়ের পাতা থেকে, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির দ্য লাস্ট সাপার। বছরের পর বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে লিওনার্দো মিলানের গির্জার দেয়ালে এঁকেছিলেন এই অমর শিল্পকলা। কিন্তু ভ্যাপসা বদ্ধ ঘর, স্যাতস্যাতে দেয়াল আর প্রত্যহ লক্ষ পর্যটকের নিঃশ্বাসের বাস্পের কারণে আসল রঙ হারিয়ে এই বিশ্ব সম্পদ আজ তার অস্তিত্ব নিয়ে হুমকির সম্মুখীন, যে কারণে এখন প্রতিদিন অতিমাত্রায় সতর্কতার দরুন মাত্র গুটিকয় দর্শক চর্মচক্ষে সেই রূপসুধা উপভোগ করতে পারেন। খানিকটা বেলা করে আসায় এযাত্রা আর আমাদের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ল না, ইতিমধ্যেই সেই দিনের কোঁটা তো পূরণ হয়েছেই, সামনে ভিড় করে আছে আরো হাজার ইতিবাচক মানসিকতার শিল্পপূজারী, কিন্তু ভেতরে ঢোকা যাবে এ আশায় সেদিনের মত গুড়ে বালি। রওনা হলাম মিলানের আরেক বিশ্বনন্দিত জাদুঘর পিনাকোটেকো অ্যাম্ব্রোসিয়ানা দেখার আশায়, যেখানে সংরক্ষিত আছে দ্য ভিঞ্চি, ক্যারাভাজ্জিও, তিনতোরেত্তো, রাফায়েলসহ অনেক কালজয়ী শিল্পীর চিত্রকর্ম।
ক্যারাভাজ্জিওর ফলভর্তি ঝুড়ির ছবিটিকে ধরা হয় জাদুঘরের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, বলা হয়ে থাকে এর চেয়ে নিখুত ঝুড়ি সম্ভবত বাস্তবেও সম্ভব নয়। চিত্রকর্মটিতে কিন্তু কেবলমাত্র সুপক্ক, সুমিষ্ট সুস্বাদু ফলের সমাহার তা নয়, একটু খুঁটিয়ে দেখলেই পোকায় কাঁটা, দাগে ভরা ফলও চোখে পড়ে। ক্যারাভাজ্জিও হয়তো এভাবেই জীবনে ভাল ও মন্দের, আনন্দ ও বেদনার সহাবস্থান বুঝিয়েছেন
Caravaggio__Still_Life_with_a_Basket_of_Fruit

যদিও আমাদের দৃষ্টি বেশীক্ষণ আটকে থাকল লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির দ্য মিউজিশিয়ান চিত্রকর্মটির উপরে। কি অপরূপ ভাবে ছোট এক ক্যানভাসে তুলির পর তুলির নিপুণ আঁচড়ে তৈরি হয়েছে অমূল্য পেইন্টিংটি। শিল্পবোদ্ধা কার্লোস অনেকক্ষণ নিবিড় দৃষ্টিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে জানাল এইটে আসল চিত্রকর্ম, দর্শকদের বোকা বানাবার জন্য ঝুলিয়ে রাখা কোন কপি নয়,
800px-Neuschwanstein_Castle_LOC_print

P1160561

তাই এর আর্থিক মূল্য নিরূপণের বৃথা চেষ্টা না করে চললাম প্রায় অন্ধকার এক বিশাল গ্যালারীতে সংরক্ষিত প্রিয় শিল্পী রাফায়েলের বিশ্বখ্যাত স্কুল অফ এথেন্সের মূল কাজটির খসড়া ড্রইং দেখার জন্য ( আসলটি জগৎ আলো করে আছে ভ্যাটিকান সিটিতে) বিশাল সেই ক্যানভাস থেকে আবছা আলোতে খুঁজে বাহির করলাম সক্রেটিস, প্লেটো, টলেমী, অ্যারিস্টটল, দ্য ভিঞ্চি, মাইকেল এঞ্জেলো, হেরোডটাস প্রমুখের সাথে মরণশীল ঈশ্বর বলে পরিচিত রাফায়েলকে।

P1160547

P1160538

এছাড়াও অ্যাম্ব্রোজিওর নারীর চিত্র, বত্তিচেলির প্যাভিলিয়নের ম্যাডোনা, অ্যাডোরেশন অফ ম্যাজাইসহ আরো অসংখ্য সুবিখ্যাত চিত্রকর্ম আর ভাস্কর্য দেখে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো এক গ্রন্থাগার, যা এই পিনাকোটেকো অ্যাম্ব্রোসিয়ানার একটি অংশে অবস্থিত। আমার মা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম গ্রন্থাগার রাজশাহী বিশ্ব-বিদ্যালয় গ্রন্থাগারে চাকরী করেন প্রায় ৩৬ বছর ধরে, ছোট্টবেলার কত যে অমূল্য স্মৃতি সেই লাইব্রেরীর বইয়ের তাকগুলোতে লুকিয়ে আছে, এখনো চোখ বুজলে স্পষ্ট দেখতে পাই পাঁচ-ছয় বছরের এক বাচ্চা আকুল হয়ে অজানা আকর্ষণে বাংলা রূপকথার বই খুঁজে বেড়াচ্ছে। কাজেই এমন মন উতল করা গ্রন্থাগারের সন্ধান পেলে যে দুপুরের খাবারে মুলতবি দিয়ে তার খোঁজেই যাব তা তো জানা কথাই, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে রক্ষনাবেক্ষনের জন্য মূল গ্রন্থাগার ভবন বছরের প্রায় সবসময়ই বন্ধ থাকে, কেবল গ্রীষ্মকালে তিন থেকে চার সপ্তাহের জন্য খোলা! এবারে কিন্তু পুরোপুরি অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ, সেই বিরলদিনগুলোর একটিতেই আমরা কড়া নাড়লাম বিবলিওটেক অ্যামব্রোসিয়ানায়, যার অর্থ অ্যামব্রোসিয়ানার গ্রন্থাগার। আহ, মহাকাল পর্যন্ত যেন থমকে গেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এইখানে। রেনেসাঁ যুগে যাত্রা শুরু করা কত জ্ঞানীগুণীরা এসেছেন এখানে জ্ঞান অন্বেষণে। দেখলাম মেঝে থেকে শুরু করে ছাদ পর্যন্ত নানাকৃতির তাকে বইয়ের সাম্রাজ্য, কিন্তু অধিকাংশ বই-ই এত পুরনো যে স্পর্শ করা নিষেধ, এই বিপুল সংগ্রহে আছে নানা ভাষার বই, ল্যাটিন থেকে শুরু করে ইংরেজি পর্যন্ত। সেই স্বপ্নরাজ্যে বেশ কিছুক্ষণ অতিক্রম করে অবশেষে চললাম পেটপূজোর উদ্দেশ্যে।
P1160575

ইতালি খাবারের দেশ, কত শত রকমারি মজাদার রসনাতৃপ্তকারী খাবারের জন্ম ও ছড়াছড়ি এই দেশে, মুখে জল আনা পিজ্জা, পাস্তা, স্প্যাগেত্তি আর কত নাম বলব! সেই সাথে বিশ্বের সেরা মজ্জারেলা চীজটিও হয় এই দেশেই। তাই পাতে পড়ল দুপুরে, আহ, সে কি মখমলের নরম অথচ খাবার সময় কচি তালশ্বাসের মত কচকচ করে উঠল, সেই সাথে মাখনের মত গলে গেল মুখগহ্বরে কিন্তু মুখে সেই অমৃতের স্বাদ লেগে রইল বহুক্ষণ (এখনো আছে!), সেই সাথে সালাদ আর সেদ্ধ আলুর সাথে মাংসের সুস্বাদু এক ডিশ, আর আবশ্যকীয় ভাবে মিলানের জিলাটো ( আইসক্রিম)।
P1160531

পেট ঠান্ডার পরে যাওয়া হল মিলানের বিখ্যাত শপিংমলগুলো একনজর দেখতে। শতাব্দী প্রাচীন অট্টালিকা আর টাওয়ারগুলো অক্ষত ভাবে ধরে রেখেও যে কি চমৎকার ভাবে আধুনিকতাময় প্রযুক্তিকে( বিদ্যুৎ, পাতাল রেল, টেলিফোন, পানির লাইন) স্থান করে দেওয়া যায় মিলান তার অন্যতম প্রকৃষ্ট উদাহরণ, মনে হল বাংলাদেশের সমস্ত নগরপরিকল্পনাবিদদের এখানে ঘুরিয়ে আনা দরকার, যাতে তারা কয়দিন পর পর উন্নয়নের ধুয়ো তুলে রাস্তা খুড়াখুড়ি আর অযথা ভাঙচুর বন্ধ করুন।
IMG_0401

P1160524

বলা হয় রাতের মিলান কখনো ঘুমায় না, প্রমাণ পেলাম হাতে নাতে সে রাতে ফুটবল দেখে বাহির হবার পর। দলেবলে আমরা বিশাল- এশিয়া, ল্যাতিন আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া- আমাদের গ্রহের প্রায় সবকোণের ভ্রমণপাগলরা মিলে এগিয়ে গেলাম মিলান কেন্দ্রের দিকে যেখানে বসেছে হাজারো পর্যটকের মেলা। যে কেউ-ই আড্ডায় বসতে পারে যে কোন দলের সাথে, গীটার বাজিয়ে চলছে দরাজ গলায় গান, কেউবা জুড়েছে উদ্দাম নৃত্য, কারও সাথী ওয়াইনের বোতল, সবই শালীনতা বজায় রেখে, জীবনকে উপভোগের আশায়।

মাথার উপর আশ্রয় হয়ে আছে ইতালির তারা জ্বলজ্বলে আকাশ, থেকে থেকেই ঝরে পড়ছে উল্কা,( কি একটা বিশেষ দিন ছিল মহাকাশে যেন) চিৎকার করে সবাই জানান দিচ্ছে তাদের ইচ্ছাপূরণের স্বপ্ন,কিন্তু মনের আকাঙ্ক্ষার কথা মুখে বলে না কেউ ই, পাছে পূরণ না হয় ! আমার ইচ্ছাটি মনের ভিতরে থাকলেও আজ বলি আপনাদের—এমন আনন্দের দিন যেন ঘুরে ঘুরে আসে আমাদের সকলের জীবনে।।

http://www.sachalayatan.com/tareqanu/41992

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s