দিন কেটে যায়

EEE Quiz চলছেঃ

প্রিন্স অনেকক্ষণ ধরে খাতায় কাটাকাটি করে, তারপর কলমটা ফেলে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে গান ধরে- “নিথুয়া পাথারে নেমেছি বন্ধুয়া , ধর বন্ধু আমার কেহ নাই…” গাইতে গাইতেই সে তার পাশে বসা হাবীব এর খাতার দিকে তাকায় কিছু দেখার আশায় ।

হাবীব প্রিন্সের দিকে একটা বিষদৃষ্টি দিল । তারপর আবার জোর করে ম্লান একটা হাসি দিয়ে খাতার দিকে মনোযোগ দিল ।

প্রিন্স কিছুক্ষন মাথা চুলকালো , তারপর খাতার দিকে তাকাল , তারপর খাতা জমা দিয়ে বের হয়ে গেল ।

দরজা খুলে বাইরে বের হতেই সিয়ামের সামনে পড়ল সে ।

“হাই, তুই সেকেন্ড হইসোস। বাই দা ওয়ে, এত পরে বাইর হইলি ?? ”

“বাঁশটা খাইলাম”- মৃদুস্বরে প্রিন্স – “এরপর কি ক্লাস রে ?”

সিয়াম বলল, “এম ই সেশনাল……” তারপর একটু থেমে এক ভ্রু উঁচু করে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি দিয়ে বলল- “মিশা ম্যাডামের ক্লাস…”

প্রিন্স বিরক্ত চোখে তাকাল- “গ্রাফ আঁকছিস ?”

সিয়াম ভ্যাবাচ্যাকায় খেয়ে গেল, “গ্রাফ আছে নাকি?? শিট…”

এবার প্রিন্স একটা আকর্ণ হাসি দিয়ে মাথাটা বাঁকা করে বলল-“মিশা ম্যাডামের ক্লাস…” কথাগুলো বলার সময় সে মুখটা শক্ত করে হাসল, যাকে আমরা বলি ক্রুর হাসি… ল্যাব রিপোর্টে ভুল থাকলে মিশা ম্যাডাম কি করেন সেটা সিয়ামের চোখে ভাসতে থাকল । হুট করে সে উঠে দাঁড়ালো সে, “তোর ব্যাগ কই রাখছিশ? আর প্র্যাক্টিক্যাল কোন চেনের ভিত্রে? ” খুবই বিরক্ত সে । সেশনালের আগের সময়টায় আর চা খাওয়া হল না ।

“লাস্ট বেঞ্চে । চেন একটাই ”বলল প্রিন্স । বিরবির করতে করতে সিয়াম চলে গেল ।

করিডোরে প্রিন্স একা। হাঁটতে হাঁটতে ফোন বের করল। কল দিয়ে ফোন কানে ধরল সে । একটু পর শোনা গেল প্রিন্সের গলা-

“হ্যালো জানেমান, কি কর??” প্রিন্সের মুখ কিন্তু শুকনা – কথাগুলো মন থেকে না ।

একটু পর, ক্যান্টিনেঃ

প্রিন্স বসে আছে। তানভীর-তাসীফ-মঈন-হাবীব ঢুকলো । হাস্যজ্জল । হাবীব হাসতে হাসতে আফসোস করছে-“ইশশিরে, জাস্ট ওহমের প্রতীকটা দেই নাই । নইলে ২০ পাইতাম ।”

প্রিন্স আস্তে একটা গালি দিল ।

ওরা এসে বসল প্রিন্সের সাথেই , খুবই আন্তরিক । মঈন বসেই শুরু করল- “আরে কালকে হলে ০৯ এর এক ভাই ধরছে । বলে, আমরা নাকি খোঁজ খবর নেই না, যোগাযোগ রাখি না,আমাদের উপর ক্ষ্যাপা ।” তাসিফ কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল- “হ্যাঁ, এটা আসলে রাখা দরকার । বড় ভাইরা কামের । অনেক হেল্প হয় চেনা থাকলে । চোথা-মোথা পাওন যায়।” “পূজার ছুটিতে এই টার্মের চোথা যোগার করে ফেলতে হবে। কুইজ তো শুরু হয়ে গেল …” হাবীব গম্ভীরভাবে বলল । পুজার ছুটির কথা উঠতেই তানভীরের চোখ জলজল করে উঠল- “চল প্রিন্স , এই ছুটিতে বান্দরবান যাই…”

“আচ্ছা দেখি…” কথা শেষ করার আগেই তার ফোন আসল । ফোন হাতে নিয়ে সে বলল, “ওই, সিয়াম ফোন দিচ্ছে, আমি গেলাম।”

তানভীরঃ “আচ্ছা, যা ।”

প্রিন্স বের হচ্ছে, সায়েম ঢুকছে । প্রিন্সকে দেখেই সভাবসুলভ সে তাকে দেয়ালে চেপে ধরল । তার গাল নাড়ল কিছুক্ষন কথা বলতে বলতে । দূর থেকে তাসিফরা কিছু শুনল না, জাস্ট দেখল আর হাসল ।

প্রিন্স ই এম ইর নিচে এসে লিফটের জন্য দাঁড়ালো, ল্যাব এ যাবে । তার সামনে মাথায় লাল ওড়না দেয়া একটা মেয়ে । সে প্রিন্সকে দেখে সচকিত হল, “দোস্ত জানিস… আমার না… এগজাম খুব খারাপ হইসে……” “আমি না… ফেল করব…”ভেঙাল প্রিন্স ওকে , “বল… ফেল করবি ,বল ।”মেয়েটা অনিন্দ্য সুন্দর একটা হাসি দিল, “দোস্ত সিরিয়াস…” “আমি জানি প্রীতি তুমি কত সিরিয়াস। এখন লিফটে ওঠ । দেরি করলে সুন্দরী প্রেজেন্ট দিবো না । ”

লিফটের দরজা বন্ধ হবার ঠিক আগ মুহূর্তে সিয়াম দৌড়ে আসল । লিফটে ০৯ এর এক আপু ছিল । যথাসম্ভব তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো সে ।

“বাইনচোদ…” ওর কান্ড দেখে হাসি পেল প্রিন্সের ।মৃদুস্বরে উচ্চারন করল গালিটা ।(যেন প্রীতি না শোনে…)

ফুয়েল টেস্টিং ল্যাব ৫ তলায় । একদম কোনার রুমটা । জানালার পাশের টেবিলটায় ব্যাস্তভাবে ইন্দ্র আর নয়ন ডিজেল না জানি কিসের যেন কার্বন রেসিডিউ বের করছে । দলের অন্যরা জানালায় বসে গল্প করছে । ক্লাসের ফার্স্ট বয় মঈন জোকস শোনাচ্ছে-

“এক বুড়া তার কুকুরকে নিয়ে গোসল করতে গেছে পুকুরে । কুকুরের নাম “কিছুকিছু” । পুকুর পাড়ে লুঙ্গি খুলে রেখে বুড়া নামছে গোসলে । উঠে দেখে তার কুত্তা লুঙ্গি নিয়ে উধাও । বুড়া ওই অবস্থায় উঠে তার কুত্তা-লুঙ্গি খোজা শুরু করল । এমন অবস্থায় রাস্তায় এক মেয়ের সাথে তার দেখা । মেয়ে কম বয়সী, বুড়ার নাতনীর বয়সী । বুড়া জিগেস করে, “মা, তুমি আমার কিছুকিছু দেখছ ?” মেয়ে তখন বলে, “দাদু, আমি তোমার কিছুকিছু না, সবকিছুই দেখছি ।””

সবাই হাসা শুরু করল । ক্লাসের মেয়েরা শুরুতে জোকস শুনতে আগ্রহী হয়ে এগিয়ে আসছিল । নাতনীর উত্তর শুনে আবার বিব্রত মুখে যে যার জায়গায় চলে গেল ।

হাসাহাসি থামলে আদিত ঘোষণা করল যে ক্লাস শেষে কেমিক্যাল এর সাথে ক্রিকেট খেলা আছে। সো, যারা খেলে তারা বাসায় যেতে পারবে না । প্রিন্স গাইগুই শুরু করল- “দোস্ত আমার টিউশনি আছে…”

“একদিন না গেলে কিছু হবে না”- সবাই সমস্বরে বলে উঠল।

“একটা ফোন করে দিলেই হয়”- বিজ্ঞের মতো করে বলল সায়েম।

তবে প্রিন্সের মঙ্গলবারের টিউশনির গুরুত্ত সিয়াম জানত । ভিকারুন্নেসার সেকেন্ড ইয়ার এর সেইরকম হট এবং প্রিন্স এর প্রতি “উইক” (প্রিন্সের ভাষ্যমতে) এক মেয়েকে প্রিন্স প্রতি মঙ্গলবার এই ভরদুপুরে পড়ায় । তার বাবা- মা চাকরি করে । এই টাইমে বাসায় ওই মেয়ে আর বুয়া ছাড়া কেউ থাকে না । প্রতিদিনই কত কিছু জল্পনা-কল্পনা ও আশা আকাঙ্ক্ষা করে প্রিন্স মেয়েটাকে পড়াতে যায় এবং কোন প্রকার “এক্সট্রা কারিকুলার” একটিভিটিস ছাড়াই সে প্রতিবার ফেরত আসে । যেহেতু নিজের “হট” ছাত্রীর প্রতি আসক্তির কথা সবাইকে বলা যায় না- তাই প্রিন্সকে খুব সহজেই অন্যদের কথা মেনে নিতে হল । সে ছিল আমাদের টীমের ওপেনিং ব্যাটসম্যান । যা হোক, এই বচসার পর প্রিন্স মোটামুটি শুকনো মুখে থার্মোকাপল এর কাছে যেতে থাকে। সিয়াম উঠে গিয়ে গিয়ে তার ঘাড়ে হাত রাখে । বিষন্ন মুখ নিয়ে তার পাশে দাঁড়ায় । বলে-

“দোস্ত, বাদ দে । কেউ না বুঝলেও আমি তো বুঝি- It hurts .“

প্রিন্স পরম নিরভরতায় তাকাল সিয়ামের দিকে । সিয়াম আরো গম্ভির হয়ে বলল-

“তুই চাইলে তোর বদলে আমি যেতে পারি আজকে । আর যদি যাই, প্রমিস যেই কাজ তুই ২ মাসে করতে পারিস নাই, আমি এক দুপুরেই তা করব…”

“খাংকির পোলা!!” বলেই সিয়ামের পাছায় সজোরে লাথি বসাল প্রিন্স । সিয়াম চিৎকার করে হাসতে হাসতে দৌড়ে সরে গেল অর কাছ থেকে । প্রিন্স ও হাসা শুরু করল । সারাদিনে একবারও ওর আর দুঃখ হয় নাই । কেন হবে? এখানে তার যা আছে, সেটা তো আর কোথাও নেই ।

ল্যাব শেষে প্রিন্স বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে । সিয়াম এর জন্য অপেক্ষা করছে আসলে- ও বাথরুমে গেছে । একটু পর শাওন আর আকাশকে আসতে দেখল সে ওর দিকে । বাংলাদেশে ইসলামী শাসন কতটা দরকার তার পক্ষে সে আকাশকে যুক্তি দিচ্ছে । পাকিস্তান- বাংলাদেশ- সৌদি আরব এইসব দেশ একসাথে হয়ে গনতন্ত্র বাদ দিয়ে খিলাফত কায়েম করে যদি চলতে পারে, তাহলে যে কত সুন্দর ১টা ব্যাপার হবে- সেটা সে কথায় কথায় বোঝানোর ট্রাই করছে আকাশকে । আর এটা আসলে ২ দিন পর হবেই । কারণ এই লক্ষে ইতিমধ্যে কাজে নেমে গেছে শাওনের দল । এসব কথা বলতে বলতে শাওনের চোখ জলজল করে । ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট নিয়ে গড়ে ওঠা এসব লেকচারে বাংলাদেশের “ভাল ছেলে”দের একটা বিরাট অংশ কনভিন্সড হলেও আকাশ হয় না। তার বাবা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা । তার বাবারও চোখ জলজল করত স্বপ্নে । সেই স্বপ্ন ছিল পাকিস্তান- বাংলাদেশ আলাদা করার স্বপ্ন । গনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র একসাথে কায়েম করার স্বপ্ন । ধর্ম নিরপেক্ষতার স্বপ্ন । সেই স্বপ্ন তারা পুরন করেছিলেন । আমেরিকার সংবিধানে ১৯৬০ সালেও কালোদেরকে মানুষ বলে স্বীকৃতি দেয়া হয় নাই ।(হ্যাঁ, সংবিধানেই) কিন্তু সেই সময়েই আকাশের বাবারা বাংলাদেশে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী বৈষম্যহীন সমাজের জন্য লড়াই করেছেন ।সেই সময়ে বিশ্বের সেরা সংবিধানটা তৈরি করেছিলেন । আজ ৫০ বছর পর ইউরোপ আমেরিকায় আন্দোলন হয় বৈষম্য কমানোর জন্য । আর আমাদের দেশে হয় বৈষম্য সৃষ্টির জন্য ।কি অদ্ভুত !!! সময়ের উল্টা স্রোতে চলছি আমরা … অ্যান্টিম্যাটার এর মতো !!!

কিছু গালিগালাজ করে শাওনের কাছ থেকে কেটে পরে আকাশ । সে এই ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে অগোছালো আর খ্যাপাটে মানুষ । ভয়ঙ্কর প্রতিভাশালী এই ছেলেটার ছবি আকার হাত অসাধারণ ।সিয়াম তাকে বলে এই ডিপার্টমেন্টের “শিল্পী ভাই” । বুয়েট ভর্তি পরীক্ষায় সে আর্কিটেকচারে ১৪ তম হয়েছিল ।

এইসব ক্রিকেট ম্রিকেট তার ভাল্লাগে না । সে সোজা হলে যাবে । রাস্তায় দেখা সায়েম এর সাথে ।

সায়েম- “কি রে আকাশ, কি খবর? ”

আকাশ- “এইত্ত , চলতাছে ।”

সায়েম- “তুই ক্লাস করিস না ক্যান? পরীক্ষাও তো ঠিকমত দেস না। শুরুতে তো এমন ছিলি না। ”

আকাশ- “ভাল্লাগে না , বালছাল……”

সায়েম- “কিন্তু এটা তো ঠিক না। দ্যাখ, আমরা সবাই ভাবছিলাম……” তার কথা শেষ করতে দেয় না আকাশ – “এ… তুই যাবি এত্থে ? ভাল্লাগতাসেনা, যায়া ঘুমামু । মাঠে যায়া খেলা দ্যাখ । ” বলে হন হন করে হেতে চলে গেল আকাশ ।

“নিজেকে যে মানুষ কিভাবে এভাবে নষ্ট করতে পারে …” বিরবির করে সায়েম । নয়ন তার দিকে এগিয়ে আসে – “আজকের প্র্যাক্টিক্যাল বুজঝিস ??”

“হুম , মনে তো হয় বুঝসি । তোর কোথাও কোসসেন আছে ?”- সায়েম বলল ।

“না, বুজঝি তো সবই , কিন্তু এই ফ্ল্যাশ পয়েন্ট আর ফায়ার পয়েন্টের রঙ আলাদা ক্যান, সেইটা নিয়ে একটু কনফিউসড ।”

এরপর সায়েম আর নয়ন ফ্ল্যাশ পয়েন্ট আর ফায়ার পয়েন্ট নিয়ে কথা বলতে বলতে হাঁটতে লাগল । তাদের সেই নিরস আলোচনা শোনার কোন মানে নাই- আমরা আবার প্রিন্স কি করছে সেটা দেখে আসি-

সিয়ামের বাথরুম করা এখন শেষ হয় নাই…

প্রিন্স অবশ্য এই একা সময়টা উপভোগ করছে । সে খুব একটা একা থাকতে পারে না । তার প্রেমিকার সাথে বাধ্যতামুলকভাবে ফ্রী টাইমে কথা বলতে হয় । আজ সকালে একটা বিশাল ঝগড়া হয়েছে- তাই এখন সে মুক্ত । “ইয়াহু…” মনে হতেই খুশি হয়ে যায় প্রিন্স । ৫ তলায় ডিপার্টমেন্টের কেউ নাই এখন- হঠাৎ দীপ্তিকে দেখা গেল তার চুল দুলিয়ে দুলিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে করিডোর থেকে বের হচ্ছে । সাথে তানভীর । ও কি যেন বলল দীপ্তিকে। সাথে সাথে দীপ্তি তানভীরের হাতের ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। মারতে মারতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকল । তানভীর হাসিমুখে মার হজম করতে থাকল ।প্রিন্স একটু হাসল । প্রিন্সকে ওরা দেখেনি ।ওরা নামতে নামতেই সিয়াম চলে আসল ।চরম অশ্লীল একটা গালি দিল প্রিন্স ওকে । জবাবে সিয়াম আরও অশ্লীল একটা গালি ফেরত দিল তাকে। এভাবে চলতেই থাকল লিফট আসার আগ পর্যন্ত ।লিফটে বড় ভাই ছিল। তাদের সামনে তো আর গালি দেয়া যায় না……… তাই থামতে হল তাদেরকে ।

লিফট থেকে বের হয়েই খবর পাওয়া গেল যে আজ খেলা হবে না । কেমিক্যালের টীমের ক্যাপ্টেনের গার্লফ্রেন্ড নাকি হঠাৎ ভার্সিটিতে এসেছে তাকে সারপ্রাইজ দিতে ।কেমিক্যালের ক্যাপ্টেন আর তার গার্লফ্রেন্ডকে ১০১ টা গালি দিতে দিতে সবাই যে যার বাসায় চলে যাচ্ছে । প্রিন্স আর সিয়াম গেল লাইব্রেরীতে । মেকানিক্যালের পাগলা দিশা সারাদিন লাইব্রেরিতেই থাকে । ওকে একটা ফোন দিতেই সে চলে আসল রিডিং রুমে। মাইক্রোকন্ট্রোলার দিয়ে একটা প্রি-ডিফাইন্ড রাস্তায় চলার মতো একটা রোবট বানানোর প্ল্যান করছে কদিন ধরে এই তিনজন । রাস্তাকে ফাংশনে রুপান্তরিত করার কাজটা সোজা । কিন্তু তারা চাচ্ছে কোন অব্সট্যাকল আসলে যেন রোবট তাকে ঘিরে ঘুরে আবার আগের রাস্তায় আসে । ইনফ্রারেড সেন্সর দিয়ে অব্সট্যাকল ডিটেক্ট করার সার্কিট সিয়াম বানিয়ে ফেলেছে । কিন্তু এই “ঘিরে ঘুরে আবার আগের রাস্তায় আসা”র ব্যাপারটা নিয়ে সবাই চিন্তিত । ২ দিন বসা হয়েছে ২ ঘণ্টা করে-প্রথম ৫ মিনিট এটা নিয়ে কথা বলে বরাবরই অন্য টপিক এ চলে যায় সবাই । ১ ঘণ্টা পর দিশা চলে যায় পড়তে ।আর সিয়াম-প্রিন্স তাদের জৈবিক আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মত বিনিময় করতে শুরু করে ।

আজও তার ব্যাত্তয় ঘটল না ।

২ ঘণ্টা পর যথারীতি – “ধুর, আজকের দিনটাও পুরা নষ্ট হইল ” টাইপ কথা বলতে বলতে ২ জন ইউ আর পির সামনে চলে গেল । কিছুক্ষন গল্প করে ২জন ২ বাসে উঠে গেল । সিয়ামের আবার টিকিট শেষ হয়ে গেছে । তাই তাকে প্রিন্সের ব্যাগে হামলা চালাতে হল (গত ৭ দিনের মতো)

বাসে উঠে বসল প্রিন্স । বিকাল ।আর্কিটেকচার বিল্ডিঙের সামনের গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে হলুদ আলো ঠিকরে পড়ছে । হঠাৎ সে উদাস হয়ে যায়। “এই দুষ্টামি, ফাইজলামি- এগুলাই কি সব ??” বাংলাদেশের আর সব ছেলের মতই এই সুন্দর ক্যাম্পাসটায় পড়ার স্বপ্ন সে দেখত ছোট থেকেই । সবার স্বপ্ন পুরন হয় না, তারটা হয়েছে । এই “স্বপ্ন” বাস্তব হবার পর থেকেই সে ধীরে ধীরে দেখছে স্বপ্নটা যত রঙিন ছিল, বাস্তবটা ততটা না । খুব খারাপ লাগে এই জিনিসটা তার । হতাশায় ভোগে । জীবনের প্রতিটা ধাপে সে তার স্বপ্ন পুরন করেছে এবং দেখেছে স্বপ্ন পুরনের পর তাকে ম্লান মনে হয় । “আমি হয়ত একটু বেশীই আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখি ” ভাবে সে । নাকি আমি “দাঁত পেয়ে দাঁতের মর্ম বুঝি না”?? হাসল ও মনে মনে । হেডফোনে “স্বপ্নীল আমার জীবন” গানটা বাজছে । জীবনটা আসলেই স্বপ্নীল ।“আমি বেচে আছি, আমার অস্তিত্ব আছে, অনুভূতি আছে” এর চেয়ে অদ্ভুত জিনিস আর কি হতে পারে ??এই জিনিসগুলো আসলে কি ?? এদেরকে কে ধারন করে ? মহাবিশ্ব ? তাহলে তাকে কে ধারন করে ?এই চিন্তাগুলো করেই ক্লাস এইটে প্রিন্স “পাগল” হয়ে গিয়েছিল । ডাক্তার দেখাতে হয়েছিল ।তখন সে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলো যে সব আসলে ইলুশন । “কত্ত বোকা ছিলাম আমি” ভাবে প্রিন্স । ইলুশন ই যদি হয়, তারও তো অস্তিত্ব আছে, “ইলুশন” জিনিসটা আছে ।সেটাই তাহলে জীবন । আর এই জীবন আমার পাওয়া গিফট । এটাকে নষ্ট করার কোন অধিকার আমার নাই । নিজের জীবনকে যদি মহাকালে ছড়িয়ে দিতে না পারলাম তাহলে তো এই জীবনটা, এই ফিলিংসটা, যে “হার্ডড্রাইভে” এরা সেভ থাকে তার স্টোরেজটা নষ্ট হবে। মরার ১০ বছর পর কেউ জানবেও না এই মানুষটা ছিল । আমি কিভাবে ভাবতাম, আমি কি অনুভব করতাম, কি জানতাম- এসব বিলীন হয়ে যাবে । মানুষ কত বোকা- নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বাচ্চা কাচ্চা নেয়। সব ছাগল ।সেই বাচ্চার বাচ্চা কি তোমাকে চিনবে?? এই সোজা জিনিসটাও কারও মাথায় আসে না ।আসলে পুরা জীবজগৎ ই ছাগল । অস্তিত্ব রক্ষার জন্য নিজের জীন ছড়ায়, আই মীন স্পার্ম ছড়ায় – হাসল প্রিন্স । কিন্তু স্পার্ম ছড়িয়ে কি আর মহাকালে টিকে থাকা যায়?? রবীন্দ্রনাথের উচিৎ ছিল “সোনার তরী”তে আরেক্তু ডিটেইলস বলা । মাথা ব্যাথা করতে থাকে প্রিন্সের । তারাতারি কনক্লুশনে পৌঁছে- “আমি ছাগল না। আমি আমার অস্তিত্ব আমার সৃষ্টি দিয়ে ছড়াবো , গাধার মতো স্পার্ম দিয়ে ছড়ানোর ট্রাই করব না। এই অনুভূতি, এই চিন্তা আমি রেখে যাব আমার পরে আসা সহস্র প্রজন্মের জন্য- আমার কাজ দিয়ে ।আনন্দ , দুষ্টামি, ফাইজলামি অবশ্যই থাকবে, কিন্তু মূল লক্ষ্য হবে অনেক বড় । অনেক অনেক বড় । আমি আমার জীবনকে গড়ার যে সুযোগ পেয়েছি, তা আরো অনেকে পায় নি ।আমাকে এটা কাজে লাগাতে হবে । আমি ভোগবাদী না ,আমার এই উপহার- এই জীবন, এই সুযোগ আমি সবার কল্যাণে কাজে লাগাবো । এটাই জীবনের প্রকৃত মিনিং এবং এটাই হবে আমার জীবন ।”

বাস ছেড়ে দিল । প্রিন্সের ফোনে নেক্সট ট্র্যাক শুরু হল – “It’s my life” ….

http://www.choturmatrik.com/blogs/%E0%A6%86%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%80-%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%AE/%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%A8-%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%9F%E0%A7%87-%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A7%9F

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: