ক্যারিবীয় সাগরতলে

PICT0015
সমগ্র পৃথিবী আজ নীল রঙে রাঙানো! গাঢ়, ফিকে, ভেজা ভেজা কত ধরনের নীল দখল করে আছে দৃষ্টিসীমার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। মাঝে মাঝেই ভ্রম হচ্ছে সামনের দিগন্তবিস্তৃত সমুদ্রখানা আসলে স্ফটিকস্বচ্ছ এক আয়নার তেপান্তর, তাতে প্রতিবিম্ব ফেলে দ্বিতীয় নীলাকাশ তৈরি করেছে ক্যারিবীয় অঞ্চলের মেঘমুক্ত ঝকঝকে আকাশ। এই স্বর্গনীলেও যারা সন্তুষ্ট নয়, তাদের ক্ষুদে এক দল চলেছে নৌকায় চেপে অথৈ নীল সাগর জলে অবগাহন করতে। স্থান কিউবার উপকূলবর্তী শহর ত্রিনিদাদের প্লায়া অ্যাংকন সৈকত।
314534_10150837257190497_608590496_21141139_1678075615_n
খানিক আগেই জীবনে প্রথমবারের মত প্রবাল সাগরে ডুব দেবার জন্য প্রয়োজনীয় গাইডলাইন আর সরঞ্জাম নিয়ে বহুজাতিক এক দলের সদস্য হয়ে চলেছি গহন সমুদ্রে। তার আগে বেশ ক,বছরের সঙ্গী চশমা নামক অতি আবশ্যকীয় অত্যাচারটিকে স্থানীয়দের জিম্মায় রেখে, চুলগুলো লোনা জলে আচ্ছাসে ভিজিয়ে খুলির সাথে লেপ্টে নিয়ে, মারো জোয়ান হেঁইয়ো বলে এই সুদৃশ্য পলকা নৌকা ভাসিয়েছি সমুদ্রে।
314925_10150817477525497_608590496_21003752_1338927903_n
316721_10150816981175497_608590496_20998998_933275305_n
300574_10150817568265497_608590496_21004110_1487154924_n
ঘন নীল চিরে বেশ কিছুক্ষন এগোনোর পরে প্রবাল প্রাচীরের চিহ্ন (জেলেদের রেখে যাওয়া মার্কার) দেখার পরপরই নোঙর ফেলা হল, গাইড সিনর হুয়ান বারংবার জানিয়ে দিল এই সাগরে কি করে ডুব দিয়ে প্রবালের কোনরকম ক্ষতি না করে কেবল এর সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে। আর এই যাত্রা ডুব খুব গভীরে দেওয়া যাবে না, কেবলমাত্র স্নরকেলিং করা যাবে, অর্থাৎ চোখে ডুবুরীর গগলস লাগিয়ে জলে উপুড় হয়ে ভাসতে ভাসতে নিচের দিকে তাকিয়ে সেই আলাদা জগৎকে দেখতে হবে এই উথালপাথাল ঢেউয়ের মাঝে। সেই সাথে পইপই করে বলে দিয়েছিলেন প্রবাল অতি ধারালো, কোন মতেই যেন আমরা তার সাথে ঘষা না লাগায়, আর তার অনুমতি ছাড়া যেন কোন কিছুই স্পর্শ না করি। মনে মনে ভাবছিলাম, এই পানির উপর দিয়ে তাকিয়ে কিই বা আর দেখতে পাব, তার জন্য এত আয়োজন! কি কুক্ষণে যে কৈশোরে তিন গোয়েন্দার অথৈ সাগর পড়েছিলাম, তখন থেকেই মুখিয়ে আছি প্রবাল সাগরে একবারের জন্য হলেও ডুব দেবার জন্য। সেই টানেই তো বঙ্গসন্তান আজ কোথাকার কোন হাঙর অধ্যুষিত সাগরে!
IMG_3390
জলে ঝপাস করে নামার পরে খানিকটা সুস্থির হয়ে নিঃশ্বাস নেবার পাইপটা দাঁতে কামড়ে যেই সাগর পৃষ্ঠে চোখ রেখে নিচের দিকে তাকিয়েছি—কেবল একটা শব্দই মাথায় এল- জাদু! এ ভোজবাজীর জাদু ছাড়া আর কিছুই না, দেখছিলাম বিক্ষুদ্ধ সমুদ্র, তরঙ্গের পর তরঙ্গ আর মুহূর্তের ব্যবধানে দেখলাম যেন পরীর রাজ্য, বহুবর্ণ প্রবাল সম্ভার, তাতে রঙধনুর সাত রঙের আবীর যথেচ্ছ শরীরে মাখা মাছের ঝাক! মনে হল স্বপ্নের ঘোরে আছি, এ জিনিসতো এতদিন দেখেছি কেবল টেলিভিশনের পর্দায়, অদম্য খুশীতে চিৎকার করে উঠেছিলাম হয়ত, মুখ থেকে পাইপ সরে যাওয়ায় পাকস্থলীতে কয়েক পোয়া জল যাবার পরে মনে পড়ল সাগরের জল ভয়াবহ নোনা!
উপরে ভেসে আবার পাইপ পরিষ্কার করে নিয়ে খানিকক্ষণ ধীরে সুস্থে স্নরকেলিং করে আবার ডুব দিলাম অল্পক্ষনের জন্য, কি আশ্চর্য চোখের গগলসখানায় ১০- ২০ মিটার গভীরের বস্তু অনায়াসে দেখা যাচ্ছে কোনরকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই, মনে হচ্ছে কোন ডকুমেন্টরীর সেটে চলে এসেছি ভুল করে। কত ধরনের মাছ, কত অপূর্ব প্রবাল, আর কতো নাম না জানা জীব।
IMG_1720
এর মাঝে উৎপাত করে চলল মেডুসা নামের এক জেলিফিশ, যদিও সিনর হুয়ান বলেই দিয়েছিলেন আকারে খুব বড় না হলে মেডুসাকে পাত্তা দেবার কিছু নেই, আর বৃহদাকৃতির হলে স্রেফ এড়িয়ে যেতে হবে। সেই সাথে খুব করে সাবধান করে দিয়েছিলেন সমুদ্রের সজারু খ্যাত সী আর্চিন নামের বিদঘুটে প্রাণীটির ব্যপারে, সমুদ্রের তলদেশে দেখলাম এরা হাজারে হাজারে জাকিয়ে বসে আছে, তাতে কোন সমস্যা নেই, কিন্তু গুটিকয়েক আবার আস্তানা গেড়েছে প্রবালের নানা গর্তে, তাই প্রবাল প্রাচীরের উপর দিয়ে যেতে যেন কোনভাবেই তাদের শরীরে পা না পড়ে! পড়লেই চিত্তির, সজারুর কাঁটার মত মানবদেহের গভীরে তা ঢুকে যাবে নিমিষে!
সেই স্বপ্নরাজ্যে ঘোরের মধ্যে আমাদের কেটে গেল ঘণ্টা দেড়েক চোখের নিমিষে, গাইডের সাথে সাথে প্রবাল উপত্যকায় নামলাম সবাই, দুপাশে কেবল প্রবাল স্তূপ, বিশ্বের যাবতীয় হীরা-চুনি-পান্নার চেয়ে অনেক অনেক মোহনীয়, কিন্তু ওপর পাশে দেখার উপায় নেই। থেকে থেকেই দেখা হল বিশালাকৃতির মাছের ঝাঁকের সাথে, কিছু কিছু জীব তাদের খোঁড়ল থেকে কেবল অস্তিত্ব জানান দিয়েই যেন সন্তুষ্ট করল আমাদের। নৌকায় ফেরার সংকেত পেয়ে রীতিমত বিরক্ত হয়েই পা চালালাম ( মানে পায়ে লাগানো ফিন),
302480_10150817477690497_608590496_21003755_432509066_n

কিন্তু মন তখন এমন অপূর্ব অনন্য অসাধারণ জগৎকে এত কাছ থেকে দেখার আনন্দে মাতোয়ারা, খুশীতে ২৮ খানা দাঁতের (৩২টাই ছিল, ৪ টা আক্কেল দাঁত ফেলে দেওয়ায় ২৮ টাই থাকার কথা, যদিও চরম উদাস দা ইদানিং মনে করছেন সেই সংখ্যা ৪২ হতে পারে) সবটাই বেরিয়ে পড়েছে।
316656_10150791788550497_608590496_20751655_3604445_n

নৌকায় তীরে ফেরার পথে হেঁড়ে গলায় মনের সুখে গান ধরলাম- ও রে নীল দরিয়া- য়া –য়া।
294535_10150817477855497_608590496_21003757_721407733_n
293656_10150817569635497_608590496_21004111_177598516_n
সেই সাথে সাথে তখনই প্রতিজ্ঞা করে ফেললাম কিউবা থাকা অবস্থায় একেবারে সমুদ্রের গভীরে একবার হলেও ডুব দিতে হবে, এভাবে উপরে ভেসে ভেসে স্নরকেলিং না, অক্সিজেনের সিলিন্ডার নিয়ে প্রবাল সাগরের তলদেশে যেয়ে উপভোগ করতে হবে সেই অন্য পৃথিবীর রূপ, রস, গন্ধ।
কিউবার নানা জনপদ ভ্রমণের ফাঁকে ফাঁকে সুযোগ পাওয়া মাত্রই সাগরে ঝাপ দিয়ে মিতালি যেমন আরো গাঢ় হয়েছে তেমন প্রতিবারই অভিভূত হয়েছি স্নরকেলিং করে। কিন্তু সাগরের সেই বহুবর্না তলদেশ ডাকতে থাকে এক সম্মোহনী ভাষায়, সেখানে না গেলে যেন মোক্ষ লাভ হবে না এই ক্ষুদ্র নশ্বর জীবনের। বিশ্বের ২য় বৃহত্তম প্রবাল প্রাচীরটা এই ক্যারিবীয় দ্বীপেই অবস্থিত ( বৃহত্তমটা গ্রেট ব্যারিয়ার রীফ), মনের কোণে আশা ছিল সেখানেই এই অসামান্য অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার, কিন্তু তার বদলে এই অন্য বিশ্বের সাথে আমাদের পরিচয় ঘটল প্লায়া হিরণ নামের এক শহরের কাছে ( অনেক শতাব্দী আগের এক ত্রাস সৃষ্টিকারী ফরাসী জলদস্যু ছিল এই হিরণ) ইতিহাস বিখ্যাত বে অফ পিগস-এ।
305457_10150797378940497_608590496_20810936_5364257_n
(সেই বে অফ পিগস যেখান দিয়ে কেনেডির শাসনামলে ফিদেল কাস্ত্রোর নবগঠিত সরকারের বিরুদ্ধে নির্লজ্জ, একতরফা, সশস্ত্র আক্রমণ চালায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এবং সারা বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে কিউবার দ্রোহের মন্ত্রে উজ্জীবিত সৈন্যদের কাছে পরাজয় ঘটে সি আই এ পরিচালিত মার্কিন বাহিনীর)।
তবে জলের গভীরে এই যাত্রা বড়ই বন্ধুর, অধিকাংশ দেশেই ৩ থেকে ৪ দিন স্রেফ ট্রেনিং-এ কাটে, প্রথমে সুইমিং পুলে সিলিন্ডার নিয়ে কসরত, এর পরে হ্রদে, পর্যায়ক্রমে অগভীর সাগরে তারপর গভীর সমুদ্রে, কিন্তু হাতে সময় বড় কম বিধায় মাত্র ১ দিনের ডুবুরী হবার চেষ্টা চালালাম। হয়ত সে কারনেই গাইড হিসেবে পাওয়া গেল সিনর হুলিও সানচেজ রুইজ কে, যিনি কিউবার অন্যতম সেরা স্কুবা ডাইভার, আবার একই সাথে পুরস্কারজয়ী জলের নিচের আলোকচিত্রগ্রাহক। সেই সাথে ডুবুরী হিসেবে সঙ্গে থাকল ফিনল্যান্ডের তরুণী সারা এসকেলিনেন।
PICT0006

নির্দিষ্ট দিনে সকালে বেশ খানিকক্ষণ হাতে কলমে সব শিক্ষা দিলেন সিনর হুলিও, সেই সাথে পই পই করে বলে দিলেন পানির নিচে যে কোন জিনিস প্রায় ২৫ % বড় দেখায় আর প্রায় ৩০ % কাছে দেখায়, কাজেই কোন বড় জীবকে কাছাকাছি দেখলে এত ঘাবড়ানোর কিছু নেই, কারণ তার আসল আকৃতি এবং অবস্থানের দূরত্ব আসলেই অন্য রকমের। সেই সাথে পানির নিচে নিঃশ্বাস নেওয়া ও ছাড়া, মুখে পানি ঢুকে গেলে কি করনীয়, বিপদে পড়লে কি করতে হবে এমন হাজারো টুকিটাকি জিনিস জানতে হল সেই অল্প সময়েই।
এখন একটা অন্য প্রসঙ্গ বলি সংগত কারণেই, এখন পর্যন্ত মানুষের যতগুলো ভয়ের কারণে জানা গেছে তার সবগুলোই কোন না কোন ভাবে বংশানুক্রমে জিনবাহিত হয়ে ছড়িয়ে গেছে মানববিশ্বে, এই ভয়গুলোর কারণ প্রোথিত আছে অনেক অনেক গভীরে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যখন আমাদের পূর্বপুরুষরা আফ্রিকার সাভান্নাচারী ছিলেন। যেমন পড়ে যাবার ভয়, আঁধারকে ভয় ইত্যাদি। তেমন খুব প্রচলিত একটা ভীতি জলের ভীতি, অর্থাৎ জলের পৃষ্ঠের নিচের কোন কল্পিত অজানা কোন কিছুর ভয়। মায়ের কাছ থেকে আমরা দুই ভাই বেশ ভাল ভাবেই পেয়েছি সেটা, যদিও আমারটা ঠিক ভীতি নয় কারণ পানিতে থাকতে বেশ ভালবাসি বলতেই হবে। কিন্তু শৈশব জুড়ে যে জিনিসটা আমার স্বপ্নে মননে ছিল তা হল লক নেসের দানব! এই নিয়েই অজস্র বই, তথ্যচিত্র, ম্যাগাজিন, সাক্ষাৎকার কিছুই বাদ দিই না এখনো, জানি মানুষের কল্পনা আর মিথ্যা আছে এটা সহ অনেক ঘটনার পিছনে, তারপরও জলদানব সম্পর্কিত বই পেলে এখনো নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে সেই নিয়েই মেতে থাকি। কাজেই, আমি বা আমার মত মানুষেরা যে পানির নিচে এই কোন প্রাণীর অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তায় থাকব তা বলাই বাহুল্য( অবশ্য অনেকের কাছেই শুনেছি তারা ভয় করেন কুমিরের, বড় মাছের, অজানা সরীসৃপের)।
293322_10150816980860497_608590496_20998995_523909503_n
সিনর হুলিওকে এই কথা জানাতেই তিনি বললেন দেখ পানির নিচের জগৎ একেবারেই আলাদা, যেহেতু তোমার প্রথমবার কাজেই উৎকণ্ঠা থাকবেই! তোমার কাজ হবে এইসব চিন্তা যতদূর সম্ভব কম করে চারপাশের মাছ, প্রবালের শোভা উপভোগ করা। আর আজ কোন ভাবেই ১০ মিটারের বেশী গভীরে যাব না, এখানে হাঙরও বিরল, আশংকার কিছুই নেই। যদিও তার গড়গড়ে স্প্যানিশ বোঝার ক্ষমতা এখনো হয় নি, কিন্তু সারার সাহায্য নিয়ে মহা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জেনে নেওয়া গেল।
প্রায় মধ্য দুপুরে আমাদের যাত্রা শুরু হল অন্যগ্রহের পানে! জলের নিচে যে আসলেই আমাদের চেনা-জানা বিশ্ব থেকে এতটাই আলাদা যে একই গ্রহের অংশ বলে মনে হয় না, বরং নিজেদের অন্য কোন পৃথিবীতে অনাহুত আগন্তক বলে মনে হতে থাকে সর্বদাই। প্রথমেই আমাদের আস্তে আস্তে এক মিটার এক মিটার করে জলের বিপুল চাপের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়ে এগোতে হল, বিশেষ করে খানিক পরপরই নাকে চাপে দিয়ে দুই কান দিয়ে বাতাস বাহির করে দুই কানের চাপ ঠিক রাখতে হচ্ছিল, এর অন্যথা ঘটলেই মহাবিপদ, খানিকপরেই শুরু হবে অসম্ভব কান ব্যথা, তখন তীরে ফেরা ছাড়া গতি থাকবে না!
PICT0010
এর মাঝেই সাগরতলে ছড়িয়ে গেছে আমাদের আগমন বার্তা, রঙের মিছিল করে কত শত ধরনের মাছেরা যে আমাদের দেখতে এল! কিছু কিছু রঙ তো মনে হল একেবারে কাঁচা গুলে দেওয়া। এর ফাঁকে তাদের জন্য আনা খাবার খাওয়াতে থাকলাম, সিনর হুলিও ফ্রেমবন্দী করতে থাকলেন সেই অসহ্য সুখের চকচকে মুহূর্তগুলোকে।
PICT0012

আসলে, আশেপাশের সবার অস্তিত্বই ভুলে গিয়েছিলাম বহুবর্ণা মাছেদের জলকেলীর সঙ্গী হিসেবে পেয়ে, এর মাঝে ডানপাশে বিশাল চলমান কিছুর অস্তিত্ব টের পেয়ে ভীষণ চমকে ঝট করে ঘুরে যেতেই দেখি আমাদের গাইড এর মাঝে ভিডিওর কাজও সেরে ফেলেছেন!
PICT0023
ক্রমশ আরও গভীরে চলেছি আমরা তিনজন, জলের চাপ বাড়ছে ক্রমশ, কানের ব্যথা টের পাচ্ছি থেকে থেকেই, সেই সাথে নজরে আসছে ভিন্ন ভিন্ন প্রবাল, সেখানে আশ্রয় নেওয়া ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির মাছ।
PICT0060

গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে জীববৈচিত্রের জগতে আমদানি ঘটেছে নতুন নতুন বাসিন্দার। অপূর্ব সুন্দর সী স্ল্যাগের সাথে দেখা হল, আলগোছে যেন উড়ে চলেছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উপর দিয়ে। বিস্ময় ভরা চোখে দেখলাম ক্ষুদে লাল সী আর্চিনদের, শতদল মেলা পদ্মের মত কাঁটা উচিয়ে বসে আছে। প্রবালখণ্ডে বাস করা অজানা জীবগুলোকে, যাদের গোটা দুইকে গাইডের অনুমতিক্রমে স্পর্শ করা মাত্রই যেন উধাও হয়ে গেল চোখের নিমিষে প্রবাল পাথরের মাঝেই!
PICT0055

PICT0042

এমনি টুকরো টুকরো স্মৃতির মণিমাণিক্যে ভরে উঠতে থাকল আমাদের রত্নভাণ্ডার। কি বিপুল ঐশ্বর্য এক জগতে! আমাদের গ্রহের ৭০ ভাগই যেহেতু জলের নিচে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে কি আমরা কোন একদিন চিরস্থায়ী ভাবে বসবাস করতে আসবে এই পরীর রাজ্যে!
মনের আনন্দে নেমেই চলেছি এই খাড়ির মাঝে এই সময় উপরের দিকে চোখের দৃষ্টি গেল, গাইড বলেই দিয়েছিলেন উপরের দিকে পারতপক্ষে না তাকাতে, কেন এইবার বুঝলাম- মাথার উপরে প্রায় ৭ মিটার জলের স্তর, উপরে সূর্যের রাজত্বের প্রান্তসীমা বোঝা যাচ্ছে, এমতবস্থায় নবীন ডুবুরীরা ভয় পেয়ে বসতেই পারে- যদি এখন কিছু হয় কি করে যাবে এতটা পথ! বাতাস শেষ হয়ে তীরে পৌঁছাতে পারব কি! যাই হোক, ভালই ভালই সে যাত্রা সামলে এক বিশাল প্রবাল প্রাচীর টপকে যেতেই এক অদ্ভুত আবিস্কার করলাম! আমি একা! আমার সঙ্গীরা সাথে নেই, তার কি ২ মিটার দূরে প্রবাল প্রাচীরের অন্য পাশে নাকি দুই হাজার মাইল দূরে মহাসাগরের অন্যপ্রান্তে তা জানার কোন উপায় নেই, অ্যাড্রিনালিনের বন্যা ছুটছে শিরাউপশিরা বেয়ে, হৃৎপিণ্ড শব্দ করে চলেছে মস্কোর জার ঘণ্টার মত। এর মাঝেও মনে হল অজানা অনেক পথেই তো আমাদের একাই এগোতে হয় জীবনে, নতুন কিছুকে আবিস্কারের নেশায়, থেকেই দেখি না কিছুক্ষন এক এই ভিন্ন গ্রহে আর সবকিছুকে ভুলে, এই অপরূপ বিশ্বে মেতে থেকে।
খানিক পরেই ( হতে পারে সেটা ১০ সেকেন্ড বা কয়েক মিনিট ) সারার দেখা মিলল, সংকেতে জানলাম আজকের সময় শেষ, ফিরে যেতে হবে ডাঙ্গায়, আমাদের প্রত্যহ জীবনে। কিন্তু সাথেই চলল এই অজানা অদেখা রাজ্যের প্রতি তীব্র বিস্ময় আর ফিরবার প্রবল আকাঙ্খা।
PICT0020
(বন্ধুরা এই পৌনে তিন মিনিটের ভিডিওটি আমাদের অজান্তেই করেছিলেন সিনর হুলিও, ভিডিওটি না দেখলে কিন্তু লেখার রস পুরোটা উপভোগ্য হবে না, সেই সাথে এই লেখায় জলের নিচের ছবিগুলো তার তোলা, সিনরের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই, আর এই লেখাটি বন্ধু কাম বন্ধুর ছোট ভাই রিজোয়ান রিয়েলের জন্য)
http://youtu.be/jW4PYu8aJH0

 

http://www.sachalayatan.com/node/41838

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: