ড. কাজী দীন মুহম্মদ ও একটি এলিজি

দিনলিপি
৩০/১০/১১
সকাল বেলা কমলকুমার মজুমদার সংক্রান্ত কিছু দলিলপত্র ঘেটে দেখছিলাম। ৮টায় ডোর বেল বেজে উঠল। এর মানে আজকের দৈনিক কাগজ হকার বক্সে রেখে গেল। উঠে আনতে গেলাম। ডাইনিং টেবিলের উপর রেখে একপলক পৃষ্ঠাগুলো উল্টাতে লাগলাম। প্রতিদিন যেমনটি করি। একই খবর। রাজনৈতিক হানাহানি। ভেতরের একটি পাতায় ছোট্ট নিউজে চোখ আটকে গেল। এক কলামে অত্যন্ত গুরুত্বহীনভাবে বাসি নিউজ হিসেবে নিউজটি ছাপা হয়েছে। ড. কাজী দীন মুহম্মদ মারা গেছেন। গতকাল নয় আরো দু’দিন আগে। আজ রবিবার। তিনি মারা গেছেন শুক্রবার রাতে। তারপরিচয় দেয়া হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক। বিশিষ্ট ভাষাবিজ্ঞানী, সাহিত্যিক এরকম কোন বিশেষণই নেই। খুবই দায়সারা খবর। অথচ আজকের এ সংখ্যাতেই আছে প্রথম পৃষ্ঠায় দু’কলাম জুড়ে একজন লেখকের অসুস্থতা নিয়ে সৌখিনতার, রঙ্গ রসিকতার খবর। আমি ধরে নিচ্ছি পত্রিকাটি একটি পক্ষের পত্রিকা। তাই বলে কী ভিন্নমতের বা অপরপক্ষের কোন কিছুই মূল্যায়ন করবো না? ¯্রফে পা-িত্যকেও না। দীন মুহাম্মদের ইসলাম পক্ষী ছিলেন হয়ত বা কিন্তু তাঁর পা-িত্যের তো কোন পক্ষ ছিল না। তিনি তো বাংলা সাহিত্যে অমূল্য অবদান রেখে গেছেন। আজ একপক্ষের নামধারীরা মুখ খোললেই তিন কলাম হয়ে যাচ্ছেন। আমি চাই তাঁরা তিন কলামের চেয়ে বেশি থাকুন। কিন্তু কোনদিন ঐপক্ষ ক্ষমতায় এলে এঁরাও তো ভেতরের পৃষ্ঠায় এক কলাম হয়ে যাবেন। আমরা কী এই রাজনৈতিক পক্ষাপক্ষির বাহিরে কোন দিনই সাহিত্যকে বিচার করতে পারবো না?

দীন মুহম্মদের সাথে আমার প্রথম পরিচয় বিগত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে। তখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ ঠিক মতো চুকেনি। মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়ে ধানম-ির কোডা কলেজে প্রভাষক হিসেবে ঢুকেছি। আমি আর কবি আজিজুন মাগফুরা। মাস্টার্সের ফলাফল এর মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। আমার ফলাফল বলছে আমার এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়া উচিত। সে খোঁজ খবর করছি। একদিন আমার শিক্ষক ড. সৈয়দ আকরম হোসেন বললেন দীন মুহম্মদ স্যারের সাথে দেখা করো। তিনি একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর সেখানে বাংলা বিভাগ খুলবেন। আমি কিন্তু কিন্তু করায় তিনি বললেন, আরে উনার নামে স্বাধীনতা বিরোধিতার অভিযোগ উঠেছিল। প্রমাণিত হয়নি। আর তুমি তো রাজনীতি করতে যাচ্ছ না। পড়াশোনার ব্যাপারে যাচ্ছ। গিয়ে আমার কথা বল। এক বিকেলে কোডা কলেজ থেকে ভেসপা টি নিয়ে আমি আর মাগফুরা তাঁর বিখ্যাত বাসায় উপস্থিত হলাম। নীচে বলল উনি দুতলায় থাকেন। দু’তলায় গিয়ে দেখি সব সুনসান। একটি কলিং বেলের সুইচ দেখে টিপলাম। একটি মুখঢাকা পর্দানশীল মুখ জানালায় উঁকি দিয়ে নাই হয়ে গেল। আর কোন খবর নেই। অনেক ক্ষণ ধরে। অস্বস্থি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এক সময় ছোট্ট একটি ৭/৮ বছরের শিশু বেরিয়ে এলো। বলল, কাকে চান? আমরা বললাম, তোমার দাদা বাসায় আছেন? বলল, কে? আমরা বললাম,ড. কাজী দীন মুহম্মদ? শিশুটি রেগে গিয়ে বলল, তিনি আমার দাদা নন, বাবা। আমাদের ধারণায় দীন মুহাম্মদ স্যার তখন ষাটোর্ধ। এ বয়সী তাঁর বাচ্চা থাকার কথা নয়। আমি আর মাগফুরা অপ্রস্তুত হয়ে হয়ে পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম। শিশুটি আমাদের একটি কক্ষের দরোজা খুলে দিলো। দেখি অপরিছন্ন এক ঘরভর্তি বিভিন্ন পরীক্ষার খাতা- কাগজপত্র। এককোণ সোফা আর টেবিল। বুঝলাম এটিই তাঁর বসার ঘর। অনেক ক্ষণ পরে আরো একটি মেয়ে একটি থালায় করে শুকনো টোস্ট বিস্কট আর বড় বড় কাচের নীল গ্লাসে করে পানি দিয়ে গেল। এরকম গ্লাস শহরে কোনদিন দেখিনি। গ্রামে শৈশবে দেখেছি। ধান দিয়ে গৃহিণীরা ফেরিয়ালার কাছ থেকে কিনতেন। আমরা খুব কৌতুক বোধ করলাম। কিছুক্ষণ পর শাদা ধবধবে পোষাক পবিহিত সৌম্য কান্তি একজন এলেন। আমরা বুঝলাম ইনিই দীন মুহাম্মদ স্যার। তাঁকে দেখেই শ্রদ্ধা জাগল। টুপ করে পা ধরে সালাম করে বসলাম। স্যার মাথায় হাত রেখে বললেন, জামাই বসেন।
আমাকে কেন জামাই বললেন তখনই বুঝলাম না। কিন্তু সাহস করে জিজ্ঞাসাও করতে পারলাম না। তারপর কুশল বিনিময় কী করছি জিজ্ঞাসা করলেন। আমরা বললাম কলেজ অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ এ কাজ করছি। স্যার কলেজের নামটি দু’বার আওড়ালেন। মনে হল খুব পছন্দ হয়েছে (পরে স্যার এ নামেই একটি স্কুল সম্ভবত খুলেছিলেন)। তারপর আসার কারণ জানতে চাইলেন। আমি আকরাম স্যারের রেফারেন্স দিয়ে কারণটি বললাম। স্যার বললেন, কাগজপত্র দেইন (স্যার আমি সিলেটি জেনে আমাদের ভাষা অনুকরণ করার চেষ্ঠা করতে লাগলেন, এবং এটি তিনি আজীবন চালু রেখে ছিলেন। সিলেটি ও প্রমিত বাংলা মিলিয়ে আমার সাথে বাতচিৎ করতেন।)। আমি ভিসির লগে কথা কইমু নে। অনেকক্ষণ গল্প করলেন। স্যারের গবেষণার বিষয় নিয়ে বেশ কথা হল। লোকজন এখন আর পড়াশোনা করে না বলে আফশোষ করলেন। তবে যারা যে বিষয়ে খুঁজ রাখার তারা ঠিকই রাখইন- আপনারে তারার দলের মনে অর – বলে মিটি মিটি হাসলেন।
এরমধ্যে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি কাজ পেয়েছি। একাজে সে কাজে স্যারের কাছে যাই। একদিন বললাম, স্যার আব্দুল হাই কেন আত্মহত্যা করেছিলেন? স্যার বললেন, এ কারণ তো কেউ জানে না। আমি জানি। আপনারে আজ কইয়া রাখরাম। আব্দুর হাই খুব ভালা মানুষ আছলা। আর পড়াশুনার মানুষ। বৈষয়িক বিষয় এতো বুঝতা না। ডিপার্টমেন্টাল ক্যাচাল তো আপনি বুঝইনই। তো উনি ডিপার্টমেন্টর চেয়াম্যান। সাহিত্য পত্রিকা কয়েক সংখ্যা বের করছিলা। আমরা বুঝছিলাম তাইন টেকা পয়সার হিসাব রাখরা না। তে একদিন অভিযোগ উঠাইলাম তাইন টেকা চুরি করছইন। সত্যই হাই সাব হিসাব দিতা পারলা না। আসলে তো চুরি করছিলা না। তাই ভিতরে ভিতওে চোট পাইছিলা। চুর সাইবস্ত হইছনই। সহ্য করতা পারছনই না। কিন্তু আমার বুঝতে পারিনি যে তিনি এ কা- করে বসবেন। সেনসেটিভ আছলা। আমরা এটা চাইনি। একটু হেনস্থা করতে চাইছিলাম।

এরই মধ্যে আমার জীবনে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যায়। আমার সহপাঠী,কবি বন্ধু, পরবর্তী সময়ে স্ত্রী আজিজুন মাগফুরা মারা যায়। অনেকদিন পর স্যারের বাসায় যাই। এবার আমি একা। স্যার বলেন, লগেরজন কই? আমি বলি নাই। মারা গিয়েছে। স্যার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর বলেন, ভুয়া। শব্দটি তিনি তিন বার উচ্চারণ করেন। আর চোখ মুছেন। আমি কিছু না বুঝে আহত স্বরে বলি, স্যার বুঝতে পারলাম না। ভুয়া বলছেন কেন? স্যার এবার স্পষ্ট স্বরে বলেন, ধুঁয়া ধুঁয়া ধুঁয়া। তারপর কিছক্ষণ চুপ করে থেকে বলেন, বুঝবার ক্ষমকা কী আমারও আছে? আল্লায় কারে নিব আর কারে রাখবো, কেউ কইতে পারব না। হুনইন, আফনারে এক কিচ্ছা কই। সমূদ্র জাহাজ ডুবি গেছে। সব মারা পড়ছইন। শুধু একটি শিশু বেঁেচ আছে। মাঝ দরিয়া। বাঁচার কোন সম্ভাবনা নাই। আজরাইল গেছনই তার জান নিতে। আল্লায় কইলা, খবরদার। এঁরে আমি বাঁচিয়ে রাখব। আল্লাহ শুধু এই শিশুকে তীরে পৌঁছাই দিলেন। আর রাজা বানাইলেন। তারপর স্যার আমার দিকে চেয়ে বললেন, জাননি মিঞা সে শিশুটি কে ছিল? সাদ্দাদ, সাদ্দাদ, আল্লার শক্র। বলে স্যার আবার চোখ মুছলেন। তারপর দু’জনেই চুপ। বাইরে তখন ধানমণ্ডীর সন্ধ্যা নেমেছিল।
আমার প্রিয় মাগফুরা,প্রিয় সাথী আমার,স্যার আজ তোমার দেশে। স্যারের সাথে একটুখানি দেখা করো।

শোয়াইব জিবরান

 

http://www.somewhereinblog.net/blog/soaibgibran/29474962

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: