অ্যামেরিকা ভ্রমণঃ ওয়াশিংটন ডিসি (মনুমেন্টস)

“কোন দেশকে ভালো বুঝতে হলে অবশ্যই তার রাজধানীতে যেতে হবে” এই রকম কোন কথা কোন মনিষী বলে গেছেন কিনা জানি না, তবে আমরা ঠিক করলাম পরের গন্তব্য রাজধানীই হতে হবে। তাই বোস্টন থেকে নিউ ইয়র্ক ফিরে রাতের মাঝেই রওয়ানা দিলাম ডিসির উদ্দেশ্যে, বাহন যথারীতি মেগা বাস।

ঢাকা থেকে আমার মফস্বল শহরে জোড়াতালি দিয়ে এয়ারকন্ডিশন্ড বাস চালু হয়েছে কয়েক বছর ধরে, মাঝে মাঝে সেটাতে চড়তে হতো। তখন দেখতাম প্রচন্ড শীতের জন্য কুলিং বন্ধ করে দেয়ায় কিছু যাত্রীর অভিযোগ, “ওই মিয়া এত টাকা দিছি কি এসি বন্ধ করে রাখার জন্য?”। এই রকম অভিজ্ঞতা মেগাবাসওয়ালাদেরও মনে হয় আছে, তা না হলে রাতের জার্নিতেও এরকম চূড়ান্ত ঠান্ডা করে রাখার কারণ আর কি হতে পারে! মনে অবশ্য ক্ষীণ সন্দেহ খেলে গেলো, আদিম যাযাবর মানুষেরা ম্যামথ শিকার করে হয়ত এই ফ্রিজার ইউজ করেই মাংস পরিবহণ করতো।

কয়েক দিনের টানা জার্নিতে ক্লান্ত হয়ে টলোমলো পায়ে দিনের প্রথম আলোতে পা রাখলাম রাজধানীতে। বাস ধরে যেতে হবে দূরবর্তী হোটেলে, পাশের স্টেট ভার্জিনিয়াতে। ফুটপাথে নেমে ইতিউতি বাসস্টপ খুঁজছি, আমাদের মফিজ দশা টের পেয়ে ফুটপাথের বেঞ্চে বসে থাকা ভ্যাগাবন্ডদের একজন উঠে আসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। আমাদের বাস স্টপ চিনতে না পেরে সে ব্যস্ত সমেত ভাবে তার সব ভাই বেরাদরদের ডেকে নিয়ে আসে পথের নির্দেশনার জন্য। ঢাকায় এক দশকের উপর বসবাস করার অভিজ্ঞতা এবার ব্যাপারটাকে বুঝে উঠতে সাহায্য করে, বিশেষত পথ দেখিয়ে তারপর সাহায্যের আহবান ব্যাপারটাকে জলবৎ তরলং করে দেয়। আমরা তড়িঘড়ি করে বাসে উঠি। যাওয়ার আগে মাহদির “লোন স্টার” ক্যাপের দিকে আঙ্গুল তুলে আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী তার মতামত জানায়, “আই হেইট কাউবয়স, বাট আই লাইক ইউ”।

বাসে করে শহরের কেন্দ্রে এসে একটা পার্কের বেঞ্চে বসে জিরোই কিছুটা। প্রাতঃভ্রমণে বের হয়েছে কিছু কবুতর আর কাঠবিড়ালি, আমি কাঠবিড়ালির ছবি তুলার চেষ্টা করে বরাবরের মত ব্যর্থ হই আর মনে মনে একটা ভালো ক্যামেরাহীন জীবনের উদ্দেশ্যে অভিশম্পাত দেই। মেট্রোরেলের স্টেশন খুঁজে পেতে কালঘাম বের হয়ে গেলে এক সময় টের পাই গুগল ম্যাপ আস্ত একটা হোটেলকে রাস্তার ডান পাশ থেকে বাম পাশে তুলে নিয়ে এসেছে, না হয় গুগলের ক্যামেরাকে বোকা বানানোর জন্য হোটেলটাই হেটে হেটে অন্য পাশে সরে গিয়েছিলো।

IMG_2299

IMG_2293

আমাদের স্টেশন ফেলে এলাম কিনা আতংকে বাংলায় নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতার মাঝে, শাড়ী পড়া এক ভদ্রমহিলা আমাদেরকে বাংলায় আশ্বস্ত করলেন। তিনি ভয়েস অফ অ্যামেরিকার বাংলা বিভাগের রোকেয়া হায়দার। অনেক বছর ধরে অ্যামেরিকা আছেন, পোশাকে এবং অভিব্যক্তিতে পুরো বাঙালিয়ানা ধরে রেখেছেন দেখে বেশ অভিভূত হলাম। উনার কার্ড দিয়ে পরের দিন সময় পেলে উনার অফিসে দেখা করে যেতে বললেন, আমাদের ছোট জীবনে অনেক কিছুর জন্যই সময় হয় না, উনার সাথে দেখা করতে যাওয়ারও সময় হয়নি।

হোটেল রুমে ঢুকে আমরা অভিভূত, ডিসি থেকে বেশ দূরে হওয়ায় বেশ সস্তায়ই স্যূট পেয়ে গেছি। এর ভেতর ফুললি-ইক্যুইপড কিচেন ইত্যাদি দেখে সবাই প্রাথমিক ভাবে ঠিক করে ফেললাম, ডিসিতে ঘুরতে গিয়ে শক্তিক্ষয় না করে বরং পাশের বাজার থেকে চাল-ডাল কিনে রান্না করে খেয়ে শুয়ে বসে দুইটা দিন কাটিয়ে দেই। অবশ্য চারটা ছেলে দুই দিন ঘরে বসে কাটিয়ে দিয়েছে, এটা নিয়ে দুষ্ট লোকেরা নানা দুষ্ট ভাবনা ভাবতে পারে ভেবে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে আমরা বেরিয়েই পড়লাম।

প্রথম গন্তব্য ওয়াশিংটন মনুমেন্ট, প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের স্মৃতির উদ্দেশ্যে বানানো। জাতির পিতা, যুদ্ধ এবং শান্তিতে সবসময় সামনে থেকে জাতিকে নেতৃত্ব দেয়ার অবদানকে স্বীকৃতি দিতে অ্যামেরিকানরা একটুও কার্পণ্য করেনি।

IMG_2311

অবশ্য আমাদের এত কিছু চিন্তা করলে কি আর চলে? এত বড় মনুমেন্ট দেখলে একজন সুস্থ সবল মানুষের মনে প্রথম যে চিন্তাটা আসবে, তা আমাদের মনেও এলো। আমি আর মঈন তাই বিপুল উদ্যমে মনুমেন্টকে ঠেলে সরানোর কাজে লেগে গেলাম। নিবেদিত ফটোগ্রাফার মাহদী আর নাফির সমস্ত মনোযোগ অবশ্য ছবি তুলার দিকে, আমরাও ওদেরকে সাহায্য করার জন্য বাংলা সিনেমার অবিসংবাদিত নায়ক শাকিব খানের মত পোজ দিতে লাগলাম মনুমেন্টের গায়ে হেলান দিয়ে। কিছুক্ষণ পরপর মনুমেন্টের উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে কিছু চপার। ঘুড়িও উড়ছে কয়েকটা।

IMG_2316

IMG_2340

মনুমেন্ট ধাক্কাধাক্কি করে ক্লান্ত লাগলে হেটে হেটে এগুই “ন্যাশনাল ওয়ার্ল্ড ওয়ার টু মেমোরিয়ালের” দিকে। উপবৃত্তাকার চত্বরের দুই শীর্ষে দুইটি আর্চ, মাঝখানে ফোয়ারা আর দুই কেন্দ্রের পাশে অর্ধবৃত্তাকারে সাজানো ৫৬ স্তম্ভ। আর্চ দু’টি অ্যামেরিকাকে ঘিরে রাখা দুই মহাসাগরের প্রতীক, স্তম্ভগুলি অ্যামেরিকান স্টেট এবং টেরিটোরির প্রতীক।

IMG_2348

IMG_2351

IMG_2330

IMG_2339

এক পাশে ফ্রিডম ওয়াল জুড়ে ৪০৪৮ টি সোনালি তারা, প্রতিটা তারা একশো জন নিহত অ্যামেরিকানকে স্মরণ করছে, পাশের একটা বেদীতে লিখা “স্বাধীনতার দাম”। আমাদের দেশ জুড়ে রিকনসিলিয়েশনের মচ্ছব চলার সময়ে মনে হলো সবাইকে এই জিনিসটা একটু মনে করিয়ে দেয়ার জন্য জায়গায় জায়গায় এই প্রাইস ট্যাগ ঝুলিয়ে দিই!

IMG_2343

বের হওয়ার পথে রাস্তায় খোদাই করা আছে যুদ্ধের সমাপ্তি কামনা।

IMG_2374

লিংকন মেমোরিয়ালের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করলাম, পথে পড়লো কোরিয়ান ওয়ার ভেটেরানস মেমোরিয়াল। আমি পুরা তাজ্জব হয়ে ভাবতে লাগলাম, এরা যুদ্ধ করতে পৃথিবীর কোন জায়গাটাতে যায়নি! কৌতুহল নিবৃত্ত করতে একটু ইতিহাস ঘেটে দেখলাম। ১৯৫০ এর কোরিয়া যুদ্ধে উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়া দখল করে নিতে থাকলে তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে জাতিসংঘের আড়ালে অ্যামেরিকা। যৌথ প্রচেষ্টায় দক্ষিণ কোরিয়া উত্তর কোরিয়া দখল করে নেয়ার পর্যায়ে চলে যায়, এমন সময় একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। উত্তর থেকে চীন তার সৈন্যদের মার্চ করে কোরিয়ায় প্রবেশ করায়, একেবারে খালি হাতে। পিপড়ার মত পিলপিল করে ঢুকতে থাকা চীনা বাহিনীর সামনে যৌথ বাহিনীর আর কিছু করার থাকে না, প্রতিষ্ঠিত হয় যুদ্ধবিরতি। বেশ তারিফ দিলাম চীনা জেনারেলদের। প্রসংগত উল্লেখ্য মিয়ানমার যখন গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে ঝামেলার সময় তাদের যুদ্ধজাহাজ নিয়ে বঙ্গোপসাগরে মহড়া দিচ্ছিলো, আমি তখন উইকিতে দুই দেশের জনসংখ্যার তুলনা করে একই রকম স্ট্র্যাটেজি দাড় করাচ্ছিলাম। নিজের চীনা প্রাজ্ঞতায় নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

IMG_2360

IMG_2356

নিচের প্ল্যাকার্ডটা দেখলাম, ভালো লাগলো। ঋণ স্বীকারে কেউ ছোট হয়ে যায় না।

IMG_2358

লিংকন মেমোরিয়ালে যেতে যেতে প্রায় অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। গ্রীক মন্দিরের অনুকরণে বানানো ঘরে চেয়ারে বসে আছেন বিশালাকৃতির লিংকন। দেয়ালে খোদাই করা আছে তার বিখ্যাত বক্তৃতা, গেটিসবার্গ অ্যাড্রেস, এবং Second Inaugural Address। সত্যি বলতে কি ভদ্রলোকের মুখ দেখে একটু ভয়ই লাগে, তবে অ্যামেরিকায় দাসপ্রথার অবসানে তার অবদানের জন্য তাকে শ্রদ্ধা না করেও পারি না। উল্লেখ্য, মার্টিন লুথার কিং এর আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম বক্তৃতা এই জায়গা থেকেই দেয়া।

IMG_2364

IMG_2366

মেমোরিয়ালকে পেছনের রেখে দাড়ালে চোখে পড়া এই দৃশ্য অনেকের চেনা মনে হতে পারে। যদিও রিফ্লেকটিং পুল শুকিয়ে খটখটে হয়ে আছে।

IMG_2365

হোটেলে ফিরে যাওয়ার আগে মনে হলো আরেকবার ওয়ার্ল্ড ওয়ার টু মেমোরিয়ালে ঢু মেরে যাই। ফিরতি পথে সন্ধ্যা পুরোপুরিই নেমে আসে।

IMG_2371

রাতের অন্ধকার আর আলোর কারসাজিতে মেমোরিয়াল আমাদের কে হতাশ করলো না।

IMG_2380

IMG_2379

IMG_2376

উইকি থেকে অনেক জ্ঞান ঝাড়লাম, কিন্তু যথেষ্ট তেলের অভাবে লিংকগুলি দিলাম না।

http://www.sachalayatan.com/node/41605

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: