ছবিব্লগঃ ফটোগ্রাফির প্যারাডক্স

অনেকদিন ধরে একটা বিষয় নিয়ে লিখবো বলে চিন্তা করেও লেখাটা আর হচ্ছিল না। কিন্তু ভেবে দেখলাম যে, আলসেমিটা আর না করে বরং একটু একটু করে শুরু করি, একদিন তো শেষ হবেই। সচলে আমার টুক-টাক লেখালেখি করার বিষয়বস্তু একটাই – ফটোগ্রাফি। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো তথ্যমূলক লেখা এই বিষয়ে পোস্ট করিনি, তবে আজ একটু কচকচানি করতেই এই লেখা নিয়ে হাজির হলাম। তবে এটা খুব গুরুগম্ভীর বা তথ্যে ভরপুর কোনো লেখা নয়। নিতান্তই ক্যামেরা নিয়ে ঘোরা একজন স্বল্পজ্ঞান সম্পন্ন মানুষের নিজের কিছু কথাকে উগরে দেয়া আর প্রয়োজনে দু’একটি ওয়েব সাইট থেকে একটু আধটু কপি-পেস্ট করা আর সাথে ৪-৫টা ছবি … (দাঁত কেলিয়ে হাসির ইমো)।

সেই ১৮২৬ থেকে শুরু হওয়া ফটোগ্রাফি জিনিসটা আজো খুব একটা বুড়িয়ে যায়নি, মানুষের স্মৃতীকে ধরে রাখার জন্য এটাই সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম বলে। এবং এর মাঝেই ১৮৬০-এর দিকে শুরু হয় ফটোম্যানুপুলেশনের কাজ, যেখানে জন কেলনের শরীরে আব্রাহাম লিঙ্কনের মাথা লাগিয়ে একটি সম্পূর্ণ পোর্ট্রেইট তৈরি করা হয়। ১৯৬৯ তে শুরু হওয়া ফটোগ্রাফির ডিজিটালাইজেশনের পরীক্ষা (সিসিডি ইমেজ সেন্সর উদ্ভাবনের মাধ্যমে) একটি পূর্ণ রূপ পায় ১৯৮৬ সালে বিখ্যাত অপটিক্যাল প্রোডাক্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কোডাকের হাত ধরে ‘মেগা পিক্সেল ইমেজ সেন্সর’ তৈরির মাধ্যমে। আর আজ, বর্তমানে, নিকন (নাইকন), ক্যানন, প্যান্টেক্স, কোডাক, অলিম্পাস -এর মতো বড় ও বিখ্যাত অপটিক্যাল প্রোডাক্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ক্যামেরা লাইন-আপে ফিল্ম প্রযুক্তি বিদায় করে শুধু ডিজিটাল প্রযুক্তিই ব্যাবহার করছে। এমনকি আজ সবার হাতে থাকা মুঠোফোনেও মেগাপিক্সেল সেন্সরযুক্ত ক্যামেরা থাকার কারণে ফটোগ্রাফি মাধ্যমটি ভয়াবহ জনপ্রিয়তা পেয়ে চলেছে।

কিন্তু আমরা, ফটোগ্রাফার ও ভিউয়াররা, ঠিক কোথায় আছি? তার আগে আরো কিছু ক্ষুদ্র জিনিশ আমাদের জেনে নেয়া প্রয়োজন।

এবার একটু মনোযোগ দেই ফটোগ্রাফির কিছু বিভাজনের দিকে। ঠিক বিভাজন নয়, আমরা একে শ্রেনীবিভাগও বলতে পারি। এর প্রথম এবং প্রধানতম শ্রেনী হলো – ফটোজার্নালিজম এবং ডকুম্যান্টারি ফটোগ্রাফি। এর অন্তর্গত ব্যাপারটা কী? ফটোজার্নালিজম ব্যাপারটা হলো কোনো নির্দিষ্ট সময়ে, কোনো নির্দিষ্ট স্থানে ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং ঐ ঘটনার ইম্পেক্ট কী, কতটা প্রবল এবং এর এরিয়া অফ ইনফেকশন কতটুকু তা তুলে নিয়ে আসা। মনে করুন বই মেলায় জার্নালিস্টিক ফটোগ্রাফি করতে গেলে প্রথমেই আপনাকে একটি দিন বেছে নিতে হবে এবং এমনভাবে আপনাকে ফটোগ্রাফি করতে হবে যেনো আপনার ফ্রেমে ঐ দিনটার জন-সমাগম, বিক্রি, আড্ডা সব উঠে আসে। যেমন এটা যদি হয় একুশে ফেব্রুয়ারীর দিন, তাহলে আপনার উদ্দেশ্য অবশ্যই থাকবে ঐ দিনটায় কতটা আগ্রহ নিয়ে মানুষ বই মেলায় যাচ্ছে, মানুষের বই কেনা আগ্রহ কতটুকু, এবং বই মেলা সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা কতটুকু ইত্যাদি। আপনি আবার ইচ্ছা করলে পুরো ২৮ দিন জুড়েই ফটোগ্রাফি করে বইমেলার আনন্দটুকু তুলে ধরতে পারেন। তবে একটা জিনিশ মনে রাখতে হবে যে আপনাকে কিন্তু ‘নির্দিষ্ট সময়’ অবশ্যই নির্ধারন করতে হবে, আপনি ২০০৯ সালের ছবি দিয়ে ২০১০ সালের বইমেলাকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারেন না। ঠিক একইভাবে ঢাকা বইমেলার ছবি দিয়েও কিন্তু আপনি বাংলা একাডেমির বইমেলাকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারবেন না। আপনার ছবিতে অবশ্যই বাস্তব চিত্র থাকতে হবে। জনসমাগম কম থাকলে আপনি ৪-৫টা ছবি ক্লোন করে লোকের ভীড় দেখাতে পারবেন না, ঠিক তার বিপরীতে লোকজনকে ক্লোন মেরে ভেনিশ করে এটা দেখাতে পারবেন না যে, ‘এখন আর লোকে বই কিনতে যায় না’। ২০১০ সালের অতি বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্থ উত্তরবঙ্গের কৃষকদের দূরাবস্থা বোঝাতে আপনি ২০০৮-এর বরিশালে বন্যায় ভেসে যাওয়া ক্ষেতের ছবি উপস্থাপন করতে পারবেন না। অর্থাৎ, আপনার ছবিটি সব দিক থেকে হতে হবে ‘সত্য’, এর কোনো অংশ কোনো ভাবেই ম্যানুপুলেটেড হতে পারবে না।

ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি প্রায় একই জিনিশ। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে এর গতি একটু ধীর। অর্থাৎ জার্নালিস্টিক ফটোগ্রাফি কাজের ক্ষেত্রে খুব দ্রুত প্রয়োজন হয়, আর ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি এতোটা দ্রুত প্রয়োজন হয় না। এই টাইপ ফটোগ্রাফিরও নীতি ঐ একই – একে হতে হবে শুদ্ধ, যেন এর দ্বারা ঐ নির্দিষ্ট স্থানের, নির্দিষ্ট সময়ের, নির্দিষ্ট জাতীগোষ্ঠি বা ব্যাক্তি ও ব্যাক্তি বর্গের সত্যিকারের অবস্থাটা পুরোপুরি বোঝা যায়। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো, শুধুমাত্র প্রফেশনালি ব্যাবহারের জন্য করা জার্নালিস্টিক ছবি ছাড়া বাকী গুলোর বাস্তবিক ব্যাবহার বা উপস্থাপন কিন্তু খুব দ্রুততার সাথে হয় না।

এবার আসা যাক দলছুটদের গল্পে। সব ক্ষেত্রে সবসময়ই কিছু লোক থাকে যারা শুধু উল্টো চিন্তা করে, স্রোতের বিপরীতে চলে – এঁরা মস্ত পাগল ছাড়া আর কিছুই নয়। এঁদের হাতে পড়ে আরো এক পদের ফটোগ্রাফির উদ্ভব হয়, যার নাম – ফাইন আর্ট ফটোগ্রাফি বা আর্ট ফটোগ্রাফি বা ফটো আর্ট। আসলে এঁরা চায় কী? ঘটনা আর কিছুই না, এঁরা নিজেদের কথা বলতে চায়, নিজের স্বপ্নকে দেখাতে চায়। কোনো স্থান, কাল, পাত্রের কোনো অবস্থা নয়। নিজের চিন্তা-চেতনা, নিজস্ব ধ্যান-ধারণা উপস্থাপন করতে চায় একান্ত নিজেদের মতো করে। এঁদের সত্যটা আসলে মুক্ত চিন্তার, নিজস্ব চেতনার সত্য। তাহলে আমরা প্রশ্ন করতেই পারি, স্থান, কাল, পাত্রের সত্যকে যারা ধর্ষণ করে নতুন এক পদের ‘সত্য’ বানাতে চায় তারা আসলেই কী ফটোগ্রাফার, তারা কী ফটোগ্রাফির কিছু বোঝে বা তাদের দ্বারা এই মাধ্যমের অবনতী বই উন্নতী কিছু হচ্ছে কী? তাহলে বলি শুনুন – ফটোগ্রাফিটা যখন recording fact, showing or describing the actual situation or facts হিসেবে ধরা হবে তখন ঐটাকে অবশ্যই চরম সত্য হতে হবে এবং ঐটাই ফটোজার্নালিজম বা ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি। কিন্তু এর বাইরে আমাকে আমার যে কোনো ছবি উপস্থাপনের বেলায় ঐ খৎ দিতে হবেনা যে, এইটা এক্কেবারে ট্রু। কিছু কী বোঝা গেলো?

আবার সেই প্রশ্নে আসা যাক – আমরা, ফটোগ্রাফার ও ভিউয়াররা ঠিক কোথায় আছি? আসলে সেই ১৮৬০-এর দিক থেকেই ফটো ম্যানিপুলেশনের (রি-টাচিং, এডিটিং, মনট্যাজিং ইত্যাদি) শুরু কিন্তু তখন এর বেশিরভাগ কাজই হতো ডার্করুমে অনেক স্কিল্ড হাতে, যা কিনা ক্যামেরা নিয়া ঘুরা বেশিরভাগ পাব্লিকের চিন্তার নাগালের বহু বাইরে ছিলো। কিন্তু ডিজিটাল যুগে এই কাজগুলাই বিভিন্ন সফটওয়্যারে করা যায় এবং তা যথেষ্টই সহজলভ্য (সফটওয়্যারটা কিন্তু, স্কিলটা না)। ঠিক একারনেই আমরা এই ম্যানিপুলেশনকে খুব ‘চিপ’ একটা জিনিশ হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমাদের ব্যাবচ্ছেদ টেবিলে ঐ ছবির Artistic Expression টা না, কতখানি ম্যানুপুলেটেড এইটাই জরুরী হয়ে দাঁড়ায়। তাই তো আমরা HRD ছবিকে বানানো ছবি বলি, প্রকৃতির উপর মানুষের ডিজিটাল ডিজাস্টার হিসেবে একে উপস্থাপন করি। কোনো আর্ট ফটোগ্রাফি দেখলে সবার আগে চিৎকার করে বলে উঠি – আরে এইটা তো এডিটেড! কিন্তু ঠিক মতো খুঁড়ে দেখতে চাই না এর অন্তর্গত মূল্যটা কী বা আর্টিস্ট এখানে ঠিক কী বোঝাতে চাচ্ছেন? এখানে এই কথাটাও এসে যায় যে, ফটোগ্রাফার/আর্টিস্ট বলে না দিলে কীভাবে তার এথিকসটা বোঝা যাবে, আর্টিস্টের কোনো স্টেটম্যান্ট তো নাই! হা … হা … হা … প্রত্যকটা আর্টেরই একটা নাম থাকে, যেটা আর্টিস্ট দেয় … জাস্ট ট্রাই টু রিড দেট থিং ভেরি কেয়ারফুলি এন্ড ইউ উইল আন্ডারস্ট্যান্ড।

আমরা বেশিরভাগ লোকজনই ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা আসলে ফটোগ্রাফির মূল উদ্দেশ্যটা কী? কিন্তু একটু খেয়াল করলেই দেখতে পারবেন এটা নির্ভর করে ঐ ছবির বাস্তব ব্যাবহার ও উপস্থাপনার উপর। কেউ যদি একটা ট্রু ফ্যাক্টকে সবার সামনে অবিকৃত অবস্থায় নিয়ে আসতে চায় সেটার আবেদন ও উপস্থাপন এক জিনিশ এবং কেউ যদি কোনো ল্যান্ডস্ক্যাপ, পোর্টেট বা লাইফস্টাইলের মাধ্যমে বা স্যুরিয়েল লং এক্সপোজারের মাধ্যমে তার নিজস্ব ধারনা তুলে ধরতে চায় সেটার আবেদন ও উপস্থাপন আবার ভিন্ন জিনিশ। এছাড়াও এদের ব্যাবহারিক দিকটিও কিন্তু ভিন্ন। কিন্তু আমরা কী করি? একটা ছবিকে জাজম্যান্ট করার সময়, সেটা যে ছবিই হোক না কেনো, তার জার্নালিস্টিক এটিচ্যুডকে প্রাধান্য দেই। অর্থাৎ ছবিটা কতখানি ‘রিয়েল’ বা ‘আন-এডিটেড’ সেই দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেই। কিন্তু একবার, শুধু একবার, নিতান্ত খালি চোখে দেখলেই বোঝা যায় ছবিটা আসলেই কী উদ্দেশ্যে করা – এটা কী শুধুই কোনো সত্যকে উপস্থাপন করছে না কী কোনো ডিফরেন্ট থট নিয়ে আসছে সামনে। সত্যি বলতে আমরা ‘এডিটিং কুসংস্কারে’ আক্রান্ত এবং এখান থেকে বেরিয়ে এসে যে কোনো ছবিকে দেখতে হবে। তাহলে হয়তো ভিন্ন ভিউ পয়েন্ট থেকে একটা ছবিকে জাজম্যান্ট করার একটা প্রচেষ্টা আমরা নিতে পারবো।

জার্নালিস্টিক ফটোগ্রাফি বা ডকুম্যান্টারি ফটোগ্রাফি – কোনোটা নিয়েই আমার সমস্যা নেই, ছিলোও না কোনো কালে। কিন্তু আমি সবসময়ই একটা ফটোগ্রাফিকে একই মাত্রা থেকে জাজম্যান্টের ব্যাপারটাতে খুব বিরক্তবোধ করি। সবকিছুকেই ভিন্ন আঙ্গিকে দেখার চোখটা সবসময় খোলা রেখে চলা উচিৎ বলে আমার মনে হয়। কারন বাস্তবতা, অতি বাস্তবতার বাইরে গিয়েও ছবিকে দেখা যায়, জাজম্যান্ট করা যায়।

————————————————————————————————–

এবার কিছু ছবি দেখাই। তবে বলে রাখা ভালো যে, আমি এর আগে কখনও কোথাও এভাবে ছবি গুলোকে শেয়ার করিনি। এটা ঐ ‘ব্যাবহারের পূর্বে ও পরে’ টাইপ বিজ্ঞাপনের মতো। আমি এই সমস্ত ছবি এডিট করেছি এতে ভিন্ন মাত্রা দিতে, অন্যরকম করে এতে নিজস্ব কিছু চিন্তা উপস্থাপন করতে। আর এটা বলে রাখি, আমি নিজেকে আজ পর্যন্ত কোনোদিন ফটোগ্রাফার দাবি করিনি, করবোওনা … I’m a proud PHOTO ARTIST.

১) Confusing what is real (Botanical Garden, Dhaka, Bangladesh.)
Paradox-1

২) Unchained Melody (Lama, Bangladesh.)
Paradox-2

৩) Therese nowhere else on earth I rather be (Lalakhal, Sylhet, Bangladesh.)
Paradox-3

৪) Silent hills and a solitary boat (Volagonj, Sylhet, Bangladesh.)
Paradox-4

৫) Melancholic silence (Khagrachari, Bangladesh.)
Paradox-5

———————————————————————————–

ক) ফটোজার্নালিজমের এথিক্স গুলো দেখতে পারেন এখানে এবং এখানে । আরও জানতে পারবেন এখানে ও এখানে
খ) ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি সম্পর্কে যদি জানতে চান তবে যেতে পারেন এখানে 
গ) ফটো ম্যানুপুলেশন বা এডিটিং-এর ছোট্ট ইতিহাস জানতে এখানে এবং এখানে দেখতে পারেন।

http://www.sachalayatan.com/anupom_tribedi/37428

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: