উইকিনামা – ২ : উইকি-রাজনীতির রকমফের


উইকিপিডিয়ার নানা নিবন্ধের লেখা নিয়ে খাপ্পা, এমন মানুষের সংখ্যা কম নয় বটে। “অমুক নিবন্ধে তমুক নাই কেনো?”, “তমুক রাজনীতিবিদকে চোর বলা হয়েছে কেনো?”, “সমুক ব্যাটার যুদ্ধাপরাধ উল্লেখ করা হয়েছে কেনো?” — এমন অভিযোগ আছে অনেকেরই, আর সেজন্য উইকিপিডিয়ার কর্তৃপক্ষের গদিতে আগুন জ্বালাতে তারা পারলে এখনই রওনা দিতে প্রস্তুত। কেউ কেউ আবার এক কাঠি এগিয়ে, বাংলাদেশের এক কুখ্যাত রাজাকার তার জীবনী নিবন্ধে তাকে রাজাকার বলা হয়েছে কেনো, এই নিয়ে উকিল নোটিশ পর্যন্ত পাঠিয়েছিলেন সরাসরি উইকিপিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা জিমি ওয়েল্সের নামে!!

তা, উইকিপিডিয়ার “কর্তৃপক্ষটা” কে? বেচারা জিমিকে উকিল নোটিশ পাঠিয়ে খুব একটা ফায়দা হবে কি?

এই প্রশ্নের জবাবটা বেশ ইন্টারেস্টিং। উইকিপিডিয়ার কর্তৃপক্ষ টাইপের কিছু আসলে সেরকম নেই। আদৌই।

খোলাসা করে বলি, উইকিপিডিয়ার সার্ভারগুলো আর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ভার রয়েছে উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন নামের একটা নন-প্রফিট সংস্থার হাতে। এর সদরদপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিস্কোতে। (সেখানেই রাজাকারটির উকিল নোটিশ পাঠানো হয়েছিলো!!)। আর উইকিপিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা জিমি ওয়েল্স এই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এমেরিটাস পদে আছেন। তবে খুব অল্প কিছু বিষয় বাদে (যেমন, চাইল্ড পর্ন, ব্যক্তি আক্রমণ) আর কোনো ক্ষেত্রে ফাউন্ডেশন বা জিমি ওয়েল্সের কোনো হাত নেই উইকিপিডিয়ার কোনো নিবন্ধে। খোদ জিমি ওয়েল্সের উইকি-জীবনী নিবন্ধেই তার নামে একগাদা সমালোচনা রয়েছে (রেফারেন্স সমেত)। (আর উইকিতে কী লেখা হচ্ছে, তার দায় দায়িত্ব মার্কিন আইন অনুসারে উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের না, সে দায়টা যে লেখা যোগ করবে, তার।)

তাহলে উইকিপিডিয়ার লেখা কী হবে, সেটা চালায় কে?

ঢাল নেই তলোয়ার নেই, নিধিরাম প্রশাসক

উইকিপিডিয়ার সম্পাদকেরা? মানে নিবন্ধিত লেখকেরা? তাহলে দেখা যাক নিবন্ধিত লেখকদের রকমফের। উইকিপিডিয়ার কিছু নির্ভরযোগ্য এবং মোটের উপরে নিরপেক্ষ ইউজারকে বেশ খুঁটিনাটি দেখা একটি ভোটের প্রক্রিয়া পেরিয়ে “প্রশাসক” পদে উন্নীত করা হয়। এই প্রশাসকেরা কিন্তু আবার বাংলাদেশের জেলা প্রশাসক বা এমপি মার্কা নন … নামে প্রশাসক হলেও কামে এরা কিন্তু খুব সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষমতা রাখেন। কাগজে কলমে প্রশাসকদের ক্ষমতার মধ্যে আছে, নিবন্ধ মুছে ফেলা, বেয়াড়া ইউজারকে ব্যান করা, কিংবা খুব বেশি ভ্যান্ডালাইজ হয় এমন পাতাকে সুরক্ষিত করে রাখা। কিন্তু প্রতিটা কাজের লগ হলো পাবলিক, আর প্রতিটা ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক অ্যাকশনের জবাবদিহি করতে এই প্রশাসকেরা বাধ্য। কাজেই নিজের ইচ্ছামতো কোনো মতামত উইকিতে ঢোকানোর এখতিয়ার এদেরও নেই, বরং এরকম ধান্ধা করতে গিয়ে অনেকেই নানা সময়ে প্রশাসকের গদি হারিয়ে ফেলেছে। প্রশাসকদের কাজকে বড়োজোর ঝাড়ুদারের সাথে তুলনা করা যেতে পারে, উইকি থেকে আবর্জনা, জঞ্জাল এসব দূর করাই তাদের কাজ, নিদেনপক্ষে দুই ইউজারের ঝগড়া মেটাতে প্রশাসকেরা কড়াভাবে নিয়ম মেনে তাদের ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন, এই যা।

ঝগড়া, চুলাচুলি, এবং অতঃপর

প্রতিষ্ঠাতাও চালাননা, প্রশাসকেরাও না, তবে উইকিপিডিয়ার কোন নিবন্ধে কী থাকবে, তা নির্ধারিত হয় কীভাবে? এইখানেই হলো ইন্টারেস্টিং ব্যাপার, উইকিপিডিয়ার নানা নিবন্ধের লেখা কেমন হবে তা কিছু নীতিমালা এবং উইকির লেখকদের ঐক্যমতের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়ে থাকে। গত পোস্টের কমেন্টেই বলেছিলাম, উইকিতে লেখা যোগ যে কেউ করতে পারে, তবে নিয়ম না মানলে সেই লেখা টিকে থাকবে না। নিয়মগুলোর সংখ্যা অল্পই, আর তা হলো, প্রতিটা কথার রেফারেন্স নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র থেকে চাহিবা মাত্র দিতে বাধ্য থাকতে হবে, আর লেখাকে লিখতে হবে নিরপেক্ষভাবে। যেমন, “হাবুল ব্যাটা চোর, তার মতো ভয়ানক দুইনম্বর মানুষ আর হয়না” টাইপের কথা লেখা চলেনা, বরং লেখা চলে, “অমুক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হাবুল একজন চোর”, ব্য্স। মানে উইকিতে কথা বলতে হলে নিজের বরাতে বলা যাবে না, বরং সূত্রের উল্লেখ রেখে নানা সূত্রে কী বলা হয়েছে, সেটা উল্লেখ করাই যাবে কেবল। আর ফ্যাক্ট ছাড়া বিশেষণ বাদ দিয়ে (“নৃশংস”, “মর্মান্তিক”, “ভয়াবহ”) লিখতে হবে সবখানে।

নীতিমালা সুস্পষ্ট থাকলেও অনেক সময়ে বিতর্ক শুরু হয় বটে। কোন সূত্র বিশ্বাসযোগ্য, কোনটা না, কিংবা কোনো নিবন্ধে কোন কোন মতবাদ প্রকাশ পাবে, সেটা নিয়ে প্রায়ই রীতিমতো মারদাঙ্গা ঝগড়া বেধে যায়। ঝগড়া, থুক্কু “আলোচনা” করার জন্য উইকিপিডিয়ার প্রতিটি পাতার সাথে রয়েছে একটি আলাপ পাতা। বলা বাহুল্য, আলাপের চাইতে সেখানে ঝগড়াই বেশি হয়। প্রাত্যহিক জীবনের মতোই কুতর্কে পারদর্শী লোকজনের সংখ্যা উইকিতে কম নয়, আর নিজের (চরমপন্থী) মতাদর্শে প্রচন্ডভাবে নিবেদিত, এমন লোকের সংখ্যা পারলে উইকিতে অনেক অনেক বেশিই বটে। ফলে সামান্য বা গুরুতর, সব বিষয়ের মতপার্থক্যেই পাতার পর পাতা লিখে লিখে ঝগড়া করতে এদের উৎসাহ কিংবা সময়ের কমতি নেই।

থিওরেটিকালি, আলাপ পাতায় আলোচনা করে একটা ঐক্যমতে পৌছানোটা উইকির নিয়ম। অনেক ক্ষেত্রেই সেটা কাজ করে। এক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার চাইতে যুক্তির সঠিকতাই বেশি গুরুত্ব পায়। তবে, সেটা থিওরেটিকালি। বাস্তব ক্ষেত্রে বাস্তব জীবনের মতো উইকিতেও গড়ে উঠেছে নানা মতাদর্শের লেখকগোষ্ঠী। আগের পোস্টেই দেখিয়েছিলাম, উইকির লেখক হলো গড় হিসাবে ৩০ এর নিচে বয়সী, পুরুষ, সিঙ্গল, পিতা নন, এরকম। আর ইন্টারনেটে পড়ে থাকার অঢেল সময় আছে। এরকম কেউ যদি চরমপন্থী মনোভাবাপন্ন হন, তবে তো কথাই নেই, দিনের পর দিন মন্তব্যের পর মন্তব্যের ঝড় বইয়ে দিয়ে আলাপ পাতার সাইজ কয়েক মেগাবাইট বানিয়ে ফেলতে তারা পিছপা হয়না। ফলে উইকিপিডিয়ার বেশ কিছু বিতর্ক মিমাংশা হয়না কখনোই। এর মাঝে হাস্যকর কিছু ইস্যু যেমন আছে (তারিখ লেখার সিস্টেম কি মার্কিনী নাকি ইংরেজি হবে, বলিউডের সিনেমাগুলো কি হিন্দি নাকি উর্দু, নাকি হিন্দুস্তানী ভাষার), তেমনি আছে গুরুতর সব বিষয় (জলবায়ু পরিবর্তন, ফিলিস্তিন-ইজরায়েল বিতর্ক, তুর্কি-আর্মেনিয় বিতর্ক)। গুরুতর ঝগড়া মেটাতে শেষ রক্ষা হলো উইকির নিজের আর্বিট্রেশন কাউন্সিল বা সালিশী বোর্ড, যেখানে “মামলা” দায়ের করে কোনো বিষয়ের মিমাংসা করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তার পরেও রয়ে যায় গুরুতর সব বিতর্ক।

তাহলে চলে কীভাবে উইকি?

যাহোক, এর পরেও উইকিপিডিয়া চলছে। আম জনতা মোটের উপরে কুতর্ক অপছন্দ করে, এই থিওরিটা উইকির সাফল্যেই প্রমাণিত। তবে উইকির নিবন্ধগুলোর সবগুলো নিরপেক্ষ নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে চরমপন্থী লেখকগোষ্ঠী তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আর গলাবাজির জোরে নিজেদের দিকে নিবন্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে বটে। ভারতীয়, চীনা, কিংবা আর্মেনিয় উইকিপিডিয়ানেরা এর উদাহরণ — উইকিতে এসব দেশের বিপক্ষে যায় এমন কিছু লিখে পার পাওয়াটা বেশ কঠিন, সাথে সাথে ঝাঁপিয়ে পড়বে এসব দেশের হাজারো উইকিপিডিয়ান সেই মতের বিপক্ষে লড়তে। দুঃখজনক হলো, বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করার মতো সেরকম কাউকে পাওয়া যায় না, ফলে উইকিযুদ্ধ মহাসমারোহে শুরু হয়েও হয়ে পড়ে স্থবির, কিংবা শর্মিলা বোসের মতবাদ উইকিতে প্রতিষ্ঠা পাওয়া ঠেকাতে হাতে পায়ে ধরে অনুরোধ করতে হয় সবাইকে। সে তুলনায় বাংলাদেশ বা তার স্বাধীনতাবিরোধী চরমপন্থীরা বেশ নিবেদিতপ্রাণ। সব দেশেই তাই। ফলে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণাত্মক উগ্র জাতীয়তাবাদী মতবাদ যেমন ধীরে ধীরে ঢুকে যাচ্ছে উইকিতে, তেমনি করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের নিবন্ধেও সুক্ষ্ণভাবে চুনকামের কাজটা চলছে। উইকিতে দেয়ার মতো সময় সবার না থাকলেও এই চরম নিবেদিতপ্রাণ চরমপন্থীদের কিন্তু ঠিকই আছে

http://www.sachalayatan.com/node/41760

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: