ভূমিকম্প ও বাংলাদেশ — প্রথম পর্ব

বিজ্ঞানের বিষয় নিয়ে ব্লগ লেখার হ্যাপা অনেক। সমীকরণ এড়িয়ে জটিল কারিগরি বিষয় সহজবোধ্য করে লেখা খুব কঠিন কাজ। অনেক সময় লেখার আকার সীমিত রাখতে গিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আলোচনার বাইরে রাখতে হয়। ফলে কোন জটিল বিষয়কে অতিসরলীকরণ করে বোঝাতে গিয়ে ব্যর্থ হলে বরং বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

আগেভাগেই বলে নেয়া ভাল যে ভূমিকম্প সম্পর্কে আমার পড়াশোনা আর মহাকাশ সম্পর্কে জোকার নায়েকের জানাশোনা প্রায় একই পর্যায়ের! তাই এ বিষয়ে আমাকে বিদগ্ধ পণ্ডিত ভাবা জোকার নায়েককে হাবুল পণ্ডিত [Edwin Hubble] ভেবে নেয়ার মতোই মুর্খামি। ভূমিকম্প সম্পর্কে আমি যা জানি তা পরীক্ষা পাশের উদ্দেশ্যে “চোথা” মুখস্ত করে শেখা। নিউটনের সেই বিখ্যাত জ্ঞানসাগরের তীরে নুড়ি কুড়ানোর উপমার সাথে তুলনা করলে বলতে হয় ভূমিকম্প সম্পর্কে আমি যা জানি তা জ্ঞানসাগরের তীরে নুড়ি কুড়ানোর উদ্দেশ্যে কক্সবাজার যাওয়ার জন্য ঢাকায় বাসের টিকেট কিনতে যাওয়ার পরিকল্পনা করার সমান।

সিরিজের শুরুতে ভূমিকম্পের কারণ ও উৎপত্তি নিয়ে ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সংক্ষেপে আলোচনা করব। পরবর্তীতে বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধে আমাদের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে। সিরিজটি পড়তে গিয়ে কারো মাথায় যদি কোন প্রশ্নের উদয় হয় তাহলে নির্ভয়ে মন্তব্য অংশে গিয়ানজাম শুরু করতে পারেন। কেননা কবি বলেছেন, “There are no dumb or stupid questions as long as they make sense.”

যেহেতু, বিজ্ঞানের বিষয়ে গোঁজামিল দিয়ে সহজে পার পাওয়া সম্ভব নয় আবার আমার বিদ্যার দৌড় দিয়েও পাঠকের সব প্রশ্নের জবাব দেয়া অসম্ভব তাই অভিজ্ঞদের আহ্বান জানাই পাঠকের প্রশ্নের জবাবে সহায়তা করার জন্য।

.:*~*:._.:*~*:._.:*~*:._.:*~*:._.:*~*:._.:*~*:._.:*~*:._.:*~*:._.:*~*:.

গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১১ বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬ টা ৪২ মিনিটে ঢাকাসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের মাটি কেঁপে উঠেছিল ভূমিকম্পের প্রভাবে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের সিকিম অঞ্চলে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর [ইউএসজিএস] এর তথ্যানুসারে ভূমিকম্পটির মাত্রা প্রাথমিকভাবে রিখটার স্কেলে ৬.৮ নির্ধারণ করা হলেও পরবর্তীতে সংশোধিত মাত্রা হিসাবে ৬.৯ বলা হয়েছে।

ইউএসজিএসের প্রতিবেদন অনুসারে উক্ত ভূমিকম্পে সিকিম–বিহার–পশ্চিমবঙ্গ মিলিয়ে কমপক্ষে ৯৪ জন মানুষ নিহত হয়েছে। নেপালে নিহত হয়েছে ৬ জন, তিব্বতে ৭ জন, ভূটানে ১ জন। শুধুমাত্র ভারতের মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ২২.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমান! বিডিনিউজের খবর অনুযায়ী ঢাকায় কয়েকটি দালান ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়াও উত্তর বঙ্গে কিছু দালানে ফাটল ধরার কথা শোনা গেছে।

ভূমিকম্পের প্রভাবে কোন স্থান কী পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্থ হবে তা মূলত নির্ভর করে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে সে স্থানের দূরত্বের উপর। উৎপত্তিস্থল থেকে দূরত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে ভূমিকম্পের ক্ষতির মাত্রা কমতে থাকে। ১৮ সেপ্টেম্বরের ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল থেকে ঢাকা শহরের দূরত্ব ৪৯৫ কিলোমিটার। ফলে উৎপত্তিস্থলে ভূমিকম্পটির মাত্রা রিখটার স্কেলে ৬.৯ হলেও ঢাকার অধিবাসীরা যে ধরনের কম্পন অনুভব করেছে তা বড়জোর ৪–৪.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে সৃষ্ট কম্পনের সমান। ইউএসজিএসের ‘দূরত্ব বনাম প্রাবল্য’ লেখচিত্র অনুসারে বাংলাদেশে যে ধরনের কম্পন অনুভূত হয়েছে তা রিখটার স্কেলে ৩.৫ থেকে ৫ মাত্রার ভূমিকম্পে সৃষ্ট কম্পনের সমান।

প্রশ্ন করা যেতে পারে ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ঢাকার আশেপাশে হলে কী ঘটতো? এ প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর পরবর্তীতে আসবে। আপাতত দেখা যাক ৪.৫ মাত্রার ভূমিকম্পের তুলনায় ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প কত বেশি শক্তিশালি!

ভূমিকম্পে নিঃসৃত শক্তির পরিমাণ হিসাব করলে একটি ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প ৪.৫ মাত্রার ভূমিকম্পের তুলনায় ৩,৯৮১ গুণ বেশি শক্তিশালি! রিখটার স্কেলে ৬.৯ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে যে পরিমাণ শক্তি নির্গত হয় তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোশিমায় বিস্ফোরিত ‘লিটল বয়’ বোমাটির চাইতে প্রায় ২২.৫ গুণ বেশি।

প্রথমে শুরু করা যাক ভূমিকম্পের সংজ্ঞা দিয়ে। স্কুলে পড়ার বয়সে পাঠ্যবইতে পড়েছিলাম, “ভূ–অভ্যন্তরে শিলাস্তরে আন্দোলনের ফলে ভূপৃষ্ঠে যে কম্পনের সৃষ্টি হয় তাকে ভূমিকম্প বলে।” ভূ–অভ্যন্তরে কারা আন্দোলন করে, কীসের দাবিতে আন্দোলন করে তা সে আমলের পাঠ্যবইগুলো থেকে জানার কোন উপায় ছিল না। স্কুলবেলার সে সময়ের বইগুলোয় ‘এসো নিজে করি’ শিরোনামে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণগুলো এত বেশি ঘোলাটে ভাষায় লেখা থাকতো যে একমাত্র চুনের পানিতে রাংতা কাগজ চুবিয়ে গ্যাসীয় বুদবুদ তৈরি করার পরীক্ষাটি ছাড়া আর কোন কিছু নিজে করে দেখা ছিল খুব কঠিন কাজ। তাছাড়া শিক্ষকদের ‘আউট প্রশ্ন’ জিজ্ঞেস করে খামাখা পিটুনি খাওয়ার মতো বেকুবি করার কোন আগ্রহ ছিল না বিধায় ‘মাটি কাঁপলে তাকে ভূমিকম্প বলা হয়’ জানতে পেরেই সন্তুষ্ট ছিলাম।

পড়তে শেখার বয়সে একটা হিন্দি সিনেমা দেখেছিলাম। ভিডিও ক্যাসেটের স্পাইনে আংরেজিতে লেখা হিন্দি শব্দটি সিলেবল ধরে বানান করে পড়ে সিনেমার নাম জেনেছিলাম ‘ভুখা এমপি’। পরে বড়দের মুখে শুনেছিলাম ক্যাসেটের গায়ে আংরেজিতে যা লেখা আছে তার বাংলা করলে দাঁড়ায় ভূমিকম্প। সেদিন কেউ বলে না দিলেও বুঝেছিলাম মন্ত্রী–এমপিরা ক্ষুধার্ত থাকলে দেশে ভূমিকম্প হয়!

মন্ত্রী–এমপিদের লুটপাট ছাড়াও ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার পেছনে যেসব কারণ জড়িত সেগুলোকে মোটাদাগে: (I) পৌরাণিক কারণ, (II) মারফতি কারণ, ও (III) প্রাকৃতিক কারণ – এই তিনভাগে ভাগ করা যেতে পারে।

পৌরাণিক কারণসমূহ:

  • নর্স পুরাণ অনুসারে দেবতা বলডারকে হত্যার কারণে দেবতা লকিকে [লকির পরিচয় জানতে হলিউডের বস্তাপচা সিনেমা ‘থর’ দেখুন] গুহায় শিকলবন্দী করে রাখা হয়েছে। লকির মাথায় এক বিষধর সাপ। সেই সাপ একটু পরপর লকির মাথা লক্ষ্য করে বিষ ঢালে। বিষের হাত থেকে লকিকে বাঁচাতে পাশে দাঁড়িয়ে তার স্ত্রী সেজিন [Sigyn] তা একটা পাত্রে সংগ্রহ করে। পাত্রটা ভরে এলে সেজিন বিষটুকু মাটিতে ফেলে দিয়ে পাত্র খালি করে। পাত্রটা খালি করার সময় বিষের হাত থেকে নিজের মুখমণ্ডলকে বাঁচাতে লকি ভয়ানকভাবে নড়াচড়া করে। ফলে শিকলের টানাটানির কারণে পৃথিবীতে ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। [উইকিপিডিয়া]
  • গ্রীক পুরাণ অনুসারে পাতাল দেবতা পসাইডনের [Poseidon] মেজাজ–মর্জি খারাপ থাকলে সে হাতে ধরা ত্রিশূল দিয়ে মাটিতে সজোরে আঘাত করে। তখন ভূমিকম্পসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটিত হয়। [উইকিপিডিয়া]
  • জাপানি উপকথা অনুসারে নামাজু [Namazu] নামের বিশাল মাগুর মাছ মাটির গভীরে কাদার ভেতর বাস করে। নামাজুকে পাহারা দিয়ে রেখেছে দেবতা কাসিমা। কাসিমা যখন কাজে ফাঁকি দেয় তখন নামাজু পালাবার জন্য ঝাপটাঝাপটি করে। নামাজুর ঝাপটাঝাপটির ফলাফলে পৃথিবীতে ভূমিকম্প হয়। [উইকিপিডিয়া]
  • বাঙালি পুরাণের খোঁজ নিয়ে লাভ নাই। বাঙালি বড় বিস্মৃতিপরায়ণ এক চুতমারানি জাতি। মাত্র চল্লিশ বছর আগে ঘটে যাওয়া ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যার কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে সে গণহত্যায় জড়িত শুয়োরদের ক্ষমতার শীর্ষে তুলে দেয় এই জাতি। যে জাতি চল্লিশ বছরের ইতিহাস মনে রাখতে পারে না তাদের হাজার বছরের পৌরাণিক গালগল্প টিকে থাকবে এমনটা ভেবে নেয়া নেহায়েত বোকামি।

পৌরাণিক গালগল্প এখানেই শেষ। আগ্রহীরা চাইলে গুগলে অনুসন্ধান করে ভূমিকম্পের পৌরাণিক কারণগুলো আরো বিস্তারিতভাবে পড়ে দেখতে পারেন।

মারফতি কারণসমূহ:

  • ছেলেবেলায় গ্রামের মুরুব্বিদের মুখে শোনা গল্প থেকে জেনেছিলাম প্লেটের মতো চ্যাপ্টা পৃথিবীকে একটা গরু তার শিংয়ের উপর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গরুটা যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন সে পৃথিবীকে এক শিং থেকে অন্য শিংয়ে স্থানান্তর করে। স্থানান্তরের সময় যে ঝাঁকুনি হয় সেটাই ভূমিকম্প। গরুটা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে সে প্রশ্ন অবান্তর। কারণ মুরুব্বিদের মুখের উপর কথা বলে কেবল ‘ব্যাদ্দপ পোলাপাইনেরা’।
  • ছেলেবেলায় এক পাড়াতো নানীর কাছে আরবি শিখতাম। সহায়সম্বলহীন বৃদ্ধা নানী পাড়ার ছেলেমেয়েদের স্বল্পমূল্যে আরবি শিক্ষা দিয়ে যে মাসোহারা পেতেন তা দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে জীবনযাপন করতেন। পড়তে পড়তে বিরক্তি ধরে গেলে নানীকে বাধ্য করতাম গল্প বলার জন্য। একদিন গল্পচ্ছলে নানী বলেছিলেন, পৃথিবীতে একজন মুসলমান যখন ক্ষুধার জ্বালায় কাতর হয়ে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে। তখন তার ফরিয়াদে আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠলে ভূমিকম্প হয়। বেঁচে থাকলে নানী দেখতে পেতেন এ বছর মুসলিম অধ্যুষিত সোমালিয়ায় দুর্ভিক্ষে না খেতে পেয়ে মারা গেছে ২৯,০০০ শিশু যাদের বয়স পাঁচ বছরের কম! কানে তুলো গুঁজে আর পাছায় ফেভিকল মেখে আরশে না বসলে ২৯,০০০ শিশুর আর্তচিৎকারে কাঁপুনির চোটে আরশ থেকে আলোর বেগে ছিটকে পড়ার কথা আল্লাহর।
  • আব্রাহামিক ধর্মগ্রন্থগুলো অনুসারে মানুষকে তাদের পাপ সম্পর্কে সাবধান করতে এবং ক্ষেত্রবিশেষে শাস্তি প্রদান করার কাজে সর্বশক্তিমান স্রষ্টা ভূমিকম্প ব্যবহার করেন। স্রষ্টা ইচ্ছা করলেই যেখানে পাপী মানুষদের পাপের পথ থেকে সরিয়ে আনতে পারেন সেখানে তা না করে ধ্বংসযজ্ঞে এত আগ্রহী হবার পেছনের যুক্তিটি কোনোদিন বুঝতে পারলাম না!
  • ভারতের গো–সেবা মিশনের স্বামী কৃষ্ণানন্দজী মহারাজ বিস্তর গবেষণা করে ব্যাপক হারে গরু নিধনকে ভূমিকম্পের মূল কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। তার কথা একটাই, গরু বাঁচলে দুনিয়া বাঁচবে।
  • অসমর্থিত সূত্র থেকে জানা গেছে দেওয়ানবাগী হুজুরের বদদোয়ার কারণে নাকি ভূমিকম্প হয়। চোখ টিপি
  • নারীদের বেপর্দা চলাফেরাকেও ভূমিকম্পের কারণ হিসাবে ধরা হয়। [কৃতজ্ঞতা: ফাহিম হাসান]
  • এছাড়াও, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারকে ভূমিকম্পের কারণ মনে করেন কেউ কেউ। চোখ টিপি

প্রাকৃতিক কারণসমূহ:

  • ভূপৃষ্ঠে বা ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি গভীরতায় বড়মাত্রার বিস্ফোরণ [নিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ, গ্যাস অনুসন্ধানী কূপে বিস্ফোরণ, খনিতে বিস্ফোরণ ইত্যাদি] ঘটলে মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি হতে পারে। এ ধরনের ভূমিকম্পকে প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্ট ভূমিকম্প না বলে মনুষ্যসৃষ্ট ভূমিকম্প বলাই যুক্তিযুক্ত।
  • আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ও অগ্নুৎ্পাতের সময় সাধারণত ভূমিকম্প সংঘটিত হয়।
  • ভূমিকম্পের মূল কারণ হিসাবে টেকটোনিক বলের প্রভাবকে দায়ী করা যায়। ভূতত্ত্বের কিছু প্রাথমিক বিষয় জানলে টেকটোনিক বলের কারণে কীভাবে ভূমিকম্প তৈরি হয় তা ভালভাবে বোঝা সম্ভবপর হবে।

টেকটোনিক বলের কারণে ভূমিকম্পের উৎপত্তি বুঝতে হলে প্রথমে পৃথিবীর আভ্যন্তরীণ কাঠামো [internal structure] সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা দরকার। পৃথিবী অনেকটা পাকা আমের মতো। আমরা জানি যে পাকা আমের বাইরের দিকটা পাতলা চামড়া দিয়ে মোড়ানো, মাঝের স্তুরটি চটচটে সুস্বাদু হলদে ধরনের এবং একেবারে ভেতর দিকে মাঝখানে একটা শক্ত বিচি বিদ্যমান। আমের মতো পৃথিবীও তিন স্তর বিশিষ্ট। স্তুরগুলো যথাক্রমে ভূত্বক [Crust], গুরুমণ্ডল [Mantle], ও কেন্দ্রমণ্ডল [Core] নামে পরিচিত।

পৃথিবীর একেবারে বাইরের স্তরটি যাকে আমার ভূত্বক বা ভূপৃষ্ঠ নামে ডাকি তা অনেকটা আমের পাতলা চামড়ার মত। ভূত্বককে ইংরেজিতে ক্রাস্ট [Crust] বলা হয়। ভূত্বক আবার দুই ধরনের। মহাদেশগুলো যে ধরনের ভূত্বক দ্বারা গঠিত তার নাম মহাদেশীয় ভূত্বক বা কন্টিনেন্টাল ক্রাস্ট [Continental Crust] আর মহাসাগরগুলো মহাসাগরীয় ভূত্বক বা ওশিয়ানিক ক্রাস্ট [Oceanic Crust] দ্বারা তৈরি।


পাকা আমের মতো পৃথিবী [ছবিসূত্র]

মহাদেশীয় ভূত্বকের গড় পুরুত্ব [average thickness] ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার। তবে কিছু কিছু জায়গায় তা দেড়–দুইশো কিলোমিটার গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত। মহাসাগরীয় ভূত্বকের গড় পুরুত্ব ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার। ঘনত্বের দিক দিয়ে মহাদেশীয় ভূত্বকের তুলনায় মহাসাগরীয় ভূত্বকের ঘনত্ব কিছুটা বেশি। কারণ মহাদেশীয় ভূত্বকের শিলাস্তর মূলত অ্যালুমিনাম/অ্যালুমিনিয়াম সিলিকেটস ঘটিত খনিজে ভরপুর অন্যদিকে মহাসাগরীয় ভূত্বকের শিলাস্তর ম্যাগনেশিয়াম সিলিকেটসঘটিত খনিজে ভরা।

ভূত্বক আবার বিভিন্ন টুকরায় বিভক্ত। টুকরাগুলোকে ‘টেকটোনিক প্লেট’ বলা হয়। মহাদেশের টুকরাগুলোকে ‘কন্টিনেন্টাল প্লেট’ ও মহাসাগরগুলোর টুকরাকে ‘ওশিয়ানিক প্লেট’ বলা হয়।


চিত্রে মহাদেশীয় ও মহাসাগরীয় টেকটোনিক প্লেটগুলো দেখানো হচ্ছে (বড় করে দেখতে ছবির গায়ে ক্লিক করুন)। [ছবিসূত্র]

ভূত্বকের নিচে যে স্তর আছে [পৃথিবীর মাঝের স্তর] সাহেবদের ভাষায় তার নাম ম্যান্টল [Mantle]। ম্যান্টলের বাংলা নাম গুরুমণ্ডল। ম্যান্টল শব্দের বাংলা ভাষান্তর করলে দাঁড়ায় প্রদীপের শিখার উজ্জ্বল আবরণ। অর্থাৎ প্রদীপের শিখার হলদেটে অংশকে ম্যান্টল বলা যেতে পারে। গুরুমণ্ডলের গড় পুরুত্ব প্রায় ২,৮৯০ কিলোমিটার।

গুরুমণ্ডলের উপরের স্তরের উপরের অংশ [uppermost solid mantle] ভূত্বকের মতোই কঠিন শিলা দিয়ে তৈরি। ম্যান্টলের উপরের স্তরের কঠিন অংশ এবং ভূত্বক একত্রে মিলে অশ্মমণ্ডল বা লিথোস্ফিয়ার [lithosphere] তৈরি করেছে। একটু আগে যে টেকটোনিক প্লেটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা মূলত অশ্মমণ্ডল বা লিথোস্ফিয়ারের টুকরা। অশ্মমণ্ডলের পুরুত্ব ৫০ থেকে ১২০ কিলোমিটারের মতো।

অশ্মমণ্ডল বা লিথোস্ফিয়ারের নিচে গুরুমণ্ডলের উপরের স্তরের আরেকটি অংশ অতি উচ্চ সান্দ্রতা বিশিষ্ট [highly viscous] এবং অতিমাত্রায় নমনীয় [plastic] ধরনের। এই অংশকে অ্যাসথেনোস্ফিয়ার [Asthenosphere] বলে। অ্যাসথেনোস্ফিয়ারের পুরুত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার।


পৃথিবীর আভ্যন্তরীন কাঠামো [ছবিসূত্র]

গভীরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে চাপ বৃদ্ধির ফলে ম্যান্টলের গলিত শিলাস্তরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ম্যান্টলের নিচের দিকে থাকা শিলাস্তর হালকা হয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকে এবং নিচের শুন্যস্থান পূরণ করতে ম্যান্টলের উপরের দিক থেকে অপেক্ষাকৃত কম গরম শিলা নিচের দিকে নামতে থাকে। ফলে ম্যান্টলের ভেতর একধরনের ঘূর্ণির সৃষ্টি হয়। ম্যান্টলের ভেতরের এই ঘুর্ণিকে বলা হয় পরিচলন [mantle convection]। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঘুর্ণিঝড় সৃষ্টির প্রক্রিয়াও প্রায় একই ধরনের।


গুরুমণ্ডলে পরিচলন প্রক্রিয়া[ছবিসূত্র]

ম্যান্টলের ভেতর তরল শিলাস্তরের ঘুর্ণির কারনে অ্যাসথেনোস্ফিয়ারের উপরে ভেসে থাকা লিথোস্ফিয়ারের টুকরাগুলো [মহাদেশ ও মহাসাগরগুলো] অতি ধীর গতিতে বছরে ১ থেকে ১০ সেন্টিমিটার গতিতে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরে যাচ্ছে।

এতক্ষণ যা পকপক করলাম তার সারসংক্ষেপ করলে দাঁড়ায়– পৃথিবী তিনস্তর বিশিষ্ট। পৃথিবীর বাইরের দিকের লিথোস্ফিয়ারের টুকরাগুলো ম্যান্টলে সৃষ্ট শিলাঘুর্ণির কারণে অতি ধীর গতিতে স্থান পরিবর্তন করছে। এর সাথে ভূমিকম্পের কী সম্পর্ক তা পরের পর্বে লিখবো। আপাতত দুটো ভাত খেয়ে এক কাপ চা খাই। চোখ টিপি

http://www.sachalayatan.com/node/41420

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: