গল্প আর ছবিঃ আজ আমাদের পঞ্চাশ বছর

১.

ঢাকার টিচার্স ট্রেনিং কলেজের ভেতরে সরু একটা রাস্তা আছে। সেই রাস্তার দুই দিকে বড় বড় সব গাছ এবং পাশেই একটা খেলার মাঠ। রাস্তার পাশে চটপটিওয়ালা, ফলবিক্রেতা আর আইসক্রিমওয়ালার হাঁকডাক আছে। মাথার উপর একটা নীল রঙের বড় আকাশও আছে। সকালে আর বিকেলে সেই রাস্তা আর মাঠ সরগরম থাকে। চোখ বুজলেই এই রকম একটা ছবি আমি আজও দেখতে পাই।

বহু বছর আগে এই দৃশ্যের ভেতর আমিও প্রবেশ করি, এক শীতের সকালবেলা। আমার পরনে ছিল ঘরে বানানো সবুজ রঙের সোয়েটার তার নিচে সাদা একটা সার্ট, নীল রঙের হাফপ্যান্ট আর পিঠে একটা ব্যাগ। আমার একটা হাত মায়ের হাত ধরে আছে…আমরা এগিয়ে চলছি যেন এক স্বপ্নময় পথ ধরে। দৃশ্যটা এখনো অমলিন আছে যদিও বাকি সবকিছুই মলিনতার গর্ভে চলে গেছে।

আমি ধীরে ধীরে সেই রাস্তাটা দিয়ে এগিয়ে চলি। রাস্তাটার শেষ মাথায় একটা গেট, সত্যিকারের গেট নয়, কাঁটাতারের বেড়া সরিয়ে তৈরি করা সরু একটা প্রবেশপথ। সেই পথ দিয়ে ঢুকলে হলুদ রঙের প্রকাণ্ড একটা ভবন চোখে পড়বে সেই সঙ্গে বিশাল একটা খেলার মাঠ। স্কুল ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে, খাঁ-খা মাঠের মাঝে শুধু নিঃসঙ্গ উড়ছে সবুজ আর লাল রঙের একটা পতাকা। আমি দুরু দুরু পায়ে প্রবেশ করি জীবনের প্রথম বিদ্যালয়ে। আমাদের সেই স্কুল ঘরে।

আজও বুড়ো হয়নি সেই স্কুলটা। কি এক যাদুমন্ত্রবলে সেখানে পা-রাখলে আমিও সময়কে অগ্রাহ্য করে উলটো পথে হাঁটতে পারি। অনায়াসে ফিরতে পারি রুহুল আমিন স্যারের ক্লাসে, অথবা হাশেম স্যারের ক্লাস থেকে পালাতে পারি, হালদার স্যারের পিলে চমকানো ধমক শুনতে পারি, মতিউল্লাহ স্যারের মার হজম করতে পারি।

২.

একটা প্রশ্ন সর্বদাই আমাকে ভাবিত করতো। আমাদের স্কুলের নাম ল্যাবরেটরি স্কুল কেন? একটু বড় হয়েই উত্তরটা পেয়ে গিয়েছিলাম, আজকে অনেক বছর দেখলাম কেউ একজন তথ্যটা উইকিতে তুলে রেখেছেন।

গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের যাত্রা শুরু হয় ১৯৬১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন জনাব খান মুহাম্মদ সালেক। স্কুলটি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রশিক্ষণরত শিক্ষার্থীদের প্র্যাকটিস টিচিং এর সুযোগ প্রদান করা। ‘ল্যাবরেটরি স্কুল’ নামকরণ সেই উদ্দেশ্যেরই প্রকাশবহ। ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ জনাব মুহম্মদ ওসমান গণির ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় স্কুলটি স্থাপিত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার পর প্রধান শিক্ষকসহ ১৪ জন শিক্ষককে নিয়ে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রদের ক্লাস শুরু হয়।

প্রতিবছরই একমাস আমাদের স্কুলের ক্লাস নিতেন প্রশিক্ষণরত শিক্ষকরা, আমরা ওঁদের বলতাম পিটি স্যার। ওঁরা আমাদের তোয়াজ করে রাখতেন, চকলেট আর টফিও দিতেন কেউ কেউ। কারণ উনারা ক্লাসে কি পড়াচ্ছেন সেটা পরিদর্শন করতে আসতেন ওনাদের শিক্ষকরা। আমরা ক্লাসে ঠাণ্ডা থাকলে ওনাদের পাশমার্ক সেটা। ওই একমাস বাদ দিলে বাকিটা সময় আমাদের ক্লাস নিতেন আমাদের স্কুলের শিক্ষকরাই – মার্কিন দেশের আদলে বলা যায় ওনারা সব টেনিওর্ড, সুতরাং শপাং শপাং বেতের বাড়ি মারতে একদমই কুন্ঠা করতেন না।

আমাদের পরিবার ছেলেদের অধিকাংশই ল্যাবরেটরি স্কুলের ছাত্র ছিলেন। স্কুলের প্রথম দিককার ছাত্র ছিলেন আমার ছোটমামা। উনি যেই বছর পাশ করে যান আমার বড়ভাই ঠিক সেই বছরটিতে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হন। একই সময় আমার অনেক কাজিনই পড়তেন ল্যাবরেটরি স্কুলে। আমার বড়ভাই যেই বছর পাশ করেন – ঠিক সেই বছর আমি ভর্তি হই ক্লাস ওয়ানে। আমি পাশ করে চলে আসতে আসতেই আমার ছোটমামার সন্তানরা ওই একই স্কুলে ভর্তি হয়। এভাবে জন্মলগ্ন থেকে আমরা এই স্কুলের অংশিদার। স্কুলের ইউনিফর্ম ছিল সাদা রঙের সার্ট আর নীল রঙের প্যান্ট। এই রঙের পোশাক পরা কাউকে দেখলে আজও সেই মাঠটা কথা মনে হয় – যেখানে সকাল-বিকাল ভিড় করত নীল আর সাদা রঙ, তাদের বয়স পাঁচ থেকে পনেরো, চোখে মুখে বিস্ময়মাখা।

৩.

স্কুলে থাকতে আমরা সেপ্টেম্বর মাসের তিন তারিখ একটা উৎসব করতাম। ওটার নাম ছিল “স্কুল ডে”। স্কুল ডে’র আগের সাত-আট দিন কোনো ক্লাস হতো না। প্রতিটি ক্লাসের ছেলেরা তাদের ক্লাসটরুমটাকে সাজাতো- রঙিন কাগজের শেকল, দেয়াল পত্রিকা, হাতে আঁকা ছবিতে পুরো স্কুলটাই যেন নতুন চেহারা পেয়ে যেত। স্কুল ডে’র দিন ঘোষণা করা হতো কাদের সাজ সবচেয়ে সুন্দর হয়েছে। একবার এই স্কুল ডে বন্ধ করে দেওয়ার কথা উঠলে স্যারেরা সেটার প্রতিবাদ করেন। আমি যতদিন পর্যন্ত স্কুলে থেকেছি ততদিন পর্যন্ত এই ট্র্যাডিশনটা বহাল তবিয়তেই ছিল। স্কুল ছেড়ে আসার পরে ২৫ বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে, আজও সেপ্টেম্বর মাস আসলে স্কুল ডে’র কথা মনে পড়বেই। এখনকার ছেলেরা কি এই দিনটা পালন করে?

ল্যাবরেটরি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা হেডমাস্টার ছিলেন খান মুহাম্মদ সালেক। আমরা স্কুলে ঢোকার অল্প কয়েকদিন আগেই উনি স্কুল থেকে বদলি হয়ে যান। ততদিনে স্কুলটা বয়েস ১৫ পেরিয়ে গেছে, উনার শ্রমে তখন ঢাকা শহরে সেরা স্কুল হিসাবে বিবেচিত হতো আমাদের সেই স্কুলটা। আজকের ল্যাবরেটরিয়ানরা কি কিংবদন্তিতুল্য সালেক স্যারের কথা জানে?

৪.

“শোন রাতে ভালো করে ঘুমাইস…” রহস্যময় হাসি এসে জুনায়েদ সন্ধ্যার পর পর বিদায় নিল। একটু খটকা নিয়েই শুতে গেলাম। রাত তিনটার সময়ে বিকট শব্দে অ্যালার্ম ঘড়িটা বেজে ওঠার পর সেই হাসির মানে বুঝতে পারলাম। বিদায় নেওয়ার আগে সে গভীর রাতে বিকট চাইনিজ অ্যালার্ম সেট করে গেছে। সকালে জুনায়েদ একগাল হেসে জিজ্ঞেস করল…কিরে ভালো ঘুম হইছে?

অঞ্জনের কাছ থেকে ধার করে এনেছি গোয়েন্দা উপন্যাস, রাত জেগে পড়ব। আয়োজন করে বইটা খুলতেই দেখলাম প্রথম পৃষ্ঠায় বড় বড় করে লেখা খুনির নাম…সেই নাম এতোবার লেখা যে ওটাকে বাদ দিয়ে বইটা পড়া সম্ভব না। ধুশ-শালা বলে বইটা ছুঁড়ে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

নাইনের হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষায় অঙ্ক খাতা পাওয়ার পর পাপু স্যারের কাছে অভিযোগ করল – স্যার আপনি আমাকে কম নম্বর দিয়েছেন – আমার পাওয়ার কথা ১০০ এর মধ্যে ১০ অথচ আপনি আমাকে ২ দিয়েছেন…

আজ এই ছেলেগুলোর কেউ চাকুরিজীবি, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ শিক্ষক অথবা কেউ ব্যাংকার। ওদের সাথে কদাচিৎ দেখা হয়। এই বিচ্ছু ছেলেগুলোকে এখন মানুষজন ভদ্রলোক বলে সম্বোধন করে…আমরা কতো রকম ভ্রান্ত ধারণা নিয়েই বাস করি।

স্কুল নিশ্চয়ই লেখা পড়ার জায়গা। কিন্তু এর বাইরেও স্কুল হচ্ছে বন্ধু তৈরির কারিগর। আমাদের স্কুলের তৈরি করা অনেক বন্ধুরা এখনো আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে আছে – সময়ে-অসময়ে তাদের ফোনকল আমাকে টেনে নিয়ে যায় উজানে…বহু দূরের এক উজ্জ্বল শহরে, যেখানে সকাল সাড়ে দশটায় একটা স্কুলে ক্লাস শুরু হয়। সেই ক্লাসে স্যারদের গর্জন আছে, আছে বেতের বাড়ির ভয়। সেগুলোর সাথে সাথে আছে অনবিল আনন্দের ভাণ্ডার। সেখানে মার খেয়ে মন খারাপ করলে মালুম ভাই নামের এক বুড়ো ঘন্টাবাদক গায়ে হাত বুলিয়ে শান্ত করে দেয়…সেখানে বন্ধুত্ব, অভিমান, রাগ, ক্রোধ, এক কামড় আইসক্রিম – সবই দারুণ মূল্যবান। সেখানে ক্লাস পালানো দারুণ এক অ্যাডভেঞ্চার। প্রবল বর্ষায় পানি উঠে পড়ে স্কুলের বারান্দায়…সেই স্কুলটাই তখন হয়ে যায় জলদস্যুদের জাহাজ! সেই স্কুলের গল্পগুলো আজও শেষ হয়নি।

৫.

আমাদের বাল্যবন্ধু টিপু মাস্তান হতে চেয়েছিল। বেশ চেষ্টা-টেষ্টা করে সে তা-ই হতে পেরেছিল। সেই বোকা ছেলেটা জানতো না যে রাস্তাটা প্রায়ই ওয়ান-ওয়ে রোড এবং এর শেষ মাথাটা খুব দূরে নয়। শেষবার যখন দেখা হয়, আমি বিদায় নেওয়ার সময়ে টিপুকে বলেছিলাম…ভালো থাকিস দোস্ত। টিপু স্বভাবমত জবাব দিয়েছিল…এইটাতো বড় কঠিন কাজ দিলি রে…

আজ থেকে ঠিক এগারো বছর আগে এই সেপ্টেম্বর মাসের ৩ তারিখ জেলের নির্জন সেলে তার মৃত্যু হয়। সেপ্টেম্বর মাসের তিন তারিখ ফিরে ফিরে আসে আনন্দ আর বেদনার স্মৃতি নিয়ে। হঠাৎ কেন যেন বিশালদেহী একটা বালকের মুখ মনে পড়ে – সে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে অথবা রয়ে গেছে জনান্তিকে। তাকে দেখার মতো চোখ নেই আজ।

বিদায় বন্ধু…ভালো থাকিস।

৬.

আমাদের সেই স্কুলটার আজ পঞ্চাশ বছর পূর্তি হলো। এক সময়ে পড়াশোনাতে ল্যাবরেটরি স্কুলের অনেক সুনাম ছিল। আমাদের ব্যাচেও ১২ জন ছাত্র মাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করেছিল। খেলাধূলাতেও বেশ ভালো ছিল স্কুলটা। এখনো মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলে আমি খবরে ল্যাবরেটরি স্কুলের নাম খুঁজে বেড়াই। যেটুকু বুঝেছি যে স্কুলটার সেই সুদিন আর নেই। সেরার তালিকায় আজকাল অচেনা সব নাম। তাতে আমার কোনো ক্ষোভ নেই, আমার শৈশব আর কৈশোরের স্কুলটা এখনো আমার কাছে সবচেয়ে উঁচু। আপন গৌরব নিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে আমার এবং আমার মতো আরও অজস্র মানুষের শৈশব আর কৈশোরের গল্পগাঁথায়। সেটা অমল ধবল অক্ষয়…তাতে চিড় ফেলতে পারেনি মহাপরিক্রমশালী সময়।

আমাদের জীবনটা সময় দিয়ে মেপে ফেলা যায় কিন্তু আমি চাই যেন আমাদের স্কুলটা যেন চির অক্ষয় থাকুক…৫০ থেকে ১০০…১৫০…অনন্তকাল সে বেঁচে থাকুক…হাজারো শিশু আর কিশোরদের প্রথম স্বপ্নভূমি হয়ে।

শুভ জন্মদিন প্রিয় ল্যাবরেটরি স্কুল, তোমার কথা এখনও নির্ভুল মনে পড়ে, বেলা এবং অবেলায়। তুমি ভালো থেকো…আমরাও ভালো আছি।

ছবিসূত্রঃ তৌসিফ সালামের ব্লগ

ঢাকা ল্যাবরেটরি স্কুল

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: