চলুন জেনে নেই বিশ্বের সবচেয়ে বিষাক্ত ১০টি প্রাণী সম্পর্কে

১.Box Jellyfish

পৃথিবীর সবচে বিষাক্ত প্রাণীর মুকুটটি পরে বসে আছে এই অদ্ভুত সুন্দর প্রানীটি। দেখতে অপরুপ হলেও এটি সাক্ষাত মৃত্যুদুত। এর বিষ পৃথিবীতে সবচে শক্তিশালী। সাধারনত এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার সাগরে এদের দেখা মেলে। সাধারনত গভীর সমুদ্রে থাকলেও মাঝে মাঝে খাবারের সন্ধানে বীচের কাছাকাছি এসে পরে।

তখন মানুষ এদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। এরা বেশিরভাগ সময়ে মানুষের পায়ে আক্রমন করে এদের বিষাক্ত হুল দ্বারা।

এর বিষ মানুষের হার্ট, নার্ভ সিস্টেম এবং স্কিন সেল গুলোকে আক্রমন করে এবং নস্ট করে ফেলে। বক্স জেলি ফিসের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ব্যাক্তি প্রবলভাবে কাঁপতে থাকে এবং তখন আস্তে আস্তে ডুবে যায় অথবা তীরে পৌঁছানোর পূর্বেই মারা যায়। আর যারা জীবিত থাকে তারা ব্যাথা ও দূর্বলতা নিয়ে বেঁচে থাকে। যদি অতি দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না নেওয়া হয় তাহলে সারভাইভের কোন আশাই থাকে না।

এর বিষের সবচে ভালো প্রতিষেধক হচ্ছে ভিনেগার। বিষক্রিয়ার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে (কমপক্ষে) ভিনেগার দিতে হবে। ভিনেগারে আছে acetic acid যা জেলি ফিসের বিষকে রক্তে মিশে যেতে বাধা প্রদান করে এবং সেই সাথে ব্যথাও উপশম করে।

————————————————————————————————————————–
২. King Cobra

শঙ্খচূড় বা কিং কোবরা, পৃথিবীর সবচে লম্বা বিষাক্ত সাপ, যার দৈর্ঘ্য হতে পারে ৫.৬ মিটার পর্যন্ত মানে প্রায় ১৯ ফিটের কাছাকাছি!! এটি মূলত সম্পূর্ণ দক্ষিণ এশিয়ার বণাঞ্চল জুড়ে দেখা যায়। ইংরেজি নামে কোবরা শব্দটি থাকলেও এটি কোবরা বা গোখরা নয়। এটি সম্পূর্ণ আলাদা গণের একটি সাপ।

এই সাপের আকার পর্যবেক্ষণ এবং ফণার পেছনের অংশ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গোখরার সাথে এটির পার্থক্য খুব সহজেই নির্ণয় করা সম্ভব। গোখরার তুলনায় শঙ্খচূড় আকৃতিতে যথেষ্ট পরিমাণ বড়।

শঙ্খচূড়ের গণের নাম হচ্ছে Ophiophagus, যার আক্ষরিক অর্থ “সাপ খাদক”, এবং প্রাথমিকভাবে এটি অন্যান্য সাপ ভক্ষণ করেই তার খাদ্য চাহিদা মেটায়। যেসকল সাপ এটি ভক্ষণ করে তার মধ্যে আছে ছোট সাপ, এবং ছোট আকৃতির অজগর। এছাড়াও অন্যান্য বিষধর সাপও এটি ভক্ষণ করে, যেমন: ক্রেইট, গোখরা, এবং নিজ প্রজাতিভুক্ত অন্যান্য ছোট সাপ।

এই সাপের বিষ মূলত নিউরোটক্সিক, অর্থাৎ এটির বিষ আক্রান্ত প্রাণীর স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করে। শঙ্খচূড়ের একটি সাধারণ দংশন-ই যেকোনো মানুষকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট।এর কামড়ের ফলে মৃত্যুর হার প্রায় ৭৫%। বাংলাদেশের সুন্দরবনের গভীরে এই সাপ দেখতে পাওয়া যায়।

———————————————————————————————————————-
৩. Marbled Cone Snail

বিশ্বের সবচেয়ে সেরা ১০ বিষধর প্রাণীর মধ্যে অন্যতম এই মার্বেল কোনা শামুক । এর ইংরেজী নাম marbled cone snail বা Conus marmoreus ।

মাত্র ৬ ইন্চি লম্বা আর ৭-৮ গ্রাম ওজনের এই শামুক নানা রকম সামুদ্রিক কীট-পতঙ্গ ও ছোট মাছ খেয়ে বাঁচে। লোনা পানির সমুদ্রের এই শামুক সর্বোচ্চ ৯০ মিটার গভীর পর্যন্ত যেতে পারে । দেখতে সুন্দর ও ছোট এই শামুকের বিষ এতটাই শক্তিশালী হতে পারে যার এক ফোটা বিষ, যা দিয়ে ২০ জন মানুষকে মারা যায়।

যদিও এই শামুক তার বিষ তাদের শিকার ধরার কাজে ব্যবহার করে। এর দ্বারা মানুষ আক্রান্ত হবার সাথে সাথে অথবা কয়েকদিন পরেও এর লক্ষণ দেখা যায়। যা তীব্র যন্ত্রণা, ফুলে যাওয়া, অনুভূতিহীন এবং ব্যাথায় টন টন করা ইত্যাদি হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় , মাংশপেশির সংকোচন, দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন এবং শ্বাসকষ্ট। এই বিষের কোন প্রতিষেধক নেই।

—————————————————————————————————————————–
৪. Blue-Ringed Octopus

এই ব্লু রিংড অক্টোপাস আকারে অত্যান্ত ছোট, বড়জোর একটা গলফ বলের আকৃতির হয়ে থাকে।

কিন্তু এর বিষকে মোটেও ছোট করে দেখলে হবে না। এটি যে পরিমান বিষ বহন করে সেটি দিয়ে ২৬ জন পুর্নবয়স্ক মানুষকে একমিনিটের মাঝে মেরে ফেলা সম্ভব। এবং এই বিষের কোন প্রতিষেধক নেই।

এটির কামড় যন্ত্রনাহীন হলেও এর মারাত্বক নিউরোটক্সিক বিষ সাথে সাথে কাজ করতে শুরু করে। মাংশপেশীর অসারতা এবং গা গোলানো থেকে এর বিষের লক্ষন শুরু হয় এবং পরিনামে মৃত্যু নিয়ে আসে। জাপান এবং অষ্ট্রেলিয়ার শান্ত সমুদ্রে জোয়ারের সময় এদের দেখতে পাওয়া যায়।

————————————————————————————————————————–
৫. Death Stalker Scorpion

বেশিরভাগ বিচ্ছু মানব জাতির জন্য ক্ষতিকারক নয়, যদিও এদের কামড়ের ফলে স্থানীয়ভাবে সামান্য ব্যথা, অনুভূতিহীন অথবা ফুলে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যায়।

কিন্তু ডেথ স্টকার নামের বিচ্ছু মারাত্মক ক্ষতিকারক একটি প্রজাতি,  যার বিষ সরাসরি স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমন করে।

এবং এর হুলের বিষ এতটাই শক্তশালী যে, অসহ্য যন্ত্রণা, জ্বর, অচেতনতা, মাংশপেশির প্রবল সংকোচন, অবশ এবং সবশেষে মৃত্যু ঘটায়। উত্তর আফ্রিকা এবং মিডল ইস্টে এই বিচ্ছু পাওয়া যায়।

—————————————————————————————————————————
৬. Stone Fish

হয়তো বা পাথুরে মাছ কোন সুন্দরী প্রতিযোগিতায় জিততে পারবে না, কিন্তু “পৃথিবীর সবচে বিষাক্ত মাছ”-এর খেতাব নিশ্চিত জয় করতে পারবে। এর বিষের বিষক্রিয়া এতটাই তীব্র যে, আক্রান্ত ব্যাক্তি যন্ত্রণাদায় দেহের অঙ্গ কেটে ফেলতে চায়।

সমুদ্রের তলদেশে থাকা নানা রকম পাথরের ভাঁজে নিজেকে নিপুন ভাবে আড়ালে করে রাখার ক্ষেত্রে পারদর্শিতা এবং পাথরের ছদ্মবেশ ধারণ করে সবার চোখকে ফাঁকি দেয়ার প্রবনতার কারণে এই প্রানীটিকে ছদ্মবেশীদের গুরু বলে অনেকেই আখ্যায়িত করে থাকেন।

এই প্রাণীর শরীরে ছড়ানো ছিটানো রয়েছে বিষাক্ত কাঁটা এবং এই বিষাক্ত কাঁটা হাঙ্গর ও অন্যান্য লুন্ঠনকারী,অনিষ্টকারী প্রাণীর হাত থেকে তাকে রক্ষা করে।

এই কাঁটার আঘাতে ভিকটিমের হৃৎপিণ্ডের কার্যক্ষমতা লোপ পায় এবং শরীর দ্রুত নিস্তেজ হয়ে আসে। আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা বিলম্বিত হলে তাকে আর বাঁচানো যায় না। পাথুরে মাছ গ্রীস্মমন্ডলীয় দক্ষিনাংশে বাস করে, কদাচিৎ ভারত মহাসাগর,লোহিত সাগর থেকে কুইন্সল্যান্ড পর্যন্ত  বিশাল শৈল প্রতিবন্ধকের শান্ত অগভীর পানিতে দেখা যায়।

——————————————————————————————————————————-
৭. The Brazilian Wondering Spider

২০০৭ সালের গীনিজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড অনুযায়ী সবচেয়ে বিষধর মাকড়সা যা বেশিরভাগ মানূষের মৃত্যুর কারন।  অন্যান্য মাকড়শার চেয়ে এই মাকড়সা অধিক শক্তিশালী বিষ (একটি ইঁদুর মারতে মাত্র ০.০০৬ মিলিগ্রাম যথেষ্ট) নিয়ে বেঁচে থাকে ।

তাদের আশ্চর্য স্বভাবের কারণে তারা অতি ভয়ংকর।  তারা সাধারণতঃ দিনের বেলায় জনাকীর্ণ এলাকায়, বাসগৃহে, কাপড়ে, জুতোর ভেতরে, গাড়িতে লুকিয়ে থাকে।

এটার বিষে শুধু তীব্র যন্ত্রণাই করে না-কয়েক ঘন্টার জন্য অস্বস্তিকর  লিঙ্গোউথ্বান করে  যা পরবর্তীতে নপুংসকতার দিকে ঠেলে দেয়।

————————————————————————————————————————–
৮. Inland Taipan

“পৃথিবীর সবচে বিষধর সাপ”-এর খেতাব আন্তর্দেশীয় (আভ্যন্তরীন/স্থলভাগের) তাইপে । যার একটা মাত্র ছোবলে ১০০জন পূর্ণ বয়স্ক মানুষ অথবা ২,৫০,০০০ সংখ্যক একটা বিরাট দলের ইঁদুর নিধন করার জন্য যথেষ্ট।

এর বিষে সধারণ কোবরা থেকে ২০০থেকে ৪০০ ভাগ বেশি পরিমান টক্সিন থাকে যা মাত্র ৪৫ মিনিটের মধ্যে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষকে মারতে সক্ষম।

যদিও এই প্রজাতি সাপ খুবই লাজুক প্রকৃ্তির এবং কোথাও এর দ্বারা সংঘটিত মানুষের প্রাণনাশের মত বিপর্যয়ের কোন রেকর্ড নেই।

———————————————————————————————————————-
৯. Poison Dart Frog
      * নীলাম্বরী ব্যাঙ (Blue poison arrow frog)

মধ্য এবং দক্ষিন আমেরিকার রেইন ফরেষ্ট গুলোতে সুন্দর ও বিভিন্ন রঙের এই ব্যাঙ গুলো দেখতে পাওয়া যায়। পৃথিবীর অন্যতম বিষাক্ত প্রাণিদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দুই ইঞ্চি (৫সেমি) লম্বা এই জাতীয়  ব্যাঙ,যার বিষ ১০ জন পূর্ণ বয়স্ক মানুষ অথবা ২০,০০০ ইঁদুরকে মারতে সক্ষম।

*কালো কানের ব্যাঙ (Black eared mantilla)

*কালো পেয়ে ব্যাঙ (Black legged dart frog)

                                                     *করোবোরি ব্যাঙ (Corroboree frog)

                                              * স্ট্রবেরি ব্যাঙ (Strawberry poison dart frog)

মাত্র ২ মাইক্রোগ্রাম প্রাণঘাতী বিষ একজন মানুষ বা বৃহৎ কোন স্তন্যপায়ী প্রানির মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট। আমেরিকান রেড ইন্ডিয়ানদের নিয়ে সিনেমায় হয়তো অনেকেই দেখেছেন, তারা বাঁশের মতো চিকন পাইপে ফুঁ দিয়ে তীর ছুঁড়ে শিকার করে। এই পাইপকে বলে ‘ব্লো পাইপ বা ব্লো গান’ আর তীরটাকে বলে ‘ডার্ট’।

                                                       *রংধনু ব্যাঙ (Dyeing dart frog)

                                                *সোনা রঙা ব্যাঙ (Golden poison frog)

                                             *সবুজ ও কালো ব্যাঙ (Green and black poison dart frog)

                                              *বলিভিয়ান ব্যাঙ (Phantasmal poison frog)

তাদের এই তীরের ডগায় বিষ মাখানো থাকে। আর এই বিষ আসে বিষধর ব্যাঙের পিঠ থেকে। তার জন্যে ব্যাঙ মারতেও হয় না। কেবল সেই বিষধর ব্যাঙের পিঠে ডার্টের মাথাটা ঘষে নিলেই হয়।

                                             * হলুদ ডুরে ব্যাঙ (Yellow banded poison dart frog)

সেই থেকে এই ব্যাঙগুলোর নাম হয়ে গেলো Poison Dart Frog/Poison Arrow Frog।

——————————————————————————————————-
১০. Puffer Fish

পৃথিবীর বিষাক্ত প্রাণিদের মধ্যে দ্বিতীয় বিষাক্ত মেরুদন্ডি প্রাণি হচ্ছে এই মাছ (প্রথম  dart Fish)। জাপানে এটি ফুগু নামে  এবং কোরিয়ায় (as bok-uh) নামে পরিচিত। বাংলাদেশে এটি পটকা মাছ নামে পরিচিত। এই মাছ উপাদেয় খাবার হিসেবেও বিশেষ পরিচিত।  কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এর চামড়া এবং ভেতরের কিছু অংশ – যা খুবই বিষাক্ত।

এই প্রাণীটি তার অনিষ্টকারীর উপস্থিতি বা বিপদ আঁচ করতে পারলে নিজেকে রক্ষা করার জন্য ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে গ্লোব বা ফুটবল আকার ধারণ করে এবং টেট্রোডক্সিনা যা কিনা সায়ানাইডের চেয়ে ১০০০ গুন  শক্তিশালী এমন বিষাক্ত পদার্থ আক্রমনকারীর উপর নিক্ষেপ করে।

এই মাছের বিষক্রিয়ায় খুব দ্রুত এবং ভয়ংকরভাবে মৃত্যু হয় । আক্রান্ত ব্যক্তি জিহবা ও ঠোটের অসারতা, মাথা ঘোরানো, বমি, মাংশপেশির অবশ হওয়া, শ্বাসকষ্ট  ইত্যাদি উপসর্গ নিয়ে ২৪ ঘন্টার মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে এবং যার কোন জানা প্রতিষেধক নেই। অনভিজ্ঞ লোকদের দ্বারা ধৃত এবং প্রস্তুতকৃ্ত  fugu থেকে বেশির ভাগ মৃত্যুর কারন ।

পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত জাপানে প্রতি বছর ২০ থকে ৪৪ জন  fugu বিষক্রিয়ার স্বীকার হয়েছে এবং তন্মধ্যে ৬ জনের বেশি মৃত্যু হয়েছে। আর বাংলাদেশে পেপার খুললেই তো দেখা যায় পটকা মাছ খেয়ে অমুক পরিবারের অত জনের মৃত্যু। fugu বিষক্রিয়ায় তাৎক্ষনিক  মৃত্যু হবার কারণে, জাপানে একমাত্র লাইসেন্সধারী রাধুনী(chefs)’দেরকে এটা প্রস্তুতের অনুমতি দেয়া হয়েছে ।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: