কন-টিকি জাদুঘর ও থর হেয়ারডালের সারা জীবন

প্রশান্ত মহাসাগরের সুনীল জলরাশি, যে দিকেই তাকানো যায় না কেন থৈ থৈ অতল নীল জল দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। এই উথাল-পাথাল ঢেউ-এর মাঝেই গাছের গুড়ি দিয়ে তৈরি ক্ষুদ্রাকৃতির নেহাৎ পলকা দর্শন এক ভেলা বিপুল জলসীমানা চিরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে আপন গন্তব্যে, ছয় জন দুঃসাহসী নাবিক এর সওয়ার, তাদের মধ্যমণি হয়ে আছেন প্রাতঃস্মরণীয় এক নরওয়েজিয়ান, স্ক্যান্ডিনেভিয়ার পুরাণকথার হাতুড়ির আঘাতে বজ্রপাত ঘটানো দেবতা থরের নামে তার নাম থর হেয়ারডাল। ল্যাতিন আমেরিকার উপকূল ছেড়ে আসার পর ইতিমধ্যেই মহাসমুদ্রে অতিবাহিত হয়ে গেছে প্রায় ১০০ দিন, পাড়ি দেয়া হয়েছে ৭০০০ কিলোমিটার। অবশেষে দূর দিগন্তে আবছা অবয়বে মরীচিকার মত সবুজের ঝলকানি চোখে পড়ল, অর্থাৎ ডাঙ্গা! অবশেষে গন্তব্য।
সমস্ত পৃথিবীর মানুষের ধারণাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে প্রাগৈতিহাসিক সরঞ্জাম দিয়ে বানানো গাছের ভেলা অবশেষে পাড়ি দিল এই গ্রহের সবচেয়ে বড় জলসীমানা! পাঠক নিশ্চয় অনেক আগেই বুঝে ফেলেছেন আলোচনা চলছে কন-টিকি অভিযান নিয়ে, ইনকাদের প্রাচীন সূর্যদেবতার নামে নাম রাখা নয়টি বালসা গাছের গুড়ি দিয়ে তৈরি এই ভেলা ১৯৪৭ সালে সৃষ্টি করে পুরনো ইতিহাসের উপর নব আঙ্গিকে আলোকপাত। প্রমাণ করে থর হেয়ারডালের ধারনা সম্ভব হতেও পারে যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জগুলোতে মানব সম্প্রদায়ের আগমন ঘটে ছিল ল্যাতিন আমেরিকা থেকে, এমন কাঠের ভেলাতে চড়েই। সেই থেকে কেবলমাত্র ইতিহাস বা নৃতত্ত্বই নয় অ্যাডভেঞ্চার, দুর্গম অভিযান সবক্ষেত্রেই কন-টিকি এক অবাক করা নাম, আর বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত এই ভেলাটিসহ থর হেয়ারডালের সুদীর্ঘ বর্ণবহুল জীবনের অধিকাংশ স্মৃতিময় অধ্যায়গুলো সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে নরওয়ের রাজধানী অসলোর কন-টিকি জাদুঘরে। চলুন, আজ ঘুরে আসি সেই অসামান্য, এক ও অদ্বিতীয় সংগ্রহশালা থেকে।
কন-টিকি জাদুঘর অসলো শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে খানিকটা দূরে সবুজে ছাওয়া উদ্যান আর সমুদ্রের সান্নিধ্যে অবস্থিত, মূল ভবনের সামনে এক ইস্টার দ্বীপের প্রতিমূর্তি। টিকিত কাউন্টারে ছাত্রদের জন্য বিশেষ ছাড় আছে। ভেতরে ঢুকেই প্রথমে চলে গেলাম কন-টিকি কামরায়, বিশাল হলঘরে রাখা সেই ভেলা আর উপরে নির্মিত ছাউনি, সেই সুবিখ্যাত দেবতার প্রতিমূর্তি আঁকা বিশাল পাল, সেই সাথে খানিকটা খোলা সমুদ্দুরের নোনা বাতাসের ঝাপটা আনার চেষ্টা করা হয়েছে ভেলার চারপাশে নানা সামুদ্রিক পাখির চমৎকার স্টাফ করা মৃতদেহ আর পাটাতনের কাছে হাঙ্গর দিয়ে।
Kon Tiki
ভাবতেই বুকে কাঁপন ওঠে কি ধরনের অতিমাত্রায় দুঃসাহসী হলে, প্রতিটি রক্তকণিকায় অ্যাডভেঞ্চারের কি পরিমাণ মাতন নাচলে এমন একরত্তি ভেলায় প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দেবার কথা কল্পনা করা যায়।
P1070949
চারপাশে ভেলা নির্মাণের সময়কার দুর্লভ আলোকচিত্র, একপাশে কিছু রঙ ঝলমলে পালক দেখে কৌতূহলী হয়ে এগোতেই লেখা দেখলাম, কন-টিকি অভিযানের একমাত্র মহিলা সঙ্গিনী টিয়াপাখি লরিটার শেষ স্মৃতিচিহ্ন, লরিটা মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের এক আকাশ ছোঁয়া ঢেউয়ের পাল্লায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ভেলা থেকে।
P1070945
ঘরের এককোণে বিশালাকার এক মোয়াই মূর্তি, ইস্টার দ্বীপের দানবাকৃতির মূর্তিগুলো পৃথিবীর মানুষের কাছে আজো এক বিস্ময় হয়ে আছে, প্রাকৃতিক ভাবেই আমাদের গ্রহের সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন জায়গাগুলোর একটি হওয়া সত্বেও কি করে এমন উন্নত সভ্যতা গড়ে উঠল সেখানে, কি করে সম্ভবপর হল এমন সব মূর্তি আগ্নেয়শিলা থেকে তৈরি করে দাড় করানো, তাও একটি দুটি নয়, শত শত বিশালাকার মূর্তি! হেয়ারডালই এখন পর্যন্ত এই বিষয়টির উপরে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন, লিখেছেন আকু-আকু নামের এক চিত্তাকর্ষক বই, উপাত্ত খুজেছেন তার ধারনার পক্ষে যে পর্যাপ্ত মানবশ্রম থাকলে সেই আদিবাসীদের দড়ি, কাঠ ও কলাকৌশল দিয়ে এমন মূর্তি তৈরি করে দাড় করানো সম্ভবপর ছিল। প্রমাণ হিসেবে নিজের বন্ধু ও ইস্টার দ্বীপের অধিবাসীদের সাহায্য নিয়ে তৈরি করেছিলেন তিরিশ ফুট উচু এক দানব মোয়াই মূর্তি, স্রেফ পাথরের সাহায্যে পাথর কেটে। সেই মূর্তিই আজ শোভা পাচ্ছে জগৎ আলো করে কন-টিকি জাদুঘরে।
Moai
জাদুঘরটির মূল আকর্ষণ দুটি বিশালাকার হলঘর, একটির বর্ণনাতো এতক্ষণ দিয়েই গেলাম, অন্যটিও কম রোমাঞ্চকর নয়, এতে ঠাই পেয়েছে হেয়ারডালের চিন্তাপ্রসূত আরেক অক্ষয় কীর্তি নলখাগড়ার তৈরি নৌকা ২য় রা। প্রাচীন মিশরের সাথে যে ল্যাতিন আমেরিকার নৌ পথে যোগাযোগ হয়েছিল তার প্রমাণ হিসেবে এই প্রায়-অসম্ভব পরিকল্পনা হাতে নেনে তিনি, নলখাগড়ার নৌকা দিয়ে কোনরকম আধুনিক সরঞ্জাম ছাড়াই পাড়ি দেন আটলান্টিক মহাসাগর। ১ম রাটি প্রাকৃতিক প্রচণ্ডতার কাছে হার মানলেও প্রাচীন মিশরীয় সূর্যদেবতার নামে নামকরণ করা এই নৌকা ঠিকই পৌঁছে অভীষ্ট লক্ষ্যে।
DSC01171
রা- এর যাত্রী নির্বাচন ছিল কন-টিকির চেয়েও চমকপ্রদ, যেখানে প্রথম অভিযানে মাত্র একজন সুইডিশ বাদে সবাই ছিলেন নরওয়েজিয়ান, সেখানে রা-এর সাতজন যাত্রীর প্রত্যেকেই ছিলেন সাত ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি! আসলে হেয়ারডালের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষার লোকেরা যে দলবদ্ধ ভাবে এমন ধরনের দীর্ঘমেয়াদি দুঃসাহসিক অভিযান সফল ভাবে সম্পন্ন করতে পারে তা প্রমাণ করা।
P1070929
দুচোখ ভরা বিস্ময় নিয়ে ঘুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করছি রা, মিশরীয় সূর্যদেবতার নামাঙ্কিত এমন নলখাগড়ার নৌকার বহর তরতর করে বয়ত অতীতের নীলনদে আর এখনো ল্যাতিন আমেরিকার টিটিকাকা হ্রদসহ অন্যান্য জায়গায় এমনতর জলযান ব্যবহার করতে দেখা যায় স্থানীয় রেড ইন্ডিয়ানদের। কি যোগাযোগ ছিল সেই কুয়াশাঢাকা অতীতে এই দুই মহাদেশের, যাদের স্থাপত্য, ধর্মীয় বিশ্বাস আর সংস্কৃতিতে ছিল নিবিড় মিল!
P1070924
আর থাকার কথা ছিল টাইগ্রিসের, সুমহান সুমেরীয় সভ্যতার সাথে প্রাচীন সুমেরীয় ও সিন্ধু সভ্যতার যোগাযোগ ছিল কিনা তা নিয়ে অতিমাত্রায় উৎসাহী হয়ে ওঠেন হেয়ারডাল, তারই ফসল ছিল ১৯৭৮ সালে ইরাকে স্থানীয় নির্মাণসামগ্রী দিয়ে নির্মিত ১৮ মিটার দীর্ঘ নলখাগড়ার এই নৌকা। ইরাক থেকে যাত্রা শুরু করে পারস্য উপসাগর দিয়ে ওমান হয়ে পাকিস্তানে সফল ভাবে পৌছায় টাইগ্রিস। এর পরে বিশাল যাত্রাপথে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে লোহিত সাগরের কাছাকাছি আফ্রিকান দেশ জিবুতিতে পৌছায়, কিন্তু এর পরপরই সেই অঞ্চলের দেশগুলোতে বিদ্যমান যুদ্ধ পাল্টে দেয় যাত্রাপথ। জাতিসংঘের কাছে সেই অনুন্নত দেশগুলোতে অস্ত্রবিক্রির প্রতিবাদে অভিযাত্রীরা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেন সাধের টাইগ্রিস! এখন কেবলমাত্র কিছু ছবি, তথ্যচিত্র আর নমুনা দিয়ে আমাদের দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাতে হয়।
P1070932
কোথায় শুরু হয়ে ছিল সত্যান্বেষণের অজানা দুরূহ পথে থর হেয়ারডালের এই দীর্ঘ যাত্রা? সম্ভবত কৈশোরেই, ১৯৩৭ সালেই ২৩ বছর বয়সে তিনি স্ত্রীসহ তথাকথিত সভ্যতাকে বিদায় জানিয়ে চলে গিয়েছিলেন সুদূর মারাক্কেস দ্বীপপুঞ্জের ফাতু-হিভা দ্বীপে। সেই নারকেল বীথি ছাওয়া সাদা বালির সৈকত আর নীল ল্যাগুনের মারাক্কেস দ্বীপপুঞ্জ যেখানকার তাহিতির পাপিতিতে রঙ ঝলমলে জীবনের খোজে ধূসর পাঁশুটে শহুরে জীবন ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী পল গগ্যাঁ, জীবনের নানা রঙে এঁকেছিলেন তার একের পর এক অমর পেইন্টিংগুলো। এখানে বছরখানেক নানা জায়গায় নারকেল পাতার কুটিরে থাকেন তারা, সেখানে আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের কাছে শোনেন তাদের প্রপিতামহ টিকির কথা যে এসেছিল সেই দ্বীপে অনেক দূরের পুবের দেশ থেকে, যা পরবর্তীতে গড়ে দেয় তার কন-টিকি তত্ত্বের বুনিয়াদ। জাদুঘরে সেই সময়ের সংগ্রহকৃত কিছু মনকাড়া নমুনা আছে, এই নিয়ে পরবর্তী জীবনে হেয়ারডাল লেখেন ফাতু-হিভা নামের এক বিশ্বখ্যাত বই।
tumblr_lbxh93dR8n1qdyd55o1_500
আর আছে সুবিদিত গ্যালোপোগাস দ্বীপপুঞ্জের নানা ছবি ও নিদর্শন, যে গ্যালোপোগোস ভ্রমণের পরপরই সেখানকার ১৩টি দ্বীপে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির পাখি, কচ্ছপ ও অন্যান্য প্রাণী দেখে চালর্স ডারউইনের মনের মাঝে বিবর্তনবাদ দৃঢ় ভিত্তি গাঢ়ে, আলোকপাত ঘটে পৃথিবীতে জীবনের উম্মেষ ও বিকাশের অন্যতম সারবেত্তায়।
জাদুঘরের এক কোনায় কাচের আড়ালে অস্কার পুরস্কার দেখে খানিকটা চমকেই উঠলাম, পরে দেখি ১৯৫১ সালে সেরা তথ্যচিত্র হিসেবে কন–টিকির প্রাপ্ত অস্কার ট্রফিটি সেখানে শোভা পাচ্ছে। উল্লেখ্য, হেয়ারডালের নানা অভিযান নিয়ে তৈরি একাধিক তথ্যচিত্র অস্কার মনোনয়ন পেয়েছে।
এছাড়াও তিনি মূল্যবান কাজ করেছেন আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় মালদ্বীপ, মধ্য এশিয়ায় আজারবাইজান, আন্দেজ পর্বতমালার হারিয়ে যাওয়া নানা সভ্যতা নিয়ে, আর গোটা কন-টিকি জাদুঘরেই আছে তার সমৃদ্ধ সংগ্রহ।
তার লেখা বই বাংলাসহ প্রায় একশটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে আর বিক্রি হয়েছে কোটি কোটি কপি। পরে এক দেয়াল জুড়ে দেখি থর হেয়ারডালের হাস্যোজ্জল ছবি আর তার সারা জীবনে প্রাপ্ত নানা খেতাব ও পুরস্কারের সমাহার। উপরে লেখা থর হেয়ারডাল- ওয়ার্ল্ড সিটিজেন। আসলেই এমন মানুষকে দেশ, কাল, সীমানার আঙ্গিকে বাঁধার চেষ্টা করাই বৃথা, বিশ্বনাগরিকই তার জন্য যথার্থ খেতাব।
40415301thor_20020419_00011.jpg
একজন মানুষ যে সারাজীবনে কত কিছু করতে পারে এবং বিশ্বকে প্রচলিত ধারণা থেকে সরে নতুন তত্ত্বের আলোকে প্রভাবিত করতে পারে তার অন্যতম নিদর্শন থর হেয়ারডাল। মনে আছে ২০০২ সালে টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে এক পাখিশুমারি শেষে ফেরার পথে রেডিওতে তার মৃত্যুসংবাদ শুনে স্বজন হারানোর বেদনাই অনুভূত হয়েছিল বুকের গভীরে, মনে হয়েছিল খুব আপন কাউকে হারাল আমাদের গ্রহটা। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, অজানা অনেক কিছু একসাথে জানার একবুক অব্যক্ত আনন্দ নিয়ে রওনা হলাম পরের গন্তব্যে।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: