ব্রায়ান অ্যাডামসের কনসার্টে

প্রাইমারী স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে হাইস্কুলে সবে পা দিয়েছি। যুগের হাওয়া আর ডিশ এন্টেনার কল্যাণে ইংরেজি গানের জগতে আমাদের ভীরু পায়ে অনুপ্রবেশ, শিক্ষক আর অভিভাবকদের রক্তচক্ষু এড়িয়ে সেই তীব্র আকর্ষণময় জগতে সময়ক্ষেপণ বেড়ে চলত সর্বদাই। বন্ধুদের আড্ডায় মাইকেল জ্যাকসন, ফিল কলিন্স, জন বনজোভি, রিচার্ড মার্ক্স, বব মার্লে, জন ডেনভার, জর্জ মাইকেল, লিওনেল রিচি, ব্রায়ান অ্যাডামস, বিটলসদের নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টার আড্ডা, বেসুরো গলায় তাদের অনুকরণের ব্যর্থ চেষ্টা, নিজ নিজ প্রিয় গায়ক নিয়ে মন কষাকষি, এমনকি হাতাহাতি পর্যন্তও গড়াত তা মাঝে মাঝে। এর মাঝে রোমিওর দল প্রেমপত্রের ফাঁকে ফাঁকে দুয়েকটি গানের কলি টুকলিফাই করে চালিয়ে দিত নিজের নামে। ফ্যাশন সচেতনদের চুল আর জিন্সের স্টাইল দেখলেই বোঝা যেত এরা রক অ্যান্ড রোলের ভক্ত। আর একটু বড় হতেই গানস অ্যান্ড রোজেস, মেটালিকা, পিঙ্ক ফ্লয়েড, ইউ টু, জিম মরিসন, জিমি হেনরিক্স, স্করপিয়ন, বব ডিলানরা Knocking on the Heavens Door- এর মাধ্যমে সজোরে ঢুকে পড়েছেন আমাদের জীবনে, মননে, শ্বয়নে, স্বপনে। অবচেতন মনে মাদকের নেশার মতই জীবনে আলো-আঁধারে ঢাকা রহস্যময় গলিঘুপচিগুলোতে তাদের সৃষ্টিশীল সংগীত সর্বদাই আমাদের সঙ্গী, চলার পথের পাথেয়। চারিদিক থেকে ঘনিয়ে আসা হতাশার গাঢ় কুয়াশার মাঝেও ক্ষীণ আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখে, নতুন দিনের স্বপ্ন দেখায় মেটালিকার Nothing Else Matters, চারপাশের বিষণ্ণ পরিবেশের প্রতি আমরা ক্ষোভ উদগীরণ করি পিঙ্ক ফ্লয়েডের The Wall গেয়ে, বন্ধু বা ভালাবাসা বিচ্ছেদের নিবিড় কষ্টে আমরা ঠাই নিয়েছি গানস অ্যান্ড রোজেসের November Rain-এ, নিজেদের জীবনে বড়দের অন্যায় হস্তক্ষেপের প্রতিবাদ ছিল বন জোভির Its My Life। আজো দেশে ফেরার সময় জন ডেনভারের Country Roads থাকে ঠোঁটের আগায়, ঠিক তেমনি পুরনো বন্ধুরা এক হলেই ব্রায়ান অ্যাডামসের Summer of 69 একসাথে শোনার ও বেসুরো গলায় গাওয়ার জন্য মন-প্রাণ আইঢাই করতে থাকে।
কাজেই ইংরেজি ভাষার প্রিয় গায়ক কে জানতে চাইলে একজনের নাম বলা প্রিয় কবির নামের মতই কঠিন, এর চেয়ে কয়েকজনের নাম বলা অনেক সহজ। তারপরও কৈশোরের সেই সোনালী দিনগুলো থেকেই কানাডার রক গায়ক ব্রায়ান অ্যাডামস তার ব্যতিক্রমী কন্ঠ, ভিন্ন গায়কী, স্পর্শকাতর অনুভূতিগুলো নিয়ে অসম্ভব রোমান্টিক সব গান আর চমৎকার গিটার বাদনের মাধ্যমে আমাদের মনের মুকুরে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছে। আমি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি সমগ্র পৃথিবীর রোমান্টিক গানগুলোর একটি ক্ষুদে তালিকা করলেও ব্রায়ানের Please, Forgive Me সেই তালিকার প্রথম দিকে থাকবে।
তাই এক সামারে যখন শুনলাম ব্রায়ান হেলসিংকিতে আসছে কনসার্ট করতে প্রথম কাজটাই ছিল যেমন করেই হোক একবারে মঞ্চের সামনে ভাগের টিকিট কেনা, যদিও আমার মত হতদরিদ্র ছাত্রের পক্ষে সেই টিকিটের দাম বেশ খানিকটা চড়া বৈকি, তারপরও স্কুলজীবনের স্বপ্ন ব্রায়ান অ্যাডামসের গান সরাসরি তার সামনে দাড়িয়ে শুনব সেই স্বপ্নপূরণের পথে অন্তত অর্থ কোন বাঁধা হতে পারে না!
অবশেষে সেই শুভদিন, ২০০৬ এর ২৫ সেপ্টেম্বর হেলসিংকির হার্টওয়াল অ্যারেনায় আমরা হাজার হাজার ভক্ত অপেক্ষা করছি অধীর আগ্রহ নিয়ে, মঞ্চে চলছে এক স্থানীয় ফিনিশ শিল্পীর গান, ভাবছি এই যন্ত্রণাটা কখন শেষ হবে বিশ্বের অন্যতম রোমান্টিক চিরতরুণ গায়কটা অবশেষে তার দর্শন দেবে (ব্রায়ানের বয়স তখন মোটে ৪৬, কিন্তু তার কন্ঠ, চলাফেরা, গান আগের মতই সজীব, প্রাণবন্ত)। অবশেষে হঠাৎ-ই দেখি মঞ্চ ফাঁকা, মহাকাশের উল্কার মত দ্রুতগতিতে কয়েকজন এসে আমাদের সামনে বিভিন্ন ভঙ্গীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাড়িয়ে গেল, তাদের মধ্যে থেকে একজন মাইক্রোফোন হাতে ঘোষণা করল- শুভ সন্ধ্যা, হেলসিংকি! আমার নাম ব্রায়ান!!
সাথে সাথে হাজার হাজার ভক্তের সম্মিলিত অ্যাডামস চিৎকারে অ্যারেনার ছাদ ভেঙ্গে পড়ার দশা, মন্ত্রমুগ্ধের মত চেয়ে আছি কৈশোরের নায়কের দিকে, হাঁ করে গিলছি তার প্রতিটি কথা, প্রতিটি গান মনে হচ্ছে অমৃতধারা, আনন্দের অফুরন্ত উৎস। শুরুই করল ব্রায়ান ছন্দময় রক গান Lets Make a Night to Remember দিয়ে, যেন আজকের সন্ধ্যার প্রতি পল, প্রতি মুহূর্ত যেন আমরা আকন্ঠ উপভোগ করি তার আহবান জানিয়ে। একটু পরেই শুরু হল তার সবচেয়ে বিখ্যাত গান Everything I Do, উল্লেখ্য এই অমর গানটি রূপক অর্থে গাওয়া। শুরুতে নিছক রোমান্সের গান মনে হলেও পরে হৃদয়ঙ্গম হয় যে এটি আসলে প্রতিটি মানুষের মাতৃভূমির গান( কেভিন কস্টনারের রবিনহুড সিনেমায় গানটি ব্যবহার করা হয়েছে)। হঠাৎ অনুভব হল ব্রায়ান যেন শুধু গান-ই গাচ্ছে না, কেবলমাত্র গীটারই বাজাচ্ছে না, বরং এক নিপুণ চিত্রকরের মত তুলির আলতো টানে রিক্ত ক্যানভাসের উপর ফুটিয়ে তুলছে এক একটা অসাধারণ চিত্রকর্ম, অতুলনীয় মাস্টারপিস। Everything I Do মনে করিয়ে দিচ্ছে আমার ফেলে আসা দেশটার কথা, শৈশবের মফস্বল শহরের স্মৃতিমাখা প্রতিটি গলি-উপগলির কথা। বাস্পরুদ্ধ কণ্ঠে গায়কের সাথে সাথে আমরা গেয়ে যাচ্ছি Everything I Do, Do It For You ! আশেপাশের তন্বীদের অনেকেরই মুগ্ধতাপূর্ণ চোখে ঝিলিক দিচ্ছে স্ফটিক স্বচ্ছ লোনাজল।
পরের গানেই আমাদের সমস্ত বিষাদ এক ফুয়ে উড়িয়ে দিয়ে আনন্দের বন্যায় ভাসিয়ে দিল Come on, Come on, Come on গেয়ে। পরপরই এল চিরসবুজ ভালবাসার গান You are Still Beautiful to Me। একের পর এক অবিস্মরণীয় গান গেয়ে ব্রায়ান এক দক্ষ জাদুকরের মতই একবার আমাদের মনকে আলোর বন্যায় ভাসাল, পরের বারই গাঢ় বিষাদে আচ্ছন্ন, কোনবার নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত, হ্রদয় খুড়ে উঁকি দিচ্ছে কোন ভুলে যাওয়া মুখ, বিস্মৃতির আড়ালে চাপা পড়ে যাওয়া জরাজীর্ণ স্মৃতি নিমেষে তরতাজা হয়ে উঠছে তার জাদুকরী কণ্ঠে। আবার জীবনের নেশায় মাতাল আমরা, সঙ্গীতের মূর্ছনায় তালে তালে উদ্দাম নৃত্যে বিভোর। সেই সাথে ব্রায়ানের ব্যাপারই আলাদা- নিজে নাচছে, অন্যকে নাচাচ্ছে, দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো মঞ্চের এক মাথা থেকে আরেক মাথা, কথার ফুলঝুরি ছুটছে সমান তালে। সব তরুণীরা চিৎকার করে তাকে প্রেম নিবেদন করে ভারমুক্ত হচ্ছে। হঠাৎ জীবন্ত কিংবদন্তী বব ডিলানের মত একহাতে গীটার আর অন্যহাতে হারমোনিকা নিয়ে শুরু করল Have You Ever Really Loved a Woman? এর পরপরই Heaven।
অ্যারেনার জনসমুদ্র ফুলে ফেপে উঠল Summer of 69 এর সাথে সাথে, প্রত্যেকের জীবনের সবচেয়ে অবিস্মরণীয় অংশ স্কুলজীবনের টক-ঝাল-মিষ্টি ঘটনাগুলোর কথা যে ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে এই গানের প্রতিটি শব্দে! আবেগে উদ্বেলিত হয়ে ফোন দিলাম বন্ধুদের- ফিনল্যান্ডে, বাংলাদেশে, কানাডায়, তারাও যেন অন্তত ব্রায়ানের কণ্ঠ সরাসরি শুনতে পায়, একই আনন্দভেলায় পা রাখে আমাদের মত।
কয়েক ঘণ্টা সময় যেন কয়েক মুহূর্তের মাঝে কেটে গেল থিওরি অফ রিলেটিভেটির যথার্থতা প্রমাণ করতে। উৎফুল্ল ব্রায়ান জানাল হেলসিংকিতে সে যতবারই কনসার্টে এসেছে এবারের শ্রোতারাই সবচেয়ে প্রানবন্ত, সজীব, উচ্ছাসে পরিপূর্ণ। এর মাঝেই এক তরুণী সুযোগ পেল প্রিয় গায়কের সাথে মঞ্চে উঠে একসাথে গান গাওয়ার, আনন্দের ডানায় ভর দিয়ে সেই ভাগ্যবতী আমান্দা মঞ্চে ওঠার পরপরই পড়ল মহাবিপদে, হাজার হাজার লোক তার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে, বেচারির কণ্ঠ কেঁপে কেঁপে সাধারণ কথায়ই ভজঘট করে ফেলল, আর গান, সে তো দিল্লী বহুত দূর! কিন্তু ব্রায়ানের অভয়মিশ্রিত হাসি আর সহযোগিতায় আস্তে আস্তে জড়তা দূর হল তার, হাতে হাতে রেখে Baby, You are Gone ভালমতই শেষ করল সে। এরপরেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে চারিদিক ছেয়ে গেল, ব্রায়ান বিনীতভাবে জানাল গত একমাসে টানা কনসার্টে তারা খুব ক্লান্ত, কাজেই দুঃখের সাথে হলেও আমাদের এখন বিদায় জানাতে চাই! আরে, এটা কি কথা? আমার প্রিয় Please Forgive Me এখনো গাওয়া হল না, আর চলে যেতে চাইছে!
সম্মিলিত We want More চিৎকারে আবার শুরু হল আনন্দের দুকূল ভাসানো গীতিধারা। অবশেষে এক পর্যায়ে শুরু হল Please,Forgive Me, হতবাক আমরা সকলেই, ভাবছি কি পরিমাণ ভালবাসতে জানলে এরকম একটা গান লেখা যায়, হৃদয় ছুঁয়ে গাওয়া যায়! দুহাত উপরে তুলে সংগীতের মূর্ছনায় দোলাতে দোলাতে অস্ফুট কণ্ঠে সবার মুখেই তখন Please Forgive me, I cant Stop Loving You । সেই মুহূর্তে চাঁদের নেশায় পাওয়া মানুষ আমরা সবাই।
আবার ব্রায়ান তাড়া দিল, যেতে হবে, আমাদের উদ্বাহু চিৎকার আরো চাই, আরো চাই বলে। মঞ্চে দাঁড়ানো দিনের রাজা বলল এইটা কিন্তু আজকের শেষ গান, এই অসম্ভব রোমান্টিক গানটা আমি লিখি ১৮ বছর বয়সে, আর তোমরা সবাই জান ১৮ বছর বয়সেই মানুষ সবচেয়ে বেশী রোমান্টিক, আবেগী, বুদ্ধিশূন্য আর বোকা থাকে! আর এটা সে বুঝতে পারে যখন তার বয়স হয় ১৯ !! এমন মজার কথায় সবাইকে মাতিয়ে ব্রায়ান জানাল বোকামিতে পূর্ণ ১৮ বছর বয়সে লেখা সেই গানটি তার সবচেয়ে পছন্দের গানগুলির একটা, আর হ্যাঁ এটা একটা অমর গান, Straight from My Heart।
গান শেষে বিদায় নিল ব্রায়ান, আমরা আশায় অপেক্ষা করছি যদি সে আবার আসে, অন্তত গায় আর একটি গান, অন্তত একটি! না হলো না, সব লাইটগুলো জ্বলে উঠল একে একে। মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন আমরা নিশিতে পাওয়া মানুষের মত পা বাড়ালাম বাড়ীর দিকে।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: