আগামেমননের সোনার মুখোশ ও গ্রীসের জাতীয় পুরাতত্ত্ব জাদুঘর

P1210200

এথেন্সের ন্যাশনাল আর্কিউলজিক্যাল মিউজিয়ামের সামনে দাড়িয়ে আছি মুগ্ধ চিত্তে। অতি সুদৃশ্য ভবন, উপরে দেবতা অ্যাপোলো, দেবী আফ্রোদিতির প্রমাণ আকারের ভাস্কর্য, সারি সারি উঁচু স্তম্ভ, নীলাকাশকে পিছনে রেখে উপরে পতপত করে উড়ছে গ্রীসের নীল-সাদা পতাকা। একেবারে গ্রীক ধারার স্থাপত্য। বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি সবচেয়ে সমৃদ্ধ পুরাতত্ত্ব জাদুঘরের এটি একটি আর ইতিহাসের নানা পর্যায়ের মাঝে বর্তমান আধুনিক সভ্যতার জন্মদাতা গ্রীক সভ্যতার এমন নানা অতুলনীয় নিদর্শনের সংগ্রহ সারা বিশ্বে দুটি নেই। বলা হয়ে থাকে সমস্ত সংগ্রহ খুটিয়ে দেখা তো দূরে থাক মোটামুটি আবছা ভাবে মূল ও অতি বিখ্যাত শিল্পকলার নিদর্শনগুলো দেখতেই এক দিনের বেশি লাগে এথেন্সের এই জাদুঘরে।
P1210188
P1210189
রবিবার বিধায় দর্শনী নেই, কিন্তু মূল ফটক পার হয়ে সামনে দিকে নজর যেতেই একেবারে স্থাণু হয়ে দাড়িয়ে রয়লাম বাস্তবজ্ঞান হারিয়ে বেশ কয়েক মুহূর্ত- এই জাদুঘরের অতি বিখ্যাত সংগ্রহগুলোর মাঝে সবচেয়ে বিখ্যাত যেটি সেই আগামেমননের সোনার মুখোশ ( ডেথ মাস্ক) আমার সামনে! বিশ্বের সব জাদুঘরেই এমন একটি বা দুটি অতিদ্রষ্টব্য বস্তু থাকেই, লুভ্যরে মোনালিসা বা ভ্যান গগ জাদুঘরে সানফ্লাওয়ার্স দেখার জন্য লক্ষ কোটি জনতা অন্য সব সংগ্রহ ফেলে মুখিয়েই থাকে সবসময়। গ্রীসের পুরাতত্ত্ব জাদুঘরে আমার সবচেয়ে বেশী দেখার ইচ্ছে ছিল এই সোনার মুখোশ, পুরাকীর্তির ও হারিয়ে যাওয়া নগরীর ইতিহাস নিয়ে কত বইয়ের মলাটে যে এই মুখোশের ছবি দেখেছি তার ইয়ত্তা নেই। আজ চোখের সামনে দেখে পিপাসার্ত মন শান্তি পেল। এই মুখোশটি ট্রয় নগরীর পুনরাবিষ্কর্তা হাইনরিখ স্লিম্যান ১৮৭৬ সালে মাইসিন এলাকায় আবিস্কার করেন, তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল এই ডেথ মাস্কটি বিখ্যাত গ্রীক রাজা আগামেমননের, যার নেতৃত্বে গ্রীকরা একজোট হয়ে ট্রয় আক্রমণ করে। কিন্তু পরবর্তীতে জানতে পারা যায় সুক্ষাতিসুক্ষ কারুকার্য সমৃদ্ধ এই সোনার মুখোশটি প্রায় ৩৭০০ বছরের পুরনো অর্থাৎ ট্রয়ের যুদ্ধেরও কয়েকশত বছর আগের ! কাজেই এটি আগামেমননের মুখোশ হতে পারে না, কিন্তু নামটি ঠিকই রয়ে যায়।
DSC02826
P1210212
এর সাথে আরও বেশ কয়েকটি সোনার মুখোশ রয়েছে সেই অদ্বিতীয় সংগ্রহশালায়। এরপরে নানা ধরনের সোনার তৈরি প্রাচীন শিল্পকলার অনন্য নিদর্শন, বিশেষ করে কয়েকটি ছুরির হাতল, যেখানে নিখুঁত সুক্ষ ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সেকালের নানা দৃশ্য। নানা ধরনের তরবারি, ছুরি, তীরের ফলা ইত্যাদি মারনাস্ত্রের বিশাল সংগ্রহ।
P1210224
P1210232
আছে কয়েকটি পানপাত্র, যার দুটিতে নিখুত ভাবে খোদাই করা হয়েছে পবিত্র ষাঁড় ধরার দৃশ্য। হাইনরিখ স্লিম্যানের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল এর একটি মহাকবি হোমারের মহাকাব্য ইলিয়ডে বর্ণিত পিলোসের রাজা নেস্টরের পানপাত্র।
P1210222
এর পরে গ্রীসের নানা দ্বীপ বিশেষ করে সান্তোরিনি থেকে আনা জগদ্বিখ্যাত দেয়াল ফ্রেসকোগুলো, হাজার হাজার বছর আগে পাকা রঙে ফুটিয়ে তোলা মদিরা হাতে সাকী বা বিশালাকার ষাঁড়ের জৌলুস বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি কালের প্রবল আক্রমণেও।
P1210237
P1210238
পরের গ্যালারীতে মৃৎপাত্রের বিশাল সংগ্রহ। নানা আকারের, নানা বর্ণের পাত্রগুলোতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে গ্রীকপুরাণ, কল্পকথা, সেকালের জীবনধারা, পশুপাখির নিখুত অবয়ব। কিছু পাত্রতো দানবাকৃতির, প্রায় দুই মিটার লম্বা।
P1210220
এর মাঝে নজরে আসে ৩০০০ বছরের পুরনো বাথটাব!
P1210244

এক কামরাতে হাড়ের তৈরি শিরস্ত্রাণ, মালা আর বর্মের মেলা বসেছে যেন।
P1210230
কত জানা-অজানা নিদর্শন, প্রত্যেকের আছে নিজস্ব বিশাল ঐতিহাসিক কাহিনী, সেই সুপ্রাচীন কালে কেন, কাদের দ্বারা তৈরি হয়ে কি কাজে ব্যবহৃত হত, আর কিভাবেই বা হাজার হাজার বছর পরে কোথা থেকে উদ্ধার হয়ে তাদের শেষ ঠিকানা হল এই জাদুঘর- সেইসব গল্প, সামনে লেখা বিবরণ পড়ে চোখের সামনে কাহিনীগুলো একের পর এক জলতরঙ্গের মত বয়ে যায়, এত অল্প পরিসরে কয়টার কথা বলি!
P1210214
পরের ভুবনবিদিত ভাস্কর্য সংগ্রহশালায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো দানবাকৃতির ব্রোঞ্জ দেবতা মূর্তি আমাদের স্বাগত জানায়। ভাস্কর্যটি কি দেবরাজ জিউসের না সাগর দেবতা পোসাইডেনের সেই নিয়ে গবেষণা এখনো অব্যাহত! বাম হাত সামনে তুলে নিষেধাজ্ঞা জারি করার সাথে সাথে ডান হাতে তুলে নিচ্ছে প্রলয়ঙ্করী দেবাস্ত্র বজ্র। অমানুষিক দক্ষতায় অত্যন্ত সূক্ষ ভাবে একে নির্মাণ করেছিলেন কোন প্রাচীন কারিগর, ভ্রম হয় কোন বিশাল মানুষ অজানা শাপে ধাতব মূর্তিতে পরিণত হয়েছে।
P1210273
P1210281
P1210275
এর পরেরজনও যথেষ্ট চমক জাগানিয়া, সাগরতল থেকে উদ্ধারকৃত দুই হাজার বছর আগের অ্যান্টিকিথেরোর ইফেবে! এককালে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাওয়া বিশালাকার এই ব্রোঞ্জ ভাস্কর্যের চোখের সাদা অংশ ও কালো মণিটি পর্যন্ত আবার যথাস্থানে বসিয়ে বর্তমান রূপ দেওয়া হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে সারা বিশ্বে এই ধারার ভাস্কর্য কেবলমাত্র এই একটিই, কিন্তু সবেধন নীলমণি ট্রয় যুবরাজ প্যারিসের নাকি তরুণ হারকিউলিসের আদলে গড়া তা আর জানার কোন উপায় নেই।
DSC02843
এরপরে মার্বেল পাথরের মিনোটর- অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক ষাঁড়ের ক্রীট দ্বীপের কিংবদন্তীর দানবমূর্তি।
P1210280
চারিদিক ঘিরে থাকা ইতিহাসময় ভালো লাগার অনুভুতিকে সাথী করে এক কামরা থেকে অন্যটিতে যাবার পথে মাঝের বিশাল বারান্দায় আর্তেমিসের অশ্বারোহী নামে ২২০০ বছর আগে এক বিশাল ভাস্কর্যের সাথে মুখোমুখি মোলাকাত, ছুটন্ত ঘোড়া ও তাতে সওয়ার ক্ষুদে বালক। দুজনেরই আকার বাস্তবজীবনের মত, ঘোড়ার দুই পা শূন্যে!
DSC02832
সংগ্রহশালার পরের অংশে ২৭০০ বছর আগের কৌরস ভাস্কর্যের সিরিজ, একের পর প্রমাণ আকারের পুরুষ ভাস্কর্য, যা এই জাদুঘরের আরেক অমূল্য সম্পদ।
P1210269
P1210256
সেই সাথে নানা দেবদেবীর ভাস্কর্যের তো ছড়াছড়ি, এক অ্যাফ্রোদিতির-ই যে কত ধরনের ভাস্কর্য আছে গুনে শেষ করতে পারলাম না। আরও আছে অ্যাপোলো, অ্যাতেনা, হারকিউলিস, জিউস, হার্মেস, প্যানের অদ্বিতীয় সংগ্রহ।
DSC02854
DSC02862
P1210264
পাঠকদের জানিয়ে রাখি এতক্ষণ গ্রীক সভ্যতা নিয়েই কথা বললেও এই জাদুঘরের মিশরীয় সভ্যতার নিদর্শনের সংগ্রহও শিল্পকলার ভুবনে অন্যতম সেরা বলে বিবেচ্য, কয়েকটি পূর্ণ মমিসহ কৌতুহলীদ্দীপক সংগ্রহ, যার মধ্যে রয়েছে প্রায় তিন হাজার বছরের পুরনো একখন্ড রুটি, যার আবার কামড় দিয়ে ছিঁড়ে নেওয়া ক্ষুদে একখন্ড কালের আবর্তে হারিয়ে গেছে।
আরো চমক জাগানিয়া তথ্য হচ্ছে ইতিহাসের নগরী এথেন্সের এই পুরাতত্ত্ব জাদুঘরের আরো কয়েক হাজার অমূল্য সংগ্রহ আছে লোকচক্ষুর আড়ালে, সেগুলো সযত্ন পরিচর্যার মাধ্যমে আস্তে আস্তে প্রস্তুত করা হচ্ছে প্রদর্শনের জন্য। এর পরের বার সেই হারানো ইতিহাসের খুড়ে বাহির করা অংশ খানিকটা বেশী দেখতে পাব এই আশা নিয়েই চললাম পরের গন্তব্যে।

http://www.sachalayatan.com/node/41174

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: