হ্যারি পটার বিষয়ক আবজাব

টার্ম ফাইনালের ছুটিতে ‘প্রিজন ব্রেক’ খতম দেবার পর হঠাৎ করেই মনে হল-এই যা, ছুটিতে তো কোন ইংরাজি ফিল্মই দেখা হইলো না। দু-দশটে ফিল্ম না দেখলে ছুটি অন্তে বন্ধুমহলে মুখ দেখানো দায় হয়ে যাবে। বন্ধুরা যখন জিজ্ঞেস করবে, এই ছুটিতে কী কী করলি- তখন “শুয়েবসেসঙ্গমবিরহে কাটিয়েছি” এমন উত্তর দিলে ধোলাই খাবার প্রবল সম্ভাবনা আছে। এদিকে, খুচরা-খাচরা ফিল্ম দেখতে ইচ্ছা করে না। ব্যবসা যখন করবোই, তখন পাইকারী ব্যবসাই করি- এমন একটা ধারনা থেকেই সিদ্ধান্ত নিলাম, হ্যারি পটার রিভাইজ দেয়া যাক। বহু বছর আগে, যখন আরবেরা খেজুরে কেমিক্যাল মেশাতো না এবং শাকিব খানও তখন “কিং খান” হয়নি, সেই সময় ডিভিডি কিনে পটার সিরিজের প্রথম তিনটি মুভি দেখেছিলাম। পাঠক হয়তো আমার সাথে একমত হবেন যে, এককালে আমাদের অনেকেরই গোলাভরা ডিভিডি এবং পুকুরভরা মুভি ছিল। জুকারবার্গের যুগে এসে সেইসব পুকুরচারী মুভি এসে আশ্রয় নিয়েছে টেরাবাইট হার্ডডিস্কে। তো হার্ডডিস্ক চষে পটার সাহেবের কিছু ছুটাছাটা মুভি পাওয়া গেলো। আশেপাশের চল্লিশ বাড়ির মধ্যেই বাকিদেরও সন্ধান পাওয়া গেলো। সবগুলোকে দ্রুত বিচার আইনে asap এক ফোল্ডারে বন্দী করা হল।হুম, জাতি এখন প্রস্তুত পটার সাহেবের আট রকম কারিগরি দেখার জন্য। শাহরুখ খান তো বলেছেনই, “মানুষ একবার জন্মে, একবার মরে আর একবারই হ্যারি পটার দেখে।”

আমার স্ম্‌তিশক্তি অত্যন্ত প্রখর। ফলত, শাকিব খান আর জুকারবার্গ পূর্ব যুগে যে তিনটি মুভি দেখেছিলাম, তার দাঁড়িকমাসুদ্ধ ভুলে গেছি। ভালোই হয়েছে এক দিক দিয়ে। প্রতিটা মুভির একদম ১০০% সোয়াদ নিতে পেরেছি। এবং আরো আগেই এই মহাকব্যিক সিরিজটি কেনো আত্নস্থ করিনি-সেজন্য নিজেকে বিস্তর অভিশাপ দিয়েছি। দোষটা আমারই। পটারকে এতোদিন শিশুতোষ ফিল্ম ভেবে দূরে সরিয়ে রেখেছি। কোন ফিল্মহিতৈষী বন্ধুও আমাকে কখনো বলেনি,”পটার শিশুতোষ ফিল্মও না, সত্তরোর্ধ এরশাদাদুদের ফিল্মও না, পটার সবার, সবাই পটারের।”

সুখেশান্তিতেই পটার দেখছিলাম। আমাদের এই সুখে ভাগ বসাতে এলো পাশের বাসার এক পিচ্চুটি। আনন্দ নাকি ভাগাভাগি করলে বাড়ে—এই বিবেচনায় আমরাও ওকে ব্যাটালিয়নভুক্ত করলাম। পিচ্চুটির বয়স পাঁচ। তার বাপ-মা ধরেবেধেও তাকে স্কুলমুখো করতে পারছে না। পড়াশোনা তার ভালো লাগে না। বড় হয়ে সে কী হবে জানতে চাইলে বিজ্ঞের মত উত্তর দেয়, “হ্যারি পটার হব।” পিচ্চুটি দেখতেও হ্যারি পটারের মত। খালি পটারের ট্রেডমার্ক চশমাখানা চোখে সেঁটে দিলেই তাকে “দেশী পটার” হিসেবে চালিয়ে দেয়া যাবে। ‘প্রিজনার অফ আজকাবান’ থেকে সে আমাদের সাথে আছে। দর্শক হিসেবে সে অত্যন্ত মনোযোগী প্রক্‌তির। আমার যেকোন ক্রিটিক বন্ধুর চেয়েও সে খুটিয়ে খুটিয়ে মুভি দেখে এবং নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে নিজস্ব মতামত প্রকাশ করে। বাচ্চারা (একালের বাচ্চাদের অবশ্য বাচ্চা বলতে ভয় লাগে। জন্মের পরপরই এদের ফেসবুকে একাউন্ট খোলা হয় এবং হাঁটতে শেখার সাথে সাথে এরা গুগল সার্চও শেখে—এদেরকে তাই যথেষ্ট সম্মান করেই কথা বলা উচিত) যে কোন ঘটনার একটা নিজস্ব ব্যাখ্যা দাঁড় করায় এবং সেই ব্যাখ্যা উইকি-আইএমডিবি’র ঋণমুক্ত হওয়ায় তাদের ব্যাখ্যা শুনতে ভালো লাগে। বেশ ভালো লাগে।

টানা হ্যারী পটার দেখার কিছু সাইড এফেক্ট আছে। প্রথমত, পটার পরবর্তী দিনগুলোতে অন্য কোন মুভিই মুখে রোচে না। তা সে সম্প্রতি আলোচিত সোর্স কোডই হোক কিংবা ওপার বাংলার অটোগ্রাফ। পটার আর মিস গ্রেইঞ্জার বিরহে ‘দিবসের আহার আর রাতের নিদ্রা’ দুটোই বিদায় নেয়। দ্বিতীয়ত, সর্বক্ষন নিজেকে মাগলব্লাড মাগলব্লাড মনে হয়। জাদুবিদ্যা না শেখার জন্য বিরাট রকমের আফসোস হতে থাকে। কী করলাম জীবনে? দু-চারটে সস্তা ট্রিকস শিখতে পারলেও তো নিদেনপক্ষে বাংলার এমা ওয়াটসনকে ইমপ্রেস করতে পারতাম। এইটুকু লিখলাম আর হুমায়ূন আহমেদের হিমু এসে আমাকে উপদেশ দিতে শুরু করলো, “বৎস! কেবল নারীকুলকে ইমপ্রেস করার জন্যে জাদুবিদ্যা শেখা কোন কাজের কথা নহে। তাছাড়া এ বিদ্যায় যে সাধনার প্রয়োজন হয়, প্রক্‌তি সেই সাধনার বীজ তোমার মধ্যে বপন করেনি। অতএব, ক্ষান্ত দাও।” অতএব, পাঠকের মূল্যবান সময় নষ্ট করার অপরাধে আমাকে গিলোটিনে ঢোকাবার আগেই আজকের মত ক্ষান্ত দিই। আর আমার মত যারা এমা বিরহে দিনাতিপাত করছেন, আমার সেই এমাতো ভাইদের জন্য শাহরুখ খানের নতুন ফিল্ম যা-ওয়ান এর নতুন ডায়ালগঃ “মানুষ একবার জন্মে, একবার মরে আর হ্যারি পটার…বারবার দেখে।”

পুনশ্চঃ হ্যারি পটারের একটিও বই না পড়েই বেচারার মুভিসমগ্র গলাৎকার করে ফেলেছি। এখন মনে হচ্ছে, হায়, হায়, এ আমি কী করেছিনু? পুরাকালে অবশ্য এক বন্ধুর পীড়াপিড়িতে ‘চ্যাম্বার অফ সিক্রেটস’ এর এই মোটা একখানা বই পড়েছিলাম বলে ইয়াদ হচ্ছে। বলতে দ্বিধা নেই, অনুবাদক অনেক কষ্ট করে চা বানিয়েছিলেন বটে, কিন্তু চায়ে চিনি দিতে ভুলে গেছেন। এতোদিন পরে হ্যারি পটারের সাথে আবার সাক্ষাতের পর তাই দুটো যুগান্তকারী ডিসিশান নিলাম। এক, অতি শিগগিরই মূল ভাষায় উনার এ্যাডভেঞ্চারগুলো পড়ে ফেলবো। দুই, ছয় মাস অন্তর অন্তর হ্যারি পটারের জগতে ঢুঁ মেরে আসবো। এমাকে কিঞ্চিত কুনজরে দেখবার জন্য কিংবা মিস্টার উইজলিকে ঈর্ষা করা সত্ত্বেও পটার সাহেব নিশ্চয়ই সীমান্তে বিএসএফ বসিয়ে চোখ রাঙাবেন না। পটারের উপর সে বিশ্বাস আমাদের আছে।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: