পোপের দেশ ভ্যাটিকান সিটি

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম স্বায়ত্বশাসিত দেশ ভ্যাটিকান সিটি আয়তনে মাত্র এক বর্গ কিলোমিটারের চেয়ে কম হলেও এর প্রতাপ দৌর্দন্ড। বিশ্বের নানা প্রান্তের শতকোটি ধর্মপ্রাণ ক্যাথলিক নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখে এই ক্ষুদে ভূখণ্ডটিকে, এখানেই যে বাস করেন তাদের ধর্মের জীবিত সবচেয়ে সন্মানিত ব্যক্তি পোপ! যার মুখ নিঃসৃত বাণী বিশ্বাসীদের কাছে ধর্মসৃষ্ট ঈশ্বরের অমোঘ বাণীর মতই পবিত্র। সেই সাথে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ জাদুঘর, যা বিশ্বের সেরা সব চিত্রকর্ম আর ভাস্কর্যের সম্ভার, বিশ্বের ২য় বৃহত্তম গির্জা, উচ্চতম গম্বুজ আর বিশ্বের সুন্দরতম ছাদ সিস্টেইন চ্যাপেল- এইসবই একসাথে ভ্যাটিকান সিটিকে পরিণত করেছে ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণের প্রাণকেন্দ্রে। চলুন বন্ধুরা, ঘুরে আসি এই স্বর্গীয়, অপার্থিব, অনন্য, অসাধারণ, অতুলনীয় সৌন্দর্যময় শিল্পকলার প্রাণকেন্দ্র পোপের দেশ ভ্যাটিকান সিটি থেকে।

IMG_5245
প্রাণসঞ্চালনকারী নদী টিবের অধ্যুষিত রোম মহানগরীর মাঝেই ভ্যাটিকান সিটির অবস্থান। রোম ভ্রমণের এক ফাঁকে এক রৌদ্রকরোজ্জল দিনে টিবের পার হয়ে দাঁড়ালাম ভ্যাটিকান সিটির সীমানা প্রাচীরের সামনে।
IMG_5147
সেই উঁচু দেয়াল ধরে এগোতে এগোতে দেখা পেলাম হাজার হাজার দর্শনার্থীর, যারা কাকভোর থেকে অপেক্ষারত ভ্যাটিকান জাদুঘরের মূল দরজায়। বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধশালী ও বৃহত্তম জাদুঘরটি দেখার রোমাঞ্চ সবার চোখে-মুখে। খুব আস্তে আস্তে এগোচ্ছে লাইন, দেরী করে আসার খেসারত দিতে হল হাজার দুই দর্শনার্থীর পিছনে দাড়িয়ে! বেশ খানিকক্ষণ পরে ১৫ ইউরোর টিকিট কেটে নিরাপত্তার ঝামেলা শেষ করে প্রবেশ করলাম পৃথিবীর ক্ষুদ্রত্তম দেশটাতে।
IMG_5154
IMG_5153
গাইড বই থেকে আগেই জেনে নিয়েছি ভ্যাটিকান সিটির জাদুঘর এতই বিশাল আর এর সংগ্রহশালা এত রকমারি জিনিসে পরিপূর্ণ যে সমস্ত সংগ্রহ দূরে থাক, বিশেষ ভাবে অতি বিখ্যাত নিদর্শনগুলোও একদিনে দেখা সম্ভব নয়! তাই প্রথম থেকেই মোটামুটি ঠিক করা ছিল কোন কোন জায়গা আর অমূল্য শিল্পকলাগুলো প্রধানত দেখতে চাই-ই চাই, সেই সাথে সাথে পথের মাঝে যা দেখা হবে তা বাড়তি পাওনা।
IMG_5162
প্রথমেই এক চিলতে সবুজ চত্বর, এর পরপরই মর্মর প্রাসাদের সমাহার। ভ্যাটিকান জাদুঘর মূলত কয়েকটি ভাগে বিভক্ত, যেমন মিশরীয় সংগ্রহ, ইৎরুস্কান সংগ্রহ, বোর্গিয়া ডিপার্টমেন্ট, রোমান চিত্রকলা, রাফায়েল কামরা, সিস্টেইন চ্যাপেল। তাই চাহিদা অনুযায়ী পথ খুজে নিতে হয় পথ নির্দেশক দেখে।
IMG_5158
প্রথমেই সূর্য দেবতা অ্যাপোলোর ভাস্কর্য স্বাগত জানায় সকলকে, এরপর ঢুকে পড়ি রোমানদের তৈরি পশু পাখির শ্বেত-পাথরের ভাস্কর্যের সংগ্রহশালায়। এ এক অন্যন্য জগৎ, চারপাশের নিখুত প্রাণীমূর্তিগুলো যেন হঠাৎ কোন অভিশাপে পাথর হয়ে যাওয়া প্রাণ, অপেক্ষায় আছে জীয়ন কাঠির ছোঁয়ায় ফের জেগে উঠবার। তাদের পশমগুলো পর্যন্ত পাথর কুঁদে তৈরি করা হয়েছে অমানুষিক দক্ষতায়, অপরিসীম মমতায়, নিপুন হাতে।
IMG_5165
সময়ের স্বল্পতা বিধায় অনেক কষ্টে হাটা ধরলাম অন্য সংগ্রহশালার দিকে। মিশরীয় সংগ্রহশালার মূল আকর্ষণ হাজার হাজার বছর আগের মিশরীয় মমি! এর পরে একের পর এক অমূল্য শিল্পকলায় থরে থরে সাজানো গ্যালারীগুলো, মাইলের পর মাইলে চলে গেছে। কোনটাতে ট্রাপেস্ট্রির বিশ্ব সেরা সংগ্রহ, কোনটাই ফ্রেসকো, কোনটাতে প্রাচীন ম্যাপের আদলে পেইন্টিং এর ছড়াছড়ি। এ এক আচ্ছা ফ্যাসাদ! এমন অদ্ভুত মধুর সমস্যায় পড়িনি কখনো, কোনটা ফেলে কোনটা দেখব।
IMG_5173
চিত্রকর্ম আর সুনিপুণ হাতের সূক্ষ কাজ, হাজার হাজার অবিশ্বাস্য রকমের জীবন্ত ভাস্কর্যগুলো যে পথের দু ধারেই শুধু সাজানো তা তো নয়- মেঝেগুলোও একেকটা দেখার মত, আকর্ষণীয় সব নকশা, নানা ধাঁচে বহু বর্ণের মোজাইকে তৈরি। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, মেঝের চেয়ে লক্ষগুণ ঝামেলা তৈরি করল ছাদগুলো, মাইলের পর মাইল নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে চলে যাওয়া কোনও ছাদের মনে হয় এক মিলিমিটার জায়গাও বাদ রাখেন নি ইতালিয়ান চিত্রকরেরা। এঁকে গেছেন একের পর এক অত্যাশ্চর্য পেইন্টিং। চারিদিকে জীবনের উজ্জল আলো ছড়ানো ভ্যাটিকানের এই জাদুঘরের তুলনা শুধু সে নিজেই।
IMG_5174
IMG_5175
তার উপর আছে হাজার হাজার দর্শনার্থীর ভিড়, কোথাও সুস্থির হয়ে দুদণ্ড দাড়িয়ে শিল্প উপভোগের যো নেই, কেবল গুটি গুটি পায়ে সামনের দিকে এগোনো। তাই বলছি এ কি আজব সমস্যা, দেখার আনন্দে মন কানায় কানায় পরিপূর্ণ, আবার খুঁটিয়ে উপভোগের সম্ভাবনায় গুঁড়ে বালি। এ যেন শাঁখের করাত, যা মনে করিয়ে দেয় রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা-
Heaven gives its glimpses only to those
Not in position to look too close.
IMG_5163
এভাবেই সৌন্দর্য সুধা উপভোগ করতে করতে কখন যে ভুবন বিখ্যাত রাফায়েলের কামরাগুলোতে নিজের অজান্তেই অনুপ্রবেশ করে ফেলেছি বলতে পারি না! বাম পাশের দেয়ালে চোখ পড়তেই টনক নড়ল- প্রিয় চিত্রকর রাফায়েলের বিশ্বখ্যাত স্কুল অফ এথেন্স আমার চোখের সামনে!!
IMG_5177
বিশাল সেই ক্যানভাস থেকে একে একে খুজে বাহির করলাম সক্রেটিস, প্লেটো, টলেমী, পিথাগোরাস, অ্যারিষ্টটল, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, মাইকেল এঞ্জেলো, ইউক্লিড, আলেকজান্ডার, হিরোডটাস, জোরোয়াস্টার এবং একমাত্র নারী সদস্য বিদুষী গণিতবিদ হাইপেশিয়া সহ স্বয়ং রাফায়েলকে যিনি পরিচিত ছিলেন মরণশীল ঈশ্বর বলে! এই বিশেষ চিত্রকর্মটি রাফায়েল এমন ভাবে নীল-সাদা আকাশের ব্যাকগ্রাউন্ড দিয়ে একেছিলেন যেন দর্শনার্থীর কাছে মনে হয় সে নিজেই এথেন্সের সেই জ্ঞানসভায় উপস্থিত আছে। কৌতূহলী দৃষ্টি মেলে শ্রদ্ধাবনত মস্তকে দেখছে চিরঅমর মহাজ্ঞানীদের সেই মিলনসভা। তৎকালীন পোপ ২য় জুলিয়াসের এই আবাসকক্ষগুলোর দেয়াল জুড়ে রাফায়েল একের পর এক অসাধারণ চিত্রকর্ম উপহার দিয়ে গেছেন আমাদের। বিশ্ব নিঃসন্দেহে তার কাছে আরও অগণিত অমর সৃষ্টি পেত যদি না অকাল মৃত্যু ১৫২০ সালে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে ছিনিয়ে নিয়ে যেত এই মরণশীল ঈশ্বরকে। উল্লেখ্য, তিনি সে যুগের অন্যতম সেরা স্থপতি ও নকশাবিদও ছিলেন, সেই সাথে সম্ভবত পৃথিবীর প্রথম দিককার একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ!
এরপরের গন্তব্য ভুবননন্দিত সিস্টেইন চ্যাপেল! বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাস্কর, রেনেসাঁ যুগের অন্যতম সেরা স্থপতি, কবি, নকশাবিদ মাইকেল এঞ্জেলো যে গুটিকয় অমর অনন্যসাধারণ চিত্রকর্মের মাধ্যমে নিজেকে সর্বকালের অন্যতম সেরা চিত্রকরের মর্যাদায় আসীন করেছেন তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত এই সিস্টেইন চ্যাপেল। অনেক শিল্পসমালোচকদের চোখে সিস্টেইন চ্যাপেলই বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত শিল্পকর্ম আর সেই সাথে অবধারিত ভাবেই এটা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সিলিং বা ছাদ। কারণ, এই সুবিশাল চিত্রকর্মটি মাইকেল এঞ্জেলো এঁকেছেন চ্যাপেলের ছাদে, এক হাতে চার বছর ধরে, উল্টো ভাবে উপুড় হয়ে অপরিসীম যন্ত্রণা সহ্য করে আমাদের এই বিস্ময় উপহার দেবার জন্য। এই বিভিন্ন ভাগে পেইন্টিং দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে বাইবেলের নানা অধ্যায়- ঈশ্বরের আলো ও অন্ধকারকে আলাদা করা, আদমের সৃষ্টি, তারপর ইভ, পরবর্তীতে তাদের স্বর্গ থেকে বিতাড়ন, নূহের বন্যা ও পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ঘটনা।
IMG_5180
১৫০৮ থেকে ১৫১২ সাল, মাত্র চার বছরে এই প্রায় অসম্ভব কাজটি তিনি সম্ভব করেন মাত্রাতিরিক্ত নিপুণ হাতে, যা অবলোকন করে নিজের অজান্তেই শ্রদ্ধায় এর স্রষ্টার প্রতি মাথা নিচু হয়ে যায় দর্শনার্থীদের এবং ঘাড় ব্যাথা হয় সকলেরই। অথচ এর জন্য প্রতিশ্রুত পারিশ্রমিকের কিছুই পান নি তিনি পোপের বদখেয়ালে! উল্লেখ্য, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে থাকা ধুলোয় প্রায় অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া ছাদ থেকে বর্তমান প্রযুক্তির সাহায্যে প্রায় এক দশক ধরে স্তরের পর স্তর ধুলোবালি পরিষ্কার করে নতুন জীবন দান করা হয় ১৯৯৪ সালে। নতুন পোপ নির্বাচনের সময় এই বিশাল ঘরটিতেই রুদ্ধদার নির্বাচন চলে। এর চারিদিকের দেয়ালে বত্তিচেলি, রাফায়েলসহ ভুবনবিখ্যাত নানা চিত্রকরের অপূর্ব সব কাজ, কিন্তু সত্যি কথায় সিস্টেইন চ্যাপেলের অনন্য সৌন্দর্যের সামনে ম্লান হয়ে যায় অন্যান্য সব কিছুই।
IMG_5182
এর সভা কক্ষেরই বেদীর দেয়াল জুড়ে আছে মাইকেল এঞ্জেলোর আরেক অমর সৃষ্টি বিশাল চিত্রকর্ম দ্য লাস্ট জাজমেন্ট বা শেষ বিচার! সিস্টেইন চ্যাপেল তৈরির তিন দশক পরে এই বিশাল ফ্রেসকো তৈরির কাজে হাত দেন মাইকেল এঞ্জেলো, শেষ করেন নয় বছরে! এইখানে তার অনন্য তুলির সাহায্যে বর্ণনা করা হয়েছে ধর্মগ্রন্থের মতে অবিশ্বাসীদের পরকালের শাস্তিপূর্ণ জীবন। দ্য লাস্ট জাজমেন্টের উচ্চতা ৪৫ ফিট আর প্রস্থ প্রায় ৪০ ফিট, আশাকরি পাঠক এই পরিমাপ থেকে এর বিশালতার কিছুটা আন্দাজ পাবেন।
f
দ্য লাস্ট জাজমেন্ট আঁকার পরে তা দর্শনে অবিশ্বাসীদের শাস্তির চিত্র অনেককেই আতঙ্কিত করলেও যথেষ্ট মনোপীড়ার কারণ হয়ে দাড়িয়ে ছিল তা তৎকালীন পোপসহ রক্ষনশীল সমাজের। জানা যায়, পোপের আদেশে নগ্ন মানবদেহের স্থান বিশেষে আব্রুর ব্যবস্থাও করা হয়ে ছিল। কিন্তু সিস্টেইন চ্যাপেলের সাথে সাথে দ্য লাস্ট জাজমেন্টের পরিষ্কার ও মূল রঙ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াও চলে এবং বর্তমানে দর্শকেরা একে আদিরূপে দেখার সৌভাগ্য পান। যদিও এখানে ছবি তোলা নিষেধ, তারপরও রক্ষীদের নজর এড়িয়ে সবাইই ব্যস্ত কিভাবে ফ্রেমবন্দী করা যায় এই অপার বিস্ময়ের আধারগুলোকে। শুধু বলতে চাই, সিস্টেইন চ্যাপেল ও দ্য লাস্ট জাজমেন্টের অপার্থিব, নিখুত, স্বর্গীয়, নয়নমনোহর সৌন্দর্য নিয়ে কোটি কোটি পাতার বই ছাপা হয়েছে আজ পর্যন্ত, তৈরি হয়েছে অসংখ্য তথ্যচিত্র ও চলচ্চিত্র, এবং তা অব্যাহত রবে বহুকাল, তাই এই নিয়ে আর বেশী আলোচনা এই ক্ষুদ্র পরিসরে না করি, তবে মনের গহনে অনেক দিন ধরেই ইউরোপে অবস্থানকালীন সময়েই সিস্টেইন চ্যাপেলের নিচে একবার হলেও দাঁড়ানোর যে সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা ছিল তা পরিণতি পাওয়ায় যারপরনাই আনন্দিত হয়ে পা বাড়ালাম পরের গন্তব্যে- ভ্যাটিকানের আরেক সম্পদ সেন্ট পিটারের ব্যাসিলিকা আর বার্নিনির চত্বর দেখতে।
IMG_5186
সেন্ট পিটারের ব্যাসিলিকায় এক সাথে ষাট হাজার লোক অবস্থান করতে পারে, যা একে পরিণত করেছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশী মানুষ ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন খ্রিষ্টান স্থাপত্যে এবং ক্যাথলিকদের কাছে এ এক অতি পবিত্র তীর্থস্থান। ভিতরে প্রবেশের জন্য তখন হাজার হাজার দর্শকের ভিড় ব্যাসিলিকার সামনের চত্বরে। পৃথিবীর অন্যতম নয়নাভিরাম এই চত্বরটির কাজ শুরু হয় ১৬৫৬ সালে, ভ্যাটিকানের বরপুত্র, রেনেসাঁ আমলের অন্যতম প্রতিভা বার্নিনির তত্ত্বাবধানে। প্রায় এক যুগ পরে শেষ হয় তার নির্মাণ কাজ, এই সুবিশাল চত্বরের ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে দ্য উইটনেস নামের ৮৪ ফুট উচ্চতার এক ওবেলিস্ক স্তম্ভ। বিশ্বের ২য় উচ্চতম এই ওবেলিস্কটির উচ্চতা ভিত্তি থেকে ১৩০ ফিট! মিশর থেকে প্রায় ২০০০ বছর আগে আনা এই স্তম্ভটির সাথে জড়িয়ে আছে ক্যালিগুলাসহ অন্যান্য ঐতিহাসিক সব চরিত্র। এর চত্বরে আরো স্থান পেয়েছে বার্নিনির নির্মিত এক বিশালাকার অনিন্দ্যসুন্দর ঝরনা যার নকশা তৈরি হয় ১৬১৩ সালে, এই স্ফটিক স্বচ্ছ জলধারা আজো পূর্ণ বেগে বহমান। চত্বরের অন্য পাশেই ভ্যাটিকানের সীমানা শেষ, শুরু রোম তথা ইতালি!
IMG_5197
একটু ভালমত খেয়াল করলেই তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে নামী স্থাপত্যকলার নিদর্শন এই ব্যসিলিকার এক প্রান্তে এই সুরম্য ব্যালকনি নজরে আসে, যার পিছনে ঝুলছে গাঢ় লাল রঙের পর্দা। জানা গেল ভ্যাটিকানের এক ও অদ্বিতীয় অধীশ্বর পোপ এই বারান্দাতেই দাড়িয়ে বিশ্বকে দর্শন দেন।
IMG_5200
IMG_5201
নিরাপত্তার বেড়ী পার হতেই চোখে পড়ল বিচিত্র রঙ-চঙে পোশাক পরা সুইস গার্ডদের, ১৫০৬ সালে যাত্রা শুরু হওয়া ভ্যাটিকানের এই নিরাপত্তাবাহিনীর মূল দায়িত্ব পোপের নিরাপত্তাবিধান, আর এদের পোশাকের মূল নকশাবিদ- মাইকেল এঞ্জেলো!
IMG_5240
অবশেষে ঢোকার সুযোগ হল সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায়। বলা হয়ে থাকে যীশু খ্রিষ্টের সরাসরি ১২ জন শিষ্যের অন্যতম গালি থেকে আশা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা ধীবর পিটার একসময় রোমে আসে এবং নিভৃতে তার বিশ্বাস প্রচার করতে থাকে। পরে ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত অত্যাচারী রোমান সম্রাট নিরোর সময় পিটারকে উল্টো করে
ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয় ক্যালিগুলার সেই ওবেলিস্কের সামনে এবং অন্য অনেকের সাথেই তাকে গোর দেওয়া হয় সেই চত্বরেই যার উপরে দাড়িয়ে আজ এই বিশাল মর্যাদাপূর্ণ তীর্থস্থান। এর আকাশ ছোঁয়া প্রায় সাড়ে চারশ ফুট উচ্চতার গম্বুজটি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু গম্বুজ, যার ভিতরের ব্যস ৪৬৪ ফিট ১ ইঞ্চি! এই আক্ষরিক অর্থেই চক্ষুচড়কগাছ করা গম্বুজ নির্মাণের মূল কৃতিত্ব দেওয়া হয় মাইকেল এঞ্জেলোকে।
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এই ব্যাসিলিকা যে কতটা জাঁকজমকপূর্ণ, দেয়ালে দেয়ালে কতটা কারুকার্য, ছাদে শিল্পের সমারোহ আর কোণে কোণে কত বিখ্যাত শিল্পীর ভাস্কর্য আর শিল্পকর্মে পরিপূর্ণ তার আর নতুন করে ব্যাখ্যা দেওয়ার কিছু নেই। ধারণা করা হয় উপাসনার মূল বেদীর নিচেই সেন্ট পিটারের দেহাবশেষ সংরক্ষিত আছে। মনের মাঝে শুধুই মুগ্ধতার রেশ, একদিনে আর কতই বা দেখা যায়!
IMG_5213
মনের আনন্দে পথহারা পথিকের মত উদভ্রান্ত ভাবে মূল দরজার দিকে এগোচ্ছি এমন সময় বাম দিকে দেখা পেলাম ভ্যাটিকান তথা বিশ্বের অন্যতম এক শিল্প সম্পদের- মাইকেল এঞ্জেলোর পিয়েতা!
IMG_5232
মেরীর কোলে পূর্ণ বয়স্ক যীশুর মৃতদেহ, কি অপূর্ব তাদের মুখমণ্ডলের অভিব্যক্তি, অজানা আবেগে উদ্ভাসিত! মাত্র ২৫ বছর বয়সে মাইকেল এঞ্জেলো এই সাদা মার্বেলের ভাস্কর্যটি তৈরি করেন এবং এটিই তার খোদাই করা ভাস্কর্য যেখানে শিল্পী তার নাম খোদাই করে রেখেছেন সফেদ মার্বেলে, হাতুড়ি-ছেনি দিয়ে, কালের করাল গ্রাস থেকে অমর, অক্ষয়, অব্যয় করে। আর মেরীর আলখেল্লার কাপড়ে বাতাসের তৈরি ভাজ দেখে ভুলেই যেতে হয় এটা পাথরের ভাস্কর্য, মোম দিয়ে বানানো বলে ভ্রম হয়! আরও কাছ থেকে দেখার ইচ্ছে ছিল শৈশবেই ভবেশ রায়ের বই পড়ে জানা এই অসীম স্নিগ্ধ ও অনন্য সুন্দর ভাস্কর্যটিকে, কিন্তু তা হবার জো নেই। কারণ, কয়েক দশক আগে এক বিকৃতমস্তিস্ক ধর্মান্ধ নিজেকে যীশু দাবি করে মেরীর মূর্তিতে হাতুড়ির আঘাত হেনে খানিকটা ক্ষতি সাধনে সক্ষম হয়! এর পরপরই পিয়েতার স্থান হয় বুলেটপ্রুফ কাঁচের পিছনে, দর্শনার্থীদের থেকে বেশ কয়েক মিটার দূরে।
পিয়েতা দর্শনের অপূর্ব সুখানুভূতি নিয়ে সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার মূল দরজায় দিয়ে বাহিরে আসা হল, সারাদিনের অবিরাম হাঁটাহাঁটির পর খানিকটে বিশ্রামের আশায় দাঁড়ালাম এর বাধানো সিঁড়িতে। তখনও হাজার পর্যটকের আনাগোনা চারিপাশে, সামনেই বার্নিনির বিশাল চত্বর, ক্যালিগুলার ওবেলিস্ক। আরও দূরে সূর্যদেব ডুবুডুবু করছে পশ্চিম দিগন্তে, তারই খানিকটা কমলা আভা ভ্যাটিকান থেকে যেয়ে পড়েছে টিবেরের জলধারায়। এমন শান্ত স্নিগ্ধ নয়নমনোহর মুগ্ধতা নিয়েই বিদায় নিল জীবনের এক অসাধারণ স্মৃতিময় দিন, মনের মানসপটে তখনও চিরস্থায়ী ভাবে জ্বলজ্বল করছে সিস্টেইন চ্যাপেল ও অন্যান্য অমর শিল্পকর্মগুলো।
IMG_5238

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: