স্টিভ ম্যাককারির আলোকচিত্র প্রদর্শনী

গোটা দেয়াল জুড়ে একটাই ছবি, তাতে একটাই মুখ- সমুদ্রের অতল গভীর থেকে উঠে আসা তরঙ্গের বেলাভূমিতে আছড়ে পড়ার আগমুহূর্তের তুঙ্গস্পর্শী ঢেউয়ের বিষণ্ণ সবুজ বর্ণ থৈ থৈ করছে চোখের তারায়, ছিন্ন বিবর্ণ লাল ওড়নায় ঘেরা মুখখানা যেন ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি- ভাবলেশহীন, কিন্তু যে কোন সময় ফুসে উঠতে পারে অন্তদহনের তীব্র ক্রোধে। এ এক যুদ্ধবিধবস্ত দেশের মর্মস্পর্শী পারিপার্শ্বিকতার শিকার এক কিশোরীর মুখ, ১৯৮৪ সালে পাকিস্তানের এক উদ্বাস্তু শিবিরে তোলা এক আফগান কিশোরীর আলোকচিত্র, যার সম্পর্কে বলা হয় তার খোলা চোখদুটোতে যেন ছুরির ধার, ঘরের যেখানেই আপনি অবস্থান করেন না কেন, আপনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেই তার এই নীরব অবলা দৃষ্টি, এটাই যেন তার প্রতিবাদ আমাদের হাস্যকর তথাকথিত মানব সভ্যতার কাছে তার বিনা অপরাধে গৃহহীন হবার অপরাধে।
AFGAN GIRL-Steve Mccurry
বিশ্বখ্যাত আলোকচিত্রগ্রাহক স্টিভ ম্যাককারির তোলা আফগান মেয়ে নামের এই আলোকচিত্রটি পায় ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির ১০০ বছরের সেরা ছবি হবার দুর্লভ সন্মান। ১৯৮৫ সালের জুন মাসের সোসাইটির পত্রিকার মলাটে আসা ছবিটি আবার মলাটে আসে ২০০২-এর এপ্রিলে, যখন ১৭ বছর পর এক অভিযানে ম্যাককারি আবার নাম না জানা মুখটিকে আবার খুঁজে বাহির করেন ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে দাড়িয়ে থাকা এক ভূখণ্ড থেকে।
steve_mccurry
খবর পেলাম সেই আফগান কিশোরীর ছবি তো বটেই, ৮০টি অসামান্য আলোকচিত্র নিয়ে বিশ্ব কাঁপানো জনজীবনের ছবি তোলার জাদুকর খ্যাত স্টিভ ম্যাককারির আলোকচিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়েছে ফিনল্যান্ডের ছোট্ট শহর সালোতে। আমার বর্তমান আস্তানা হেলসিংকি থেকে তা শত কিলোমিটারের অধিক দূর হলেও মূল ছবিগুলো দেখার দুর্দম আকর্ষণে এক রোদেলা দুপুরে রওনা দিলাম শিল্পরসিক, পাখিপ্রেমী বন্ধু স্টিফান নপম্যানের সাথে অদূরের সালোর পথে। সেখানকার চিত্রকলা জাদুঘরের চারটি প্রদর্শনী কক্ষ জুড়ে হচ্ছে এই বিশাল প্রদর্শনী।
প্রদর্শিত প্রথম ছবিটিই মন ছুয়ে যায়, চঞ্চলমতি এক কিশোরী পরম মমতায় স্পর্শ করছে মুখবন্ধ লাজুক পপি ফুলের অস্ফুট কলিকে, পেছনে মধ্য এশিয়ার অবারিত মুক্ত আকাশ, অদূরেই দাড়িয়ে তার ভাই- এ কি নিছক প্রকৃতি প্রেম না সর্বনাশা মাদক ব্যবসার জন্য এই সযত্ন লালন!
এমন করে আমাদের মানসপটে খণ্ড খণ্ড গল্প ফুটিয়ে তোলে ফ্রেম বাঁধানো ক্যানভাসগুলো। যুদ্ধ বিধ্বস্ত কাবুলের রাস্তার অশীতিপর বৃদ্ধ দাঁতের ডাক্তার আর মান্ধাতার আমলের চোঙওয়ালা ক্যামেরার কারিগরকে মনে হয় জীবন্ত ইতিহাস। বুলেটের আঘাতে শতছিদ্র গাড়ীর বনেটে হারিকেনের মায়াবী আলোকে সোনালী জীবনের আলোয় ভরা কমলালেবুর বিকিকিনি করতে বসা তরুণকে বড় আপন মনে হয়, ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করে তার এমন অবস্থার জন্য দায়ী রাষ্ট্রনায়কদের আর ভাতৃত্বপূর্ণ ভালবাসায় তার অদম্য জীবন সংগ্রামের প্রতি মাথা নুইয়ে আসে পরম শ্রদ্ধায়। নিহত আফগান নেতা মাসুদের ছবি সম্বলিত কার্পেট বিক্রির ছবিটিতে দৃষ্টি আটকে যায়, কয়লা খনির ক্লান্ত বিশ্রামরত মজুরের কালো গুঁড়োয় ঢাকা মুখমণ্ডলে যেন আগামী দিনে স্বপ্ন ঝকঝক করে, কাবুলের তীব্র শীতের মাঝেও গায়ে গোটা বিশেক সুয়েটার জড়ানো পোশাক ব্যবসায়ী অপলকে বলে যায় দিন বদলের গল্প। স্টিভের ছবিগুলোই এমন, ছেড়া ছেড়া আনন্দ-বেদনার, জীবন সংগ্রামের মহা আলেখ্য, অপার অব্যক্ত অনুভূতিগুলোর দক্ষ চিত্রায়ন। আর প্রদর্শনীর মূল আকর্ষণ আফগান মেয়ের প্রতিকৃতির কথাতো শুরুতেই বলেছি।
stevemccurryafghanistan4
Afgan Coal Miner
পেশাগত কারণে জীবনের অনেকটা সময় এশিয়াতে কাটিয়েছেন আমেরিকায় জন্ম নেওয়া স্টিভ, এই বিশেষ প্রদর্শনীর সবগুলো আলোকচিত্রই এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গত তিন দশকে তোলা, যার বেশ কয়েকটি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকার মলাটের মূল আলোকচিত্র হবার দুর্লভ সন্মান অর্জন করেছে।
Exhibition St
মনে দাগ কেটে যায় বন্যায় বুক পর্যন্ত উঠে আসে পানি ঠেলে জীবিকার সম্বল সেলাই মেশিন কাঁধে সংগ্রামরত ভারতীয় এক বৃদ্ধের ছবি, রাজস্থানের কোন অজ গ্রামে অপূর্ব নীল রঙে নিকানো মাটির দেয়ালের বিপরীতে দাঁড়ানো আপাদমস্তক লাল পোশাকে মোড়ানো রাজপুত রমণী, সাদা পাগড়ী মাথায় পড়া দেবদূত সদৃশ্য গ্রাম্যবৃদ্ধের সাথে কৌতুকরত নাতি – পিছনে পোষা উটের লম্বা গ্রীবা, মৌসুমি বৃষ্টিতে গোড়ালি পানি ঠেলে দিল্লীর চাঁদনিচক বাজারে এগোনো জনতা, মুম্বাই-এ ট্যাক্সির জানালার পাশে দাঁড়ানো বৃষ্টিস্নাত করুণ সাহায্যপ্রার্থিনী, কোলকাতার ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন ট্রাম, ভূস্বর্গ কাশ্মীরের ভুবননন্দিত ডাল হ্রদের সৌন্দর্য, সাতরঙা ফুলের পসরার একফালি রঙধনু নিয়ে তরতর করে এগোচ্ছে মাঝি। শ্রীলঙ্কার সমুদ্র সৈকতে তোলা বাঁশের মাথায় অবস্থানরত একদল জেলের জোয়ারের পানি থেকে অভিনব পদ্ধতিতে মাছ শিকারের ছবিটিতো দেখেছি নানা বইয়ের মলাটে।
Mumbai life
Monsoon
Lake is Kashmir
Indian childhood
Fishing in Srilanka
nyc5904
11a071d8817fa99c6f45103699a7012c
এরপরেই প্রদর্শনী কক্ষের সাদা দেয়ালকে পরাবাস্তবতার সবুজ প্রান্তরে পরিণত করে যেন শূন্য থেকে ঝুলছে এক গাঢ় সবুজ ক্যানভাসের ছবি, মৌসুমি বৃষ্টির প্রবল বেগকে উপেক্ষা করে ঘাসের উপরে অবস্থানরত একদল নারী শ্রমিক, ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশের চা বাগানে অসামান্য মুহূর্তটি ফ্রেমবন্দী করেছিলেন স্টিভ।
Bangladesh,Tea Garden
এরপরে আসে বার্মার সন্ন্যাসী, নীরব প্রকৃতি, জিরাফগলার রমণীদের স্মৃতিময় পোট্রেট। দেয়াল জুড়ে কম্বোডিয়ার দৃশ্যপট, কেন্দ্রস্থলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মন্দির আঙকোর ভাট, গেরুয়ারঙা সন্ন্যাসীরা সম্মুখপানে এগিয়ে যাচ্ছে প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে, পিছনে দিগন্ত ঘিরে থাকা আঙকোরের পাথুরে দেয়াল।
ফিলিপাইনের পাহাড়ি ঢালে সারি সারি ধানক্ষেতে বপণরত কিষাণী, ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের জলাবদ্ধ জনতা যেন জীবনের নেশায় উম্মুখ। ইয়েমেনের অচল করাল কামানের উপর ক্রীড়ারত শিশুর দল যেন উপহাস করে যাচ্ছে বুড়োদের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলাকে।
প্রদর্শনীর শেষ কক্ষটি পুরোপুরি তিব্বতের দখলে, মুখে অজস্র বলিরেখার হাসি দেওয়া শতবর্ষী দাদীমা থেকে কয়েক সপ্তাহ বয়সী অজস্র কাপড়ে মোড়ানো প্রায় পুঁটুলিতে পরিণত লাল টুকটুকে তিব্বতি শিশু, সবাই স্থান পেয়েছে সেখানে। বিশেষ করে পশুপালনকারী যাযাবর আদিবাসীদের নানা চিত্র দেখানো হয়েছে মুন্সিয়ানার সাথে- চমরী গরুর পাল নিয়ে তীর্থযাত্রীরা চলেছেন মোক্ষ লাভের আশায়, যাযাবর রমণীর চামড়ার তাবুতে জ্বলছে জীবনরক্ষাকারী আগুন, সেই সাথে অপার্থিব সৌন্দর্যের অধিকারী তিব্বতের রূক্ষ প্রাণময় ভু-প্রকৃতি।
TIBET-10542
TIBET-10009
কি অপরিসীম ক্ষমতা এই নীরব আলোকচিত্রগুলোর, মনে হয় এমন মহান সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই যেন বলা হয়েছে- এক হাজার লাইনের চেয়ে একটি ছবি অনেক বেশী বর্ণনাময়। প্রদর্শনীর শেষে বন্ধু স্টিফানের বলা কথাগুলো কানের পর্দায় বাজতে থাকল- এগুলো কোন আলোকচিত্র নয়, এগুলো ঘটনাময় সময়কে ফ্রেম বন্ধী করা অমূল্য চিত্রকলা! জয়তু জীবন সংগ্রাম! জয়তু স্টিভ ম্যাককারী!!
Me with Main Poster

মূল লেখার লিংক
http://www.sachalayatan.com/40405

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: