ক্রেডিট কার্ড ও আন্তর্জাতিক নেপো’চক্র

ইশকুলে পাটিগণিত করতে যাঁদের পায়ের ঘাম মাথায় ফেলতে হত না, তাঁদের জন্য একটা ছোট্ট অঙ্ক:

গোপালগঞ্জের হাটে বছিরুদ্দি শেখ ঝুড়ি ভরে জামরুল বেচতে আসে ফি-সোমবার। একটা জামরুল তিন টাকা দরে হলে তার ঠিক-ঠিক হয়। কিন্তু সবার আয়ের পাঁচ পারসেন্ট ভাগ আবার দিতে হয় ওই হাটের ব্যবসায়ী-সমিতির মাতব্বর নেপো’কে। আর নিজের পেট চালাতেও তো হবে? সেজন্য সে বিক্রিতে ১০% হারে লাভ রাখতে চায়। তাহলে, কুড়িখানা জামরুল’ওয়ালা একটা ঝুড়ি যদি রামবাবু কেনেন, তাহলে তাঁর কেনা দর কত পড়েছে?

উত্তরটা হল, ৬৯ টাকা ৪৭ পয়সা।

আর এর মধ্যে, রামবাবুর অজান্তেই তাঁর পকেট থেকে সাড়ে তিন টাকা চলে গিয়েছে নেপো’র গেঁজেতে। ওই পরিমাণটা, বছিরুদ্দির করা একটা কৃত্তিম মূল্যবৃদ্ধি বলেও ধরতে পারেন।

(১)

এই প্রসঙ্গ কেন তুললাম? কারণ, দেশেই হোক বা আমেরিকায়, আপনি যখনই কোনো দোকানে টাকা দিয়ে এমন কিছু কিনছেন, যা রামবাবু এসে ক্রেডিট কার্ড দিয়েও কিনতে পারেন, তার অর্থ – আপনি একরকম কৃত্তিম মূল্যবৃদ্ধির শিকার হচ্ছেন।

খুব সহজ ভাষায়ই বুঝিয়ে বলছি। কিন্তু তার আগে ধরে নিন, বছিরুদ্দি শেখ এখন আর হাটে বসে না, তার নিজের একটা ঝাঁ-চকচকে দোকান হয়েছে, নূরজাহান ব্যাঙ্কে সে টাকা রাখে। আর রামবাবু সব কেনাকাটাই করেন তাঁর ব্যাঙ্ক অফ কচুবাগান-এর ক্রেডিট কার্ড দিয়ে। আর সেটার উপর জেস্টারকার্ড-এর ছাপ্পা মারা।

তাহলে, যখনই রামবাবু ওই কার্ড দিয়ে কিছু কেনার জন্য বছিরুদ্দিকে টাকা দিচ্ছেন, তার একটা অংশ চলে যাচ্ছে ওই দুই ব্যাঙ্ক আর জেস্টারকার্ডের হাতে। সেই জন্য, জিনিসের মুদ্রিত মূল্য বছিরুদ্দিকে বাড়িয়ে রাখতে হচ্ছে, যাতে ওইগুলো বাদ দেওয়ার পর তার হাতে আসল মূল্যের সমান টাকা আসে।

তাই আপনি যখন বছিরুদ্দির দোকানে গিয়ে ওই একই জিনিস কিনছেন মুদ্রিত মূল্যে, কিন্তু রোক্কা নোট দিয়ে, তখন ওই বাড়তি টাকাটা পুরোটাই বছিরুদ্দির লাভ হয়ে যাচ্ছে!

(২)

আপনার দুরাবস্থার আলোচনায় পরে আসব। তার আগে, ক্রেডিট কার্ডের দইটা কোন নেপোয় কীভাবে মারে তা দেখে নিই।

এই যে ব্যবস্থাটা, যাতে বছিরুদ্দির দোকানে বসানো কার্ড-রীডার মেশিনের মাধ্যমে বিক্রির টাকাটা সরাসরি তার নূরজাহান ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে গিয়ে জমা পড়ছে, এর জন্য তার ব্যাঙ্ক তার থেকে একটা কমিশন পায়। সেটা ধরুন ২%। এই ফী-টা হচ্ছে তাকে দেওয়া ব্যাঙ্কের সুবিধাগুলোর দাম। তাকে টাকা নিয়ে গিয়ে ব্যাঙ্কে জমা করতে হচ্ছে না, সরাসরিই গায়েবি টাকা তার অ্যাকাউন্টে জমা পড়ছে। আর সে যে গ্রাহকদের কার্ড ব্যবহারের আরামটা দিতে পারছে, এর জন্য সে গ্রাহক পাচ্ছেও বেশি।

কিন্তু এরও আগে, রামবাবুর ব্যাঙ্ক থেকে টাকাটা বেরোবার সময়ই, কেটে নেওয়া হচ্ছে একটা অংশ। সেটাকে বলে ইন্টারচেঞ্জ ফী। যেহেতু ব্যাঙ্ক অফ কচুবাগান থেকে ওই টাকাটা বেরোচ্ছে, তাদেরকে টাকাটা অন্য এক ব্যাঙ্কে পাঠাতে হচ্ছে, তাই একটা ২% ট্রান্সফার ফী কেটে নেয় তারা। আর সেই সাথেই, যেহেতু এই কার্ডের কাজটা হচ্ছে জেস্টারকার্ড-এর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে, কার্ডে তাদের ছাপ্পা যেটার প্রমাণ, তাই তারাও একটা ১% হিস্যা পায়।

মানে এইরকম – ১০০ টাকা বিলের জন্য কার্ড দিলে, ১০০ টাকাই তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে কাটলো, কিন্তু ৯৭ টাকা বেরোলো রামবাবুর ব্যাঙ্ক থেকে, তার থেকে আবার বছিরুদ্দির ব্যাঙ্ক কেটে নিয়ে ৯৫ টাকা দিল তার অ্যাকাউন্টে।

(৩)

তা এতগুলো ফী দিলে তো বছিরুদ্দির অনেক লস। তাই অনেক দোকানে দেখবেন, একটা সর্বনিম্ন দামের কম বিল হলে (প্রায়শই ১০ ডলার) ক্যাশ দিয়েই কিনতে হয়। নইলে এতগুলো উপরি ফী দিয়ে তাদের পড়তায় পোষায় না।

আবার বছিরুদ্দি ভাবতেই পারে, এতসব ফী কেন সে নিজের পকেট থেকে দেবে? সে হয়ত শুরুর অঙ্কটার মত সব জিনিসেরই দাম একটু করে বাড়িয়ে রাখল। সেক্ষেত্রে কেউ ক্যাশে কিনলে ওই পরিমাণটা তারই লাভ।

বা সে যদি হিসাবে আরও দড় হয়, সে যদি দেখে, যে তার দোকানে অর্ধেক ক্রেতা ক্যাশ দেয় আর অর্ধেক কার্ড, তাহলে সে হয়ত পুরোটা না বাড়িয়ে অর্ধেকটা দাম বাড়াল। তাহলে, যাঁরা ক্যাশে কিনছেন, তাঁরা কার্ড-ধারীদের ভর্তুকি দিচ্ছেন, এভাবে ভাবা যেতে পারে।

অধিকাংশ বিক্রেতাই এমনটা করে থাকেন। তাহলেই দেখুন, কার্ড-ব্যবহারকারীদের সুবিধার জন্য ক্যাশ-দাতাদের বেশি পয়সা দিতে হচ্ছে আখেরে।

(কার্ড-ব্যবহারকারীরা আরও একটা পরোক্ষ সুবিধা পান। এই যে ২% তাঁর ব্যাঙ্কের পকেটে যাচ্ছে, তাঁর ব্যাঙ্ক তো হিসাব রাখছে যে তিনি কতবার কার্ডটা ব্যবহার করছেন। তারপর ওই থেকে তাঁদের কিছু রিওয়ার্ড দেওয়া হয়, নিয়মিত ব্যবহারকারী হিসাবে। এই যেমন হোটেল বুকিংয়ে বা রেস্তোরাঁয় ছাড়।)

(৪)

এর প্রতিকার হচ্ছে, যাঁরা কার্ড দিয়ে কিনছেন, সরাসরি তাঁদের কাছেই এই আরামের জন্য ফী দাবি করা। আমি লন্ডনে যখন ছিলাম, যতদূর মনে পড়ে, ছোট ছোট দোকানগুলো হয়ত পঞ্চাশ পেন্স বেশি চার্জ করত কার্ড ব্যবহারের জন্য। অস্ট্রেলিয়াতেও শুনেছি বিক্রেতাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে কার্ড-ব্যবহারকারীদের থেকে একটা সারচার্জ নেওয়ার। এর ফলে সেখানে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার কমেছে, পিন-ওয়ালা ডেবিট কার্ড বা ক্যাশ ব্যবহারের চল বেড়েছে।

(ডেবিট কার্ড যেমন প্রায়শই সোয়াইপ করে তারপর পিন এনট্রি করে ব্যবহার করা যায়, তাতে ফী সবচেয়ে কম হয়। ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড শুধু সোয়াইপ করলে, তারপর কাগজে সই করলে, সেটায় ফী খানিক বেশি লাগে। আর যখন কার্ডের নম্বর দেখে দেখে বিক্রেতা মেশিনে এনট্রি করে, যেমন অনেক রেস্তোরাঁয় করা হয়, তখন ফী লাগে সবচেয়ে বেশি। ব্যাঙ্কের তরফে কার্ডের প্রসেসিং-এর ধাপ তখন বেড়ে যায় বলেই এইরকম।)

কিন্তু এতেও একটা সমস্যা আছে। একজন বিক্রেতা হিসাবে ভিসা বা মাস্টারকার্ড এর মাধ্যমে টাকা নিতে গেলে, মানে তাদের কার্ড পড়তে পারে এমন মেশিন ব্যবহার করতে গেলে, যে কাগজে সই করতে হয় তাতে বলা আছে, তুমি আমাদের কার্ড-ধারীদের থেকে বেশি টাকা নিতে পারবে না। তাই ইউকে বা অস্ট্রেলিয়ায় যে ওই ব্যবস্থা করা গেছে, তা কেবল সরকার বিশেষ আইন করে ওই ‘নো-সারচার্জ পলিসি’ তুলে দেওয়ার ফলে। কানাডা সরকারও একই আইন করায় ওরা আবার তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। আমেরিকার কিছু স্টেট আবার অনুমতি দিয়েছে যে, কার্ড-ধারীদের থেকে বেশি টাকা না নিলেও তুমি ক্যাশ-দাতাদের কিছু ছাড় দিতে পারো।

(৫)

কার্ড কোম্পানিদের এমন জবরদস্তি নিয়ে আরো একটা গল্প শোনাই। ভিসা এবং মাস্টারকার্ডের মতই আরেকটা বড় নেটওয়ার্ক চালায় আমেরিকান এক্সপ্রেস, কিন্তু বস্টনের অনেক দোকানেই দেখবেন তাদের লোগো-ওয়ালা কার্ড নেয় না। আমেরিকার অনেক জায়গাতেই। এর পেছনে একটা গল্প আছে, যেটা বস্টন ফী পার্টি (বস্টন টি পার্টি-র অনুকরণে) বলে খ্যাত।

একটা সময়, আমেরিকান এক্সপ্রেসের নিয়ম ছিল, যেসব বিক্রেতা কেবলমাত্র তাদের কার্ডই গ্রহণ করে, তাদের জন্য ফী-তে বিশেষ ছাড় দেওয়া। এমনিতে তাদের ফী ছিল ৪%, আর বাকিদের ছিল ১%-এর মত; কিন্তু শুধুমাত্র তাদের কার্ড নেয় যারা তাদের থেকে হয়ত কেবল ০.৫% ফী নিত। এর ফলে অনেক দোকানই তাদের সঙ্গে এমন চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল, আর বাকি কোম্পানিগুলো খুব চটে যেত।

কিন্তু ১৯৯১ সালে বস্টনের অনেকগুলো রেস্তোরাঁ মিলে ঠিক করে, যে তারা উলটে আমেরিকান এক্সপ্রেসেরই কোনো কার্ড নেবে না, বরং বাকিদের কার্ডই নেবে। দ্রুত এই কাজ দেশের অন্যান্য জায়গার রেস্তোরাঁগুলোও শুরু করে। ফ্যাসাদে পড়ে তারা তখন তাদের ফী অনেকটাই কমিয়ে নিয়ে আসতে বাধ্য হয়, আর ওইরকম নিয়মও চুক্তিপত্র থেকে তুলে ফেলে।

(৬)

এই যে কোম্পানিগুলোর এত বেশি ফী দাবি করা, তাই নিয়ে নানা দেশে অ্যান্টিট্রাস্ট মামলা (মানে মোনোপলির বিরুদ্ধে) হয়েছে। উপরে যেমন বললাম, অস্ট্রেলিয়ার সরকার আইন করে এই ফী-এরও সীমা বেঁধে দিয়েছে।

আজকের ডিজিটাল যুগে এক ব্যাঙ্ক থেকে অন্য ব্যাঙ্কে টাকা ট্রান্সফার করা দুধভাত। তাই এত বেশি ইন্টারচেঞ্জ ফী দাবি করাও অনুচিত। এই যুক্তিতে তাই এই ফী-টাই বিশেষ করে আমেরিকা, ইউরোপ ইত্যাদি অনেক দেশের সরকার কড়া নজরে রেখেছে, অনেক কোম্পানিকে এই ফী-র বিশদ তালিকা দিতে, হার কমাতে নির্দেশ দিয়েছে।

কিন্তু আজব ব্যাপার এই যে, অস্ট্রেলিয়াতে যেমন সরকার ফী-এর সীমা বেঁধে দিয়েছে, কার্ড-ধারীদের বেশি চার্জ করবার অনুমতিও দিয়েছে যাতে ক্যাশ-দাতারা অনায্যভাবে বেশি টাকা দিতে বাধ্য না হয়, তারপরও কিন্তু বিক্রেতারা কোনো জিনিসের দাম কমায় নি! বরং অনুমতি পেয়েই কার্ড-ধারীদের আরও উপরি চার্জ করছে। আর এই ঘটনা দেখে কার্ড কোম্পানিরা টিড্ডিম টিড্ডিম করে নাচতে নাচতে সরকারকে গিয়ে বলেছে, ওই দেখো, আমাদের উপর জোরজবরদস্তি করে ফী কমানো করালে, এই আইন করলে, সেই আইন করলে, তোমার ক্রেতাদের লাভ হল কোন কচু?

মূল লেখার লিংক
http://www.sachalayatan.com/kaustubh/40485

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: