অ্যামেরিকা ভ্রমণঃ বোস্টন ও কেমব্রিজ

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ ইহা একটি হাতি পোস্ট

উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে অ্যামেরিকা এসে এমনি বিনোদনের জন্য ঘুরে বেড়ালে তো হবে না, তাই ট্যুরের এবারের অংশটাকে শিক্ষা সফরের রূপ দিতে পরবর্তী গন্তব্য বেছে নেয়া হয় হার্ভার্ড আর এমআইটি ক্যাম্পাস । নিউ ইয়র্ক ছেড়ে এবার পা বাড়াই বোস্টনের দিকে, বাহন মেগাবাস। বাসে উঠার পর নিজেকে সবজী আর বাসকে ডীপ রেফ্রিজারেটর মনে হতে থাকলো। কোন উত্তেজনা ছাড়াই কাঁপতে কাঁপতে ভোরবেলা যখন বোস্টনে পৌঁছালাম তখন হাত পা পুরোপুরি জমে গেছে।

এই কাক-ডাকা, গ্র্যাড-জাগা ভোরে বাস স্টেশনে এসে হাজির বিশিষ্ট সজ্জন এবং সচলের প্রবাদ-প্রতীম লুলপুরুষ কৌস্তুভ। সুজনদার পোস্ট দেখে কৌস্তুভের চেহারা সম্পর্কে একটু আন্দাজ ছিলো, তা সামনা সামনি দেখে মনে হলো ওই ক্যারিকেচারে সুজনদা কালির পোচ একটু বেশিই দিয়ে দিয়েছেন। গায়ে সাদা ফতুয়া আর পায়ে চটি পরে বেশ বাঙ্গালি বাবুটি, ফতুয়ার সাদা জমিন ঠেলে অল্প করে উঁকি দিচ্ছে সদ্য গজানো ভুঁড়ি।

বোস্টনের পাশে কেমব্রিজে আছে হার্ভার্ড আর এমআইটি এর মত দুই দুইটা প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়। এত ইন্টেলেকচুয়াল কর্মকান্ডের তাপকে প্রশমিত করার জন্যই কিনা এই সামারেও এখানকার তাপমাত্রা বিস্ময়কর ভাবে আরামদায়ক শীতল। গাইড হিসেবে কৌস্তুভের জুরি মেলা ভার, কেমন করে যেন সব কিছু জেনে বসে আছে। তার কাছ থেকেই জানা গেলো এই অঞ্চল (নিউ ইংল্যান্ড), তার জলবায়ু ইংল্যান্ডের মত হওয়ায় প্রথম দিকের ব্রিটিশ স্যাটলারদের পছন্দের আস্তানা ছিলো।

হার্ভার্ডঃ
প্রথমেই হার্ভার্ড ক্যাম্পাস ঘুরতে বের হলাম। জন হার্ভার্ডের স্ট্যাচুর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে তুলতে জানা গেলো একে বলা হয় “স্ট্যাচু অফ থ্রি লাইজ”। প্রথম মিথ্যাঃ এটা আদতে জন হার্ভার্ডের মূর্তি নয়, বরং উনিশ শতকের শুরুর দিকে এক ছাত্রকে মডেল করে এটা বানানো হয়েছে। দ্বিতীয় মিথ্যাঃ স্ট্যাচুর গায়ে লিখা আছে, জন হার্ভার্ড এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু সত্যি হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়টা আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো, জন হার্ভার্ড মোটা অংকের টাকা ডোনেশন করায় সত্য এবং নামটা বদলে গেছে। তৃতীয় মিথ্যাটা হচ্ছে বয়স চুরি সংক্রান্ত, দুই বছর বয়স লুকিয়ে স্ট্যাচুর গায়ে লিখা আছে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় কাল ১৬৩৮ সাল। মনে মনে একবার হিসাব ঝালিয়ে নিলাম অনেক টাকা পয়সা হলে হার্ভার্ডে দান করে দিব কিনা, পরে আমার নাম উচ্চারণ করতে অ্যামেরিকানদের কষ্টের কথা চিন্তা করে মাথা থেকে চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলে দিলাম। একটু পরে দেখা গেলো হার্ভার্ডের মূর্তি ঘিরে ভীর, অনেকে আবার সৌভাগ্যের আশায় হার্ভার্ডের পা ছুয়ে আসছে।

IMG_2135

হার্ভার্ড ক্যাম্পাস মন ভরিয়ে দেয়ার মতই। অনেক জায়গা জুড়ে ঘাসের চত্বর, তার মাঝেই পুরোনো রীতিতে বানানো দৃষ্টিনন্দন ইমারত। হাটতে হাটতে হার্ভার্ড স্কুল অফ ইকোনোমিক্সের সামনে এসে দাঁড়ালাম। এখানকার পন্ডিতেরা বেশ কিছু উন্নয়নশীল দেশকে পরামর্শ দিয়ে তাদের লালবাতি জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন, শ্রদ্ধায় তাই আপনা-আপনি মাথা নীচু হয়ে গেলো। নতুন সায়েন্স বিল্ডিং পুরোনো অংশের সাথে কিছুটা বেমানান হলেও এর স্থাপত্যের কারণে এর দিকে তাকিয়ে থাকা যায়।

IMG_2193

IMG_2165

IMG_2156

IMG_2155

মাঠের একটা জায়গায় পাথর ফুঁড়ে পানি বেরিয়ে আসছে, আমি আর মঈন বসে খানিকটা জিরিয়ে নিলাম। এক পিচ্চি পাথরের উপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে বৃত্তাকার চক্কর দিচ্ছে, তার গতিপথে আমরা পড়ে গেলে সে বেশ আবদারের সাথে বললো তুমি সরে বসো। ব্যাটা, তুই হলি মানুষের বাচ্চা, তোর এত টাইগারের মত অবিচ্ছিন্ন পথে হাঁটার দরকার কী!

IMG_2172

এতক্ষণ ধরে হার্ভার্ডের নিন্দামন্দ করে যাচ্ছি, কৌস্তুভ না স্নাইপার ভাড়া করে আমার অমূল্য মাথাকে ধড় থেকে সরিয়ে দেয়, তাই এবার ভালো ভালো কথা বলব। প্রথম আধুনিক কম্পিউটার মার্ক ওয়ান হার্ভার্ডের সম্পত্তি, দেখতে গিয়ে মুগ্ধ হলাম। একই সাথে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম, ভাগ্যিস টাইপরাইটার সদৃশ ইনপুট দিয়ে আর আজকাল কম্পিউটার ব্যবহার করতে হয় না। তা না হলে দেখা যেত, ফার্মগেট ওভারব্রীজের নীচে বিশাল সব টাইপ রাইটার নিয়ে কিছু লোক বসে আছে, পাশে একটা কাগজে লিখা থাকতো, “অভিজ্ঞ টাইপিস্ট দিয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাস আপডেট করা হয়”।

IMG_2185

কম্পিউটার সায়েন্সের নিবেদিত ছাত্র হিসেবে আমরা যেকোনো ক্যাম্পাসে গেলে কম্পিউটার সায়েন্স বিল্ডিং দেখে আসি। এখানেও তাই করলাম, মাইক্রোসফটের অর্থায়নে বানানো ধারালো বিল্ডিং দেখে তারিফের সাথে ভাবতে থাকলাম, “কম্পিউটার সায়েন্সের কাজ কারবার হলো কাটিং এজ টেকনোলজি নিয়ে, তার বিল্ডিং এমন না হলে মানায়!”।

IMG_2198

এবার গেলাম চার্লস নদীর উপর ব্রিজে। নৌকা বেয়ে বেড়াচ্ছে কিছু লোক। হার্ভার্ডের ছাত্রদের কি মজা, চাইলে নৌকা চড়ে ক্যাম্পাসের চারপাশে চক্কর দিতে পারে। নিজের পোড়া কপালের কথা চিন্তা করলাম, সেই নটর ডেম কলেজ থেকে শুরু করে বুয়েট হয়ে ইউএনসি; সব ক্যাম্পাসে দেখা সবচেয়ে বড় পানির আধার হচ্ছে টয়লেটের বেসিন!

IMG_2205

হার্ভার্ডের পাট চুকিয়ে এবার এমআইটি’র উদ্দেশ্যে রওয়ানা হব, স্যুভেনির কেনার উদ্দেশ্যে একটা দোকানে ঢুকলাম। নিজেদের মধ্যে বাংলায় কথা বলছি দেখে, ক্যাশিয়ার বাংলায় আলাপ জুড়ে দিলো। অল্পের জন্য লাঞ্চের দাওয়াত মিস হয়ে গেলো। উদার হস্তে দুইটা স্যুভেনির কিনলাম, তবে কপালে বেশিক্ষণ সইলো না, এমআইটিতে পৌঁছেই হারানোর কাজটা সুচারো রূপে সম্পন্ন করে ফেললাম।

এমআইটি ক্যাম্পাসঃ
ট্রেনে করে এমআইটি ক্যাম্পাসে এসে পৌঁছালাম, হার্ভার্ড ক্যাম্পাস থেকে অল্প দূরে। চারদিক থেকে পানি ছুটে এসে এক বিশাল ধাতব গোলককে ভিজিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে এমন একটা জায়গায় বসে সবাই খানিকটা জিরিয়ে নিলাম। এখান থেকে শুরু হলো মঈনের রাণীক্ষেত সিম্পটম। মাহদী আর নাফি বিপুল উদ্যমে গোলকের গায়ে পানির আঘাতের ছবি তুলায় ব্যাস্ত। আমার যেহেতু জাতের ক্যামেরা নেই, তাই নিজের অপূর্ব খোমা নিয়ে ওদের ক্যামেরার সামনে পোজ দিয়ে বেড়ালাম।

IMG_2212

এমআইটির ক্যাম্পাস হার্ভার্ডের তুলনায় বেশ কাঠখোট্টা, আধুনিক স্থাপত্যের নিদর্শনই বেশি। দেখতে দেখতে মনে হলো একটা সুস্পষ্ট ম্যাসেজ দেয়া হচ্ছে, “সৌন্দর্যের জন্য প্রকৃতির পরোয়া আমরা করি না, এখানে মানুষই সব কিছু নির্মাণ করে”। ম্যানেজমেন্ট স্কুলের সামনের নিদর্শন দেখে বুয়েট লাইফের কথা মনে পড়লো, শিকলে বেঁধে কত বাশই না বুয়েট আমাদের দিয়েছে।

IMG_2217

এম আইটির স্টাটা বিল্ডিং মানুষের সৃষ্টিশীলতার কিংবা খামখেয়ালীর এক অসাধারণ উদাহরণ। যত রকম জ্যামিতিক আকৃতি থাকা সম্ভব, ইচ্ছামত তা কাজে লাগানো হয়েছে। এই বিল্ডিং এর কোন এক পাশের ছবি দেখে এর সম্পর্কে ধারণা পাওয়া অনেকটা অন্ধের হাতি দেখার মত ব্যাপার।

IMG_2234

কোন একটা বিল্ডিং এর সামনে বসে আমি আর কৌস্তুভ প্রকৃতির ডাকে দিগবিদিক জ্ঞান শুন্য হয়ে ছুটে যাওয়া বাকিদের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। চড়ুই(?) এর মত দেখতে একটা পাখি আমাদেরকে পাত্তা না দিয়ে আমাদের পায়ের কাছে ঘুরঘুর করছিলো, পারমিশন না নিয়েই তার কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। বিলডিং এর সামনেই সিম্বল দিয়ে তৈরী একটা সুন্দর স্ট্যাচু।

IMG_2249

IMG_2252

এক ফাঁকে নদীর পাড় থেকে ঘুরে আসলাম, দূর থেকে বোস্টন ডাউন টাউন দেখা যাচ্ছিলো। ব্রীজের একপাশে দাঁড়িয়ে দেখি দূরে ডাউনটাউনের বিল্ডিংগুলোর উপরের অংশ আড়াল করে আছে কুয়াশা(!)।

IMG_2228

IMG_2229

বোস্টন ডাউনটাউনঃ
এরপরের গন্তব্য বোস্টন ডাউনটাউন। প্রথমেই চার্চ অফ ক্রিশ্চান সায়েন্টিস্টের মত বিনোদন উদ্রেককারী চার্চের সামনের চত্ত্বরে ঘাসের উপর শুয়ে বসে গল্পগুজব করে নিলাম, মঈন ততক্ষণে ঘুমের দেশে ট্যুর দিয়ে বেড়াচ্ছে। পাশেই বিশাল আয়তাকার জায়গা জুড়ে ওভারফ্লোয়িং চৌবাচ্চা, একেবারে ডুব দিয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।

IMG_2257

IMG_2264

সবাই মিলে গেলাম এক ইথিওপিয়ান রেস্টুরেন্টে। লোকাল এক্সপার্ট কৌস্তুভের পরামর্শে ইনজেরা রুটি দিয়ে রোজমেরী সহযোগে রান্না করা টক মত “লেগা টিবস” খেয়ে আচ্ছা করে ঢেকুর তুললাম। বলতেই হয় গোমাংস খেয়ে যদি জাত বিসর্জন দিতেই হয়, সেটা লেগা টিবস খেয়ে দেয়াই উত্তম।

lega tibs

ডাউনটাউন উচু বিল্ডিং এ ভরা, বেশ ব্যাস্ত মনে হলো। এক শপিং কমপ্লেক্সে ঢুকে তার কাচের ছাদ দিয়ে শহরে চোখ বুলিয়ে নিলাম। হঠাৎ করে শুরু হলো রক্তাক্ত জোম্বিদের শুভ অথবা অশুভ যাত্রা। প্রথমে একটু ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম, এত নিখুত মেক আপ। দুই/তিন জন জোম্বি টের পেয়ে গেলো আমি তাদেরই দলে। কাঁধে হাত দিয়ে, হাই ফ্রেন্ড বলে এমন আন্তরিক চাওনি নিয়ে তাকিয়ে রইলো যে আমার এই নশ্বর পৃথিবীর মায়া ছেড়ে তাদের সাথে চলে যেতে ইচ্ছা করলো।

IMG_2279

শিক্ষা সফরের শেষটা লাইব্রেরী দিয়ে হলেই যুতসই হয়। শেষ গন্তব্য তাই বোস্টন পাবলিক লাইব্রেরী। বিশাল লাইব্রেরীর দুইপাশে বসে আছে দুই বোন, বিজ্ঞান আর মানবিক দুই বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবে।

IMG_2285

IMG_2288

IMG_2286

লাইব্রেরীর সামনের চত্বরে সন্ধ্যা নেমে আসে, রাস্তা আর সামনের বিরাটা এলাকা জুড়ে এখানে সেখানে মানুষ জটলা বেঁধে বসে বা দাঁড়িয়ে আছে, বেশ ইয়োরোপিয়ান একটা ভাব। বাসের সময় হয়ে আসে, তাই বোস্টনকে বিদায় জানিয়ে রওয়ানা হই পরবর্তী গন্তব্য, ওয়াশিংটন ডিসির উদ্দেশ্যে।

ঋণ স্বীকারঃ লেগা টিবসের ছবি মঈনের কাছ থেকে নেয়া

 

মূল লেখার লিংক

http://www.sachalayatan.com/node/40666

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: