আফ্রিকায় পেঙ্গুইন, আফ্রিকার পেঙ্গুইন !

সর্পিল পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে গাড়ী ছুটে চলেছে আফ্রিকা মহাদেশের সর্ব দক্ষিণের প্রান্তবিন্দু কেপ পয়েন্টের উদ্দেশ্যে, কেপ পয়েন্ট থেকেই নাকি আটলান্টিক মহাসাগর আর ভারত মহাসাগরের মিলন স্থল দেখা যাবে, দুই বিপুল জলরাশির মিলনস্থলে চলছে প্রতিনিয়ত এক বিশাল কর্মযজ্ঞ, দুই স্রোতের জলের রঙটাও আলাদা, যেমন আলাদা লাগে পদ্মা- মেঘনার মিলনস্থলে, এখানে শুধু আরও অনেক ব্যপক আকারে।
IMG_4262
সে কি পথ, এক পাশে উঁচু পাহাড় আর অপর পাশে বিশাল খাদ, ঢালের মত নেমে গেছে সাদা বালির সৈকতে, মহাসাগরীয় বেলাভূমির চরণ স্পর্শের আশায়। ঘন সবুজ জঙ্গল (টেবিল মাউন্টেন ন্যাশনাল পার্কে বেড়ে ওঠা একাধিক প্রজাতির উদ্ভিদ বিশ্বের অন্য কোথাও পাওয়া যায় না)
IMG_4229
আর খানিক পরপরই রোমাঞ্চ জাগানিয়া তীক্ষ বাঁক কেপ পয়েন্টের এই রাস্তাকে পরিণত করেছে বিশ্বের অন্যতম নয়নাভিরাম পথে, যে কারণে হলিউড- বলিউডের রূপালি বানিজ্যে প্রায়শই এর স্থান হয় সেলুলুয়েডের ফিতায়।
IMG_4187
IMG_4270
DSC04079
IMG_4251
গাড়ী চালক স্থানীয় স্যামুয়েল জানালো প্রায়ই পাহাড়ি রাস্তা বিধায় পাথর গড়িয়ে পড়ে পথ বন্ধ থাকে, তখন একমাত্র অবলম্বন ধীর প্রতিক্ষা। চলন্ত গাড়ী থেকেই নজরে আসে অলস বানরের দল আর সামুদ্রিক পাখির ঝাক।
IMG_4258
IMG_4204
কেপ পয়েন্ট দর্শন শেষে আমাদের বাহন চলল উল্টো রাস্তায় মহাসুমদ্রের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা চিত্রপটের সাজানো ছবির মত সাজানো শহর জেমস টাউনের পানে, সেখানেই তো আমাদের আজকের যাত্রার মূল আকর্ষণ- পেঙ্গুইন কলোনি ।
IMG_4223
জী পাঠক, ঠিকই পড়েছেন, পেঙ্গুইন! আমাদের গ্রহে বর্তমানে যে ১৭ ধরনের পেঙ্গুইন বাস করে তার মধ্যে কেবল মাত্র একটিই আফ্রিকা মহাদেশে স্থায়ী ভাবে বসবাসরত, তাও সর্ব দক্ষিণের অন্তরীপের কিছু বিচ্ছিন্ন দ্বীপ আর সৈকতে, নামিবিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায়। পেঙ্গুইন শব্দটা কর্ণকুহরে প্রবেশ করা মাত্রই আমাদের মানসপটে নিজের অজান্তেই ভেসে ওঠে বরফাচ্ছাদিত তেপান্তরে হেঁটে বেড়াচ্ছে সাদাকালো কোট পরা মানুষের মত একদল পাখি, প্রকৃতি যাদের উড়াল ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে দিয়েছে সাতারের ও জলের নীচে ডুব দেবার অপাখীয় ক্ষমতা।
IMG_4364
আফ্রিকার মত তীব্র গরমের ভূখণ্ডে পেঙ্গুইন আসল কি করে! আসলে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগে যখন অ্যান্টর্কটিকা ও আফ্রিকা একসাথে ছিল তখনই এই আফ্রিকান পেঙ্গুইনদের পূর্বপুরুষদের আগমন ঘটে এইখানে, পরবর্তীতে মহাদেশীয় প্লেটগুলো পরস্পরের থেকে সরতে থাকলে আর ফিরে যাওয়া হয়নি তাদের। ১৭ ধরনের পেঙ্গুইনই থাকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দক্ষিণ গোলার্ধে- অ্যান্টর্কটিকা, আফ্রিকা , দক্ষিণ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে। কেবলমাত্র তীব্র ঠাণ্ডার বরফঢাকা ভুমিতেই নয়, পেঙ্গুইন স্থায়ী ভাবে থাকে আমাদের গ্রহের সবচেয়ে শুষ্কতম স্থান চিলির আটাকামা মরুভূমিতেও, যার মধ্যাঞ্চলে আজ পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের কোন রেকর্ড নেই! তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষুবরেখার ঠিক কাছাকাছিই এর অবস্থান, মহামতি চার্লস ডারউইনের স্মৃতিধন্য গ্যালোপাগাস দ্বীপপুঞ্জে স্থায়ী ভাবে বসবাসরত গ্যালোপাগাস পেঙ্গুইন। আকার-আকৃতিতেও আছে বিস্তর ফারাক, পেরুর মরুভূমিতে পাওয়া গেছে ৫ ফিট লম্বা দানব পেঙ্গুইনের জীবাশ্ম আর বিবর্তনের কঠিন স্রোতে টিকে যাওয়াদের মাঝে বর্তমানে সবচেয়ে বড় আকারের পেঙ্গুইনের নাম এম্পেরর পেঙ্গুইন( সম্রাট পেঙ্গুইন), রেকর্ড ৪ ফিট উচ্চতায় পৌছাতে পারে তারা, তবে এই বিশাল পরিবারের অধিকাংশ সদস্যরাই কিন্তু দেড় থেকে দুই ফিট উচ্চতার মোটামুটি লিলিপুট আকৃতিরই হয়ে থাকে।
জেমস টাউনের শহরতলীর অল্প দূরেই সেখানকার পেঙ্গুইন বসতি, এর আকর্ষণে প্রচুর পর্যটক আসে বিধায় নানা লোকজ সামগ্রীর বিপণন ব্যবস্থাও গড়ে উঠেছে একে কেন্দ্র করেই। সামনে বড় করে সাইনবোর্ডে তীর চিহ্ন দেওয়া- পেঙ্গুইন!!
IMG_4382
টিকেট কেটে অনধিকার প্রবেশ করলাম তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থানে, মোটা মোটা গাছের গুঁড়ির নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হতেই নাকে এসে লাগল বিকট এক মেছো গন্ধ! আরে বাবা, মাছের রাজ্যে এসেছি, আর পেঙ্গুইনরাও মাছখেকোই, একটু-আকটু গন্ধ নিয়ে এত অভিযোগ কিসের?
সেই সময়ই দৃষ্টি সীমার এল পাথুরে বোল্ডারগুলোর ধার ঘেঁষে যে সবুজ ঝোপ জাতীয় উদ্ভিদগুলোর রাজত্ব বিস্তারের চেষ্টা করছে বালির সাম্রাজ্যের উপরে, তার এক কোণে হেলেদুলে এগিয়ে আসছে দুটি সাদাকালো প্রাণী, আমাদের বহু প্রতীক্ষিত পেঙ্গুইন!!
IMG_4324
সেই কবে স্কুল জীবনে অ্যান্টার্কটিকা ফেরত অভিযাত্রী ইনাম আল হকের নজর কাড়া সব ছবি নিয়ে জি কিউ গ্রুপের ক্যালেন্ডার দেখেছিলাম, যদিও সেগুলো বরফ মহাদেশের ভিন্ন প্রজাতির পেঙ্গুইন ছিল, আর আজ চোখের সামনে দেখলাম জীবন্ত পাখি রাজ্যের বিস্ময়গুলোকে!
অতি আদরণীয়, দেখলেই মনে হয় কি তুলতুলেই না হবে এরা, একটু ছুয়ে দেখব নাকি! এই জন্যই হয়ত পেঙ্গুইনের বিচরণক্ষেত্রে ঢোকার আগেই অত্যন্ত কড়া ভাবে লেখা আছে- এদের স্পর্শ করা ও খাবার দেওয়া নিষিদ্ধ, শত হলেও এতো চিড়িয়াখানার পাখি নয়, বুনো স্বাধীন সত্ত্বা। এরাও কোন রকম ভয় ডর না দেখিয়ে চলেও আসে মানুষের অতি কাছে।
ক্ষুদে পাখিগুলোর পিঠ কুচকুচে কালো পালকে আবৃত, কিন্তু পেটের নিচটা সম্পূর্ণরূপে ধবধবে সাদা পালকের, ডানা কালো আর চোখের উপরে সামান্য জায়গা জুড়ে গোলাপি গ্ল্যান্ড। এমনটা সাদাকালো হবার পেছনের কলকাঠি নেড়েছে কোটি বছরের বিবর্তন- পানির তলের শিকারি প্রাণীরা নিচ থেকে দেখার চেষ্টা করলে ধবধবে সাদা পেটের কারণে তা সাগরের জলে প্রায় অদৃশ্য দেখাবে আর উপর থেকে শিকারি পাখিদের নজরে কালো পিঠ আর নিকষ কালো জল মিলিয়ে দেখা যাবে না কিছুই।
IMG_4335
এরপরে একের পর এক অসংখ্য পেঙ্গুইন চোখে পড়ল গোটা কলোনি জুড়ে, অধিকাংশই জোড়ায় জোড়ায়, অনেকে দলবদ্ধ ভাবে। বিশেষ করে বাচ্চা পেঙ্গুইনগুলো যেগুলোর গায়ে এখনো রোমশ হতশ্রী দর্শন পালক, তাদের অধিকাংশই দেখি একসাথে জটলারত আর তাদের তত্ত্বাবধানে আছে কোন পূর্ণ বয়স্ক পেঙ্গুইন!
DSC04073
থেকে থেকেই কানে আসছে তাদের খচ্চর সদৃশ তীক্ষ নিনাদ, যে কারণে এ প্রজাতির নামই ছিল আগে জ্যাক-অ্যাস পেঙ্গুইন, পরে দেখা গিয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি অন্য প্রজাতির পেঙ্গুইনরাও প্রায় একই ধরনের আওয়াজ উৎপন্ন করে, তাই এদের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় কালো পা পেঙ্গুইন বা আফ্রিকান পেঙ্গুইন।
তাদের বসতিতে প্রাকৃতিক পরিবেশে অবলোকন করা এক অতি নির্মল আনন্দদায়ী অভিজ্ঞতা, ঘন্টার পর ঘণ্টা চলে যাবে এই অতি সুন্দর পাখিগুলোর পায়চারী, ডিমে তা দেওয়া, নিজেদের মধ্যকার খুনসুটি দেখে। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আমাদের সেখানে অবস্থানকালীন সময়টা তাদের শিকারের সময় ছিল না, কাজেই রূপো রূপো মাছের ঝাকের সন্ধানে তাদের মহাসমুদ্রে ঝাপিয়ে পড়ার দৃশ্যটা অদেখাই থেকে গেল। কিন্তু একাধিক পেঙ্গুইনকে পাওয়া গেল ডিমে তা দেওয়া রত অবস্থায়। কোথাও একটু পাথুরে মাটি খুঁড়ে, কোথাও বা আবার অল্প কিছু নুড়ি পাথর জমিয়ে তার উপরেই ডিমে তা দেয়া চলছে পালাক্রমে।
IMG_4336
জানা গেল পানিতে পেঙ্গুইনের শত্রু হিসেবে যেমন আছে হাঙ্গর, সীল, কিলার হোয়েল ঠিক তেমনি ডাঙ্গায় আছে বেজী, বিড়াল, কুকুর, কয়েক প্রজাতির বড় পাখি। কিন্ত এদের সবচেয়ে বড় শত্রু – মানুষ! যে কারণে ১৯১০ সালে দেড় মিলিয়ন আফ্রিকান পেঙ্গুইন থাকলেও আজ মাত্র একশ বছরের ব্যবধানে তাদের সংখ্যা শতকরা নব্বই ভাগ কমে গেছে! মূল কারণ- মানুষ কতৃক তাদের ডিম সংগ্রহ, সারের নামে তাদের বর্জ্য সংগ্রহের সময় বাসস্থানের ক্ষতি করা, আর নিকটবর্তী সমুদ্রে তেলবাহী ট্যাংকারের দূষণ।
IMG_4330
IMG_4345
আশাজাগানিয়া কথা, বর্তমান দক্ষিণ আফ্রিকা ও নামিবিয়ার সরকার এদের রক্ষায় যথেষ্ট তৎপর, সেই সাথে স্থানীয় জনগণ আগের চেয়ে অতি অল্প হলেও সচেতন। আশা করা যায় আগামী অনেক বছরেও তাই আমরা দেখতে পারব আফ্রিকার এই কোট পরা ভদ্রলোকদের তাদের আপন বুনো মুক্ত পরিবেশে।
IMG_4323

মূল লেখার লিংক
http://www.sachalayatan.com/40440

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: