পত্রিকাওয়ালাদের কাছে বিনীত অনুরোধ

একটি চিনামাটির ছোট প্লেটে যদি খুব ছোট এক টুকরো কাগজে আগুন জ্বালিয়ে সেটা একটা কাঁচের গ্লাস উপুড় করে ঢেকে দেয়া হয় তাহলে দেখতে দেখতে সেই কাঁচের গ্লাসটি ধোঁয়ায় ভরে ওঠে। এখন ঠিক তার পাশেই যদি আরেকটি চিনামাটির প্লেট একটি কাঁচের গ্লাস দিয়ে ঢেকে দেয়া হয় ভেতরে কোনো জ্বলন্ত কাগজ ছাড়াই, আর আগের গ্লাসের ধোঁয়া দৈব উপায়ে পাঠিয়ে দেয়া হয় নতুন গ্লাসটির মধ্যে, তাহলে দর্শকের অবাক না হয়ে উপায় থাকেনা। ব্যাপারটি অদ্ভুত। দুটি চিনামাটির পাত্রে উপুড় করা গ্লাস ছিল পাশাপাশি। যার একটি ছিল ধোঁয়ায় ভরা আর অন্যটি শূন্য। যাদুর শক্তিতে দেখা গেল এক গ্লাসের ধোঁয়া কোন অদৃশ্য পথে চলে গেল অন্য গ্লাসে!

এই যাদুটি দেখানোর জন্য দুটি রাসায়নিকের প্রয়োজন হয়। হাইড্রোক্লোরিক এসিড, এবং অ্যামোনিয়া। কোনো হাত সাফাই অনুশীলন করার প্রয়োজন নেই। কেবল দ্বিতীয় যে গ্লাসটিতে প্রথম গ্লাসের ধোঁয়া পাঠিয়ে দেয়া হবে সেটির মধ্যে দুফোঁটা হাইড্রোক্লোরিক এসিড দিয়ে রাখতে হয় আগে থেকে। আর চিনামাটির পাত্রে মাখিয়ে রাখতে হয় একটুখানি অ্যামোনিয়া। প্রথম গ্লাসে কাগজ পুড়ে তৈরি ধোঁয়া একটু পরে এমনিতেই মিলিয়ে যেতে থাকে। দ্বিতীয় গ্লাসে আসলে প্রথম গ্লাসের ধোঁয়া পাচার করা হয়না। অ্যামোনিয়া মাখানো প্লেট যখন হাইড্রোক্লোরিক এসিড মাখানো গ্লাস দিয়ে ঢেকে দেয়া হয় তখন রসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে ধোঁয়া তৈরি হয় সেখানে। দর্শক এতকিছু জানেনা বলে তার মনে হয় প্রথম গ্লাসের ধোঁয়া কোন অদৃশ্য উপায় চলে গেল দ্বিতীয় গ্লাসে!

বিজ্ঞানের এরকম মজার খেলা আছে হাজারো। একটুখানি পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট একটি কাগজে নিয়ে তার উপরে যদি একফোঁটা গ্লিসারিন দেয়া হয় আর তারপর আরেকটা কাগজ দিয়ে সেটাকে ঢেকে দু’আঙুলে জোরে চাপ দিয়ে ছুঁড়ে দেয়া হয় তাহলে সেটি খুব আশ্চর্যজনকভাবে দপ করে জ্বলে ওঠে!

আকাশে আতশবাজির খেলা খুব চমৎকার। কেউ যদি একটুখানি ধাতব সোডিয়াম জোগাড় করতে পারে তাহলে সে এই খেলাটি দেখাতে পারে পানিতেও। কোনো আয়োজনের দরকার নেই, ধাতব সোডিয়াম নিয়ে পানিতে ফেললেই তা আতশ বাজির মতো জ্বলতে থাকে। নিরাপদ দুরত্ব থেকে দেখার জন্য সে খুব চমকপ্রদ দৃশ্য!

ছোটবেলায় এক কবিরাজকে দেখেছিলাম গ্রামে একটি ছেলের জন্ডিসের চিকিৎসা করতে। তার কবিরাজির জন্য আগে থেকে সে চুনের পানি জোগাড় করে রাখতে বলেছিল। অসুস্থ ছেলেটিকে বেশ ঝাড়ফুঁক করে সে যখন চুনের পানিতে তার হাত ধুয়ে ফেলেছিল, তখন টলটলে স্বচ্ছ পানির বদলে তার হাত থেকে বেরিয়েছিল হলুদ রঙের পানি। পানির ওরকম হলুদ রং দেখে আর কারো সন্দেহ ছিলো না যে অসুস্থ ছেলেটির জন্ডিস নিজের হাতে তুলে নিয়ে কবিরাজ ধুয়ে ফেলে দিয়েছে! আমরা বাড়ির নচ্ছারেরা অবশ্য অন্য একটি রহস্য আবিষ্কার করেছিলাম। লুকিয়ে দেখেছিলাম জন্ডিস চিকিৎসার আগে আগে কবিরাজ মশাই বাড়ির বাগানের একটি গাছের পাতা দুহাতে ডলে নিয়েছিল। কবিরাজ চলে গেলে আমি নিজে সেই গাছের পাতা হাতে মেখে চুনের পানি দিয়ে ধুয়ে দেখেছিলাম। কবিরাজি না জানা আমার হাত থেকেও দারুণ হলুদ রং বের হয়েছিল সেদিন!

আশ্চর্যজনক ঘটনায় মানুষের আগ্রহ চিরন্তন। শিশুরা যে চোখ বড় বড় করে রূপকথার গল্প শুনতে চায়, সেটাও এই কারণেই। পুরাণে হিরণ্যকশ্যিপু নামের এক অসুর ছিল। তার দৈবশক্তি ছিল এমন যে, পানিতে বাতাসে অথবা মাটিতে তাকে মারা যাবেনা। দিনে অথবা রাতের বেলায় তাকে মারা যাবেনা। মানুষ অথবা পশুর কেউই তাকে মারতে পারবেনা। এই অসুরের গল্পটি বলে আমি সচলায়তনে আমার একেবারে প্রথমদিককার একটি লেখা লিখেছিলাম। সেই লেখাটি ছিল ভাইরাস নিয়ে। ভাইরাস হিরণ্যকশ্যিপুর চাইতেও ক্ষমতাশালী। জীবদেহের বাইরে থাকলে তার প্রাণ থাকে না, অথচ সুবিধাজনক জীবদেহের ভেতরে যেতে পারলেই সে প্রাণ ফিরে পায়! সে নিশ্বাস নেয় না, খায় না, ঘুমায় না, হাঁটাচলা করেনা, জন্মের পরে আকারে আয়তনে বৃদ্ধি পায়না, অথচ বাচ্চা দেয়! ভাইরাস যখন কোষের ক্ষতি করে তখন সে আসলে কোষের সঙ্গে যুদ্ধ করেনা, কোষের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে দৈব ক্ষমতায় সেই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে যাওয়ার মতো!

গবাদিপশুকে ওষুধ খাওয়াতে দেখেছিলাম ছোটবেলায়। একটুখানি ওষুধ অনেকখানি কলাপাতা মুড়ে গরু ছাগলের মুখে পুরে দেয়া হয়। কলাপাতার সঙ্গে গবাদিপশু ওষুধটুকুও খেয়ে ফেলে নিজের অজান্তে। হোমিওপ্যাথি ওষুধও অনেকসময় এই রকম উপায়ে খেতে দেয়া মানুষকে। মিষ্টি মিহিদানায় মাখিয়ে দেয়া হয় ঝাঁঝালো ওষুধ। এতক্ষণ বকবক করে গল্প শোনাবার কারণও অনেকটা এরকম। আমাদের পত্রিকাওয়ালাদের একটা অনুরোধ করা। অনুরোধ শুনতে কারো ভালো লাগে বলে জানা নেই। আচমকা অনুরোধ করে বসলে তাই সেটা না শুনে এড়িয়ে যেতেই পছন্দ করে সবাই। কিন্তু আমার এই অনুরোধটি আমি শোনাতে চাই। অনুরোধে এতক্ষণ ধরে কলাপাতা মুড়লাম এজন্যেই!

প্রিয় সম্পাদকেরা, আমরা কি একটি পুর্নাঙ্গ বিজ্ঞান পাতা পেতে পারি। অন্তত সপ্তাহে একদিন? বিজ্ঞান রুপকথার চাইতেও চমকপ্রদ। নায়ক নায়িকাদের হেঁসেলের গল্পের চাইতেও কৌতুহলোদ্দীপক! আমার কথা মিথ্যে হলে আপনি এই লাইনটি পড়ছেন না!

বিজ্ঞান কেনো প্রচারের প্রয়োজন সেটি কাউকেই বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। আমি কেবল বলতে চাইছি, বিজ্ঞানের একটি পাতা হলে সেটি সবাই আগ্রহ নিয়েই পড়বে! বিজ্ঞানের খোলসটি খটমট। (দীর্ঘদিনের চেষ্টায় যারা বিজ্ঞানকে তিতা করে তুলেছেন তাদের কথা এখন বলতে চাইনা)। কেবল বলতে চাই আমাদের দৃষ্টিতে তিতা বিজ্ঞানকে কলাপাতায় মুড়ে উপস্থাপন করা যায়। কলাপাতায় মুড়ে দিলে উঠতি নায়িকার সঙ্গে কার প্রেমের সম্পর্ক হয়েছে, অথবা জমিদখল করতে গিয়ে কোথায় কে কাকে গুলি করে মেরে ফেলেছে সেসব জানার চাইতে মানুষ বেশি আগ্রহ বোধ করবে বিজ্ঞানে। জেনেটিকসের নাম শুনলেই ছুটে পালাতে ইচ্ছে করে অনেকের। কিন্তু কাউকে যদি নিচের ছবিটি দেখিয়ে বলা হয় এই মাছগুলি অন্ধকারে জ্বলতে থাকে আর এটি করা হয়েছে জেনেটিকসের যাদুতে তাহলে অনেকেই জানতে চাইবেন এটি কিভাবে সম্ভব হয়েছে! (ছবিসূত্র: উইকিপিডিয়া)

অথবা এই লিঙ্কে গিয়ে অন্ধকারে আলো দেয়া তামাক গাছ দেখে আসতে পারেন। জেনেটিকসের বই আপনি কখনো উল্টে না দেখতে পারেন, কিন্তু অন্ধকারে আলো দেয়া গাছ কিভাবে বানানো হলো সেটি আপনার জানতে ইচ্ছে করছে বলে ধারণা করি! [কপিরাইটের সমস্যা আছে বলে
আমি ছবিটিকে সরাসরি এখানে জুড়ে দিতে পারলাম না!]

*** *** ***

আমাদের প্রধান প্রধান পত্রিকাগুলোতে বিজ্ঞান পাতার নামে যেটি আছে সেটি কম্পিউটার প্রযুক্তি বিষয়ক একটি পাতা। কম্পিউটার অবশ্যই বিজ্ঞানের সেরা যাদুগুলির মধ্যে একটি। কিন্তু সেটিতেই বিজ্ঞানের সব যাদু সীমাবদ্ধ নয়। কম্পিউটারের কথা থাকার সঙ্গে সঙ্গে তাই বিজ্ঞানের আর সব যাদুর কথাও লেখা দরকার। কম্পিউটার পাতাতে অবশ্য সত্যিকার বিজ্ঞানের কিছু বলা হয় বলে সচরাচর আমার চোখে পড়েনা। কম্পিউটার সহায়িকার মতো টিপস দেয়া হয় সেখানে! কী করলে কম্পিউটার ভালো থাকবে, কোন সমস্যাটি কিভাবে মেটানো যায় অথবা কোথায় কম্পিউটার বিষয়ক কী কর্মশালা হলো এরকম। পত্রিকাওয়ালারা কি জানেন আমাদের কম্পিউটার পাতাগুলো পড়ে কেউ একটি সফটওয়ার বানাতে আগ্রহী হয়ে ওঠে কিনা! আমাদের কম্পিউটার পাতা পড়ে কেউ কি মার্ক জুকারবার্গ অথবা মেহদী হাসান খান হতে চায়?

আমাদের শিশুরা সুপারম্যান অথবা স্পাইডারম্যান হতে চায়। সিনেমার নায়কদের মতো গায়েবী শক্তির অধিকারী হতে চায়। আমাদের শিশুরা কি আলেক্সান্ডার ফ্লেমিং হতে চায় কখনো? তারা কি জানে, শ’খানেক সত্যিকারের সুপারম্যান মানুষের যতো কল্যাণ করতে পারত, আলেক্সান্ডার ফ্লেমিং একা তার হাজার গুণে বেশী করেছেন? আমাদের শিশুরা কি অসুস্থ মানুষের কথা জেনে প্রতিজ্ঞা করে তাদেরকে বাঁচানোর? আমাদের শিশুরা কি প্রশ্ন করতে শিখেছে? তারা কি ভাবতে শিখছে? আমাদের শিশুদের কি প্রশ্ন করার জায়গা আছে?

প্রিয় সম্পাদকেরা, আপনাদের হাতে অনেক ক্ষমতা! আপনারা চাইলেই পারেন একটি শিশুর মনে বিজ্ঞানের স্বপ্ন বুনে দিতে! আপনারা চাইলেই পারেন বুড়োদের মন থেকে কুসংস্কারের অন্ধকার ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে! আপনারা চাইলেই পারেন!

একটি পাতা ছাপানোর আগে যেটি সবার আগে চিন্তা আসতে পারে সেটি ‘পাঠকের পছন্দ’! আমার এই লেখাটি লেখার উদ্দেশ্য আপনাদেরকে বোঝাতে চেষ্টা করা যে, বিজ্ঞানে পাঠকের আগ্রহের কমতি হবেনা কখনো। একটুখানি গল্প করে বিজ্ঞানকে বললেই সেটি রূপকথার চাইতেও লোভনীয় হয়ে উঠবে মানুষের কাছে। মানুষ রূপকথার আশ্চর্য ঘটনা কেবল ভেবে আনন্দ পায়। অথচ বিজ্ঞানের রূপকথা মানুষ নিজে ঘটিয়ে দেখতে পারে, ছুঁতে পারে, উপভোগ করতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা বিজ্ঞানকে জানা জরুরী। বিজ্ঞানের সঙ্গে থাকা জরুরী। পথে ঘাটের ভণ্ড পীর ফকিরেরা কবে জগৎ ধ্বংস হবে তা জানালে পত্রিকায় বড় বড় খবর হয়ে যায়। আমাদের পত্রিকা কি আমাদেরকে জানিয়েছে সুপারবাগের কথা? আমরা কি জানি ভারতে নয়াদিল্লির পানিতে সুপারবাগ পাওয়া গেছে? আমরা কি জানি, অল্প কিছু মহামানব যাঁরা সুপারবাগের বিরুদ্ধে লড়ছেন তাঁরা হেরে গেলে আমরা সত্যি সত্যি ধ্বংস হয়ে যেতে পারি!

প্রিয় সম্পাদকেরা, আপনারা নিশ্চয়ই আমার চাইতে অনেক জ্ঞানী। পত্রিকা, পাঠক, বিজ্ঞান এসব বিষয়ে আপনাদের স্পষ্ট ধারণা আছে। আপনারা স্পষ্ট ধারণা রাখেন মানুষের সম্পর্কেও। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, বিশ্বের সঙ্গে তুলনা করলে জাতি হিসেবে আমাদের ‘সম্ভাবনা’ ছাড়া বস্তুত বিশেষ কিছু নেই। আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারেন, সম্ভাবনা আর আশাবাদের মাদকে তৃপ্ত থেকে আমরা আসলে বাস্তবতা থেকে মুখ ফিরিয়ে আছি। বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াবার জন্য, সফল এবং সুন্দর মানুষের একটি দেশের নাগরিক হবার জন্য আমাদের মহাশক্তিশালী যাদুকর প্রয়োজন। কে না জানে, বিজ্ঞানের চাইতে বড় যাদু আর হয় না। আপনারা কি আমাদের শিশুদেরকে যাদুকর হতে উৎসাহিত করবেন? আপনারা কি তাদেরকে পরিচয় করিয়ে দেবেন বিজ্ঞানের যাদুর ভুবনটির সঙ্গে? আপনারা কি তাদেরকে জানিয়ে দেবেন যে তারা চাইলেই যাদুকর হয়ে উঠতে পারে, আমাদের দেশটিকে, আমাদের পৃথিবীটিকে তারা চাইলেই বদলে দিতে পারে তাদের যাদুর ছোঁয়ায়?

আপনারা কি আমাদেরকে নিয়মিত একটি পূর্নাঙ্গ বিজ্ঞান পাতা পড়তে দেবেন?

http://www.sachalayatan.com/anarjo_sangeet/38927

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: