মিগ ৩১ ফক্সহাউন্ড – আইকন ইন্টারসেপ্টর ফাইটার

মিগ ৩১ হল রাশিয়ান এয়ার ফোর্সের অন্যতম ইন্টারসেপ্টর ফাইটার। মিগ ৩১ মূলত মিগ ২৫ এর রিভাইজড ভার্সন। এটি মূলত মিগ ২৫ ফক্সব্যাট কে রিপ্লেস করার জন্য করা হয়েছিলো।

১৯৭০ এর দশকে সোভিয়েতরা তাদের হাই অলটিটিউট ইন্টারসেপ্টর ” মিগ ২৫” “ফক্সব্যাট” কে সার্ভিসে আনে। মিগ ২৫ তার ম্যাক ৩ সুপারসনিক স্পিড, ম্যানুভারিটি,টিমেন্ডাস পারফর্মেন্সের কারণে দীর্ঘদিন ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডের কাছে ফিয়ার ফ্যাক্টর হিসাবে ছিলো। তবে সফলতার পাশাপাশি এই ফাইটারের বেশ কিছু ড্রব্যাকসও ছিলো । যেমন – লো অলটিটিউটে ইন্জিনের কার্যকারিতা হ্রাস, দীর্ঘক্ষন ম্যাক ৩ স্পিডে চলার সমস্যা , হাই ফুয়েল কনজিউম রেট ইত্যাদি।
ঝামেলার শুরু হয় ১৯৭৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর এক সোভিয়েত পাইলট Viktor Belenko তার মিগ ২৫ নিয়ে জাপানের Hakodate Airport এ ল্যান্ড করার পর, যা কিনা আমেরিকানদের ঘাটি হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছিলো। ঐ সময় আমেরিকানরা মিগ ২৫ কে ৬৬ দিন তাদের জিম্মায় রাখে এবং ভালোভাবে পরীক্ষা করে। ঐ সময় তারা মোটামুটি এই বিমানের ব্যবচ্ছ্যাদ করে ফেলে। যা বিপদে ফেলে সোভিয়েতদের।
আমেরিকানরা সংগ্রহীত ডাটা তাদের পরবর্তি বিভিন্ন আপগ্রেডেশনে ব্যবহার করে। যেমন – এয়ার টু এয়ার মিসাইল AIM-54 Phoenix এর আপগ্রেডেশন, এফ ১৬ এর ইন্জিন এর আপগ্রেডেশন ইত্যাদি।

তবে মিগ ৩১ এর বেসিক ডিজাইন শুরু হয় এই সব ঘটনা শুরুর আগেই ১৯৭৫ সালে। সোভিয়েতদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিলো তাদের মিগ ২৫ এর ঝামেলা গুলোকে কমিয়ে মিগ ২৫ সুপার ফক্সব্যাট ভার্সন তৈরি। সেই লক্ষ্যে তারা Ye-155MP নামে একটা প্রোটোটাইপ ও তৈরি করে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিলো এমন একটা বিমান তৈরি যা হাই অলটিউটে ভাল পারফরমেন্সের পাশাপাশি লো অলটিটউতেও মোটামুটি পারফরমেন্স দেখাতে সক্ষম। এই জন্য তারা Ye-155MP প্রোটোটাইপে স্ট্যাকচারাল ম্যাস কমাতে ফ্রেম স্ট্রাকচারে এ্যালুমনিয়ামের ব্যাবহার বাড়িয়ে ৩৩% করে এবং টাইটানিয়াম এর পরিমান বাড়ানো হয় ১৬% এ ।যেখনে মিগ ২৫ এর ফ্রেম স্ট্রাকচারের ১১% এ্যালুমনিয়াম এবং ৯% ছিলো টাইটানিয়াম। Ye-155MP প্রটোটাইপ আকাশে উড়ে ১৯৭৫ সালে।

Ye-155MP প্রটোটাইপ

১৯৭৬ এর ঘটনার পরে সোভিয়েতরা মিগ ২৫ সুপার ফক্সব্যাট এর চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে নতুন কোন ফাইটার তৈরির চিন্তা করতে থাকে। Ye-155MP এর উপরই তারা তাদের রিমডেলিং চালানোর প্ল্যান শুরু করে ।

এর মধ্যে আমেরিকানরা মিগ ২৫ থেকে তাদের সংগ্রহীত ডাটার বিভিন্ন ব্যবহার শুরু করে এবং আমেরিকানরা ১৯৮০ এর মধ্যে তাদের সব ধরনের এন্টি এয়ার রেইডারকে মিগ ২৫ ধরার উপযোগি করার সিদ্ধান্ত নেয়। যা সোভিয়েতদের আরও খেপিয়ে তোলে। পাল্টা ব্যাবস্তা হিসাবে সোভিয়েতরা ডিসিশন নেয় ১৯৮৫ এর মধ্যে তারা তাদের সব মিগ ২৫ কে নতুন কোন ফাইটার দিয়ে রিপ্লেস করবে। :| এর ফলে দুই দেশের মধ্যে বিমান নিয়ে শুরু হয় এক নতুন স্নায়ু যুদ্ধ।

Ye-155MP প্রটোটাইপ কেই সোভিয়েতরা মিগ ৩১ এর জন্য নির্বাচন করে এবং কাজ শুরু করে। প্রটোটাইপের স্ট্যাকচারাল রিমডেলিং আগেই হয়েছিলো এবার শুরু হয় বাকি কাজ। প্রথমেই ছেটে ফেলা হয় মিগ ২৫ এর Tumansky R-15B-300 afterburning turbojets ইন্জিন। কারন এর হাই ফুয়েল কনজিউম রেট পাশাপাশি এর হিট সিগনেচার আমেরিকান মিসাইল গুলোর কাছে পরিচিত হয়ে গিয়েছিলো। বিশেষ করে হিট সিগনেচারের কারনেই সোভিয়েতরা টার্বোজেট ইন্জিন ব্যবহারই বন্ধ করে দেয়। তারা টার্বোজেট কে রিপ্লেস করে Aviadvigatel D30-F6 turbofans দিয়ে। এই ইন্জিন পুর্বের টার্বোজেট ইন্জিন থেকে কম ফুয়েল কমজিউম করত। পাশাপাশি ফুয়েল ট্যাংকের আকার এবং ফুয়েল টাইপ ও পরিবর্তন করা হয়। শক্তিশালি এই ইন্জিনের সাহায্যে মিগ ৩১ এর রেট অফ ক্লাইম্বিং হল মিনিটে ৪১,০০০ ফিট। এছাড়া ইউনিক নজেল ডিজাইনের এর থ্রাস্ট কে এমন ভাবে পাস আউট করে যে হিট সিগনেচার চারপাশে ছড়িয়ে যায়। এতে ইনকামিং হিট সিকিং মিসাইল কিংবা রাডার খুব সহজে এই বিমানের ডিরেকশন বের করতে পারে নাহ।

এর পরেই ধরা হয় মিগের রাডার সিস্টেমকে, মিগ ৩১ এ বিশ্বের প্রথম (PESA) passive electronically scanned array radar Zaslon S-800 ব্যাবহৃত হয়। যা একই সময় ৩৬০* ডিগ্রি এরিয়াল রেন্জ কভার করতে পারতো। ফলে এই বিমানের গ্রাউন্ড রাডার স্টেশনের দরকার পড়তো নাহ। এই Zaslon S-800 এর এরিয়াল রেন্জ এরিয়া ছিলো ২০০ কিলোমিটার। মিগ ৩১ এই রাডারের সাহায্যে ২০০ কিলোমিটারের মধ্যে একই সময় একই সাথে ১০ টা টার্গেট ট্রাকিং এবং ৪ টাতে অট্যাক করতে সক্ষম ছিলো। কোন কারনে অন্য কোন রাডার এর কোন মিসাইল দ্বারা বিমান এইমড হলে এই রাডার তা নিজেই ডিটেক্ট করত এবং প্রয়োজন অনুসারে নিজেই ফ্লেয়ার ছুড়ে দিতো । বেসিক্যালি এই মিগ ৩১ দিয়েই BVR (Beyond-visual-range) এর যুগ শুরু হয়।


Zaslon S-800

এর পরেই পরিবর্তন আনা হয় ককপিটের মধ্যে। মিগ ২৫ এর ইন্টারসেপ্টর ভার্সনে একজন পাইলট থাকলেও মিগ ৩১ এ কাজের চাপ কমাতে তা বাড়িয়ে করা হয় ২ জন, এদের একজন ফ্লাইং এবং অন্যজন থাকে অপারেশন কন্ট্রোলে। এছাড়া ককপিটে এ্যাড করা হয় এলসিডি ডিসপ্লে প্যানেল ,মাল্টিপ্যানেল ফাংশনাল ডিসপ্লে। ককপিটের প্রত্যেকটা পার্ট কেই আপগ্রেড করা হয়।


মিগ ৩১ এর ককপিট

আর্মানেন্ট এ এ্যাড করা হয় ম্যাক ৪.৫ গতি সম্পন্ন Vympel R-33 missile কে যার অপারেশনাল রেন্জ ১৬০ কি.মি. এবং ১৩০ কি.মি. রেন্জের মাঝে এই মিসাইলের সাকসেস রেট ছিলো ৯৬% । এছাড়াও সর্টরেন্জের জন্য R-60 (AA-8 ‘Aphid’) এ্যাড করা হয়। উল্লেখ্য এই সব মিসাইলেই গাইডেন্স ছিলো সেমি এ্যাকটিভ রাডার + হিট সিগনেচার রেইডার এর কম্বিনেশন । সো এদের এড়ানো যথেষ্ট কঠিন কাজ ।


Vympel R-33 missile

মিগ ৩১ এর তৈরি করার সময় সোভিয়েতরা সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রেখেছিলো। তারপরেও এই বিমান আমেরিকান স্যাটেলাইটের রিকনে ধরা পড়ে তবে আমেরিকানরা এটাকে সু ২৭ এর প্রোটোটাইপ মনে করে তেমন গুরুত্ব দেয়নি।

সব ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষ করে এই বিমান সিরিয়াল প্রোডাকশনে যায় ১৯৭৯ সালে এবং সার্ভিসে আসে ১৯৮২ সালে। এই পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মিগ ৩১ প্রস্তুত হয়েছে।


টোটাল স্পেফিকেশন :

পাইলট : ২ জন (পাইলট এবং অপারেশন অফিসার)
লেংথ: ৭৪ ফিট ৫ ইন্চি
উইং স্প্যান : ৪৪ ফিট
শক্তির উৎস:2 × Soloviev D-30F6 afterburning turbofans

পারফরমেন্স –

সর্বচ্চো গতি :
ক্রুজিং (হাই অলটিটউডে): ম্যাক ২.৫ (২৪০০ কি.মি./ঘন্টা )
ক্রুজিং (লো অলটিটউডে): ম্যাক ১.৫ (১৬০০কি.মি./ঘন্টা )
আফটার বার্নিং (হাই অলটিটউডে): ম্যাক ২.৮ (৩০০০ কি.মি./ঘন্টা )

রেন্জ :
কমব্যাট রেন্জ : ১০০০ কি.মি.
ফেরি রেন্জ : ৩৩০০ কি.মি.
*সার্ভিস সিলিং : ৬৭,৫০০ + ফিট

আর্মামেন্ট :

* ২৫০ রাউন্ড হেভি বুলেট সহ ১টা ৬ ব্যারেল GSh-6-23 ক্যানন
* ৪ টা Vympel R-33 এয়ার টু এয়ার মিসাইল
* ৪টা R-60 (AA-8 ‘Aphid’) সর্ট রেন্জ এয়ার টু এয়ার মিসাইল
* ২টা R-40TD1 (AA-6 ‘Acrid’) মিসাইল
* ২টা Kh-31P (AS-17 ‘Krypton’) এন্টি রাডার মিসাইল।

এবার আসা যাক এর রেকর্ড আর পারফরমেন্সের দিকে। মিগ ৩১ এখনও পর্যন্ত আক্রান্ত না হওয়া একটা বিমান। ১৯৮৫ সালে একটা মার্কিন রিকন এয়ারক্রাফট ব্ল্যাকবার্ড কে ধাওয়া করার সময় মিগ ৩১ সোভিয়েত এয়ার এরিয়া ক্রস করে নরওয়ের ব্যারেন্টস সি এরিয়ায় প্রবেশ করলে মিগ ৩১ এ প্রথম ছবি তুলে নরওয়ের এক পাইলট। তবে ঐ ৬৭৫০০ ফিট উপর দিয়ে চলা ঐ মিগ ৩১ কে নরওয়ের রাডার ডিটেক্ট করতে পারেনি। কারন তাদের কাছে তেমন রাডার ছিলো নাহ । ন্যাটো একে কোড নেম দেয় “ফক্সহাউন্ড”
পশ্চিমা বিশ্ব এখনো এই সোভিয়েত বিস্টকে যথেষ্ট সমীহ করে চলে। যে কারনে সিরিয়া ২০০৭ সালে ৮টা মিগ ৩১ অর্ডার করলে ইসরাইলি এবং আমেরিকানরা সেই অর্ডার ঠেকায় মরিয়া হয়ে। কারণ এখনো এই বিমানকে ঠেকানো যথেষ্ট কঠিন।

সব মিলিয়ে মিগ ৩১ ইন্টারসেপ্টর একটা আইকন

 

http://www.somewhereinblog.net/blog/sadharonmanush/29376841

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: