ছ্যাঁচানামা

জলপাই ছ্যাঁচা

ঘটনাটা অনেক বছর আগের। একটা বেসরকারী ব্যাংকে কয়েক মাস ধরে চাকরি করি। বৈদেশিক বাণিজ্য শাখায় আমার কাজ এলসি ওপেন করা। ব্যাকটুব্যাক এলসির কাজই বেশি; খুব ঘোরপ্যাঁচের কিছু না হলে বসের চেম্বারে তেমন একটা ডাক পড়ে না। একদিন সেরকম একটা তলব পেয়ে গিয়ে দেখি মাঝবয়েসী এক সেনাকর্তা বসে আছেন। পরনে জলপাই উর্দি, সঙ্গে পাইক-বরকন্দাজ, টেবিলে জমজমাট আপ্যায়নের নমুনা। জানলাম, সেনা কল্যাণ সংস্থার গম ভাঙানোর কারখানার জন্য মেশিনপত্তর আমদানি করবেন। লেইটেস্ট ফরম্যালিটিজ জানতে চান। তখনও একাডেমিক ছাত্রত্ব শেষ হয়নি আমার (চাকরিটা জুটেছিল ব্যাচেলরের অ্যাপিয়ার্ড সার্টিফিকেট দিয়ে), তাই নিয়ম-কানুন শিখতাম যত্ন করে। খানিকটা বলেছি, অমনি সেনাকর্তা উঠে দাঁড়ালেন। আরেকদিন এসে বাকীটা শুনবেন। আমিও উঠে পড়ি। আর ওদিকে আমার বস পারলে তাকে কোলে করে গাড়িতে তুলে দিয়ে আসেন।

তো পরদিন তিনি এলেন; পরনে জলপাই উর্দির বদলে কটকটে বেগুনী রঙের শার্ট, ধারেপাশে সাঙ্গপাঙ্গ নেই। যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন একটা সিভিল-চেহারা ধারণের। সেনাকণ্ঠও আগের দিনের চেয়ে অনেক মোলায়েম। ম্যানেজার সাহেবকে বোঝালেন, তাকে আর দশজন ক্লায়েন্টের চেয়ে আলাদা করে না দেখলেই তিনি খুশি হবেন। তারপর আমার ডেস্কের সামনে এসে বসলেন। আমদানি হবে সুইৎজারল্যান্ড থেকে; সে হিসেবে এলসি ভ্যালু, কমিশন, ভ্যাট এসবের এস্টিমেট দিই। এরপর নানা প্রশ্ন; তার ভাষায় সাপ্লিমেন্টারি কোয়্যারি। ইন্ডেন্টে আনে কীভাবে, পিএসআই হলে কী হতো ইত্যাদি ইত্যাদি।

উত্তর দিতে দিতে ততক্ষণে আমি একটু বিরক্ত। আরে বাবা, ফর্মে সিলছাপ্পড় মেরে অ্যাকাউন্টে দশকোটি টাকা ফেলে রেখে যা; তোর এলসি তুই ক্যান্টনমেন্টে বসে পাবি; আমার মুখ খরচাচ্ছিস কেন! মনের ভাবটা মুখে না ফোটানোর কায়দাটা তখনও ঠিকমতো রপ্ত হয়নি আমার। ভদ্রলোক বোধহয় সেটা বুঝেই প্রসঙ্গ পাল্টালেন। ভার্সিটির ক্লাস-বন্ধু এসব মিস করছি কিনা, “মনে হয় না– সোমবার সকাল, মঙ্গলবার দুপুর, বুধবার বিকেল– জীবন থেকে এসব হারিয়ে গেল?”

এবার সত্যি-সত্যিই অবাক হই। এই ব্যাটা ইয়ার টুয়েলভের পর থেকে খোঁয়াড়ে আছে, এসব কি তার বোঝার কথা! ভাবনাটা বোধহয় আমার চেহারায় বোল্ড লেটারে লেখা ছিল। তড়িঘড়ি বললেন, “আরে আমিও তো ভার্সিটি লাইফ কাটিয়ে এসেছি, আমি বুয়েটের ছেলে, ইঞ্জিনিয়ারিং কোর… । আচ্ছা আজ আসি, ফোন করব কিন্তু।”

উঠে দাঁড়িয়ে যাবার আগে বছর পঞ্চাশের “ছেলে”টি আমার দিকে তাকিয়ে বাঁ চোখ টিপলেন। ভুল দেখলাম না ঠিক দেখলাম বুঝে ওঠার আগেই আবার একই কাণ্ড; এবার ডান চোখ, পরপর দু’বার। লজ্জাঘৃণাঅপমানে আমাকে স্তম্ভিত করে দিয়ে, বদমায়েশী একপেশে হাসি হাসতে হাসতে, বেগুনী জলপাই অদৃশ্য হলেন।

ব্যাংকে ক্ষমতাবান ক্লায়েন্টের দুর্ব্যবহার একেবারে অচেনা কিছু না। তারপরও এধরণের অভিজ্ঞতা এর আগে আমার কখনো হয়নি। মনের দুঃখে ঘটনাটা লজমেন্ট ডেস্কের মান্নাভাইকে বলি। আমাদের কিছু জয়েন্ট স্টেইটমেন্ট ছিল, সেজন্য সবসময় কথাবার্তা হত; তাছাড়া বড়ভাইসুলভ একটা ব্যাপার উনার মধ্যে ছিল। প্রতিকারের কিছু নেই, আমার আশা ছিল শুধু একটু সমবেদনার। কিসের কী, ঘটনা শুনে মান্নাভাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। তারপর যেটা করলেন তার পরিণাম বিশেষ সুবিধার হলো না আমার জন্য। একটু পরপর, কলিগদের কেউ না কেউ, এসে হাজির আমার ডেস্কের সামনে।

ইয়ে মানে ম্যাডাম, কী যেন শুনলাম…
মিস তাজরীন আর ইউ ওকে?…
ও আপা, এইটা কী হইল, কে বলে আপনেরে “এরোম এরোম” করে দিছে…

আমি হতবাক। ম্যানেজার ইন্টারকমে জানতে চাইলেন, সেদিন আমার জন্মদিন কিনা। কাঁচঘরের মধ্যে থেকে দেখে ভেবেছেন সবাই উইশ করতে আসছে। ব্রাঞ্চটা বিশাল, সত্তরের ওপর স্টাফ; এরা আমার খবর করে দিলো। যাদের সঙ্গে একটু বেশি খাতির ছিল, তারা আবার আরেক কাঠি সরেস। বাজারে পিওন পাঠিয়ে জলপাই আনালেন; তাতে কারেক্টিভ হোয়াইট ফ্লুইড দিয়ে বিশেষ কায়দায় চোখ এঁকে উপহার দিলেন। ততক্ষণে আমিও হাসছি, আর ভাবছি শোধটা কেমন করে নেয়া যায়।

বদলা নেয়ার প্ল্যানিং কমিটিতে আমরা চারজন। অনেক ভাল ভাল প্ল্যানও বাতিল করে দিতে হলো শুধুমাত্র টার্গেট জলপাই বলে। শেষমেষ সেমি-অফিসিয়াল রাস্তাতে হাঁটাই সাব্যস্ত হলো। ম্যানেজারকে বোঝানো হলো এদের হাতে আরো এলসি আছে, টার্গেটের তিনগুণ প্রফিট নিশ্চিত, তবে অন্য ব্যাংকের নজরও আছে এদের দিকে। এই লক্ষ্মী বশে রাখতে হলে কিছু ছাড় দিতেই হবে। জলপাইকে দুটো ডিপিএস আর জলপাইয়ের বউকে একটা স্পেশাল লকার খুলে দেয়া হোক। আগেও এমন করা হয়েছে, আর এবার তো ঘাটে ঘাটে লোক বসানো। সবাই বসকে সবুজ সংকেত দেয়। বসও মরিয়া, সামনে তার প্রোমোশনের সুযোগ। আর জলপাই, সে তো মাগনা পেলে উড়োজাহাজ মার্কা আলকাতরাও খায়।

অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত দিনটি আসে। সকাল থেকে আমার আর কাজে মন বসে না। ফ্যাব্রিক্সের এলসির প্রোফর্মা ইনভয়েস কোট করতে গিয়ে kiss red কে kill red টাইপ করি। ভুলভাল ভাউচার ছেড়ে ক্লিনক্যাশের খেঁকুড়ে মনির সাহেবের বিরক্তি চরমে তুলি। অবশেষে মিস্টার অ্যান্ড মিসেস জলপাইয়ের আগমন-সংবাদ পাই।

জীবনে প্রথম ডেটিংয়ে যাবার সময়ও কারো বুকে এতো জোরে হাতুড়ি পেটা হয় না; আমার যেমন হচ্ছিল। ম্যানেজারের চেম্বারে গিয়ে সাধ্যমতো তমিজে জলপাইয়ের বউকে আমার সঙ্গে লকার দেখতে যাবার আমন্ত্রণ জানাই। জলপাইও উঠতে চান; ম্যানেজারের পিএ বাধা দেয়। লকার রুমটা ন্যারো, পাশাপাশি দুজনের বেশি দাঁড়ানো যায় না, স্যারের কষ্ট হবে।

যুদ্ধবন্দী সঙ্গে নিয়ে হাঁটার আনন্দে লকার রুমে যাই। লকারের চাবিটা গর্তে ঢুকিয়ে মোচড় দিই না, আঙুলে চেপে রেখে বলি, “স্যারের চোখের সমস্যাটা কি কমেছে ম্যাডাম?” … “হোয়াট, কোন্ সমস্যার কথা বলছ তুমি!”– ঝাকানাকা শাড়ি আর তসলিমা-কাট চুলের জলপাইগিন্নী এই প্রথম আমাকে নজর করে দ্যাখেন। চোখদুটো একটু সরু হয়েই আবার যথাস্থানে পজিশন নেয়। একটু যেন ভয়ের ছায়া সেই চোখে। হয়তো জলপাই-চরিত পুরোটাই তার পড়া। ভদ্রতার রিস্কে না গিয়ে সোজা বলে দিই, ‘সেদিন আমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে “এরোম এরোম” করছিলেন তো …’

সেদিন লাঞ্চের পর আমরা ক’জন নুন-মরিচ মাখানো জলপাই খেয়ে সেলিব্রেট করছি। “থুঃ জলপাই থুঃ” বলে পলিথিন ব্যাগে জলপাইর বীচি ফেলছেন কম্পিউটার ডিপার্টমেন্টের তওহীদ ভাই। আমার জোশ এসে গেল; পেপারওয়েট দিয়ে একটা জলপাই ছেঁচতে ছেঁচতে বললাম, ‘দিলাম ছ্যাঁচা জলপাইরে!’ কপাল খারাপ, কেউ একজন এটাকে জলপাইর “বীচি” ছ্যাঁচা হিসেবে পিক করে ফেলল ।

পরবর্তী ঘটনাটা না হয় আর নাই বললাম।

http://www.choturmatrik.com/blogs/%E0%A6%A8%E0%A7%81%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0%E0%A6%BE/%E0%A6%9B%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%81%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%BE-%E0%A7%A7

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: