মার্কিন মুল্লুকে-২: ড্রিম জব

“ড্রিম জব” বলে একটা কথা আছে। এটা আমার জন্য প্রযোজ্য নয়। আমি স্বপ্নে কোনোদিন কাজ করি না। বরং স্বপ্নে দেখি যে আমি উঁচু এক পাহাড়ের চূড়ায় বসে আছি। সেখানে মেঘ এসে আছড়ে পড়ে। কাছেই আছে স্টারবাকস কফির দোকান, সিগারেটের একটা প্যাকেটও আগে ছিল কিন্তু ঐ নেশা ছাড়ার পরে স্বপ্ন থেকে ওটাকে পরিত্যক্ত করেছি। অল্পসল্প রঙ্গিন পানি থাকলেও মন্দ না, এছাড়া নেটফ্লিক্স মুভি, চিকেন বিরিয়ানী, ডালপুরি, চটপটি, শিক কাবাব, ঝালমুড়ি – এই সামান্যতেই আমি খুশি। কিন্তু স্বপ্নে কাজ করার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবি নি!

আমি বেশ অলস মানুষ, এই বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। আমার বন্ধুদের ধারণা জমিদারপ্রথা চালু থাকলে আমি ক্রেডিট কার্ড ঘষে টষে একটা জমিদারি কিনতাম। বিনা পরিশ্রমে প্রজাদের সম্পদ লুণ্ঠন করে নাচগান আর গরীব মানুষের জন্য অশ্রু বিসর্জন করে দিন কাটাতাম। আমার উত্তর পুরুষরা আমার আলস্য (জমিদারী) নিয়ে হয়ত রীতিমত গর্ব করত। কিন্তু কিছুই হয়নি, আমাকে সকালে অফিসে আসতে হয় বিরসবদনে…কিন্তু জীবনে একবার একটা ড্রিম জব প্রায় পেয়ে গিয়েছিলাম। এই গল্প সেটা নিয়েই।

আমি তখন নতুন এসেছি আমেরিকাতে। টেক্সাস টেকের রেডনেক ছাত্ররা আমাদের বলে “পিগস”। এর মানে হচ্ছে পুওর ইন্ডিয়ান গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ড, দারিদ্র আমাদের সাথে হাতধরাধরি করে চলে। আমাদের বই কেনার পয়সা নেই, অন্যের বই ধার করে ফটোকপি করতে হয়। হেঁটে হেঁটে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই, মাঝে মাঝে ছাত্রাবাস থেকে বেলুনভর্তি পানির গোলা ছুঁড়ে মারে বদমাশগুলো। ইন্টারন্যাশানাল স্টুন্ডেট এডভাইজার মাইকেল মার্ফির মতে এই ক্যাম্পাসের মত শান্তিময় জায়গা আর গোটা আমেরিকাতে নেই – ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ও একটা মিছিল হয় নি এখানে!!!

আমি এইসব জিনিস গায়ে মাখি না। দিনরাত আমি একটা কাজ খুঁজছি। ক্লাস শুরু হতে একটু বাকি আছে, প্রফেসররাও একটু কম ব্যস্ত। এই সময় ওনাদের মন নরম থাকে, হাড়ে রাগের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কম। একটা কাজ জোটানোর এটাই সময়। আমি আপাতত দাঁড়িয়ে আছি ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্মেন্টের হেড ডঃ জন ব্রেডেসনের রুমের সামনে। উনি ফোনে কথা বলছেন, হাতে একটু সময় আছে, আমি চারদিক দেখছি। উনার রুমটা আমাদের বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল ডিপার্টমেন্টের হেড সিদ্দিক হোসেন স্যারের রুমের চেয়ে ছোটই হবে। রুমটা একদম বিশেষত্বহীন, স্যারের বাথরুম পেলে উনাকেও দৌড়ে যেতে হবে অনেকটা দূর। এবার আমার দিকে চোখ ফেরানো যাক। আমি শুধু বঙ্গসন্তান নই, আপাদমস্তক বঙ্গবাজার সুপার মার্কেট থেকে কেনা কাপড় পরে আছি। প্যান্টটা অল্টার করে একটু দৈর্ঘ্য কমাতে হয়েছে, যার ফলে ওটার অবস্থা হুমায়ূন আহমেদের ছোট গল্পের মত অর্থাৎ দেখলে মনে হবে হঠাৎই শেষ হয়ে গেছ। জামাটাতে হলুদ দাগগুলো ডিজাইনারের করা নয়, ওগুলো ডাল খাওয়ার সময় দুর্ঘটনা থেকে হয়েছে।

“ইয়েস, হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ…?”

স্যারের ডাকে সম্বিত ফিরে পাই আমি।

“স্লামালাইকুম স্যার…” মাথা নেড়ে বলেই জিব কাটতে হলো। এগুলো হচ্ছে কালচারাল শক, উনি সিদ্দিক হোসেন নন, জন ব্রেডেসন, সালাম কী জিনিস তা জানেন না।

আমার অবাক করে ডঃ ব্রেডেসনও মাথা নাড়লেন। দূর থেকে উনি সালাম শুনেননি মনে হয়, ওটা হ্যালো ভেবে ওয়ালাইকুম হ্যালো দিয়েছেন।

আমি আমার উদ্দেশ্য উনাকে ব্যক্ত করলাম। একটা কাজ পেলে ভালো হয়। উনার কোনো রিসার্চ এসিসট্যান্ট দরকার হলে এই বান্দা জীবন দিয়ে সেই কাজ করবে এটাও জানালাম।

“তুমি সি প্লাস প্লাস জানো?”

এটার উত্তর এককথায় দেওয়া যায়। আমি সি++ জানি না। সেই সময় বুয়েটে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লে ফোরট্র্যান ছাড়া আর কোনো কিছু শেখা যেত না। ফোরট্র্যান দিয়ে মনে হয় মিউজিয়ামে চাকরি খুঁজতে হবে। অনেকদিন আগে আমাদের বাসার কাজের ছেলে রফিকের রিক্রুটমেন্ট ইন্টারভিউতে আমি উপস্থিত ছিলাম। আম্মা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে সে রাঁধতে জানে কি না। রফিকের চেহার দেখে উত্তরটা বেশ বোঝা যাচ্ছিল কিন্তু একটা মরিয়া ভাব নিয়ে সে জবাব দিয়েছিল – রান্না সে দ্রুতই শিখে ফেলবে। আমি ঠিক সেই রকম মরিয়া হয়ে জানালাম যে আমিও সি++ শিখে ফেলব।

“আমার তো দরকার ইমেডিয়েট আউটপুট…আচ্ছা তোমার কথা আমার মনে থাকবে…”

আমি এইবার অন্য একজনকে পাকড়াও করি। লর্ড ভানু বন্দ্যোপাধ্যয় বলেছেন যে চাকরির জন্য সৌরজগতের যে কোনো জায়গায় যাওয়া যেতে পারে। আমিও যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত। সার্কিট ডিজাইন থেকে এম্বেডেড সিস্টেমস সব বিষয়েই আমার সমান জ্ঞান – অর্থাৎ কিছুই জানি না।

“ফাইবার অপ্টিকের ট্র্যান্সমিশন উইন্ডোর ব্যাপারটা জানো তো?”

এবার টেনিদার কথা মনে পড়ল। প্রাণীতোষিণী মহাপরিনির্বানের পাতা উল্টেয়িছো কোনোদিন? টেনিদার আঁতকে উঠে বলল…আজ্ঞে না…উল্টাতে চাইও না। বড় ভাইয়ের বিয়েতে ফাইবার অপ্টিকের একটা লতা উপহার দিয়েছিল কেউ, আমি ওটাকে বসবার ঘরের প্লাগে লাগিয়েছিলাম। বিজ্ঞানের এই অনবদ্য আবিষ্কার নিয়ে আমার কাজ ঠিক ওইটুকুই।

“তোমার রিসার্চ ইন্টারেস্ট কী?” অন্য একজন প্রশ্ন করেন।

প্রফেসর ঠিক যেই কাজ করেন আমার রিসার্চ ইন্টারেস্ট ঠিক তা-ই হয়ে যায়। কিন্তু আসল উত্তর হবে আমার কোনো রিসার্চ ইন্টারেস্ট নেই (মাধুরী দীক্ষিত ছাড়া), একটা কাজ দিলে আমি জুতা সেলাই থেকে চন্ডিপাঠ সব কিছুই শিখতে রাজী আছি।

সবাই এরকম টুকটাক প্রশ্ন করেন। কেউ ইমেজ প্রসেসিং, কেউ পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স, কেউ বা সেমিকন্ডাকটার নিয়ে। সব প্রশ্নের জবাবেই আমি দ্রুত শিখে ফেলার আশ্বাস দেই। আমার ভগ্নহৃদয় আর জ্ঞানের পরিমাণ দেখে একজন আমাকে জানালেন যে ইউনিভার্সিটি সেন্টারে একজন ঝাড়ুদার নিয়োগ হবে, আমি চাইলে সন্ধ্যায় সেখানে যেতে পারি। কাজটা সন্ধ্যা বেলাতেই। ইউনিভার্সিটি সেন্টার হচ্ছে আমাদের টিএসসির মত, সারাদিনই ছাত্রছাত্রীদের ভীড়ে গমগম করে জায়গাটা।

শ্রমের মর্যাদা হচ্ছে বেতনের পরিমাণে। বিশ ঘণ্টা ঘর ঝাড়ু দিলে চলে যাবে মোটামুটি- এই ভেবে হাজির হলাম সেখানে। ইউনিভার্সিটি সেন্টার বা ইউসির পাশেই সেন্ট্রাল লাইব্রেরি, মাঝে বসার ছিমছাম কিছু জায়গা আছে। ঝাড়ুদারদের সর্দারনী হচ্ছে একটা মেয়ে, দেখতে-শুনতে দারুণ। হিমুর বর্ননা ধার করে বলতে হয় মেয়েটা দেখতে বেশ “ইয়ে”। ধরা যাক তার নাম জুলি। দিনের বেলা বিজনেস স্কুলে পড়ে আর সন্ধ্যায় ইউসির ঝাড়ুদারদের তদারকি করে। বয়স একুশ-বাইশ হতে পারে। দেশে থাকলে এই কাজ আর করতে হতো না তাকে, অনায়াসে জলিল ভাইয়ের নায়িকা হতে পারতো সে। ইউসির পাশের সেই ছিমছাম জায়গায় আমাকে নিয়ে বসল সে। জুলি একটা সিগারেট ধরালো, আমাকেও দিল একটা। আমি প্রশ্নের অপেক্ষায় আছি। সব প্রশ্নেরই তো একই উত্তর।

ফস করে ধোঁয়া ছেড়ে বলল…

“আচ্ছা ছেলেদের বাথরুমের ইউরেনাল…যেখানে দাঁড়িয়ে তোমরা হিসু করো…সেটাতে প্রচুর চুল পড়ে থাকে দেখি…পুরুষ মানুষ মনে হয় প্রতিবার বাথরুমে গেলেই একটু করে চুল হারায়…এরকম চললে তো ওইখানে টাক পড়ার কথা…কিন্তু আমি একটাও ব্যাটা মানুষ দেখিনি যার ওইখানে টাক…ব্যাপারটা কী বলত?” (এখানে চুলটাকে হিন্দিতে অনুবাদ করলে আপনারা যথার্থ ভাবটা ধরতে পারবেন, এই ভাষাটা আসলেই অনেক গূঢ়)।

আমি হঠাৎই আমার ড্রিম জবটা দেখতে পেলাম। এই বুদ্ধিমতি মেয়েটার সাথে কাজ না করলে জীবনের বারো আনাই মাটি। লোকে বলে যে ব্লন্ডরা বেকুব হয় – এটা মনে হয় সত্যি না । সৌন্দর্য আর বুদ্ধিমত্তাও ঈশ্বর মাঝে মাঝে একসাথে দিয়ে দেন, যদিও উনি টায়ার্ড থাকলে এসব ঘটনা ঘটে।

“শোনো এই কাজ যেকোন গাধাও করতে পারবে – রাত দশটার মধ্যে কাজ শেষ…পার্টি ও গেটিং লেইড…এই কাজ করে সবই করা সম্ভব…” কাজের বেনেফিটগুলো তুলে ধরে সে।

আমি সাথে সাথেই রাজি। কথা হলো পরের সোমবার থেকে কাজ শুরু করব আমি। কিন্তু আমার ভাগ্য ওই চুলের মতই। সোমবারের আগেই জানলাম যে আমার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে আমাকে এক প্রফেসর বিশ ঘন্টা কাজ দিয়েছেন। ইমিগ্রেশনের নিয়ম অনুযায়ী আমি বিশ ঘন্টার বেশি কাজ করতে পারবো না, ড্রিম জব শুধু মরিচিকাই রয়ে যায়।

আমি এরপরে অনেক কাজই করেছি। এখনও করে যাচ্ছি। মোটাসোটা সব লোকজন আমার সহকর্মী, তাদের প্যান্টগুলো ভুড়ি পিছলে প্রায়ই বিপদজ্জনক স্থানে নেমে আসে। দুপুরে তারা হুপুস হাপুস চিজ পিৎসা আর ডায়েট কোক খায়। ওদের দোষ দেই কেন, আমার নিজের অবস্থাও তথৈবচ। সুন্দরী এবং বুদ্ধিমতি সহকর্মী আর হলো না এই জন্মে…না হলো পাহাড়ের চূড়ায় থাকা।

সবই ভাগ্য বুঝলেন ভাই, সবই ভাগ্য।

http://www.sachalayatan.com/tmhossain/37150

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: